অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

ব্যালান্স

গোত্রপ্রধান যেমন দাম্ভিক, তেমন জালিম। তাঁর হুকুম অমান্য করলেই কড়া শাস্তি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গোত্রের সব সদস্যকে যে তিনটি বাক্য শপথ পাঠ করার মতো বলতেই হয়, তা হলো: সূর্য পশ্চিম দিকে উঠেছে, অল্পতেই সুখী আমরা এবং গোত্রপ্রধান জিন্দাবাদ। যে বা যারা ব্যত্যয় করে, তার বা তাদের ওপর নেমে আসে নৃশংস অত্যাচারের খড়্গ। নব্বই বছরের এক বৃদ্ধ বয়সের কারণেই হোক কিংবা বংশপরম্পরায় হোক, তাঁর মস্তিষ্কে ডিমেনশিয়া ভর করে আছে। তিনি প্রায়ই নিজের নাম ও বয়সের কথা ভুলে যান; কিন্তু সদা সতর্ক থাকেন বাক্য তিনটির যেন কোনো হেরফের না হয়। একদিন প্রবল জ্বরের ঘোরে বলে ফেললেন, সূর্য পূর্ব দিকে উঠেছে। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ মিসটেক গোত্রপ্রধানের কানে গেল।

তাঁর নিয়োজিত কর্মী বাহিনী ও সদস্যদের ডাকলেন।

গোত্রপ্রধান অদ্ভুত ধরনের সাজগোছ করে বিচারকার্যে আসেন এবং প্রায় অর্ধ–উলঙ্গ হয়ে বিশেষ ধরনের গদি–আঁটা চেয়ারে বসেন। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য চেয়ারের ওপর ছাউনি; হেলান দেওয়ার অংশে বাঘের ছাল; আর হাতল দুটো হরিণের চামড়ায় মোড়ানো। পেছনে সুডৌল স্তনের দুজন নগ্নবক্ষা নারী। পায়ের কাছে দুজন স্বাস্থ্যবান যুবক উপুড় হয়ে থাকবে। তাদের পিঠের ওপর সদস্যদের দেহ থেকে সুচ দিয়ে টানা রক্ত মিশিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের মদ; আর তার সঙ্গে বাঁশের খোলের গ্লাস। বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুবকদ্বয় একচুল নড়াচড়া করতে পারবে না। এমনকি জোরে শ্বাসও নিতে পারবে না। যদি করে কিংবা নেয়, তাহলে কঠিন শাস্তি। বাঘের খাঁচায় নির্মমভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তাদের। তাঁর কিম্ভূতকিমাকার দশাসই দেহের ভেতর দূষিত জীবাণুর মতো লুকিয়ে আছে একটা কুৎসিত মন। বাঘ যখন তাদের ছিঁড়েফেঁড়ে খায়, তখন তিনি আরাম করে হাসেন।

আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই জড়ো হয়েছে।

অভিযুক্ত বৃদ্ধের ঊর্ধ্বাঙ্গে কাপড়ের লেশমাত্র নেই। গলায় লোহার ভারী আংটা। দুহাত ওপরের দিকে কড়িকাঠের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা। মাথা নিচের দিকে ঝোলানো। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। দাঁড়াতে পারছিলেন না ঠিকমতো। ‘আমি নির্দোষ’—একই কথা বারবার বলছেন বৃদ্ধ। কিন্তু কে শোনে তাঁর কথা! গোত্রপ্রধানের ভয়ে সবাই তটস্থ। বৃদ্ধের পক্ষে টুঁ শব্দ করার মতো কেউ নেই। এমনকি জঙ্গলের পাতারাও নড়ছিল না। বাতাস থমথমে। জন্তুজানোয়ারগুলো কেমন যেন ভাবলেশহীন!

অভিযুক্ত বৃদ্ধের ঊর্ধ্বাঙ্গে কাপড়ের লেশমাত্র নেই। গলায় লোহার ভারী আংটা। দুহাত ওপরের দিকে কড়িকাঠের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা। মাথা নিচের দিকে ঝোলানো। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। দাঁড়াতে পারছিলেন না ঠিকমতো। ‘আমি নির্দোষ’—একই কথা বারবার বলছেন বৃদ্ধ। কিন্তু কে শোনে তাঁর কথা!

