অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

বিশ্বাস কুবিশ্বাস

শত শত বছর আগে যেমন ছিল আজও তেমনি এখানে ঢোলকলমি কিংবা হিজল-করচগাছের ছায়ায় মাছের লোভে ওত পেতে বসে থাকে আলদ সাপ। যেমন বদমেজাজি তেমনি বিষাক্ত। কুচকুচে কালো আর তেল-চকচকে শরীর। দেহের তুলনায় মাথা একটু চিকন হলেও মস্ত মস্ত টাকি কিংবা নলা মাছ গিলে ফেলতে পারে। শিকারের সময় মানুষ-গরু সামনে পড়ে গেলে রক্ষা নাই। লকলকে লম্বা দেহটা স্প্রিংয়ের মতো শুধু লেজের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ফোঁসফাঁস করতে করতে তাড়া করে। প্রচণ্ড গতি! তাকে বিরক্ত–করা মানুষটার কাছে পলকে চলে আসে। কিন্তু আজ সে ক্লান্ত। একজনকে ফেলে এসেছে। অনেক দিনের মজুত বিষ উগলে দিয়ে ভারসাম্যহীনের মতো কেমন একটা নেশার ঘোরে সে আচ্ছন্ন। তার চারপাশে হেলিকপ্টারের মতো পাক খাচ্ছে দুটো রাজা ফড়িং। পাশ দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছে একটা দুধসাদা বক। সামনেই জার্মনি ফুলের নীল ছায়ায় টুপটাপ ডুবছে-ভাসছে একঝাঁক শোল মাছের পোনা। আঙুল সাইজ। সকালে এখানেই ঘাস কাটতে এসেছিল কেশবপুরের বোরহান। গফাইখালীর ডহর থেকে একটা টাকি মাছকে তাড়া করেছিল সে। বোরহানের কপাল মন্দ। হঠাৎ তার সামনে পড়ে যায়। বিজলির চমকের মতো কালো দেহটা শূন্যে দুলে ওঠে। বিস্ফারিত চোখে বোরহান হেলে পড়তে পড়তে ছোবলটা এসে লাগে তার বুকে। বোরহানের বাবা নাই। তাই মা-বোনের দিশাহারা চিৎকারে আশপাশের বাড়িগুলো থেকে অনেকেই ডিঙি বেয়ে ছুটে এসেছে। ঝোড়ো বাতাসে হাওর উথালপাতাল। কালো থমথমে আকাশ নেমে এসেছে মাথার ওপর। শনশন গর্জন তুলছে রাগী বাতাস। বোরহানদের ঘাটে বাঁধা ডিঙিগুলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে অনিশ্চিত ভঙ্গিতে দুলছে। প্রকৃতি এমন মারমুখো, যেন রুষ্ট বিধাতার কঠিন মুখ। দূর থেকে তাকালে ভয় হয়। ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে লাগে অনাবিষ্কৃত দ্বীপের মতো!

বোরহান হেলে পড়তে পড়তে ছোবলটা এসে লাগে তার বুকে। বোরহানের বাবা নাই। তাই মা-বোনের দিশাহারা চিৎকারে আশপাশের বাড়িগুলো থেকে অনেকেই ডিঙি বেয়ে ছুটে এসেছে। ঝোড়ো বাতাসে হাওর উথালপাতাল। কালো থমথমে আকাশ নেমে এসেছে মাথার ওপর। শনশন গর্জন তুলছে রাগী বাতাস।

