অলংকরণ: আরাফাত করিম
অলংকরণ: আরাফাত করিম

গল্প

দুহিতার বেসাতি

অন্ধকার ঘরে বসে আছে কুলসুম। তার কোলের ওপর একটা শাড়ি। লাল জমিনের ওপর জরির কাজ করা। হারিকেনের মরা আলোতেও শাড়িটা খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এত সুন্দর শাড়ি কোনো দিন দেখিনি সে। কোনো দিন পরতে পারবে, এমনটাও ভাবেনি। অথচ শাড়িটা এখন তার হাতে।

তবে শাড়িটা হাতে পেয়েও কুলসুম খুশি হতে পারে না। তার মুখে হাসি নেই। লম্বাটে ফরসা মুখটা গম্ভীর করে বসে আছে সে। তার গাল বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।

কুলসুমের হাতে শাড়িটা তুলে দিয়েছে টুনটুনি।

টুনটুনির বয়স আট-নয় বছর হবে। গোলগাল ফরসা মুখে বাঁশির মতো টানা নাক। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলো কাঁধ অবধি নেমে এসেছে। সবাই বলে টুনটুনি ঠিক কুলসুমের মতো চেহারা পেয়েছে। তাদের আপন দুই বোন ভেবে ভুল করে অনেকেই। যদিও টুনটুনি কুলসুমের চাচাতো বোন। কুলসুম নিজের বোনের মতোই ভালোবাসে টুনটুনিকে। কুলসুমের মনে হয় টুনটুনি তার চেয়ে বেশি সুন্দর। অন্তত গায়ের চামড়া তার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই কুলসুমের।

আজ শাড়ি হাতে নিয়ে টুনটুনি অনেক খুশি। এত খুশি যে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। কুলসুমের চোখের পানি তার নজরে এল না। কুলসুমের হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে নিজের ফুলতোলা ময়লা ফ্রকের ওপর মেলে ধরল টুনটুনি। শাড়ির লাল আভায় টুনটুনির ফরসা গাল আরও লাল হয়ে গেল।

কুলসুম টুনটুনিকে বলল, ‘তর পছন্দ হইছে শাড়িডা? পিনবি?’

টুনটুনি লজ্জা পেয়েও নিজেকে সামলে নিল, ‘হ, পিনমু।’

‘নে, ঝটপট পিন্দা নে।’

এবার টুনটুনি কী যেন চিন্তা করে। গম্ভীর মুখে বলে, ‘আম্মায় মারব আমারে। তা ছাড়া মানুষটা বেজার হইব। তোমার জন্য শাড়িডা আনছে।’

‘তুমি পিন্দ বু।’ এটুকু বলে টুনটুনি খিলখিল করে হাসতে থাকে।

একটু দম নিয়ে বলে, ‘আম্মা তোমারে সুন্দর করে সাজবার কইছে বু। হাতে চুরি পিনতে কইছে। লাল নিবিস্টিক দিবার কইছে।’

কুলসুম বলল, ‘আচ্ছা তুই যা। পরে আসিস টুনটুনি।’

কুলসুমের ঘর থেকে বের হয়ে পাশের ঘরে গেল টুনটুনি। তাদের ঘরটা আধাপাকা। তবে ঘরটা অনেক পুরোনো। ঘরের মাঝে একটা টিনের বেড়া দিয়ে দুটি পৃথক ঘর করা হয়েছে। এক ঘরে থাকে টুনটুনি আর কুলসুম।

অন্য ঘরে থাকে কুলসুমের চাচা আমিনুল আর চাচি রাশেদা।

শাড়িটা কোলে নিয়ে কুলসুম আবার ভাবনায় জড়িয়ে গেল।

শাড়িটা একজন লোক এনেছে। শাড়িটার দিকে তাকাতেই তামাটে বর্ণের সুঠাম স্বাস্থ্যের লোকটার ছবি ভেসে উঠল তার মনে। শাড়ির লাল জমিনে যেন তার কুৎসিত ছবি আঁকা রয়েছে।

