অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

গল্প

ঈগল থাবা ও রাঘব বোয়াল

মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে ছোট্ট মাঠটা পার হতে থাকলে ঝোড়ো হাওয়ায় পাশের ঝাউগাছ দুটি থেকে শনশন শব্দ ওঠে। চমকে ওদিকে তাকিয়েছিলাম আমি, সঙ্গে সঙ্গে বেলাও।

—এই, ঝড় আসবে না তো? চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল ও।

—না, তা তো হওয়ার নয়, ওয়েদার ফোরকাস্ট তো তা–ই বলছে।

হঠাৎ ওঠা দমকা হাওয়া সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায়। আমি নরম সবুজ ঘাসে চাদর বিছিয়ে বরফসহ বালতিতে শ্যাম্পেইনের বোতল খুলে দিচ্ছি, বেলা বনভোজন–ঝুড়ি থেকে একটি থালায় সাজাচ্ছে তিন রকমের চিজ, হাঁসের কলিজার ‘পাতে’, কিছু আঙুর, শুকনো খেজুরের মতো আরও অনেক কিছু। ঠিক তখনই খানিক দূর থেকে ডাক ভেসে এল:

—কামিলা...কামিলা...

মাঠের ধারে ঝাউয়ের তলায় বসা বুড়োর গলায় উৎকণ্ঠা স্পষ্ট। বুড়ো বসে থাকলেও লম্বায় আমার সমান, দাঁড়ালে না জানি কেমন হবে। এত লম্বা বলেই কেন যেন সমীহের সঙ্গে একটু দূরত্ব বজায় রেখে এই জায়গা বেছে নিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত হামাগুড়ি দেওয়া মেয়েটার নাম কামিলা। বুড়োর নাতনিটাতনি হবে হয়তো। এতে উৎকণ্ঠার কী আছে! মেয়েটা যাচ্ছিল তো নানি বা দাদির দিকে। মহিলা বসে আছেন আমাদের ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে। মেয়েটা ওদিকেই যাচ্ছিল। বুড়োর গলা শুনে ঘাড় ফেরালে কামিলাকে চোখে পড়ে না, মহিলাকে ছাড়িয়েও না। হঠাৎ উবে গিয়েছে, মা ধরণি গিলে খেয়েছে। গেল কোথায় মেয়েটা? হামাগুড়ি দিয়ে চোখের আড়াল! অসম্ভব! এ ছাড়া মাঠে আর তো কেউ নেই। তবে... চোখের কোণ দিয়ে রন আমিচির মতো কাউকে কি পেয়েছি? নাহ্, অসম্ভব। রন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তেইশ বছর আগে।

শেরউইন উইলিয়ামস—আমেরিকান বিখ্যাত রঙের কোম্পানি। এই নামের কোনো গ্রাম আছে বলে জানা ছিল না। সেই কৌতূহল থেকেই আমরা নেমে স্টেশনের পাশেই একটা হোটেলে উঠি।

গ্রামের নাম শেরউইন উইলিয়ামস। স্টেশনে নামার দুই মিনিট আগে ঘোষণা শুনে অবাক হয়েছিলাম, শেরউইন উইলিয়ামস—আমেরিকান বিখ্যাত রঙের কোম্পানি। এই নামের কোনো গ্রাম আছে বলে জানা ছিল না। সেই কৌতূহল থেকেই আমরা নেমে স্টেশনের পাশেই একটা হোটেলে উঠি। এমন নয় যে বিশ্বের সব গ্রামের নামই আমার জানা বা আমরা এই অঞ্চলে থাকি। ব্যাপারটা অন্য রকম। গ্রাম হিসেবে নামটাই গোলমেলে, কিন্তু কেন যে গোলমেলে, নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।

