অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

ইঁদুর

ভোরের কাক ডেকে ওঠার আগেই মানুষের হইচইয়ে ঘুম ভাঙল মোজাফ্ফরের। ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা দেখা, নিজের পড়াশোনা চুকিয়ে শুতে শুতে রাত হয় বেশ। ঘড়িতে অ্যালার্ম ঝোলে সকাল ১০টা নাগাদ। উঠে গা গোসল সেরে ছোটে কলেজে। দুপুর ১২টা থেকে টানা বিকেল সাড়ে ৫টা অবধি ক্লাস। মাঝে ৩০ মিনিটের ফুরসত। ফেরার পথে হালকা সওদাপাতি। দিনের শেষে বাজারের শুকিয়ে যাওয়া শাকসবজি, নয়তো এক হালি ডিম। মাঝেমধ্যে মাছবাজারেও উঁকি দেয়। পেটপচা চাপিলা অথবা কাটা ড্রামের পানিতে মরে সাদা হয়ে ভেসে থাকা পাঙাশ। নীল পলিথিনে ঝুলিয়ে হাঁটে বাসার পথে। বউটা টেঁসে যাওয়ার পর থেকে একার সংসার, যা রাঁধে তাই উতরে যায় নিজের কাছে।

জানালার পর্দাটা সরাতেই কুয়াশা ঘোলা শার্সির ওপাশ থেকে গলির মাঝামাঝি লাফিয়ে পড়ে চোখ দুটো। মাছির মতো চাক বাঁধা মানুষের জলটার মধ্যে। কবাট খুলতেই অপেক্ষারত অতিথির মতো ঢুকে পড়ে বরফধোঁয়া বাতাস। মাঘের শুরু। সুযোগ পেলেই দাঁত ফোটাচ্ছে শীত। জটলাটা ওপরে সূর্যমুখী ফুলের মতো ঘন। চোখ গলানোর ফাঁক নেই। নিচে কবরখানার বেড়ার মতো পাগুলোর ঘুলঘুলি গলে তাকাতেই কিছু একটা দেখা গেল। খরায় শুকনো খালের বুকে জমে থাকা একচিলতে জলের মতো। লাল রক্তের ধারা গড়িয়ে এসে থেমে গেছে হঠাৎ। ক্ষয়ে যাওয়া বৈঠার মতো সরু পা দুটো লাঙলসদৃশ হয়ে আছে। এক পায়ে একটা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। অন্যটা খালি। শিয়ালরঙা প্যান্টটা ঘুচে উঠে গেছে হাঁটু অবধি। কালো লোমগুলো ঘন হয়ে আছে মিঠাইয়ে ধরা কালো পিঁপড়ের মতো। লোকদের পাগুলো সামান্য নড়েচড়ে গেলে পড়ে থাকা লোকটার বুক অবধি গড়িয়ে যায় চোখ। ছাইরঙা সোয়েটারের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে জলপাই রঙের টি–শার্ট।

‘আরে জাদু রে। কার মায়ের বুকটা খালি হইলোরে মা।’ মধ্যবয়সী এক নারী বিলাপ করে জানালাটা পার হওয়ার মুহূর্তে মোজাফ্‌ফরের চোখও যায় তার পিছু পিছু। জানালার গ্রিলের সঙ্গে লেপ্টে আছে গাল। ঘাড়টা বাঁ থেকে ফের ডানে ঘোরাতেই ওপর থেকে নরম কিছু একটা অকস্মাৎ তার মাথায় পড়ে। ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে সে। ততক্ষণে ছোট্ট প্রাণীটা জানালা আর খাটের মাঝের ফাঁক দিয়ে সেফ এক্সিট নিয়েছে।

প্রায়ই লম্বা ঘুমে, না হয় নীলক্ষেতের পুরান বইয়ের ঢিপি কিংবা আজিজ মার্কেটের প্রথমা-তক্ষশিলায় বই নাড়াচাড়া করেই কাটে। নিত্যদিনের নিয়ম ভেঙে ইঁদুরের সাম্রাজ্যে হানা দেওয়ার আগ্রহ জন্মে না খুব। যদিও দু-একবার ভেবেছে মেঝেতে, খাটের নিচে নক্ষত্রের মতো অবিন্যস্ত বইগুলো ঝেড়েপুছে তাকে তুলবে।