লোকটা বসে আছে কুলসুমের চাচার ঘরে।

চাচার সঙ্গে একমনে কথা বলে যাচ্ছে লোকটা। যদিও চাচা কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না। আসলে উত্তর দিতে পারছে না। কারণ, তার কথা বলার শক্তি নেই। সে আগে সিএনজি চালাত। একটা দুর্ঘটনায় প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়েছে। এখন কিছুই করতে পারে না। মুখের অস্পষ্ট কথাগুলো জড়িয়ে আসে। কিছুই বোঝা যায় না। বোবা প্রাণীর মতো শুধু গোঁ গোঁ শব্দ করে।

প্রতিদিন সকালবেলা কুলসুম আর তার চাচি টেনেটুনে উঠানে নিয়ে আসে আমিনুলকে। উঠানে পাতা জলচৌকিতে শুয়ে শুয়ে তার দিন কাটে। কুলসুমের চাচার আশপাশে সারাক্ষণ মাছি ভনভন করে। কখনো তার মুখে লেগে থাকা খাবারের লোভে, কখনোবা তার নোংরা লুঙ্গির সঙ্গে লেপটে থাকা নোংরার খোঁজে। সে অসুস্থ হয়ে শুধু নিজেই বিছানায় পড়েছে তেমন নয় বরং এ সংসারটাকেই পথে বসিয়ে দিয়েছে।

তাই কুলসুমের চাচিকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। তিনিই এ সংসারের কর্ত্রী। চাচিই কুলসুমের একমাত্র অভিভাবক। তিনিই কুলসুমের বিয়ে ঠিক করেছেন। বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে আছে। চাচার ঘরে বসে থাকা লোকটার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।

লোকটার কথা মনে হতেই আবার কুলসুমের গা গুলিয়ে এল।

লোকটাকে কুলসুমের মোটেই পছন্দ না।

কিন্তু সে কথা কাউকে বলতেও পারছে না কুলসুম।

কাকে বলবে?

কুলসুম এতিম মেয়ে। চাচার ঘরে মানুষ হয়েছে। চাচা নিজ সন্তানের মতোই তাকে দেখতেন। চাচা কুলসুমকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। চাচির শাসন-অত্যাচার থেকে আগলে রেখেছেন। কুলসুম তার জীবনের সবটুকু ভালোবাসা একমাত্র চাচার কাছ থেকেই পেয়েছে। চাচাকে বলা যেত এই লোকটাকে বিয়ে করতে ইচ্ছা করছে না তার। কিন্তু এখন সেটা কীভাবে সম্ভব?

আর বাকি থাকে চাচি।

কিন্তু চাচিকে এ কথা কীভাবে বলবে সে? সংসারের জোয়ালের চাপে এমনিতেই চাচির চেহারায় কাঠিন্য ভর করেছে। কাঁচা চুলগুলো পাকতে শুরু করেছে। শ্যামলা চামড়া বিবর্ণ হতে হতে তামাটে রং ধারণ করেছে। পঁয়ত্রিশ পেরোনো চাচিকে ভীষণ ভয় করে কুলসুম। ছোটবেলা থেকে আজ অবধি ভয় এতটুকু কমেনি কুলসুমের।

কুলসুম আবার ভাবে, লোকটাকে সে যতটা অপছন্দ করে ততটা অপছন্দ করার মতো লোক সে না।

তার অনেক টাকা আছে।

বাজারে বড় ব্যাবসা আছে।

নিজের দুটি মনিহারি দোকান আছে।

কুলসুম নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে, যার এত কিছু আছে তার বউ হতে এত অনীহা কেন? সারা জীবন অর্থকষ্ট করেছে সে। পরনের জামা নোংরা হতে হতে কালশিটে না পড়লে সাবান ছোঁয়ানো হতো না। দুটি জামার বেশি কপালে জোটেনি কখনো। বাজারের সবচেয়ে কম দামি জামাটা যে তার গায়েই উঠত, সেটা সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে। অথচ আজ তার হাতে দামি লাল শাড়ি। লাল জমিনে জরির কাজ করা। সুন্দর শাড়িটা বুকে জড়িয়ে নিজেকেই প্রবোধ দেয় সে, ‘এই লোকের সাথে বিয়ে হলে সুখেই থাকব আমি!’