আমরা থাকি সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে। অর্ধ–অবসর নেওয়ার পর থেকে সাত বছর যাবৎ প্রতিবারই ইউরোপে আসা হয়। আসি সাধারণত অফ সিজনের একটু আগে। এতে করে টিকিট পাওয়া যায় সস্তায়, পর্যটকের ভিড় থাকে কম। এ ছাড়া কড়ি সাশ্রয়ের জন্য টিকিটও কিনে রাখি অনেক আগে থেকে। প্লেন ও ট্রেন, দুটোই। সাধারণত এসে নামি হিথরো বা চার্লস দ্য গালে। ট্রেনের টিকিটের মেয়াদ এক মাস, বাইশবার ওঠানামা করা যাবে। এভাবেই প্রতিবছর আমরা এক মাস ইউরোপ দেখি, ট্রেন থেকে কোনো অচেনা জায়গায় নেমে পড়ি। সঙ্গে দুটো ব্যাকপ্যাক ছাড়া কিছুই থাকে না। মোটামুটি দেখা হয়ে যায় দু–এক দিনের মধ্যেই। আবার ট্রেনে উঠি অজানা কোনো গন্তব্যের খোঁজে। তবে মনে হয় না, এবার দু–এক দিনের মধ্যে এই জায়গাটাকে আবিষ্কার করতে পারব। ছোট হলেও গ্রামটা ভীষণ অন্য রকম। টারকয়েজ নীল গাছপালার রং থেকেই এটাকে আলাদা করা যায়। তা ছাড়া ট্রেন থেকে নেমেই দেখেছি, এখানকার বাসিন্দারা সব যুদ্ধফেরত সৈনিক ও তাদের পরিবার; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে বড় বড় যুদ্ধফেরত পশ্চিমা এখানে বাসা বেঁধেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শেষজন মারা গিয়েছে অল্প কয়েক বছর আগে।

গ্রামে ওরা ফলায় প্রচুর মাছ–মাংস ও কৃষিজাত পণ্য। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পাঠায় অন্যান্য জায়গায় আর আমদানি করে অন্য সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। বলা হয়ে থাকে, অ্যাটম বোমা হামলা না হলে এই একটা গ্রামই ঠেকিয়ে দিতে পারবে যেকোনো ধরনের আক্রমণ।

আজ সকালে হোটেল থেকে বেরোলে চোখে পড়ছিল প্রচুর পুকুর। হোটেলের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম নয়–দশ বছরের এক মেয়ে বড়শিতে গেঁথেছে রাঘব বোয়াল। একা টেনে তুলতে পারছিল না। ‘দাদা...দাদা...’ ডাকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। ঠিক পাশেই লম্বা তালগাছের ওপরের ঈগলটা ঠোঁট দিয়ে নখর ধারাচ্ছিল আর ঘাড় কাত করে তাকাচ্ছিল। তবে অবাক হয়েছিলাম অন্য এক দৃশ্য দেখে; খুব ভোরে আমারই মতো চামড়ার শ ছয়েক নারী–পুরুষ এসে নামল কয়েক ডজন বাস থেকে। সব চলে গেল খেতখামারে; কিন্তু গ্রামের বিশাল কারখানা তিনটির দিকে কেউ এগোল না। জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছিলাম, লাভজনক নয় বলে অনেক বছর যাবৎ ওগুলো বন্ধ রয়েছে।

প্রতিবছর আমরা এক মাস ইউরোপ দেখি, ট্রেন থেকে কোনো অচেনা জায়গায় নেমে পড়ি। সঙ্গে দুটো ব্যাকপ্যাক ছাড়া কিছুই থাকে না। মোটামুটি দেখা হয়ে যায় দু–এক দিনের মধ্যেই। আবার ট্রেনে উঠি অজানা কোনো গন্তব্যের খোঁজে।

বেলা আর আমি মেয়েটাকে খুঁজতে বৃদ্ধের সঙ্গে যোগ দিই। যোগ দেন বৃদ্ধাও, যাঁকে আমি মেয়েটার দাদি বা নানি ভেবেছিলাম। মেয়েটাকে নাকি বই পড়তে পড়তে লক্ষই করেননি, জানিয়েছিলেন উনি। ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় সবাই, যোগ দিয়েছে আমাদের সঙ্গে, কারও কারও হাতে কে–৯ কুকুরের চেইন। কুকুরগুলো ওদের আগে আগে হাঁটছে, এদিক–ওদিক অনিশ্চিতভাবে গন্ধ শুঁকছে, কিন্তু কোথাও কামিলার গন্ধ নেই। সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বেলা তিনটার পরপরই চলে গিয়েছে সব কটি বাস। গ্রামের অধিকাংশেরই সন্দেহ, ওদের কেউ একজন কামিলাকে চুরি করেছে। আমি যতই বলতে চাই, শেষবার যখন কামিলাকে দেখেছি, তখন বাজে চারটা সাতচল্লিশ, কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না, উল্টো সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, দমকা হাওয়ার কারণে মুঠোফোন দেখেছিলাম। তখন লেখা উঠেছিল ৪:৪৫। তা ছাড়া স্টেশনের পাশের দোকানটাতে কেনাকাটার রসিদে রয়েছে ৪:২৩–এর ছাপ।