মোজাফ্ফর ঘাড় তুলে তাকায়। ইঁদুরটা পর্দার স্ট্যান্ডের ওপর বাইতে গিয়ে লাইনচ্যুত হয়েছে হয়তো। ঘরে আজকাল উৎপাত বেড়েছে ইঁদুরের। কুটকুট শব্দে কী যেন কুচিয়ে যায় রাতভর। শুরুতে একটা আওয়াজ কানে বাজলেও ইদানীং ঘরের নানা প্রান্ত থেকে শব্দটা কোলাজ-স্বরে নীরবতার পর্দা ফুটো করে। সহকারী অধ্যাপক মোজাফ্ফর হোসেনের জীবন একঘেয়ে নীরস হয়ে গেছে আজকাল। কলেজ, ক্লাস, ফেরার পথে টুকটাক সওদাপাতি, রান্না, খাওয়াদাওয়া, পরীক্ষার খাতা দেখা, না হয় পরের দিনের ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি আর ঘুম। এই তার সপ্তাহের কর্মদিবস। ছুটির একটি দিন। প্রায়ই লম্বা ঘুমে, না হয় নীলক্ষেতের পুরান বইয়ের ঢিপি কিংবা আজিজ মার্কেটের প্রথমা-তক্ষশিলায় বই নাড়াচাড়া করেই কাটে। নিত্যদিনের নিয়ম ভেঙে ইঁদুরের সাম্রাজ্যে হানা দেওয়ার আগ্রহ জন্মে না খুব। যদিও দু-একবার ভেবেছে মেঝেতে, খাটের নিচে নক্ষত্রের মতো অবিন্যস্ত বইগুলো ঝেড়েপুছে তাকে তুলবে। পরক্ষণে চার তাকের বুকশেলফের উপচে পড়া দশা দেখে ক্লান্ত হয়ে ভাবে, এবার নতুন একটা শেলফ না আনলেই নয়। ওই পর্যন্ত। শেলফ আর আসে না ঘরে। আবার মনের কোথাও উঁকি দেয় আলুথালু ভাবনা। সুরভী চলে যাওয়ার পর নির্লিপ্ত নিঃসঙ্গতার জাল কাটছে ইঁদুরগুলো। ওদের চঞ্চলতা কালো কোটের মতো অন্ধকারের বুকে মৃদু প্রাণের অস্তিত্বের জানান দেয়। মন্দ কী! মোজাফ্ফরের তখন মনে হয় সে একা নয়। আরও কেউ আছে এই এলোমেলো ঘরটায়।

পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনে সুড়ুৎ করে বইপত্রের স্তূপে পালিয়ে যায় চিন্তার ইঁদুর। শার্শিটা হাতের তালোয় মুছে নিয়ে আতঙ্কিত দৃষ্টিটা জলে ছিপ ফেলার মতো ছুড়ে দেয় সে। নিমেষেই কালো পিঁপড়ের দঙ্গল মানুষগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। দেহটাকে এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সে আরেকটা কবাট খুলে দেয়। যদি আরেকটু ভালো দেখা যায়। তার মতো আশপাশের অনেক জানালা তাকিয়ে আছে পথে। ডানায় সোনালি কোমল আলো মাখা চিলটার ঘুম ভেঙেছে যেন। উড়ে উড়ে আলো ছড়াচ্ছে পাখিটা। সে আলোয় দেখা যায়, ছেলেটা ডান দিকে কাত হয়ে ঘুমোচ্ছে। অবিন্যস্ত দাড়ি-গোঁফ কৃষ্ণকায় মুখ। তাতে এঁটে গেছে যন্ত্রণার ছাপ। বয়স কুড়ি-বাইশ। তার বেশি নয়। খানিকটা এসে থমকে যাওয়া লোহিতধারার উৎসমুখটা আঁচ করা যায় ঘাড়ের ওপাশটায়। কয়েকজন মিলে নিথর দেহটাকে একটা সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগের ভরে নিল। শেষ বিকেলের মাছ বিক্রেতার কথা মনে পড়ে মোজাফ্ফরের। যে তাকে এভাবেই ব্যাগে তুলে দেয় একটা ফ্যাকাশে পাঙাশ। ব্যাগটার দুপাশের হাতলে ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুজন।