কালো হলেও তরুণ বোরহানের চামড়ায় কলমিপাতার বাহার আছে। করাল বিষের প্রতিক্রিয়ায় ঠোঁটের কষে ফেনা, মুখটা পোড়া কয়লা! অজ্ঞান দেহটা হেলে পড়ে আছে একটা চেয়ারে। বোরহান বুঝি গভীর ঘুমে অচেতন। অথবা মরেই গেছে! স্মার্টফোন হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও হাওরবাসীর কিছু কিছু বিশ্বাস-অবিশ্বাস এখনো সেই উনিশ শতকে থমকে আছে। তাইতো সাপেকাটা রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না নিয়ে ডাকা হয়েছে আফিল ওঝাকে। মাছ ধরা এবং বিক্রি করা লোকটার পেশা হলেও সাপেকাটা রোগীর দেহ থেকে বিষ নামানো তার নেশা। সে নেচে নেচে গাইছে : হেই...ই ধর্ম ছালি (ছাই), পাঁচ ভাই পাণ্ডব ছালি, আসমান ছালি, জমিন ছালি, পৃথিবী ছালি, ভ্রহ্মা— ছালি। যেইখানে বিষ্যের ঘর, সেইখানে উড়াল দিয়া পড়। ওঝার মন্ত্রপড়া হাতটা গিয়ে পড়ে রোগীর মস্তকে! এই দেখে উপস্থিত কেউ কেউ ফিসফিস করে পাশের জনের সঙ্গে আলাপ জোড়ে: আলদ সাপে ছোবল মারলে দশ মিনিটেই শেষ। পাশ থেকে থুত্থুরে এক বুড়া বলেন; বেজাত সাপে কামুড় মারলে আত্মা ছাপুরিয়া (স্তব্ধ হয়ে) থাহে। বেউল্লা সুন্দরীর পতী লখিন্দরের কতা মনে নাই?

বিদ্যুতের চকচকে আলো, ঝকঝকে পাকা রাস্তা, মোবাইল-ইন্টারনেট...বিশাল বিশাল হাওরের খেয়ালি প্রকৃতির মধ্যে জীবনের অংশ হয়ে যাওয়া এসব আধুনিকতম প্রযুক্তি কখনো কখনো প্রায় অর্থহীন। অতিবৃষ্টি কিংবা উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ হঠাৎ যেমন পাকা ধান তলিয়ে যায়, ভেসে যায় ঘরবাড়ি, তেমনি এখানে কেউ কেউ ছোবল খায় বিষধর সাপের। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপেকাটা রোগীর জন্য ‘ভেনাম’ রাখা থাকলেও হাওরবাসীদের অনেকেই ভরসা রাখে ওঝাতে। এই ডিজিটাল জমানাতেও হাওরের দেশে সাপের যেমন অন্ত নাই, তেমনি ওঝাও আছে।

তরুণ আফিল রোগীর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মন্ত্র পড়তে থাকে: একে এক ছালি, দুইয়ে দুই ছালি, তিনে তিন ছালি, চারে চার ছালি, হেই...ই পাঁচে পাঁচ ভাই পাণ্ডব ছালি। ছয়ে ছয় গুণ ছালি, সাতে সাত মহিষ খাইয়া ছালি। হেই...ই অষ্টতে জংলা ছালি, নয়ে নিরানব্বই ছালি, দশে রাবণ ছালি, এগারোতে ব্রহ্মাণ্ড ছালি, যেইখানে বিষ্যের ঘর সেইখানে উড়াল দিয়া পড়। এই সত্যের উপর ঈশ্বর মহাদেবের জটা ছিঁড়িয়া ভূমিতে পড়। দোহাই ঈশ্বর মহাদেবের দোহাই!

বোরহান বুঝি গভীর ঘুমে অচেতন। অথবা মরেই গেছে! স্মার্টফোন হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও হাওরবাসীর কিছু কিছু বিশ্বাস-অবিশ্বাস এখনো সেই উনিশ শতকে থমকে আছে। তাইতো সাপেকাটা রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না নিয়ে ডাকা হয়েছে আফিল ওঝাকে।

বাড়িটার ছোট্ট উঠানে সাপেকাটা রোগী আর আফিলকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শখানেক কালো কালো নারী-পুরুষ। দূর থেকে তাকালে দেখা যায় হাওরময় পৃথিবীটাই ধোঁয়া ধোঁয়া কালো, পায়ের নিচের মাটিও কালো আর চারপাশের সবকিছু দেখে মানতেই হয়, হাওরপারের মানুষেরা এখনো মাটির সন্তান। এককালে এখানে মিঠাপানির সমুদ্র ছিল। নাম ছিল কালিদহ সাগর। তুর্কি-পাঠান-মোগল-ইংরেজ-পাকিস্তানিরা গেল, উপমহাদেশ ভাঙতে ভাঙতে হলো খণ্ডবিখণ্ড। ইতিহাসের কালো কালো পৃষ্ঠাগুলো যেভাবে বারবার ভয়াল থেকে ভয়ালতর হয়ে অনাহক ফিরে আসে। রক্তগঙ্গা বয়ে যায় নিরিহ, ভাববাদী মানুষের চারণভূমিতে, ঠিক সেইমতো প্রকৃতির বিক্ষেপে উত্তরের পাহাড় গলে গলে ঢলের সঙ্গে বয়ে এনেছে কোটি কোটি টন পলি। নিয়তির অদৃশ্য হাত শত শত বছর ধরে, একটু একটু করে সমুদ্র ভরাট করে সৃজন করেছেন বৈভব-বৈচিত্র্যভরা হাওরের দেশ।