গোত্রপ্রধান রক্ত মেশানো মদ গ্লাসে ঢাললেন, তারপর মুখে নিলেন; তবে ঢোঁক গিললেন না। পেছন ফিরে নগ্নবক্ষা রমণী দুজনের বুকে পিচকারির মতো মুখের মদ ছুড়ে তাঁর অভিব্যক্তি আরও কঠিন করে তুললেন। সিংহের মতো ঘাড় দুলিয়ে এবার অভিযুক্ত বৃদ্ধের দিকে হিংস্র চোখে তাকালেন, ‘আমি বাক্‌স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। মনখুলে কথা বলো, তবে আমি যা চাই বা যেভাবে চাই, তোমাদের সেভাবেই কথা বলতে হবে!’

‘আমি নির্দোষ,’ বৃদ্ধ আবারও বললেন।

‘কেউ যখন আমার আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে, তার মানে আমি প্রহসনের বিচার করতে বসেছি! নরাধম! এত সাহস আসে কোত্থেকে?’ গোত্রপ্রধান ক্ষিপ্ত ভঙ্গিমায় বললেন। পরক্ষণে গলার স্বর ভারী করলেন, ‘কে দোষী আর কে নির্দোষ, তা নির্ধারণ করব আমি।’ এবার তাচ্ছিল্যের সুরে, ‘তুই কেডা রে?’

‘ন্যায়বিচার করুন,’ বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে বললেন।

‘অপরাধীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া মানেই ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করা। তা ছাড়া যারা আমাকে সবক দেওয়ার সাহস করে, তাদের বিরুদ্ধে আমার রায় নিঃসন্দেহে আরও ভয়াবহ।’ গোত্রপ্রধান আবারও গ্লাসে মদ ঢাললেন। গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে হুংকার ছাড়লেন, ‘তোমাদের জন্য যে তিনটি সত্য ফরজ করে দিয়েছি, তার মধ্যে এক সত্য বলতে ভুলে গেছে সে। এই অপরাধেই অপরাধীর পুরো জিহ্বা কেটে ফেলার হুকুম দিতে পারতাম, কিন্তু দিলাম না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তার জিহ্বার তিন ভাগের এক ভাগ কর্তন করো।’

যেমন হুকুম তেমন কাজ। ফিতা দিয়ে বৃদ্ধের জিহ্বা মাপার পর এক ভাগ কেটে আনা হলো। বৃদ্ধের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হলো। এমন রোমহর্ষ দৃশ্য উপস্থিত নারী ও শিশুদের হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দিল। কেউ কেউ ভয়ে মূর্ছা গেল। গোত্রপ্রধানের হিংস্রতা এখানেই শেষ হলো না, তিনি কাটা জিহ্বা মদ দিয়ে ধুয়ে নিলেন, তারপর মুখে নিয়ে আয়েশ করে চিবোতে লাগলেন। মেঘশিরীষের পাতারা বেশ ঘন ও সাবালক। পাতার ঝাড় থেকে হঠাৎ একটা বিশাল পাখি দুর্বোধ্য ডাক দিয়ে উড়ে উঠল। পোত্রপ্রধানের কান দুটো বেহায়া, তাঁকে বিভ্রান্ত করল। তিনি শুনতে পেলেন ‘জিহ্বাখেকো’। তাঁর মেজাজের পারদ লাফালাফি করল। কর্মীদের হুকুম দিলেন, যেভাবেই পারো যেখান থেকেই পারো, পাখিটাকে জীবিত ধরে আনতে হবে। তাঁকে নিয়ে মশকরা করার ফল পাখিটাকে পেতেই হবে।

জনাকতক সঙ্গে সঙ্গে পাখির পেছনে ছুটল।

গোত্রপ্রধান তাঁর গোত্রের যেকোনো নারীকে যেকোনো সময় ভোগ করার অধিকার রাখেন; এমনকি রজঃস্বলা নারীদেরও। পর্বতসমান উঁচু নিতম্বের এক নারীকে বগলদাবা করে ঘরে ঢুকলেন। কামুক হিসেবে নারীদের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ তিনি। অনেকেই তাঁর কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকে।

‘কেউ যখন আমার আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে, তার মানে আমি প্রহসনের বিচার করতে বসেছি! নরাধম! এত সাহস আসে কোত্থেকে?’ গোত্রপ্রধান ক্ষিপ্ত ভঙ্গিমায় বললেন। পরক্ষণে গলার স্বর ভারী করলেন, ‘কে দোষী আর কে নির্দোষ, তা নির্ধারণ করব আমি।’ এবার তাচ্ছিল্যের সুরে, ‘তুই কেডা রে?’

