নিকষ কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, সঙ্গে দুদ্দাড় বৃষ্টি। কার্নিশে চুপচুপে ভেজা বাদামি রঙের একটা চড়ুই ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। শোভনের সঙ্গে প্রথম যেদিন আমার কথা হয়, কিছুটা সখ্য গড়ে ওঠে, সেদিনও ছিল আজকের মতো অবিশ্রান্ত বৃষ্টির দিন। সেদিন এই একলা চড়ুইয়ের মতো বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু আমি পাড়ার রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছিলাম। আমাকে পাশ কাটিয়ে কয়েকজন পথচারী ছাতা মাথায় চলে যায়। তাদের ছাতা থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা আমাকে আরও ভিজিয়ে দেয়। আমি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রাণপণে সামনে হাঁটছিলাম। আমার বাড়ির পথে ছাতার মতো কয়েকটি তালগাছ, ওদের ছায়ায় মোড়ানো জায়গাটি কিছুটা শুকনো দেখে সেখানে আশ্রয় নিই। ঠিক সে সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া শোভন ওর হাতের ছাতাটি আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। ওই মুহূর্তে ছাতাটি ভীষণ দরকারি বস্তু হলেও অল্প চেনা ওর দান ফিরিয়ে দিই। বৃষ্টি থামার লক্ষণ না দেখে মুষড়ে পড়ি। মেঘে মেঘে ঘর্ষণ, নির্জন পথে ভয়ংকর বজ্রপাতের শব্দ, ভয় লাগে। বৃষ্টি কমার আশা বাদ দিয়ে পুনরায় হাঁটা ধরি। কিছু দূর এগোতেই আবারও শোভনের সঙ্গে দেখা। এবার ছাতাটা ও নিজ থেকেই আমার মাথায় ধরলে আর না করি না। একলা পথে বড় কাঠের ছাতার নিচে নিশ্চুপ আমরা জলভরা পথ ধরে হাঁটছি। তালগাছের মতো গোল ছাতাটি আমাদের ঘিরে রাখে। আমরা ঘন হয়ে হাঁটতে হাঁটতে টুকটাক কথা বলি। ছাতার ছায়ায় আমাদের হৃদ্যতা একটু একটু করে সেলাই হতে থাকে। আঙুলে আঙুল, প্রথম ওর স্পর্শ পাই ওই ছাতার নিচে। শুধু ছাতার শিক দেখেছে কীভাবে আমরা কেঁপে উঠেছিলাম প্রথম স্পর্শে। আমার বাড়ির প্রবেশমুখে ছিল বাঁশঝাড়। সেই ঝাড়ের পাশে থেমে কিছু সময় আমরা দুরন্ত হাওয়ায় পথের ধারে দোল খাওয়া জংলি ফুল দেখি, কচুপাতা থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা দেখি, জলে ফোটা পদ্ম দেখি। ধোঁয়া ধোঁয়া চরাচরে সে সময় একটা ছায়া আমাদের পাশে ঘুরঘুর করে, নিঃশব্দে গল্প বলে, যে ছায়া শুধু আমরা দেখেছি, যে গল্প শুধু আমরা শুনেছি। গা ছমছম অন্ধকারাচ্ছন্ন বৃষ্টিদিনের ভয় দূর করে, রক্তপ্রবাহে আলতো পুলক জাগিয়ে আমাকে ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে শোভন চলে যায়।
ও চলে যাওয়ার পর উপলব্ধি করি, মিনিট বিশেকের আলাপে ছাতার মায়ার চেয়েও ওর মায়াটাই বেশি জড়িয়ে ধরেছে। এই দিকে আমি ওই দিকে শোভন, মাঝখানে মায়া। আঙুলে আঙুল, সেই প্রথম স্পর্শ আমার হৃদয়ে একটা বিন্দু এঁকে যায়। বিন্দুটিকে ঘিরে ধীরে ধীরে একটা বৃত্ত তৈরি হতে থাকে। বৃত্তটি দীর্ঘ হতে হতে কখন যে আপাদমস্তক আচ্ছন্ন করে ফেলে, বুঝিনি। ইউনিভার্সিটিতে কয়েকবার শোভনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছে, অল্পস্বল্প কথাও বলেছি, অনুভূতি তখনো প্রশ্রয় পায়নি। বৃষ্টিদিনের আবছা যাতায়াত, একটুখানি স্পর্শের নির্যাস গভীর চুম্বনের মতো লেপ্টে থাকে আমার মনে, যা আমাকে শান্তি দেয়, স্বস্তি দেয়। আমি ওকে মন থেকে আর সরাতে পারি না। সময় গড়ায়, আমার একান্ত উঠোনজুড়ে ওর আনাগোনা বাড়তে থাকে। আমাদের চিঠি দীর্ঘ হয়, আমরা স্বপ্ন দেখি, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠি, হরেক রঙে হরেক ছবি আঁকি। তবে সেই অসীম আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। সম্পর্কের বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে টের পাই, আমাদের মাঝখানে আপত্তির দেয়ালটি প্রায় আকাশচুম্বী। অবশেষে, সেই দেয়ালটি আমরা টপকাতে পারিনি।