হুম, কুলসুমের চাচিও সেটাই বলেন। এই বিয়ে হলে কুলসুমের সুখের সীমা থাকবে না। সে নাকি রাজরানির কপাল নিয়ে এসেছে। কুলসুমের অনাগত ভাগ্য দেখে চাচি নিজেই নিজের কপাল চাপড়ান।

তবে কুলসুম সব বোঝে!

এই বিয়ে হলে তার যেমন কপাল খুলবে, তেমনি চাচির কী-ই বা ক্ষতি আছে। বরং তার চাচির লাভের ওপর লাভ। তবু সে চাচির কথার পিঠে কথা বলে না। নীরব থাকে।

কুলসুমের নীরবতায় চাচি আরও যুক্তি দেখান,

‘শোন কুলসুম, মানুষটার না হয় বয়স একটু বেশিই। তাতে কি! তা কতই বা বয়স হইছে তার?’

চাচির কথায় উত্তর দেয় না কুলসুম।

চাচি আবার বলেন, ‘না হয় লোকটার একটা খুঁত আছে। কিন্তু সেই খুঁতে তার দায় কই? সাপের কামড়ে তার বউ মরছে। তাই কি মানুষটা আর বিয়াশাদি করবে না?’

কুলসুম আবারও নিরুত্তর থাকে।

চাচি যুক্তি দেখান, ‘তর খুঁত নাই কুলসুম। সেই কবে তর বাপ-মায়েরে খাইছস! সেই হিসাব আছে? এতিম মাইয়ারে কে বিয়া করে? মানুষটা সাদা দিলের। তাই রাজি হইছে।’

চাচির কথাগুলো সত্যি বলেই মনে হয় কুলসুমের কাছে। তাই সে এবারও চুপ থাকে।

চাচি আবার বলেন, ‘মানুষটা কি একলা একলা বাকি জীবন পার করব? পুরুষ মানুষ কি একলা সংসার করতে পারে?’

হুম, পারে না। কুলসুম মাথা দুলিয়ে চাচির সঙ্গে সম্মত হয়।

চাচি আবার বলেন, ‘না হয় তার চারটা ছেলেমেয়ে আছে। তাতে কি? যে লোকের বউ ছিল তার সন্তান থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তবে ভালা যে সবাই বড় হয়ে গেছে। বড় মেয়েটার ঘরের নাতনিও আছে। দুই ছেলেরে বিয়া করাইছে। এমন গোছানো সংসার সবার ভাগ্যে কী হয়?’

না, মনে মনে ভাবে, এমন ভাগ্য আর কজনার হয়!

তাই কুলসুম চাচির কথা মেনে নেয়।

কিন্তু তবু লোকটাকে সে পছন্দ করে না। পছন্দ করতে পারে না। লজ্জায় গা গুলিয়ে আসে তার। চাচিকেও বলতে পারে না কিছুই।

অবশ্য চাচিকে বলারই বা কী আছে?

তার চাচি কি সব বোঝে না!

হুম, সব বোঝেন চাচি। অবশ্যই বোঝেন। সব জানেন তিনি।

তাই মনকে প্রবোধ দেয় কুলসুম, চাচিকে বলে কী হবে?