কানাগলির মুখে অপেক্ষা করছে পুলিশের গাড়িটা। সড়কের পাশে। লাশটার পিছু নেয় একদল লোক। কৌতূহলী নারী, পুরুষ, কিশোর, যুবক আর মায়ের কোলে শিশুরাও। যত দূর দেখা যায়, জানালায় হেলে পড়ে মোজাফ্ফর তার দৃষ্টিটাকে নীল মাছির মতো ছুটিয়ে দিল লোকেদের সঙ্গে। সাদা ব্যাগ চুইয়ে রক্ত পানি টপটপ করে দাগ ফেলে যাচ্ছে পথে। সেই দাগে শুঁকতে শুঁকতে একটা বাড়ন্ত স্তনের কুকুরী পিছু নিয়েছে সেই মিছিলে। একটা হাফপ্যান্ট পরা কিশোর পেছন ফিরে খেঁকিয়ে উঠতেই কুকুরটাও দূরে সরে ঘেউ করে প্রতিবাদ জানাল।

কলেজে যাওয়ার পথে তখনো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে থাকতে দেখে মোজাফ্ফর। দেহটা যেখানে পড়েছিল, সেখানে জমে গিয়ে রক্তটা গরুর কলিজার মতো দেখাচ্ছে। একটা কুকুর সেই জমাট পিণ্ডে জিব দিয়ে চেটে তরল করে শুষে নিচ্ছে। তার কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে সেই স্তনঝোলা কুকুরী তাকিয়ে আছে নির্লিপ্ত চোখে। মাঝেমধ্যে অবনত গলায় ঘেউ ঘেউ শব্দ তুলতেই তরল আস্বাদনরত কুকুরটা ঠান্ডা দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে তাকে। ওই চাহনিতে প্রচ্ছন্ন একটা হুমকি টের পায় কুকুরী। ভয়ে আর এগোয় না।

দেখেশুনে পা ফেলে মোজাফ্ফর কোনোমতে গিয়ে উঠল চুপ্পু মামার চায়ের স্টলে। কলেজে যাওয়ার পথে গলির মুখে এই দোকানে খানিকক্ষণ বসে সে। চা পানের ফাঁকে চুপ্পু মামার সঙ্গে গল্প হয়। কানাগলি নাম হলেও এই গলিতে অনেক নামীদামি লোকের বাস। নামকরণের কয়েকটি গল্প চাউর আছে। কেউ বলে এককালে এখানে এক মাস্তানের আখড়া ছিল। নাম ছিল মাইকেল। একবার বিক্ষুব্ধ জনতা ধরে তার একটা চোখ তুলে নেয়। সেই থেকে মাইকেল উধাও। তবে গলিটাকে লোকে নাম দেয় কানা মাস্তানের গলি। আস্তে আস্তে মাস্তান বাদ পড়ে। রয়ে যায় কানাগলি। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, গলিটার একটাই মুখ। অপর প্রান্তে একটা বাগানবাড়ি। ভেতরে কয়েক শ গাছগাছালি। উঁচু-চড়া-লম্বা সেই সব গাছ। যেহেতু গলিটায় ঢোকার, বেরোনোর একটাই পথ, তাই লোকে কানাগলি ডাকে।

কলেজে যাওয়ার পথে তখনো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে থাকতে দেখে মোজাফ্ফর। তার কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে সেই স্তনঝোলা কুকুরী তাকিয়ে আছে নির্লিপ্ত চোখে। মাঝেমধ্যে অবনত গলায় ঘেউ ঘেউ শব্দ তুলতেই তরল আস্বাদনরত কুকুরটা ঠান্ডা দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে তাকে। 