আকাশজুড়ে শ্রাবণের ঘনকালো মেঘ। মাঝে মাঝে টোটাফাটা মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝলক ঝলক আলো এসে আছড়ে পড়ে। একটুক্ষণের জন্য ঝলমল করে ওঠে হাওরময় সংসার। তো একটু পরেই আবার গোমড়া। থমথম করে বগার হাওর, গলাকাটা হাওর, খেওলার হাওর। আরও দক্ষিণে ভবানীগঞ্জ বাজারের পরে আছে গঙ্গাচরার হাওর। যেদিকেই চোখ যায় শুধু হাওর আর হাওর। হু হু, শোঁ শোঁ বাতাসে পানি কলকল করে, খলখল করে ঢেউ। থমথমে কালো আকাশের নিচে অথৈ-উন্মত্ত সাগর আর কুয়াশাময় ঝাপসা অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা গ্রামগুলোর দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মন কেমন কেমন করে!

পানির গন্ধভরা বাতাস আসে মুঠো মুঠো ঠান্ডা পরশ নিয়ে। বাড়ির পেছন দিকে শোনা যায় টাউক, টাউক...করে ওঠা ডাহুক পাখির গলা। হাওরে পাখির কি অন্ত আছে? কানিবক, ধলাবক...বকপাখিই তো চার প্রকার! একের সঙ্গে অন্যেরটা মেলে না। কিন্তু সব বিচিত্র সুর আর বাতাসে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গান মিলে ভাটির দেশে প্রকৃতিই সেরা গায়ক। পানির দেশের সেইসব সুর-তাল-লয়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে, চকচকে কালো আর দীর্ঘ দেহটা দোলাতে দোলাতে আফিল গায়:

আরে ধনা গোদা উইঠা বলে মনা গোদা ভাই,
ওইযে দেখ সুন্দর কন্যা জলে ভাইসা যায়।
ধনা গোদা বলে আরে মনা গোদা ভাই,
ওই কন্যারে রাখার একটা উপায় করা চাই।
তাই শুনিয়া ধনামনা ডাক দিয়া জিজ্ঞাসা করে,
কোথা হতে এলে কন্যা বল সত্যি করে।
কী কারণে ভাসিয়াছ সাগরেরি জলে,
ভেলার উপর কীবা আছে বল সত্যি করে।
বেহুলা বলে; অরে গোদা তোমারে জানাই,
যে দুঃখ আমার মনে তা বলার সাইধ্য নাই।
উজানি নগরে বাড়ি আমার,
সাহেরি রাজার কন্যা আমি বেহুলা সুন্দরী,
সাত ভাইয়ের বোন নয় মামার ভাগিনী,
শুন আমার দুঃখের কাহিনি।
মাতাপিতা দিল বিয়া চম্পক নগর,
চান সওদাগরের ঘরনি সনকার উদর—
আমার পতী লখিন্দর।
তাহারে নিয়া শুয়াছিলাম কালবাসর ঘর।
পদ্মাবতীর নাগে আমার পতীরে করিল দংশন।
কাঞ্চানারী হইলাম আমি লোহার বাসরঘর,
মরাপতী লইয়া আমি ভাসলাম কালিদর সাগর,
মনে আশা যাব আমি ইন্দ্রদেবপুর...।

হাওরের দেশে ফরসা মানুষ বিরল। অবশ্য কালো কালো মানুষদের মধ্যে ভাগ্যবানরা অন্যের শ্রম চুরি করে অনেক বছরের তপস্যায় একটু-আধটু ফরসা হয়ে যাচ্ছে। তো হাবশি-কালো আফিলের নৃত্যের তাল, হাত-পায়ের কাজ, বিচিত্র ভঙ্গিতে বাবরিটার নাচন...মন্ত্রের সুরের সঙ্গে তরুণ ওঝার সবকিছুই দর্শকরা গিলছে।