এসব ভাবতে ভাবতেই বাইরের ঘর থেকে চাচি ডাকলেন, ‘কুলসুম কী করে মা? সাজগোজ হইছে।’

চাচির আদুরে গলার ডাক শুনে কুলসুম মনে মনে হাসে। এমনিতে চাচি যখন কুলসুমকে ডাকেন, তখন খুব কর্কশ গলায় ডাকেন। যখন কথা বলেন তখন খোঁটা দিয়ে কথা বলেন। যখন কুলসুমের দিকে তাকান তখন শ্যেন দৃষ্টি দিয়ে তাকান। যখন গায়ে হাত তোলেন তখন পাষাণ হয়েই গায়ে হাত তোলেন।

অথচ লোকটা যেদিন ঘরে আসে, সেদিন চাচি যেন অন্য মানুষ হয়ে যান। চাচির ডাকগুলো আদুরে হয়। কথাগুলো রসে ভরা মিষ্টি হয়। চাচির দৃষ্টিগুলো হয় নিরীহ।

কুলসুম কিন্তু সব বোঝে কেন চাচি এই ভোল পাল্টান! কেন চাচির মুখে মধু ঝরে পড়ে, সব বোঝে কুলসুম।

চাচির আদুরে ডাক শুনে বিছানা থেকে উঠে বসে কুলসুম।

বাইরে চাচি রান্না করছে। মাছভাজার শব্দ শুনতে পায় সে। গরম তেলে ছাঁৎ করে শব্দ করে উঠল। ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে মনে হয়। মাছের গন্ধে কুলসুমের পেট মোচড় দিয়ে উঠল।

কুলসুম জানে এরপর পোলাও রান্না করা হবে। প্রতিবার লোকটা আসলে চাচি পোলাও রান্না করে। পোলাওয়ের গন্ধে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় টুনটুনি। কিছুক্ষণ পরপর টুনটুনি এসে রান্নার বিষয়ে কুলসুমকে জানিয়ে যাবে। টুনটুনির মুখ হাসি হাসি থাকবে। আজ সে পেটপুরে পোলাও খাবে। এ আনন্দেই কদিনের উপোস থাকার কথা ভুলে যাবে সে।

হুম, গত দুদিন এ বাড়িতে চুলা জ্বলেনি। এক বয়াম মুড়ি আর একচিলতে পাটালি গুড় ছিল সম্বল। সেই গুড় পিঁপড়ার মতো একটু একটু করে খরচ করতে হয়েছে।

এসব ভাবতে ভাবতে ঘরের পেছনের দরজা খুলল কুলসুম। পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে উঠানে চলে এল সে। উঠানের এক কোনায় চাচি রান্নায় ব্যস্ত। কুলসুম ভাবল চাচিকে রান্নায় সাহায্য করবে।

কিন্তু চাচি কপট রাগ দেখালেন, ‘তরে না কইছি নয়া শাড়ি পিনতে। একটু সুনু পাউডার দিয়া সাজগোজ করতে। হাতে চুড়ি পিনতে। জামাই আসছে দেহস নাই?’

কুলসুম দীর্ঘশ্বাস গোপন করে।

চাচির কথা তার কানে বাজে, জামাই?

মানে কুলসুমের স্বামী। কিন্তু এ কেমন জামাই? যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি, সে কেমন জামাই কুসুম সেটা ভেবে পায় না। চাচির কথায় কুলসুমের প্রচণ্ড ঘেন্না হলো। আবার ঘরে চলে এল সে। রাতের অন্ধকারের মতো এক পরিচিত ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলল। আতঙ্কে মনটা কেঁপে উঠল আবার।

চাচির কথামতো সাজতে বসল কুলসুম।

কুলসুম জানে এরপর কী হবে?

সে সাজগোজ করে ঘরে বসে থাকবে। লোকটা তার ঘরে আসবে। পাশে বসবে। তারপর তাদের বাসর হবে।

এ সময় চাচা পাশের ঘরেই থাকবেন। চাচার গোঁফের সঙ্গে লেগে থাকবে থকথকে আমের রস। সেই আমের রসে নীল মাছি বসবে। চাচার চোখ দিয়ে পানি পড়বে।

আর চাচি?