শোভনের বাসার গেটে উবার থামতেই ও নেমে আসে। বুঝতে পারি, ও হয়তো বারান্দায় পায়চারি করছিল আমার অপেক্ষায়। অনেক মানুষের ভিড়ে ছাতা মাথায় ঠিক আমার সামনে এসেই ও দাঁড়ায়। অবাক হই, এত বছর পরও প্রথম দেখায় চিনতে পেরেছে দেখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের পর আমার যে ছবিগুলো ও দেখেছে, সেগুলো বেশ আগেকার ছবি। ও সামনে, আমি পেছনে, আমরা সিঁড়ি ভেঙে ঘরে ঢুকি।
অনেক বছর পর শোভনের সঙ্গে যখন আগামীকাল দেখা হবে, তখন আবহাওয়া বার্তায় দেখছি আজ এবং আগামীকাল দুদিনই ভারী ঝড়, বৃষ্টি হবে।
বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছি। অনেক দিন পর নিরুপদ্রব পরিবেশে অবসর কাটাচ্ছি। শোভনের সঙ্গে দেখা হবে ভাবতেই বুকের গহিন নদীর জল আনন্দে ছলছলিয়ে উঠছে। এরই মধ্যে শোভনের ফোন, সময়মতো যেন রওনা দিই। বেলা বাড়লেই জ্যামে পড়ার আশঙ্কার কথাও মনে করিয়ে দেয়। রাত ক্রমে উর্বশী হয়ে ওঠে। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিই। শোবার ঘরে এসে আয়নায় অনেকক্ষণ নিজেকে দেখি। ভাবি, শোভন এত বছর পর চিনতে পারবে তো? ঘোর অমাবস্যায় কেটে যাওয়া জীবনের পাড় ভেঙেছে ঢের, যার ছাপ স্পষ্ট চোখেমুখে। ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে অনুভূতির সবটাজুড়ে কামিনী ফুটলেও মনের কার্নিশে একটা দ্বিধাও টের পাই। পুরোনো বাড়ির ছাদের মতো জীর্ণ মনে হয় নিজেকে। ভোর পাঁচটায় মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করে শুয়ে পড়ি। নকশিকাঁথাটা আঁকড়ে ধরি শূন্য বুকে দুই হাতে। শিয়রে জানালার পর্দা সরিয়ে দিই। একদল দমকা ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকলে চোখ বুজে আসে। মুদিত চোখেই হাত বাড়িয়ে কিছু খুঁজতে থাকি। কী খুঁজছি? প্রেম, ভালোবাসা? আদর, যত্ন? কোথায় পাব এসব? লোহার বাগানে সেই কবে দাবানলে পুড়ে গেছে যা, কেন আমি সেসব খুঁজছি? ব্যক্তিগত অথই ভাবনার সমুদ্রে ডুবে থাকা অবস্থায় মোবাইলে সেট করা অ্যালার্ম বেজে ওঠে। কীভাবে যে রাতটি গত হলো, টেরও পাইনি।
ঘোরের মধ্যে কেটে যায় আরও কিছুটা সময়। অন্ধকার কেটে নরম আলো ফুটতে শুরু করেছে। নির্ঘুম রাত শেষে সাধারণত খুব ক্লান্ত বোধ করি, কিন্তু গত রাতের অনিদ্রায় তেমন ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে না। জীবন বড় রহস্যময়, কোন পাড়ে এসে সে ঘাঁটি বাঁধে আর কোন পাড়ের আলোয় কখন সে সামনে ভেসে চলে, আন্দাজ করা মুশকিল। তড়িঘড়ি ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি শোভনের মিসড কল, অবশ্য এতে আমি মোটেও আশ্চর্য হইনি। ও খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, জানি। ঝটপট তৈরি হতে হতে উবার কল করি। ততক্ষণে মা উঠে চা বানিয়ে দেন। এর মধ্যে আবারও শোভনের কল আসে, ধরিনি। গাড়িতে চড়েই কল ব্যাক করি, ও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়।
সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় রাস্তাঘাট ফাঁকা পেয়ে প্রত্যাশিত সময়ের আগেই পৌঁছে যাই। শোভনের বাসার গেটে উবার থামতেই ও নেমে আসে। বুঝতে পারি, ও হয়তো বারান্দায় পায়চারি করছিল আমার অপেক্ষায়। অনেক মানুষের ভিড়ে ছাতা মাথায় ঠিক আমার সামনে এসেই ও দাঁড়ায়। অবাক হই, এত বছর পরও প্রথম দেখায় চিনতে পেরেছে দেখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের পর আমার যে ছবিগুলো ও দেখেছে, সেগুলো বেশ আগেকার ছবি। ও সামনে, আমি পেছনে, আমরা সিঁড়ি ভেঙে ঘরে ঢুকি। ঘরে ঢুকে আমার চক্ষু চড়কগাছ। বিশাল একটা ফ্ল্যাট শোভন কী সুন্দর, আর পরিপাটি করে রেখেছে। আমার মা–বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে যে বেকার শোভনের হাত ছেড়ে পরবাসী হই, সে আজ দুটি গার্মেন্টসের মালিক। ওকে দেখে বিশ্বাস হয় না এত বছর পর আমাদের দেখা হয়েছে। ও আমার প্রথম দেখার মতোই আছে।
মুখ ফুটে না বললেও মনে মনে খুব করে চাইছি শোভন আরও কাছে আসুক, ঘন হোক। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এই মনে একটু দোলা লাগুক। পরিবার, সমাজ ও সমাজের মানুষগুলো তো অনেক দেখলাম। দিন শেষে আমি একা, আমার খারাপ থাকা আসলে কারও কাছে কোনো ব্যাপার না। আমি একাই কাঁদি, একাই যন্ত্রণা সয়ে যাই, কেউ ফিরেও তাকায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে যখন ভাবনায় ডুবে ছিলাম ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে টের পাই তপ্ত শ্বাস। সেই প্রথম স্পর্শের মতো আমি আজও ওকে এড়াতে পারি না। নিজেকে ওর মধ্যে সঁপে দিয়ে স্বর্গ সুখে ভেসে যাই।
ফোনের অপর প্রান্তে শোভনকে যতটা চঞ্চল মনে হয়েছে কাছে এসে দেখি ও আগের মতোই, ধীরস্থির। দেখা হওয়ার পর থেকে আমরা দুজন দুজনের মধ্যে ডুবে আছি, জগতের অন্য কিছুই আমাদের আর স্পর্শ করতে পারে না। সকালের নাশতা তৈরিতে ওকে সাহায্য করি। সুন্দর করে ও নাশতা টেবিলে সাজিয়ে দেয়। খেতে খেতে নিজেকে খুব সুখী মানুষ মনে হয়। ভালোবাসা, প্রেম, নির্ভরতা বিষয়গুলোর ওপর ইতিমধ্যে চরম অনাগ্রহ তৈরি হলেও শোভনের আন্তরিকতা, মনোযোগ, যত্নে মোমের মতো গলে যেতে থাকি। মনে মনে ভাবি, সতেরো বছর আগে যদি আজকের দিনটি আসত, কিংবা আমার আজকের ম্যাচিউরিটি যদি সতেরো বছর আগে হতো, তাহলে আজ এতটা নিঃস্ব হতাম না। আমাদের বোঝাপড়া ঠিক আগের মতোই আছে। আমি যখন কথা বলি সবটুকু মনোযোগ দিয়ে চোখে চোখ রেখে শোভন আমার কথা শোনে। ওর এমন অভিব্যক্তি আগেও ভালো লাগত, এখনো ভালো লাগছে।
খাওয়া শেষে পুরো বাসা ঘুরে ঘুরে শোভন দেখায় আমাকে। ওর বুকশেলফ থেকে শুরু করে টবের গাছগুলো পর্যন্ত খুব গোছানো। ভাবি, একা একটা মানুষ কেমন করে বাসা এত পরিপাটি করে রেখেছে! টেলিভিশন, খাট, পড়ার টেবিল, বাথরুম, রান্নাঘর, কোথাও ধুলাবালু নেই। জীবনের অপ্রত্যাশিত ঝড়ে ভেতরটা তছনছ হয়ে গেলেও শোভনের যত্নে, মায়ায় ভেতরে সেই ইউনিভার্সিটি জীবনের চঞ্চল প্রজাপতিটা উড়তে শুরু করেছে। আমরা কেউ কাউকে স্পর্শ না করলেও ওর শরীরের ঘ্রাণে বুকটা অন্য রকম শিহরণে কেঁপে ওঠে। আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গানের কলি নিয়ে খেলি। ভুলে যাওয়া অনেক প্রিয় গান ও মনে করিয়ে দেয় আমাকে। আমি ওর আরও গভীরে ডুবে যেতে থাকি। মুখ ফুটে না বললেও মনে মনে খুব করে চাইছি শোভন আরও কাছে আসুক, ঘন হোক। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এই মনে একটু দোলা লাগুক। পরিবার, সমাজ ও সমাজের মানুষগুলো তো অনেক দেখলাম। দিন শেষে আমি একা, আমার খারাপ থাকা আসলে কারও কাছে কোনো ব্যাপার না। আমি একাই কাঁদি, একাই যন্ত্রণা সয়ে যাই, কেউ ফিরেও তাকায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে যখন ভাবনায় ডুবে ছিলাম ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে টের পাই তপ্ত শ্বাস। সেই প্রথম স্পর্শের মতো আমি আজও ওকে এড়াতে পারি না। নিজেকে ওর মধ্যে সঁপে দিয়ে স্বর্গ সুখে ভেসে যাই।
