অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

যৌবন তামাতামা

তুমি অদিতি ইসলাম। তুমি একটা ফোক-রক ব্যান্ডের ম্যানেজার। তুমি আমেরিকায় চলে যাবে স্বামীর কাছে। তোমার বন্ধুরা তো রয়ে যাবে এই পিতলা বাংলায়। তাদের শানে তুমি আয়োজন করেছ একটা মাহফিল। তুমি আমন্ত্রণ জানিয়েছ ঢাকাইয়া মিড-আর্ট ইন্ডাস্ট্রির কুতুব, আবদাল ও আশেকানদের। একে একে সবাই আসতে শুরু করেছে। কিন্তু তোমার বয়ফ্রেন্ড সানিদের উস্তাদ তানভীর এখনো আসছে না।

তুমি তানভীর। ছাপড়িদের সাথে যখন তুমি নেশা করো, তোমাকে একদম অরিজিনাল ছাপড়ির মতোই লাগে। যখন তুমি বড়লোকের কন্যার সাথে প্রেম করো, তোমাকে মনে হয় গানপাউডার এম্পায়ারের কোনো প্রিন্স। কিন্তু তোমার চাইনিজ ফোন বেজে ওঠে। অদিতির কল। অদিতি তোমাকে পার্টিতে যেতে তাড়া দেয়। তুমি তো যেতেই চাও। কিন্তু গ্রামবাংলা থেকে এসেছে তোমাদের এক্স-চাষার ছেলে কাম তোমার ছোটবেলার বন্ধু সুলেমান। সুলেমানকে রেখে তুমি কীভাবে যাবা? কিন্তু নাছোড়বান্দা অদিতির কথায় সুলেমানকে সাথে নিয়েই তুমি ধানমন্ডি থেকে একটা সিএনজি করে রওনা দিয়েছ নিকেতনের দিকে, যেখানে পার্টি শুরু হচ্ছে। রনির অফিস কাম বাসায়।

তুমি ওয়াহিদ রনি। তোমার পুরা নাম জানি না। ধর্ম জানি না। দেশভাগের সময় তোমার বাবারা চলে এসেছিল পূর্ব বাংলায়। তুমি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নাকি সিনেমার আর্ট ডিরেক্টর, ঠিক জানি না। তোমাকে আমরা চিনি সফটকোর বামপন্থী ও সেমি-হিট গায়িকা সুমু আফরোজের এক্স-জামাই হিসেবে। এখনো সুমুর জন্য তোমার শিরায় শিরায় রক্ত। তুমি ছেড়ে এসেছ মরফিন প্রজাতন্ত্র। তোমাকে সুমু এসে বলে, একটু পরে তানভীর আসবে। ছাপড়ি তানভীর আসবে জেনে তোমার মেজাজ নষ্ট হয়। ছোটলোকগুলা সব জায়গায় ঢুকে যাচ্ছে। তুমি সুমুর ওপর রাগ করতে জানো না। কোনো মেয়ের সাথেই তুমি রাগ করতে জানো না। একে একে এসে পড়েছে তোমাদের বন্ধুরা। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে, যাদের এই জাতি চেনে। ফলে তাদের নাম নেওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকায় এসে শুনলে, আজ সন্ধ্যায় তানভীরের একটা পার্টি আছে। তানভীর তোমাকে আমন্ত্রণ জানাতেই তুমি রাজি। তুমি তো ভিন্ন সংস্কৃতি জানতে চাও। তুমি দেখতে চাও লিবারেলরা এই জীবন লয়ে কী করে! তুমি বন্ধু তানভীরের সাথে দাঁড়িয়ে আছ রনির বাসার দরজায়।

নাম না জেনেই এই দুনিয়ায় ঢুকে পড়ো যেখানে অভূতপূর্ব একটা সন্ধ্যা নামছে। এইটা শ্রমজীবীদের বাড্ডা না, না এইটা শিল্পপতিদের গুলশান। এইটা নিকেতন আবাসিক এলাকা। এইখানেই পার্টিটা হচ্ছে। লেকের ওই পারে বুর্জোয়া গুলশান থেকে আসছে একটি দুর্লভ চোরাচালান। ষাট বছরের পুরোনো হুইস্কির বোতল, আরও দূরে ছিঁচকে বাড্ডা থেকে আসছে মারফতি দেশাল পট যাকে গরিবেরা ডাকে ‘সর্বহারার এসি’ বলে। নিকেতনের এক নম্বর রোডের একটা বাড়ির সামনে এসে থামে সবুজ সিএনজি। সিএনজি থেকে নামছ তোমরা—তানভীর ও সুলেমান।