চাচি রান্না শেষ করে টুনটুনিকে দোকানে পাঠাবে। টুনটুনি লোকটার জন্য মিষ্টি পান আনবে।

মিষ্টি পান এনে টুনটুনি জানতে চাইবে, ‘বুজান কই?’

চাচি বলবেন, ‘ঘরেই আছে।’

টুনটুনি আবার বলবে, ‘দুলাভাই কই?’

চাচি আবার জবাব দেবেন, ‘কুলসুমের ঘরেই আছে।’

টুনটুনি বলবে, ‘আম্মা, বুজান কি লাল শাড়ি পিনছে?’

চাচি বলবে, ‘হ পিনছে।’

টুনটুনি আবার বায়না ধরার মতো করে বলবে, ‘আমি যাই? এক দৌড়ে দেইখা আসি।’

চাচি খামচি দিয়ে টুনটুনির হাত ধরে ফেলবে। বলবে, ‘ওই হানে যাবি না কইলাম মাগি।’

সন্ধ্যারাত মরে গিয়ে যখন রাত গভীর হবে তখন আবার চাচির গলা শোনা যাবে।

চাচি আহ্লাদি কণ্ঠে কুসসুমকে ডাকবে, ‘জামাইরে নিয়া ভাত খাইতে আয় কুলসুম।’

কুলসুম তার হবু জামাইয়ের বুকের রোমশ লোম থেকে কোনোমতে মুখ তুলে বলবে, ‘আইতাছি চাচি।’

তার হবু জামাই তাকে ছাড়তে চাইবে না। আবার পিষে ধরবে নিজের ঘমার্ত বুকের সঙ্গে।

কুলসুম তাকে বাধা দেয় না কখনো! নিষেধ করে না তাকে। আহা, খরচাপাতি কী কম করেছে লোকটা? প্রতিবার ইলিশ মাছ, মুরগি, পোলাওয়ের চাল নিত্যনতুন আরও কত কী আনে সে।

সঙ্গে নগদ টাকা তো আছেই! যে টাকায় তাদের দিন পনেরো চলে যায় নিশ্চিন্তে। সুতরাং খরচের টাকা না তুললে তার হবু জামাইয়ের পোষাবে কী করে?

প্রতিবার এভাবেই রাতের খাবার খেয়েই চলে যায় লোকটা।

কিন্তু আজ সন্ধ্যা হতেই বৃষ্টি নামল। চাচার ঘরে চাচা, চাচি আর লোকটা গল্প করছে। চাচি বললেন, ‘আজ রাতটা না হয় থাইকা যান। এই বাদলার দিনে বাড়ি যাইয়া কী করবেন?’

প্রত্যুত্তরে লোকটা কী বলল, এ ঘর থেকে শুনতে পেল না কুলসুম। তবে লোকটার সম্মতিসূচক হাসির শব্দ কানে এল তার।

রাত বাড়তে থাকে। কিন্তু চাচি আর লোকটার গল্প শেষ হয় না।

এ ঘরে কুলসুম সাজগোজ করছে। তার সঙ্গে আছে টুনটুনি। লিপস্টিক, চুড়ি, আর লাল শাড়িতে সাজিয়ে নিল নিজেকে। তার দিকে টুনটুনি হাঁ করে তাকিয়ে আছে।

সাজগোজ শেষ হতেই কুলসুমের হবু জামাই ঘরে এল। তার মুখ হাসি হাসি। মুখ থেকে মিষ্টি পানের সুবাস আসছে। কুলসুমকে দেখে যেন চমকে গেল। বলল, ‘খুব সুন্দর লাগছে তোমারে।’

লোকটা ঘরে আসতেই চাচির গলা শোনা গেল, ‘টুনটুনি শুইনা যা।’