তির-বল্লম ছোড়ার পরও পাখিটা নাগালের বাইরে রইল। তারা ফন্দি আঁটল, যেকোনো একটা পাখি শিকার করে আগুনে ঝলসাবে, তারপর গোত্রপ্রধানের হাতে তুলে দেবে। তারা একটা দাঁড়কাক আগুনে ঝলসিয়ে গোত্রপ্রধানের কাছে ফিরে এল। তিনি খুশি হলেন না। তাঁর নির্দেশমতো কাজ না করায় তেড়েফুঁড়ে এলেন, ‘গর্দভের দল! পাখির রোস্ট চাইনি আমি। জীবিত চেয়েছি। তোমরা আমার হুকুম অমান্য করেছ! কারও ওজর–আপত্তি শুনতে অভ্যস্ত নই আমি! তবে শুধু প্রশংসা করলে অখুশি হই না। কারণ, সব প্রশংসার দাবিদার আমি। তোমাদের রক্ত চুষে চুষে খাব, জীবন কেড়ে নেব, তবু তোমরা তোতাপাখির মতো বলবে, হে মহান! হে দয়ালু!’

হে মহান! হে দয়ালু! তারা সমস্বরে বলল।

‘যাও! প্রায়শ্চিত্ত করো!’ তুচ্ছ বিষয়েও তাঁর দণ্ড ভয়াবহ নির্মম। চাবুকে চাপকিয়ে চাপকিয়ে তাদের শরীর রক্তাক্ত করে আবার বললেন, ‘দৌড়াও! দৌড়াতে থাকো। যতক্ষণ না তোমাদের মৃত্যু নিশ্চিত না হচ্ছে।’

তারপর তাদের পেছনে তাঁর পোষা কুকুরদের লেলিয়ে দিলেন। কুকুরগুলো ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী, হিংস্র ও মাংশাসী। ইয়র্কশায়ার টেরিয়ারের মতো কান খাড়া খাড়া। লাল জিহ্বা বের করে নিজেদেরই রোমশ মুখ বারবার চাটে। তারা ধাওয়া করল রক্তাক্ত ও জঠরানলে কাবু মানুষগুলোকে; যারা পড়িমরি করে ছুটছিল সামনের দিকে। তাদের অসহায়ত্বে সূর্যের চোখে জল এলেও তিনি ছিলেন জড় পদার্থের মতো নির্বিকার, ভাবলেশহীন।

হঠাৎ গোত্রের মধ্যে এক অচেনা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটল। এক শিশুর গাঢ় কালো ত্বক ফ্যাকাশে হতে হতে শ্বেতবর্ণ ধারণ করল। গোপনে গোপনে লতাপাতা, শিকড়বাকড়ে চিকিৎসা করেও যখন ফললাভ হলো না, তখন তারা গোত্রপ্রধানের শরণাপন্ন হলো। তিনি আবারও সবাইকে ডাকলেন। শিশুটির শ্বেতবর্ণ অভিশাপ হিসেবে ঘোষণা দিলেন। অভিশাপমুক্ত করতে গেলে তাকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কাঠখড়ি জড়ো করে তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করে তাতে আগুন দেওয়া হলো। আগুন দাউ দাউ করে উঠলে তার ইশারায় শিশুটিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করল। মা–বাবার চোখের সামনে শিশুটি পুড়ে পুড়ে অঙ্গার। এখানেই ক্ষান্ত হলেন না, চূড়ান্ত নৃশংসতা প্রদর্শন করলেন। একমাত্র সন্তানের পোড়া মাংস মা–বাবাকে খেতে বাধ্য করা হলো। তাদের চোখে যখন সন্তান হারানোর গভীর বেদনার জল, তখন তার নির্দেশে তাদের দিকে জ্বলন্ত ছাইভস্ম ছুড়ে মারা হলো।

গোত্রপ্রধান মোচে তা দিয়ে বললেন, ‘অভিশাপমুক্ত হলাম। আর ভয় নেই। তোমরা যাও! ফুর্তি করো!’