সন্ধ্যা সাতটায় মেয়রের অফিসে জরুরি সভার ডাক পড়ে। বেলা আর আমি সবার পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। সবাই মেয়রের সঙ্গে একমত, বাইরে থেকে আসা কেউ একজন এই অপকর্ম করেছে। আগামীকাল থেকে আর বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

—তাহলে খামার, কৃষিকাজ, পরিষ্কার—এগুলো কে করবে? সভার অনেকেই প্রশ্ন করে মেয়রকে।

—আমরাই, জবাব দেয় মেয়র। বড় বড় যুদ্ধ করে আসা সাবেক সৈনিক এই সামান্য কাজ করতে পারবে না!

—তা ছাড়া জিনিসপত্র বিক্রি করতেও তো অনেকে গ্রামে আসে, আবার প্রশ্ন আসে ভিড়ের মধ্য থেকে।

—আগামীকাল থেকে বাইরের কিছু আর গ্রামে ঢুকবে না। আমাদের জিনিস আমরাই গড়ে নেব। কারখানা তিনটি আবার চালু হবে, আমাদের বেকার লোকেদের কর্মসংস্থান হবে। কেউ বাইরের কিছু আনলে শতকরা ৫৭ ভাগ শুল্ক আদায় করব। উত্তর দেয় উষ্কখুষ্ক সাদা চুলের মেয়র।

আমি আশপাশের কোথাও বৃদ্ধকে দেখতে পাই না। নিশ্চয়ই বনবাদাড়ে খুঁজছে। সে ভালো করেই জানে, কটার সময় মেয়েটা ‘নাই’ হয়ে গেছে।

—চলো, আমরাই ওকে সাহায্য করি।

বেলা প্রস্তাব দিলে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম মেয়রের অফিস থেকে।

দ্রুত আরেকটি সরঞ্জাম নিয়ে এলে বেলার সঙ্গে বিশাল পুকুরটিতে নেমে তলিয়ে যাই। হেনরি নেমেছিল পশ্চিম পাড় দিয়ে আর আমি পুবে। গাঢ় মশারির মতো তাঁবু দিয়ে ঢাকা ছোট্ট চারপেয়ে একটি খাট, পুকুরের তলায় স্থির।

রন আমিচি এক অদ্ভুত চরিত্র। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় কর্মসূত্রে, মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। রনের সঙ্গে ছিল বব, বব সেরনা। দুজনই আমাদের কাস্টমার, রেইনবার্ড কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। রনের নামে রয়েছে সতেরোটি আমেরিকান পেটেন্ট, যদিও সব কটির মালিকই হচ্ছে কোম্পানি। রন ও বব হরিহর আত্মা। সেই ভিয়েতনামের সময় থেকে। রন তিন–তিনবার ববের জীবন বাঁচিয়েছে। দুজনই ডেকোরেটেড। রন মেরিন, বব আর্মি। রনের বাপ–দাদা দুজনই মেরিনে ছিলেন। দুজনই ইতালির হয়ে যুদ্ধ করেছেন। তবে রনের জন্ম আমেরিকায়। কীভাবে সেটা সম্ভব হলো, তা জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর পাইনি রনের কাছ থেকে। আমাদের খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলেও ভিয়েতনাম প্রশ্নে কোনো জবাব পেতাম না। শুধু জমে থাকা সব ক্রোধ এসে ফরসা মানুষটার মুখটাকে লাল করে দিত। মাঝেমধ্যে এমন সব কাজ করত যে ওকে পুলিশ এসে থানায় নিয়ে যেত। একবার পুরোনো ইনজেকশন মোল্ডিং মেশিনের ব্যারেল দিয়ে কামান বানিয়ে ভেতরে বিশাল বিশাল আস্ত আলু ঢুকিয়ে ফায়ার করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল চুলা ভিস্তা শহরের চৌঠা জুলাইয়ের সন্ধ্যে। পুলিশ এসে ওকে ধরে নেওয়ার সময় অট্টহাসি দিচ্ছিল। থানায় নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে আর উত্তরে ও হো হো করে হাসে। শেষ পর্যন্ত ওকে ভেটেরান হাসপাতালে পাঠানো হয়। পিটিএসটি বলে দেওয়া চিকিৎসকের ওষুধগুলো ও আমাকে দেখিয়ে নর্দমায় ফেলে দিয়েছিল আর হাসছিল। খুব ভালো পেনে রাঁধত ও। রাঁধলেই ডাক পড়ত বব আর আমার। রনের বাড়িতে ছিল শুধু ইয়াং; খুব সুন্দর একটি ম্যাকাও। বাড়িতে ঢোকার আগে থেকেই শুনতে পেতাম, চিৎকার করছে, ‘এই রন, অতিথি, অতিথি’। কেন যেন রনের কথা খুব করে মনে পড়ছিল। ওকেই কি দেখতে পেয়েছিলাম? না, কীভাবে? কিন্তু এরাও তো সাবেক যোদ্ধা, হয়তো কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, মাঠে এসে থাকলে হয় বৃদ্ধার সঙ্গে নয়তো বৃদ্ধের সঙ্গে, জিজ্ঞাসা করতে হবে। হেনরিকে পেয়েছিলাম মাঠ বা পার্কটির পাশের এক পুকুরে। ততক্ষণে বৃদ্ধের নাম জেনে গেছি। পিঠে অক্সিজেন নিয়ে ডুব দিয়েছিল। পুকুরের তলা ওলটপালট করেও কিছু পায়নি। জানিয়েছিল ও। এখন কাছের আরেক পুকুরে যাবে।