চুপ্পু মামার কাছে কানাগলির আপডেট সব খবরাখবর থাকে। লোকের হাঁড়ির খবর রাখেন তিনি। কার মেয়ে কার ছেলের সঙ্গে প্রেম করে। বউয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলো কার। সরকারের কয়েকজন জাঁদরেল আমলা, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তা, রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীর কেনা ফ্ল্যাটও এই তল্লাটে। যদিও তারা এখানকার নিয়মিত বাসিন্দা নন। তবে রাতদুপুরে তাদের ফ্ল্যাটে কাদের আনাগোনা, কে কতটা লাস্যময়ী, সে খবরের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম চুপ্পু শেখ। কাশফুলের মতো চুল-দাড়িওয়ালা মানুষটি ছেলেবুড়ো সবার কাছেই চুপ্পু মামা। সত্তরের দশকের সেই মাইকেল মাস্তানকেও নাকি দেখেছেন তিনি। তখন এখানে একটা কাঠ আর টিনের তৈরি ছোট্ট টং ছিল তার বাবার। চুপ্পু শেখের বয়স তখন কতই–বা, বারো-তেরো হবে হয়তো। বাবার সেই টং এখন ছোটখাটো মুদিখানা। চুপ্পু মামার ছেলেই এখন দোকানের দেখভাল করে। এই গলিতেই এক কাঠা জমিতে লম্বা তালগাছের মতো চারতলা বাড়ি। সেখানেই সপরিবার বেঁচে আছে।

‘হাতুড়ি পেটা করছে ছেলেটারে। মাথার পেছনে যেন বাউরি পাখির খোঁড়ল।’ চুপ্পু শেখ চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলেন মোজাফ্ফরের দিকে। ‘দিনকাল এত খারাপ পড়ছে মামা।’

‘ছেলেটা কি এই গলির?’ চিনি ছাড়া দুধ চায়ে চুমুক দেয় মোজাফ্ফর।

‘না, রিকশা চালায়। রিকশাটা ছিনতাই করতে খুন করছে।’ চুপ্পু বলতে থাকেন। ‘ভিডিও বাইর হইছে তো। দেখেন নাই?’

‘না তো। কী দেখাচ্ছে তাতে?’ মোজাফ্ফরের কণ্ঠে কৌতূহল।

‘সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ছে। ফেসবুকে ছড়ায়ে গ্যাছে।’ চুপ্পু শেখ মুঠোফোনটায় পাসওয়ার্ড চাপেন। ‘একটা রিকশার চেয়ে মানুষের জীবনের দাম কম! ভিডিওটা দেইখা ঠিক থাকন যায় না। হায় রে এজিদ! হায় রে পাষণ্ড!’

‘থাক দেখাতে হবে না।’ মোজাফ্ফর হাত নেড়ে নিবৃত্ত করে চুপ্পু শেখকে। ‘এসব খুনখারাবি আমি সহ্য করতে পারি না।’

‘কতক্ষণ আর চোখ বন্ধ কইরা রাখবেন মামা? যা শুরু হইছে।’ চুপ্পু শেখ মুঠোফোন থেকে চোখ তোলেন। ‘পল্লবীতে এক বাসায় চারজনের লাশ পাইল সেই দিন। স্বামী-স্ত্রী আর দুই বাচ্চা। খবরে কইল বেডায় বউ বাচ্চারে মাইরা নিজে ফাঁস নিছে। কে জানে আসলে কী!’

মৃত্যুর খবর দিয়ে ঘুম ভেঙেছে মোজাফ্ফরের। সেই থেকে ছেলেটার নিথর দেহটি তার কল্পনায় ভাসছে। সাতসকালে মৃত্যুর এত খবরে তার মনটা নৈরাশ্যপীড়িত। একবার ভাবল আজ আর কলেজে গিয়ে কাজ নেই। বাসায় বইপত্র ঘেঁটে পার করে দেবে। আবার ভাবল বাসায় থাকলে একা একা সেই চিন্তাটাই মনের মধ্যে খাবি খাবে বারবার। তার চেয়ে ক্লাসে একবার ডাহুকের মতো ডুব দিতে পারলে বিষণ্নতা ভুলে থাকা যাবে।