ফুর্তি করার মন ও মানসিকতা কার আছে! তবু তার নির্দেশ। সঙ্গে সঙ্গে মাদল, টামাক, ধামসা একসুরে বেজে উঠল। আকাশ-বাতাস ধ্বনিত হলো। গোত্রপ্রধানের মনোরঞ্জনের জন্য রক্ষিত অদ্ভুত সাজের নৃত্যদল নাচতে থাকল। তাদের সঙ্গে পুরুষেরাও যোগ দিল। ভীতিকর আতঙ্কের সঙ্গে গম্ভীরতার যে পরিবেশ ছিল, জংলি নাচের তালে তালে সেখানে সুড়সুড়ি কিছুটা আঁচড় কাটল।

কিন্তু তাদের শুকনা মুখে লেপ্টালেপ্টি করে থাকা ভয় দূর হলো না। অভিশাপ আরও জেঁকে বসল। শ্বেতবর্ণ রোগটা গোত্রের মধ্যে সংক্রমিত হতে লাগল। কজনকে পুড়িয়ে মারবেন! গোত্রপ্রধান ছাড়া গোত্রের প্রায় সবাই এ রোগে সংক্রামিত হলো। এদের মধ্যে অনেকেই পটাপট মারা গেল। তবু গোত্রপ্রধানের হুঁশ হলো না; বরং তাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে রঙ্গ করতেন, ‘এই, তোমরা সাদা চামড়ার হয়ে যাচ্ছ, মানেটা কী? সবাই মিলে আমাকে গদিচ্যুত করতে চাও নাকি? বলবে, সাদারাই সেরা জাতি; কালোরা আমাদের অধীন। তা হবে না। জঙ্গলের রাজা কালোরাই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কঠোর হস্তে তোমাদের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেব।’

সলাপরামর্শ করল, কীভাবে তারা এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে? তাদের মধ্যে অশীতিপর এক বৃদ্ধ, যিনি বাঁকা ডালের তৈরি বিশেষ ধরনের লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, এক শ বছর আগের দৈব ঘটনার উল্লেখ করে ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘তোমরা যদি গোত্রপ্রধানের রক্ত খেতে পারো, তাহলে...তাহলে...’

গোত্রপ্রধানকে তারা সম্বোধন করে মালিক বলে। প্রায় অর্ধ–উলঙ্গ এক যুবক, লতাপাতা দিয়ে তার গোপনাঙ্গ আবৃত্ত, সাহস করে মাথা তুলল, ‘মালিক, আমরা মারা যাচ্ছি, আর আপনি আপনার গদি নিয়ে ব্যস্ত।’

‘বোকা বালক! এখন তো ব্যস্ত, যখন শঙ্কিত হব, তখন তোমাদের সবাইকে এক এক করে হত্যা করব।’ পরক্ষণে দম্ভ করলেন, ‘মাই নেম ইজ খাটাম্বু! তোমাদের রক্তে রঞ্জিত করব এই জঙ্গল, খাল–বিল, নদী–নালা! আমার হত্যানেশায় ভয় পেয়ে বাঘ-সিংহরা পালাবে! সূর্য নেমে আসবে মাটিতে, স্যালুট করবে আমাকে!’