—রন আমিচিকে চেনো? হঠাৎ আমার প্রশ্নে চমকে ওঠে বৃদ্ধ।

—তুমি! ওকে চেনো? এই তো আজ বিকেলেও এসেছিল। খুব ভালো ফ্রগম্যান।

—তাহলে সে–ই হবে, ওকেই দেখেছি। আর তাই বুঝি তুমি শুধু পুকুরগুলোতেই খুঁজছ? কিন্তু ওর দ্বারা কি কোনো শিশুর ক্ষতি সম্ভব?

—আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আমরা মাঝেমধ্যে পাগল হয়ে যাই, বোধবুদ্ধি সব লোপ পায় তখন।

—বাড়তি স্কুবা সরঞ্জাম আছে? জিজ্ঞেস করেছিলাম।

—কেন? জানো নাকি?

—হ্যাঁ, একটু–আধটু। এতটুকু গভীরতায় অসুবিধা হবে না।

—মেনিয়েরসের কারণে ডাক্তার না তোমাকে ডুব দিতে বারণ করেছে!

বাড়ির সদর হাঁ করে খোলা। ড্রয়িংরুমের দরজা প্রায় প্রচণ্ড ধাক্কায় খুলে যায়। সামনে কামিলা, দোলনায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। একটু থেমে কামিলাকে পরখ করে হেনরি, মেয়েটার বিন্দুমাত্রও ক্ষতি হয়নি। একলাফে এগিয়ে যায় হেনরি, জড়িয়ে ধরে রনকে।

আমাকে বিরত করা যাবে না বুঝতে পেরে বেলা কথা শেষ না করে থেমে আমার মুখের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকল।

দ্রুত আরেকটি সরঞ্জাম নিয়ে এলে বেলার সঙ্গে বিশাল পুকুরটিতে নেমে তলিয়ে যাই। সূর্যের আলো তখনো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। হেনরি নেমেছিল পশ্চিম পাড় দিয়ে আর আমি পুবে। গাঢ় মশারির মতো তাঁবু দিয়ে ঢাকা ছোট্ট চারপেয়ে একটি খাট, পুকুরের তলায় স্থির। একটি পায়ার সঙ্গে অক্সিজেন ট্যাংক, ওপর দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে অক্সিজেন টিউব। যত দ্রুত সম্ভব সাঁতার কেটে দুজনে ধরে খাটটা ওপরে নিয়ে আসতে আসতে গোধূলি পার হয়–হয়। চারদিকে লোকজন ঘিরে ধরেছে। বেলা আর মেয়র দাঁড়িয়েছে পাশাপাশি। ভেতর থেকে কামিলার হাত–পা ছোড়ার স্পষ্ট শব্দ পাচ্ছি। সবাই মুঠোফোনে ভিডিও করছে। হেনরি খুব ধীরে ধীরে সতর্কতার সঙ্গে মশারির একটা অংশ তুলে ভেতরে মাথা ঢোকায়।