কালো চকচকে শরীর, মাথায় কালো বাবরি আর কালো পুরুষ্ট ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁফ নিয়ে আফিল ওঝা যেন রূপকথার হাবশি তরুণ! হাওরের দেশে ফরসা মানুষ বিরল। অবশ্য কালো কালো মানুষদের মধ্যে ভাগ্যবানরা অন্যের শ্রম চুরি করে অনেক বছরের তপস্যায় একটু-আধটু ফরসা হয়ে যাচ্ছে। তো হাবশি-কালো আফিলের নৃত্যের তাল, হাত-পায়ের কাজ, বিচিত্র ভঙ্গিতে বাবরিটার নাচন...মন্ত্রের সুরের সঙ্গে তরুণ ওঝার সবকিছুই দর্শকরা গিলছে। কাঁদছে শুধু ছেলেটার মা-বোন।

রোগীর দেহ থেকে বিষ নামানোর জন্য আফিল উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেহুলার দুর্দশার কথা বয়ান করে:

আমি বেহুলার কপালে রে দারুণ বিধি কী লিখলে,
সবার সুখ লেখতে বিধি রে তর কলমে ছিল কালি,
আমার সুখও লেখতে বিধির শুকাইল কালি।

মেঘ কেটে গেছে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের লাল আলোয় ঝলমল করে গলাকাটা হাওরের পানি। খেয়ালি প্রকৃতিও একটুখানি হাসে। ঘরের সঙ্গে ঘর তবু যেটুকু ফাঁকফোক আছে, তা দিয়ে হাওরের পাগলা বাতাস বাড়িটাতে ঢুকে মাতালের মতো পাক খেতে থাকে। সেই এলোমেলো বাও-বাতাসে আফিলের গতরের ঘাম এই শুকায় তো ওই ভেজে। হাওরের ঝোড়ো বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে শোনা যায় তার গলা:

মাছের মিলন খালে-বিলে, পাখির মিলন ডালে,
আমার মিলন হলো ভঙ্গ, কাল-বাসর ঘরে।

হঠাৎ করেই আবার আকাশটা অন্ধকার হয়ে যায়। সাপে ছোবল মারার মতো ফোঁস করে বিজলি চমকায়। ঝলসে ওঠে হাওরের দেশ। বজ্রপাতের গড়র...গড় শব্দটা গড়িয়ে আসতে আসতে আকাশেই দ্রিম করে বিস্ফোরিত হয়। ঝনঝন করে কেঁপে ওঠে টিনের চালগুলো। আফিল আর সাপেকাটা তরুণকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক-শ্রোতারা দুই হাতে কান চেপে, দৌড়ে গিয়ে সারিসারি ঘরগুলোর বারান্দায় ওঠে। সেই সকাল থেকে মন্ত্রের পর মন্ত্র! আফিলের বিরক্তিও চরমে। কিছুতেই বিষ নড়ছে না! সে নাচের তালে দুলতে দুলতে, রাগে খাচ্চি ভাষার একটা মন্ত্র বলতে শুরু করে:

রক্তজবা ফুল বলে আমি বড় লাল,
পদ্মাবতীর বাপে খাইল পদ্মার দুইটা গাল।
কদম ফুল উইঠা বলে আমি বড় গোল,
বাপে-ঝিতে প্রেম করিয়া লাগল গণ্ডগোল...।

সূর্যের মুখ দেখা না গেলেও হাওরের পতঙ্গ-পাখি-পিঁপড়ার মতো আফিলও অনুভব করে; দুপুর গড়িয়ে গেছে। মাঝে একবার হাওয়া পড়ে গেছিল, এখন আবার শুরু হয়েছে ঝোড়ো বাতাসের উথালপাতাল, ঢেউয়ের গর্জন কানে লাগে। দেহমন শীতল করা বাতাসে পানি, কচু-কলমির ভেষজ গন্ধ...প্রকৃতির এই সতেজ বাতাসে বোরহান হয়তো বেঁচে উঠবে। নাম-যশ হবে আফিলের। অথবা মারা যাবে। বোরহানের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য উপস্থিত বুড়োদের কেউ কেউ তখন হয়তো বললে বলতেও পারেন:

সাপে খায় লেখাত,
বাঘে খায় দেখাত।