তারপর পৈশাচিক হাসি দিলেন।

গোত্রপ্রধানের হুমকি ও পৈশাচিক হাসি তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ ও আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিল। তাদের ভয়ার্ত চোখে-মুখে মৃত্যুর কালো ছায়া ক্রমে যত ঘনীভূত হতে লাগল, সময় তত নিষ্ঠুর পরিবর্তনের দিকে মাকড়সার পদবিন্যাসে এগোচ্ছিল। এ সময়টা প্রচুর বৃষ্টি হয়; কিন্তু এবারে ঘটল তার উল্টো। কোনো এক অশুভ ইঙ্গিতে আকাশ মেঘবর্ণ ধারণ করল না। হাড়কিপটে মেঘের দরজায় গুড়গুড় আওয়াজ উঠল না। খণ্ড খণ্ড বিজলির উল্লম্ফন ঘটল না। আকাশ দাপিয়ে বৃষ্টি নামল না। প্রচণ্ড খরা ও তাপে মাটি ফেটে চৌচির। নদীর পানি শুকিয়ে ধু ধু বালুচর। বিল-ডোবা-খাল, কোথাও একফোঁটা পানি নেই। কুয়োর পানি নেমে গেছে। চাপকলেও পানি পাওয়া কঠিন। দৃশ্যত পানির হাহাকার। ফসল পুড়ে ছাই। জঙ্গল বিবর্ণ। খোঁয়াড়েই গবাদিপশু মরে পড়ে থাকছিল। ভয়াবহ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল জীবনযাপন। বউঝিরা কলস কাঁখে পানির সন্ধানে জঙ্গলের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরত। শিশুরা প্রস্রাব করে সেই প্রস্রাবেই লেপটালেপটি করত; কিছুটা ঠান্ডা পাওয়ার আশায়। কুসংস্কার যত ডালপালা ছড়াচ্ছিল, তার সবই প্রায় পালন করা হচ্ছিল, কিন্তু কোনোটাতেই পরাক্রমশালী আকাশদৈত্যের মন গলছিল না।

ফলে পানিসংকটে নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধ। তাই বলে গোত্রপ্রধান তো তাঁর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করতে পারেন না। তিনি রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিলেন। রক্ত দিয়ে গোসল সেরে সারা শরীরে জয়তুনের তেল মাখতেন। তারপর ছায়াতলে বসে যৌনসম্ভোগের বাড়ন্ত শক্তি লাভের উদ্দেশ্যে অষ্টধাতুর সঙ্গে মধু মিশিয়ে ককটেল বানিয়ে সেই ককটেল গলায় ঢেলে আত্মশ্লাঘা ও আত্মতৃপ্তির সুরে বলে ওঠেন, ‘মাই নেম ইজ খাটাম্বু!’

তারপর চপাৎ চপাৎ করে জিহ্বা ঘোরান। এর মাধ্যমে বার্তা দিতে চান জঙ্গলের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ কামুক পুরুষ।

ভয়, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ গোত্রবাসীকে নিয়ে যেন তামাশা করছিল। বাঁচার তাগিদে তারা খুব কম সময়ের মধ্যে পরস্পরের কাছাকাছি এল। সলাপরামর্শ করল, কীভাবে তারা এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে? তাদের মধ্যে অশীতিপর এক বৃদ্ধ, যিনি বাঁকা ডালের তৈরি বিশেষ ধরনের লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, এক শ বছর আগের দৈব ঘটনার উল্লেখ করে ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘তোমরা যদি গোত্রপ্রধানের রক্ত খেতে পারো, তাহলে...তাহলে...’

‘তাহলে কী?’ মৃত্যুর সন্নিকটে থাকা একজন ধৈর্য হারাল।

‘অভিশাপমুক্ত হবে,’ বললেন তিনি। আরও যোগ করলেন, ‘প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের মধ্যেই নিহিত আছে আমাদের মুক্তি।’ আকাশে এক ভয়ংকর ইগল চিৎকার করে ডাকছিল। তার দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘তার মতো হিংস্র হও!’

এ এক কঠিন ও দুর্গম পরীক্ষা। যার সামনে মাথা তুলতে সাহস পায় না, তার রক্ত? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দুর্জ্ঞেয় ফিসফিসানি ঝড়ের রূপ নিল। কোনো সমাধানে আসতে পারল না তারা। কিন্তু তাদের মধ্যে বাঁচার আকুতি তীব্রতর হলো। মানুষ তার প্রয়োজনেই সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে। অধৈর্য ব্যক্তিটি বৃদ্ধের পরামর্শ আমলে নিল। গোত্রপ্রধানের রক্ত পান করলে সত্যি সত্যিই অভিশাপমুক্ত হবে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য তার চোখে-মুখে আগুনের ঝিলিক উঠল। মেরুদণ্ডে শিরশির করে বয়ে গেল এক অচেনা শক্তি।