একই রকম সতর্কতার সঙ্গে বের করে নিয়ে আসে কামিলার আকৃতির একটি পুতুল, মুখে অক্সিজেনের নল গোঁজা। গলায় নেকলেস। ভিড়ের কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু সবার দীর্ঘশ্বাস একত্রে মিলে ঝোড়ো হাওয়ার রূপ নেয়। তালগাছটার মাথা থেকে ঈগলটা উড়াল মারে। হেনরি নেকলেসের লকেট খুলে ভেতর থেকে অভিজ্ঞ মেরিনের মতো বের করে একটি চিরকুট: ‘তালগাছে ওঠো। ঈগলটা পঞ্চাশটি ডিম পেড়েছে। আমি ওর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড থেকে আনা একেবারে অন্যগুলোর মতো একই রকম আরেকটি নকল ডিম রেখেছি। ওটি চিনে নিয়ে খুললে ভেতরে পাবে পরবর্তী নির্দেশ। অন্য কোনোটা ছোঁয়া যাবে না।’

মাথা নেড়ে দুহাত উল্টো করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে হেনরি। আমি কাছে থাকায় হাতের লেখাটা চিনতে পেরেছিলাম—রন আমিচি। আমাদের চোখে চোখে কথা হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে আমি গাছে চড়ায় ওস্তাদ। কাপড়চোপড় খুলে তৈরি হতে শুরু করলে মাথা নেড়ে বলে হেনরি, ‘দেখছ না এখানে কী লেখা আছে? আমাকেই উঠতে হবে, ওর নির্দেশ পরিষ্কার। তা ছাড়া না ছুঁয়ে একান্নটি ডিম থেকে সঠিকটি চিনে নেওয়া আমি ছাড়া আর কারও কম্ম নয়। বুড়ো হয়েছি, কিন্তু মনে হয় এখনো পারব, শেষবার গাছে উঠেছিলাম তা–ও বছর তিরিশেক তো হবেই।’ বলতে বলতে কাপড়চোপড় ছেড়ে হাতে একটুকরো রশি নিয়ে এগিয়ে গেল তালগাছের দিকে। কোমরে গোঁজা কমব্যাট নাইফ। আমি বারবার আকাশের দিকে তাকাই চক্কর দেওয়া ঈগলের ভয়ে।

তড়তড়িয়ে কোনো কিশোরের মতো হেনরি উঠে যাচ্ছে তালগাছ বেয়ে, হাতের রশিটা দিয়ে যেভাবে ওপরে উঠছে, মনে হচ্ছে প্রতিদিনই সে গাছটায় চড়ে ঈগলের সঙ্গে গল্প করার জন্য। ওপরে উঠলে ওর শরীরের অর্ধেকটা ঢাকা পড়ে যায় তালপাতার আড়ালে। ঈগলটাকে আশপাশের কোথাও দেখা যায় না। যেভাবে উঠেছিল, তারও বেশি গতিতে নেমে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় আরেকটি চিরকুট: ‘তোমার ড্রয়িংরুমে দেখা হবে।’ হাতের ছোরা বাগিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে এগোয় হেনরি। ওর পিছু নিয়ে পথ আগলে ছোরা কেড়ে নিই।

—ঠিক আছে, খালি হাতেই ওর সঙ্গে আজ হবে একহাত। হয় ও মরবে, নয়তো আমি।

বলতে বলতে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায়। ওর সঙ্গে পা মেলাতে আমাদের দৌড়াতে হয়। বাড়ির সদর হাঁ করে খোলা। ড্রয়িংরুমের দরজা প্রায় প্রচণ্ড ধাক্কায় খুলে যায়। সামনে কামিলা, দোলনায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। একটু থেমে কামিলাকে পরখ করে হেনরি, মেয়েটার বিন্দুমাত্রও ক্ষতি হয়নি। একলাফে এগিয়ে যায় হেনরি, জড়িয়ে ধরে রনকে।

—আজ শোধবোধ হলো।

মেয়র চিৎকার করে পুলিশ ডাকতে বলে।

—ওর বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। বাদী কে হবে? বলে হেনরি।