টুনটুনি চলে গেল।

টুনটুনি চলে যেতেই লোকটা কুলসুমের কাছে চলে এল।

কুলসুমকে জড়িয়ে ধরতেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

কুলসুম জানে তার হাসি চাচার কানে যাচ্ছে। তার বেহায়াপনার কারণে একটুও লজ্জা পেল না সে। হিহি করে হেসেই যাচ্ছে মেয়েটা।

লোকটা আরও কাছে এল কুলসুমের।

কুলসুম হাসতে থাকে। হিহি হিহি।

কুলসুম জানে লোকটা তাকে কোনো দিন বিয়ে করবে না। কোনো দিন না। চাচির চোখের দিকে তাকিয়ে সব পড়ে ফেলতে পারে কুলসুম। সোনার ডিমপাড়া হাঁস হারাতে চায় কে? কুলসুম যে চাচির ডিমপাড়া সোনার হাঁস, এটা কুলসুম ভালো করেই জেনে গেছে এ কদিনে।

আর লোকটা?

বিয়ে না করে এত নিরাপদ বাসর ছাড়বে কোন পুরুষ? অযথা বিয়ে করে লোকটাই–বা তার বাড়িতে ঝামেলা পাকাবে কেন? বাড়িতে ছেলে আছে, ছেলেবউ আছে। তাই কুলসুম জানে এ বিয়ে হওয়ার নয়। কোনো দিন এ বিয়ে হবে না বলে কুলসুম নির্ভার হয়।

কিন্তু সে জানে, দিন পনেরো পর আবার তাদের বাসর হবে। আবার কোনো সন্ধ্যায় লোকটা ঘরে আসবে। কুলসুমকে বউ সাজতে হবে আবার। চুড়ি-লিপিস্টিক পরে মনের মতো করে সাজতে হবে আবার।

আবার চাচি ইলিশ মাছ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। মাছভাজার ছাঁৎ করা শব্দ ঘর থেকে শুনতে পাবে কুলসুম।

লোকটার জন্য পান সাজিয়ে বসে থাকবে টুনটুনি। পানের খিলি থেকে চুরি করে মিষ্টি সজ খেয়ে ফেলবে টুনটুনি। সঙ্গে নেবে এক চিমটি পান। চাচি কপট ধমক দিলে ফিক করে হেসে উঠবে টুনটুনি। হারিকেনের আলোতে টুনটুনির লাল জিব দেখা যাবে।

আর কুলসুম!

কত কিছুই তো ভাববে সে! ইঁদুর মারার বিষ কিনে বালিশের নিচে রেখে দেবে। কিংবা ফাঁস নেওয়ার জন্য দড়ি জোগাড় করবে। নিদেনপক্ষে এ বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি নেবে সে। কিংবা বিষাক্ত হাতে চাচির গলা টিপে ধরার প্রস্তুতি নেবে। হয়তো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে লোকটার ভুঁড়ি গালিয়ে দেওয়ার কথাও ভাববে সে।

প্রতিবার এমন ভাবে কুলসুম।

কিন্তু পেরে ওঠে না সে। কিছুই করা হয়ে ওঠে না তার। ভাবতে ভাবতেই পনেরো দিন চলে যাবে। আবার লোকটা ঘরে আসবে। লোকটার বুকে শুয়ে কুলসুম আগামী পনেরো দিনের খোরাকি জোটাবে। এ খোরাকি না জোটালে তার টুনটুনি ক্ষুধায় যে ছটফট করবে! তার চাচা যে ওষুধের অভাবে বিছানায় কাতরাবে! তাই তাকে শুতেই হবে। দিনের পর দিন শুতেই হবে।