জঙ্গল দাপিয়ে একটা বনমোরগ শিকার করে লাঠির মাথায় বেঁধে নিয়ে ফিরছিল, হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনে বিভ্রান্ত হলো সে। ধীরে ধীরে একটা জীর্ণ কুটিরের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখে, এক মা তার স্বামী ও সন্তানের লাশ ধরে কাঁদছে। শ্বেতরোগে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

সময় তখন দুপুরের দাস। জঙ্গল কেমন যেন নিশ্চুপ! সুনসান নীরবতার চোখে গভীর ঘুম। তীক্ষ্ণ সুচালো সুচ নিয়ে গোত্রপ্রধানের বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো সে। নুইয়ে পড়া গাছগাছালিতে ঘেরা কাঠের দোতলা বাড়ি। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। ধাপে ধাপে পা ফেলে সন্তর্পণে একেবারে কাঙ্ক্ষিত ঘরে পৌঁছাল সে।

নারকীয় গরম। হাঁসফাঁস করছিল বাতাস। তার মধ্যেই গোত্রপ্রধান এক উদোম নারীকে কোলবালিশের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছেন। বিভিন্ন সরীসৃপ প্রাণীর মুখ আঁকা তাঁর গাউন উঠে এসেছে হাঁটুর ওপরে। হাঁটুর নিচে থলথলে মাংস, সেখানেই সুচ ফুটিয়ে রক্তের স্বাদ নেওয়ার মনস্থির করল সে। উপুড় হয়ে কেবল সুচ ফোটাবে, অমনি গোত্রপ্রধান ঘুমের মধ্যেই পা সরিয়ে নারীটির দেহের ওপর রাখলেন। পা-টা অতি সাবধানে আবার টেনে আনল নিজের দিকে, সুচ ফোটাতেই তিনি মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে থাপড় দিলেন সেখানে। তারপর বাঁ গালটা এমনভাবে বাঁকা করলেন যেন সামনে বসা বিড়াল বা কোনো শিশুকে ভয় দেখাচ্ছেন। জেগে ওঠার জন্য শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দও করলেন। একবার জেগে গেলে তার পরিণাম কী হতে পারে, তা সে ভালোমতো জানে। ফলে তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরল। সঙ্গে সঙ্গে খাট ঘেঁষে বসে পড়ল মেঝেয়। অপেক্ষমাণ অবস্থায় হঠাৎ নজরে এল একটা মশা। মেঝেয় পড়ে ছিল; রক্ত খেয়ে টইটম্বুর। উড়তে পারছিল না। মশাটার এমন অবস্থার কারণ অনুমান করল। মেঝে থেকে উঠিয়ে নিয়ে গপ করে গিলে ফেলল সে। তারপর সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে এল।

মশাটা কার রক্ত খেয়েছে? মালিকের, না ওই উদোম নারীর? প্রশ্নটা মনের মধ্যে খচখচ করলেও তির-ধনুক নিয়ে শিকারে গেল সে। জঙ্গল দাপিয়ে একটা বনমোরগ শিকার করে লাঠির মাথায় বেঁধে নিয়ে ফিরছিল, হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনে বিভ্রান্ত হলো সে। ধীরে ধীরে একটা জীর্ণ কুটিরের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখে, এক মা তার স্বামী ও সন্তানের লাশ ধরে কাঁদছে। শ্বেতরোগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। করুণ দৃশ্যটা ভারাক্রান্ত করল তাকে। মনে মনে ভাবল, যদি তার নিজের শ্বেতরোগটা মালিকের রক্ত খাওয়ার কারণে সেরে, ওঠে তাহলে শ্বেতগ্রস্ত মানুষদের নতুন জীবন দিতে পারবে সে।