তুমি সুলেমান। তুমি গ্রামবাংলা। তুমি কওমি মাদ্রাসা। তুমি দাড়ি–টুপি। তুমি সিল্কের জোব্বা। তোমাকে লিবারেলরা মোল্লা বলেই ডাকে। তুমি জীবনে একটা বিড়ি খাও নাই। কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাও নাই। তুমি তাহাজ্জুদ পড়ো। কিন্তু তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড লিবারেল তানভীর। তুমি হয়তো তানভীরের বেস্ট ফ্রেন্ড না। কিন্তু তানভীরকে যখন বললে ঢাকায় আসবে, তানভীর তোমাকে বলে বাসে উঠে পড়তে। ঢাকায় এসে শুনলে, আজ সন্ধ্যায় তানভীরের একটা পার্টি আছে। তানভীর তোমাকে আমন্ত্রণ জানাতেই তুমি রাজি। তুমি তো ভিন্ন সংস্কৃতি জানতে চাও। তুমি দেখতে চাও লিবারেলরা এই জীবন লয়ে কী করে! তুমি বন্ধু তানভীরের সাথে দাঁড়িয়ে আছ রনির বাসার দরজায়। দরজা খুলে দেয় রনি। তুমি প্রবেশ করছ। তানভীর সবার সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেয়। তুমি সবাইকে সালাম দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছ। অদিতির সাথে তোমার পরিচয় হয় এবং তোমাকে দেখে সে তব্দা খায়। রনি ভ্রু কোঁচকায়। আমিরুল ব্যঙ্গ করে হাসে। তোমার উপস্থিতি যে কেউ সহ্য করতে পারছে না, এইটা কি তোমার হীনন্মন্যতা থেকে আসা ভুলভাল চিন্তা? নিশ্চিত হতে তানভীরের কানে কানে জিজ্ঞাসো...

কী হচ্ছে বলো তো তানভীর? তোমার বন্ধুরা কি সুলেমানকে দেখে আল-কায়দা ভাবছে? তোমার রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও তো তোমার বন্ধুরা নিশ্চিত নয়। কখনো মনে করে, তুমি সাঈদ কুতুব করো। কখনো ভাবে, অ্যান্ডি ওয়ারহোলের লাইন। তোমাকে অদিতি এসে ইশারায়–ইঙ্গিতে কী যেন বোঝায়। তোমাকে বলে যে তারা সারা রাত এইখানে থাকবে না। তারা ডিনার করে বের হয়ে যাবে। অদিতি তোমাদের তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে বলে। তুমি বুঝে ফেলেছ যে আসলে সুলেমানের উপস্থিতি কেউ নিতে পারছে না। তাই তোমাকে আসলে অদিতি বলতে চাইছে, তাড়াতাড়ি ডিনার করে দুই/তিন পেগ খেয়ে যেন তোমরা চলে যাও। তোমার মেজাজ খারাপ হয়। তুমি আবার সুলেমানকে বুঝতে দিতে চাও না যে তারা সুলেমানকে ঠিক পছন্দ করছে না। তোমার কথা শুনেই কিন্তু সুলেমান একদম চিল।

কয়েক পেগ মেরে তোমার বন্ধু সুলেমানের কাছে যাও। সুলেমান একদম চিল। সে লিবারেলদের কাণ্ডকীর্তি দেখে খুব আমোদ পায়। সে কিছুক্ষণ আগে ঢাকার এক নম্বর কাচ্চি খেয়েছে। এখন খাচ্ছে পেপের ঠান্ডা জুস। মদ খায় না বলে নাকি অদিতি আনিয়েছে। পার্টি জমে উঠেছে। একটার পর একটা গান চলছে।