গলি থেকে বেরিয়ে কিছু দূর গেলেই বাসস্টপ। দু-চার মিনিটের পথ। হাঁটতে হাঁটতে ঘুরেফিরে ছেলেটার মুখই কল্পনা হচ্ছিল তার। ভিড়ে ঠাসাঠাসি বাস। বসার জায়গা নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই কল্পনাতেই হাঁসের কচি ছানার মতো সাঁতার কাটছে মোজাফ্ফর। যখন দুজনে হাত-পা ধরাধরি করে ছেলেটাকে সাদা ব্যাগটায় তুলছিল, তার মাথাটা গলাকাটা মুরগির মতো নেতিয়ে পড়েছিল একদিকে। মানুষ হয়ে মানুষ টানার পেশায় নেমেছিল এই বয়সে। অভাবের সংসার নিশ্চয়ই। যে মুখগুলো তার দিকে তাকিয়ে থাকত, তারা কী করছে এখন? একটা রিকশা ছিনতাই করার জন্য মানুষ মানুষকে এভাবে খুন করতে পারে? কত টাকা দাম একটা রিকশার? তাই বলে খুনই–বা করতে হবে কেন? একটা ছুরি চাকু দেখালেই তো রিকশাটা সহজেই হাতিয়ে নিতে পারত ছিনতাইকারী। মানুষ এত নির্দয় হতে পারে? ইদানীং সময়টা বড় গুমোট হয়ে আছে। সব যেন ছেড়ে দেওয়া বন্য মহিষের দল। যার যা খুশি করে বেড়াচ্ছে। কারও কোনো ধার ধারার সময় নেই! সব মূর্তমান দানব।

সকালে বেরিয়ে কিনে আনল গমের মতো লাল দানার ইঁদুর মারার বিষ। আনল কয়েকটা লোহার ফাঁদও। আনাচে–কানাচে ছড়িয়ে দিল লাল দানাগুলো। টেবিল, খাট আর বইয়ের তাকটার নিচে পেতে রাখল ফাঁদ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই জানালা–দরজার পর্দা টেনে অন্ধকার নামিয়ে আনল ঘরজুড়ে।

কলেজে ক্লাসের সময়টুকুতে চিন্তাটা সত্যিই মাথার কোথাও লুকিয়ে ছিল ঘাপটি মেরে। একা হতেই আবার ঘরের ইঁদুরগুলোর মতো বেরিয়ে এসে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আজ আর ক্লাস শেষে বাজারমুখো হয়নি মোজাফ্‌ফর। সোজা ফিরে এল বাসায়। একটু আগে ফেরায় ভাবল কিছুটা বাড়তি সময় আছে হাতে। বইয়ের স্তূপগুলোর একটা বিহিত করলে কেমন হয়? আচমকা বাতি জ্বালতেই বুকশেলফের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট ইঁদুর লাফিয়ে পড়ল মেঝেতে। তারপর পলকেই সিঁধিয়ে গেল টেবিলের নিচে, বইয়ের ঢিপিতে।

শেলফের ওপরের তাকটায় কাত করে রাখা বইয়ের ওপর শুইয়ে রাখা বইগুলো তুলে নিতেই কিছুটা চমকে উঠল মোজাফ্ফর। দুটি বইয়ের ভাঁজে একটা কাপড়ের টুকরো রাখা। ‘আহ্!’ জিনিসটা আলোতে মেলে ধরতেই ভেতর থেকে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। সুরভীর শেষ চিহ্ন। সাদা কাপড়টায় নিজের হাতে নকশা তুলেছিল সে। জমিনটা ঘন সবুজ আর তার মাঝের বৃত্তটা আঁকা লাল সুতোয়। বছর দুই আগে ১৬ ডিসেম্বর মোজাফ্ফরের জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল সুরভী। ইঁদুরের ধারালো দাঁত নকশা তোলা সেই পতাকাটা ভাঁজে ভাঁজে কেটে দুখণ্ড করেছে। ছেঁড়া টুকরো দুটো পাশাপাশি মেলাতে সে দেখল, বেশ অনেকটুকু গেছে ইঁদুরের পেটে। টেনেটুনে জোড়া দিতে গেলেও নিচের দিকটায় ফাঁকা রইছে অনেকটা। টুকরো দুটোর দিকে যতবারই চোখ রাখছে, সুরভীর মন খারাপ করা মুখটা ভেসে উঠছে বারবার। ঠিক তার শেষ দিনগুলোর মতো। বিয়ের বছর পাঁচেকের মাথায় আকাশের তারা হলো সুরভী। কর্কটব্যাধির সূচনা জরায়ুতে হলেও তত দিনে ছড়িয়ে পড়েছিল দেহে। শেষ ধাপে গিয়ে যখন শরীরটা ভাঙতে থাকল, তখন ফুরিয়ে গেছে সময়। কত দ্রুত পেরিয়ে গেল শেষের দিনগুলো!