তার শ্বেতগ্রস্ত স্ত্রী যখন আগুন জ্বালিয়ে মোরগটা পোড়াচ্ছিল, তখন খুব ধোঁয়া উঠছিল। ফলে মাংসটা ঝলসাচ্ছিল না। সে দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ করল এবং কাছে এসে তাকে সাহায্য করল। ঝলসানো শেষে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে খেতে স্ত্রীকে বলল, আজ রাতে তাকে যেন শান্তিতে ঘুমাতে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখে এক আশ্চর্য ঘটনা। তার শ্বেতবর্ণ স্ত্রী আগের বর্ণে ফিরে এসেছে; আর সে নিজে শ্বেতবর্ণেই রয়ে গেছে। কীভাবে ঘটল! বিস্ময়বোধে তাড়িত হলো সে। মূঢ় হতাশায় নিজের চুল টানল। চুলের গোড়া এতটাই দুর্বল ছিল ছিঁড়ে ছিঁড়ে জমছিল তার হাতে। আরও হকচকিয়ে গেল সে। কাঁপা হাতে ধাক্কা দিয়ে স্ত্রীর ঘুম ভাঙাল। চোখ মেলে নিজেকে দেখামাত্র তার স্ত্রী বেজায় খুশি। সাত আসমানের তারা হাতে পাওয়ার মতো নতুন জীবন যেন ছুঁয়ে গেল তাকে। কুলুঙ্গি থেকে আয়না এনে মুখমণ্ডল একবার দেখার প্রয়োজন বোধ করল না। খুশির চোটে খইয়ের মতো ফুটতে ফুটতে হড়বড় করে বলে ফেলল সব। গতকাল বিকেলে মালিকের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছিল সে। মালিক তাকে নিজ হাতে ফল কেটে খাওয়াচ্ছিলেন; এমন সময় ধারালো ছুরিতে আঙুল কাটে তাঁর। টপটপ করে রক্ত ঝরছিল এবং সেই রক্ত মেঝেয় পড়তে না দিয়ে ভালোবাসার অভিনয় করে খেয়ে ফেলে সে। সেই অশীতিপর বৃদ্ধের কথা তার মনে ছিল।

স্ত্রীর ওপর যতটা না ক্ষিপ্ত, তার চেয়ে বেশি মালিকের ওপর। কারণ, মালিক তার স্ত্রীকে ব্যবহার করেছেন। প্রতিশোধের আগুন দাবানলের মতো জ্বলে উঠল তার ভেতর। বৃক্ষের পাতায় পাতায়, কোটরে কোটরে নিয়তি তখন লিখছিল পুনরুত্থানের কাহিনি। খবরটা দ্রুত চাউর করে দিল সে। শ্বেতগ্রস্ত মানুষেরা তাদের কালোবর্ণ ফিরে পাওয়ার আশায় ভিড় করল তার সামনে। তাদের উদ্দেশে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করল সে, ‘মালিক এত দিন আমাদের ক্রীতদাস বানিয়ে আমাদের রক্ত শোষণ করেছে। আমাদের রক্ত পান করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, রক্ত দিয়ে গোসলও করেছে সে। রক্ত দিতে দিতে আমরা নিঃশেষ হয়ে গেছি। সুচ ফোটালেও একফোঁটা রক্ত বেরোয় না আর। আমরা এখন শুকনা পাটখড়ির মতো নির্জীব ও দুর্বল হয়ে পড়েছি। ফ্যাকাশে হতে হতে আমরা শ্বেতবর্ণ হয়ে গেছি। এটা আমাদের পূর্বপুরুষদের বর্ণ নয়। এখন আমাদের সেই বর্ণে ফিরিয়ে আসার পালা। তোমরা একেকজন দানব হও! ঝাঁপিয়ে পড়ো! পান করো তার রক্ত। শোষকের রক্তেই নিহিত আছে আমাদের মুক্তি।’

উত্তেজিত শত শত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ঘিরে ফেলল গোত্রপ্রধানের বাড়ি। হইচই শুনে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর দিকে ইটপাটকেল, তির-বল্লম ছুড়ল তারা। বিপদ আঁচ করে গোত্রপ্রধান পেছনের সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তবু বাঁচতে পারলেন না। ধাওয়াকারীদের বল্লম এসে তাঁর পিঠে বিঁধল। ইট পড়ল মাথায়। গড়াতে গড়াতে একটা শুষ্ক তবে ছিপছিপে পানির পুষ্করিণীতে পড়ে গেলেন তিনি। তাঁর রক্তে লালে লাল হয়ে উঠল কাদাপানি। শ্বেতগ্রস্তরা সেই কাদাপানিতে সাদা নেকড়েদের মতো গড়াড়ড়ি করতে লাগল।

ফরসা আকাশ ক্রমে কালোবর্ণ ধারণ করতে থাকে।