একবার চিন্তা করে কুলসুম, কোনো একদিন চাচির পায়ে পড়বে সে।

বলবে চাচি চলো ভিক্ষা করি। চাচাকে নিয়ে শহরে চলে যাই। সেখানে কেউ চাচাকে চিনবে না। একটা ঠেলাগাড়িতে চাচাকে শুইয়ে দিয়ে আমি বসে থাকব। সারা দিন রোজগার করব আমরা। দেখবে আমাদের খোরাকি উঠে আসবে। শহরের বস্তিতে একটা ঘর নেব। টুনটুনিকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দেব। সুগন্ধি শ্যাম্পু কিনে টুনটুনির আঠালো চুলগুলো ধুয়ে সাফ করে দেব। পুরাতন ফুলতোলা ফ্রকটা ফেলে দেব। সস্তা মার্কেট থেকে টুনটুনির জন্য দুই জোড়া নতুন জামা কিনব। জুতা কিনব। এমনভাবে সাজাব তুমি নিজেই টুনটুনিকে চিনতে পারবে না।

কুলসুমের মনের কথাগুলো চাচিকে সহসা বলতে পারে না সে। মনের কথাগুলো মনের ভেতরেই ক্লান্ত কোনো পাখির মতো ডানা ঝাপটায়।

আজ এসব যখন ভাবছে ততক্ষণে লোকটা তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। কুলসুম মুহূর্তেই দেখল লাল শাড়িটা আর তার শরীরে নেই। শাড়িটা জড়সড় হয়ে বিছানার এক কোনায় পড়ে আছে। হারিকেনের চাপচাপ অন্ধকার আলোয় ঘরটা জমাট হয়ে আছে। সে আলোতেই লোকটা ঠিকঠিক তার শরীরের সবকিছু চিনে নিচ্ছে।

আরও একটু কাছে টানতেই কুলসুম হিহি হিহি করে হেসে উঠল।

তার হাসি শুনে লোকটা ভড়কে গেল। কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। পরক্ষণেই আবার নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।

হাসি বাদ দিয়ে এবার কুলসুম মুখ খুলল। বলল, ‘আইজ তো বাদলা দিন। আইজ আপনে আইছেন কেন?’

লোকটা তার কথার ভুল মানে খুঁজে নিল। বাইরে ঝম-ঝম বৃষ্টি হচ্ছে। সে ভাবল কুলসুম সেটার কথা বলেছে। তাই সে বলল, ‘বাদলা দিন আর শীতের দিন আমার খুব ভালা লাগে রে কুলসুম।’

কুলসুম আবার হাসে।

লোকটার ভুল শুধরে বলল, ‘আপনে ভুল সময়ে আইছেন। তিন দিন পরে আইসেন। হিহি হিহি। তিন দিনের আগে এ বাদলা কমব না।’

তার কথা শুনে লোকটা যেন বজ্রাহত হলো। এবার সে তার কথার অর্থ বুঝতে পারল। কুলসুমের কোমর থেকে তার হাত সরিয়ে চুলের মুঠি ধরে ফেলল। লোহার মতো শক্ত হাতের সেই টানে কুলসুম টালমাটাল হয়ে গেল।

ভারী কণ্ঠে বলে, ‘তিন দিন পরে! আগে কইলি না কেন?’

কুলসুম আবার হাসে।

লোকটা বলে, ‘তাইলে...?’

হাসি থামিয়ে কুলসুম বলে, ‘তাইলে কী? আপনের বাজার জলে গেল ভাবতাছেন? হিহি হিহি। সেইটা নিয়া চিন্তা কইরেন না। তিন দিন পর যহন আইবেন তখন আর বাজার আনতে হইবো না। হিহি হিহি, আমার জবানের কিন্তু দাম আছে।’

কুলসুমের কথায় লোকটা উশখুশ করতে লাগল। সে হয়তো ভাবে কুলসুম মিথ্যা বলছে। তাই দ্বিগুণ তেজে তাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।

কুলসুমের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখে অন্ধকার দেখছে সে। তবু লোকটা তাকে ছড়ল না। পুরুষালি জোর খাটাতে চাইল লোকটা।