ষাট বছরের পুরোনো মদের বোতল ঘিরে বসেছে তানভীরের বন্ধুরা। সবাই খুব উত্তেজিত। কিন্তু গোল বাধে বোতল খোলা নিয়ে। কে এই বোতল খুলবে? কে এই পার্টির মূল কুতুব। রনি? অদিতি? কিন্তু তুমি আমিরুল থাকতে এইখানে আর কে সেন্টারে থাকবে! তুমি পাঠশালা ইনস্টিটিউটের অল্প জলে গভীর সাঁতার। তুমি মদের বোতলের নিয়ন্ত্রণ নাও আর জানাও যে এইটা নকল মদ। রনি চেক করে দেখে জানায় যে এইটা মোটেও নকল মদ নয়। তুমি আমিরুল, তুমি রনি বিতর্ক করতে থাকো। কিন্তু তুমি তো রনি একটা। তোমার কথা হলো, ভেজাল হলেও এই মদ তুমি খাবে। তুমি কর্ক খুলে ডিরেক্ট বোতলে চুমুক দিয়ে দুইটা ঢোক দাও। সবাই তাকিয়ে আছে রনি মরেটরে যাচ্ছে কি না। না, রনি মরছে না। সুতরাং এই মদ ভেজাল না। একে একে সবাই মদ খেতে শুরু করে। তুমি আমিরুল খাবে না। তুমি তোমার জন্য আনানো মারফতি গুল্ম রোল করে জয়েন্ট বানাও। তোমাকে ঘিরে ধরছে তোমার গাঞ্জুট্টি বন্ধুরা।

তুমি তানভীর গাঞ্জা খাও না। কয়েক পেগ মেরে তোমার বন্ধু সুলেমানের কাছে যাও। সুলেমান একদম চিল। সে লিবারেলদের কাণ্ডকীর্তি দেখে খুব আমোদ পায়। সে কিছুক্ষণ আগে ঢাকার এক নম্বর কাচ্চি খেয়েছে। এখন খাচ্ছে পেপের ঠান্ডা জুস। মদ খায় না বলে নাকি অদিতি আনিয়েছে। পার্টি জমে উঠেছে। একটার পর একটা গান চলছে। সিগারেট আফটার সেক্সের অ্যাপোকেলিপস থেকে হাবিব ওয়াহিদের ‘বন্দে মায়া লাগাইসে’। সুমু আফরোজের এক্স জামাই রনি আস্তে আস্তে তুরীয় দশায় পৌঁছে যাচ্ছে। রনির মাথা নষ্ট হচ্ছে। এইটা সে ঢালবে কোথায়। এদিকে তাকাচ্ছে সে। রনি হঠাৎ তেড়ে আসছে তোমাদের দিকে। রনি তোমাকে বলে, এক্ষুনি তোমার বন্ধু সুলেমানকে নিয়ে বের হয়ে যেতে। তুমি তো গোঁয়ার। তুমি বের হবে না। তোমাকে সানি এসে বোঝায় যেন বের হয়ে যাও। তুমি বের হয়ে যাও।

তুমি সানি। এলিফ্যান্ট রোডের পাপীদের সম্রাট। তুমি তানভীরকে ওস্তাদ মানো। ওস্তাদরে যে বের করে দেওয়া হয়েছে, এইটা নিয়ে তোমার মন ছটফট করে। তুমি অদিতিরে সেই কথা বলো। অদিতি তোমারে বলে, এই সব মাথা থেকে ফেলে দিতে। তুমি আস্তে করে ফেলে দাও। সবকিছুর পর একসময় পার্টি শেষ হয়ে আসে। সবাই ক্লান্ত। মদের ঘোরও কমে আসে। আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে। রনি অদিতিকে তাড়া দিচ্ছে আস্তে আস্তে সবাইকে বের করে দিতে। সবাই আস্তে আস্তে তৈরি হয় বের হয়ে যেতে। হঠাৎ রনি দেখে, তার ল্যাপটপের ওয়্যারলেস মাউসটা পাওয়া যাচ্ছে না। রনি নিশ্চিত যে কেউ না কেউ এটা চুরি করেছে। রনি সবাইকে দাঁড় করিয়ে একে একে সবার ব্যাগ চেক করে। অদিতির মনে হতে থাকে, রনির বাসায় পার্টি করাটা ভুল কাজ হয়েছে। তার সব অতিথিকে অপমান করা হচ্ছে। অদিতির মনে হয় এইগুলা সব তার কর্মফল। তানভীর ও তার বন্ধুকে বিদায় করে দেওয়া ঠিক হয় নাই।

হয়তো অন্য গল্পের মতোই মাউসটা পাওয়া যায় কোনো সোফার কোনায়। বা হয়তো অদিতি সকাল সকাল চলে যায় তোমার বাসায়। তুমি ও তোমার বন্ধুর কাছে ক্ষমা চায়। হয়তো মাউসটা আসলে তুমিই নিয়ে চলে এসেছিলে। অদিতি চলে যাওয়ার পর হয়তো তুমি মাউসটা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দাও বাইরে।