সুরভীর হাতের নকশার পতাকাটার দিকে তাকাতেই নিজের ওপর নিজের রাগ হচ্ছিল খুব। কেমন মানুষ সে? স্ত্রীর শেষ স্মৃতিচিহ্নটাও যত্নে রাখতে পারল না? সুরভী বেঁচে থাকতে কতবার ফ্রেমে বাঁধিয়ে আনতে বলেছে। আজ করছি, কাল করছি করে আর হয়নি। ওর চলে যাওয়ার পর বাঁধাবে বলে রেখেছিল বইয়ের তাকে। ভেবেছিল চোখের সামনে রাখলে মনে থাকবে। মনে আর থাকেনি। সর্বগ্রাসী শূন্যতা ইঁদুরের মতো কেটে কেটে ফাঁপা করে দিচ্ছে তার ভেতরটা। না, ইঁদুরের উৎপাত আর বাড়তে দেওয়ার মানে হয় না। ভেতরের ইঁদুরটার নাগাল পাওয়া না গেলেও ঘরময় ছুটে বেড়ানো জন্তুগুলোর একটা বিহিত তাকে করতেই হবে।

পরদিন আর কলেজে গেল না মোজাফ্ফর। সকালে বেরিয়ে কিনে আনল গমের মতো লাল দানার ইঁদুর মারার বিষ। আনল কয়েকটা লোহার ফাঁদও। আনাচে–কানাচে ছড়িয়ে দিল লাল দানাগুলো। টেবিল, খাট আর বইয়ের তাকটার নিচে পেতে রাখল ফাঁদ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই জানালা–দরজার পর্দা টেনে অন্ধকার নামিয়ে আনল ঘরজুড়ে। তারপর বিছানার এক কোণে সুরভীর হাতের সুবাসমাখা দ্বিখণ্ডিত পতাকাটা বুকে চেপে নিঃশব্দে বসে রইল সে। ইঁদুরগুলো বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়। একটা একটা করে বেরোতে লাগল জন্তুগুলো। টেবিল, খাট, বইয়ের তাক, আলমারির নিচ থেকে। মেঝেতে রাখা বইয়ের স্তূপ থেকেও প্রাণীগুলো বেরিয়ে আসার শব্দ পেতে লাগল মোজাফ্ফর। পর্দার স্ট্যান্ডের ওপর দিয়েও তরতর করে বেয়ে যাচ্ছে লাল লাল বিন্দুর মতো চোখগুলো। রান্নাঘরের দুয়ারের নিচের ফাঁক গলে সেই বিন্দু বিন্দু লাল দৌড়ে বেড়াচ্ছে ঘরময়। দু-একটা আবার খাটের পায়া বেয়ে মশারির স্ট্যান্ডের ওঠানামা করছে নির্ভয়ে। মোজাফ্ফরের মনে হলো, ইঁদুরের এই সংসারে সে-ই এক অবাঞ্ছিত প্রাণী। রাত যত গভীর হচ্ছে, ইঁদুরদৌড় খাটো হয়ে আসছিল ততই।

পরদিন ঘুম ভাঙতেই যা দেখল তাতে গা ঘিনঘিন করে উঠল মোজাফ্ফরের। পা ফেলার জায়গা নেই ঘরের মেঝেতে। সর্বত্র মরা ইঁদুর। পা তুলে আছে আকাশের দিকে। কয়েকটার লেজ নড়ছে ধীরে। জল সাঁতরে পেরিয়ে যাওয়া সাপের মতো। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না মোজাফ্ফর। মরা ইঁদুরের গুমোট গন্ধে গা গুলিয়ে বমি করল কয়েকবার। একেকবারের বিকট চিৎকারে পেট থেকে সব বেরিয়ে আসতে চাইল মুখ গলিয়ে। সে দেখল, মেঝেতে থকথকে তরলে ভেসে যাচ্ছে মরা প্রাণীগুলো।