‘এতগুলো বছর শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও আত্মিকভাবে তোমার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলাম। অনেক মেয়ে জীবনে এসেছে, চলেও গিয়েছে, ওরাও হয়তো ভুলেছে, আমিও ভুলেছি, কোথাও বন্ধনে বাঁধা পড়িনি, তুমি রয়ে গেছ শেষ পর্যন্ত।’
বেঁচে থাকা নিয়ে আমার মনের সব ইচ্ছা যখন মৃতপ্রায় তখন শোভনের কথাগুলো আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঝড় তোলে। ওর সততা, সরলতায় মুগ্ধ হই। মনে মনে পণ করি, দ্বিতীয়বার যখন সুযোগ পেয়েছি, ওকে আর হারাতে দেব না।
শোভন আমাকে উবারে তুলে বিদায় জানাতেই মনে হলো স্বর্গ থেকে ছিটকে পড়েছি। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। সতেরো বছর আগের টলটলে আঁখির সেই মেয়েটি পুনরায় ধূসর চরাচরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। একদিকে বৃষ্টি ভেজা চাঁদের ঝলমলে আলোয় পৃথিবী ভেসে চলছে, অন্যদিকে গভীর আধাঁর সাঁতরে জড়সড় আমি সামনে ছুটছি, কঠিন পৃথিবীতে লড়াই করে বেঁচে থাকার জন্য।
দুপুরের খাবারের মেনু আগে ঠিক করা ছিল বলে শোভন বাজার করে রেখেছে। দুজন একসঙ্গে খিচুড়ি, মুরগির মাংস রান্না করি। সাদামাটা রান্না হলেও আমরা বেশ আয়োজন করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে খেতে বসি। শোভন আমার প্লেটে খাবার তুলে দেয়, আমি তুলে দিই ওর প্লেটে। একা খাবার খেতে খেতে একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাসটাই ভুলে গেছি। আজ ওর সঙ্গে খেতে বসে, ওর সবটা মনোযোগ পেয়ে যেন আমার আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে।
টের পাই, শোভনের সঙ্গে দেখা হওয়ার দিনটি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দুপুর ততক্ষণে বিকেলের কোলে ঢলে পড়েছে। আমরা কফি খেতে খেতে উর্দু গজল শুনি। আমি উর্দু বুঝি না, কিন্তু সুর ভালো লাগে। শোভন গজলের প্রতিটি লাইন অনুবাদ করে শোনায়। ও যখন মগ্ন হয়ে হাত নেড়ে অনুবাদ করে, আমি তখন অনুবাদ শুনি না, একজন জাত শিল্পীকে দেখি। সন্ধ্যা ঘনাতে শুরু হলে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিই। যদিও মনে মনে প্রার্থনার মতো করে চাইছি, শোভন বলুক চিরদিনের জন্য থেকে যেতে। আমার মন যেমনটা চাইছে ওর মন কি তেমনটা চাইছে? মুখে বলতে না পেরে বোঝার জন্য আরও ঘণ্টাখানেক দেরি করে ফেলি। কিছুতেই যেতে ইচ্ছা করছে না, ইচ্ছা করছে ওর বুকে লেপ্টে থাকি, অনন্তকাল।
শোভন আমাকে উবারে তুলে বিদায় জানাতেই মনে হলো স্বর্গ থেকে ছিটকে পড়েছি। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। সতেরো বছর আগের টলটলে আঁখির সেই মেয়েটি পুনরায় ধূসর চরাচরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। একদিকে বৃষ্টি ভেজা চাঁদের ঝলমলে আলোয় পৃথিবী ভেসে চলছে, অন্যদিকে গভীর আধাঁর সাঁতরে জড়সড় আমি সামনে ছুটছি, কঠিন পৃথিবীতে লড়াই করে বেঁচে থাকার জন্য।