হাত কামড়ে এক ঝটকায় লোকটাকে সরিয়ে দিল কুলসুম। নিজেকে মুক্ত করল।

বিছানায় শুয়ে হাঁপাচ্ছে লোকটা। অন্ধকারে অচেনা কোনো শ্বাপদের মতো জ্বলজ্বল করছে লোকটার চোখ দুটো।

কুলসুমের খুব ভয় হয়। লজ্জায় অপমানে মরে যেতে ইচ্ছা করে তার। কোনোমতে গায়ে একটা জামা জড়িয়ে নেয় সে। খুট করে পেছনের দরজা খুলে ফেলে। ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে আসে কুলসুম।

বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছে সে। ভেজা কুলসুম বসে আছে ঘরের পাশের পুকুরঘাটে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আর ঘরে ফিরবে না। কোনো দিন না। এমন অপমান নিয়ে আর বেঁচে থাকবে না। তবু টুনটুনির মুখটা বারবার চোখে ভেসে উঠছিল তার।

এভাবে ভেজা চোখে কত সময় কেটেছে কে জানে?

হঠাৎ তাদের ঘর থেকে কার যেন চিৎকার শুনতে পেল। হুম, চাচিই তো কাঁদছে। কিন্তু চাচি কাঁদবে কেন? কুলসুম কিছুই বুঝতে পারল না। চাচির কান্নার বেগ বেড়েই চলছে।

ভেজা শরীরে ঘরের দিকে আসে কুলসুম।

পেছনের দরজার কাছে এসে ধাক্কা দিয়ে ভেজানো দরজা খুলল কুলসুম। কান্নারত চাচির সামনে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা চাচিকে ফিসফিস করে কী যেন বলে যাচ্ছে। কিন্তু চাচির কান্না থামছে না কিছুতেই। কুলসুমকে আসতে দেখে কিছুটা থমকে যায় লোকটা। চাচির হাতে জোর করে কী যেন গুঁজে দেয়। এরপর দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যায় সে।

লোকটা চলে যেতেই এক দৌড়ে ঘরে আসে কুলসুম।

হাউমাউ করে কাঁদছেন চাচি।

তাকে দেখে জাপটে ধরল চাচি। চাচির হাত গলে লোকটার গুঁজে দেওয়া টাকাগুলো মাটিতে পড়ে যায়। এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা এতগুলো এক শ-পাঁচ শ টাকার নোট চিনতে ভুল হয় না কুলসুমের।

চাচি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব্বনাস হইছে রে কুলসুম, সব্বনাস হইছে।’

কুলসুম চাচির কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না।

চাচি এভাবে কাঁদছে কেন? কী হয়েছে চাচির?

নাকি চাচার কিছু হয়েছে?

হঠাৎ কুলসুমের বুকটা ভয়ে ধক করে উঠল। টুনটুনি কই? টুনটুনির কিছু হয়েছে নাকি?

টুনটুনির কথা মনে হতেই ভয় পেয়ে গেল সে।

বিছানায় চোখ যেতেই থমকে গেল কুলসুম।

বিছানার মাঝামাঝি শুয়ে আছে টুনটুনি।

ময়লা ফ্রকটা ওর শরীরে নেই। ফ্রকটা ওর মুখে গোঁজা।

টুনটুনির ফরসা কোমর থেকে পা পর্যন্ত রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

চিৎকার করে কেঁদে ওঠে কুলসুম। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না ওর। চোখের পানিগুলোও যেন শুকিয়ে গেছে প্রচণ্ড ক্রোধে। মাথা আছড়াতে থাকে কুলসুম। মুখ দিয়ে শুধু গোঁ গোঁ শব্দ বেরিয়ে আসে।

আধো অন্ধকার ঘরে বিছানায় পড়ে থাকে রক্তাক্ত টুনটুনি।

হারিকেনের লালচে আলোতে কেমন যেন কালচে দেখায় রক্তগুলো।