কলেজপাড়ার মোড়ে ঝাঁকড়া একটা আমগাছ। দেখলেই বোঝা যায়, অনেক বছরের পুরোনো। তার নিচে কয়েকটা অটো দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু রিকশাও। আশপাশে কয়েকটি দোকান। লোকজন কমবেশি সব সময়ই থাকে। একটু দূরেই জেবুন্নেসা মহিলা কলেজ। ক্লাসের ফাঁকে দল বেঁধে মেয়েরা এখানে চা খেতে আসে। সেই সময় আশপাশের ছেলে-ছোকরাগুলো চায়ের দোকানে ছোঁক ছোঁক করে।
বিকেলবেলা আমগাছের নিচে অটোতে বসে ছিল সোবহান। মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে হালকা লিকলিকে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, যাবেন নাকি?’
সোবহান বলল, ‘কোথায়?’
লোকটা একটু হাসল। বলল, ‘যাব মানে ঘুরব। এই এদিক–সেদিক।’
সোবহান আশপাশে তাকাল। তেমন কাউকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার বান্ধবী কই? তারে তো দেখছি না!’
লোকটা বলল, ‘আমার কোনো বান্ধবী নেই। এই জগতে আমি একা।’
স্থানীয় বেশি ভাগ যাত্রীই সোবহানের মুখচেনা। ছয়-সাত বছর ধরে সে এখানে অটো দাঁড় করায়। কিন্তু এই লোকটাকে আগে কখনো দেখেছে বলে তার মনে পড়ছে না। লোকটার কথার ধরন একটু কী রকম যেন। এইভাবে সচরাচর কেউ কথা বলে না। আবার বান্ধবী ছাড়াই এই বয়সে কেউ একা একা অটোতে চড়ে এদিক–সেদিক ঘুরতেও বের হয় না। হতে পারে লোকটা সেয়ানা। কোনো ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। নির্জন রাস্তায় তার গলা কেটে অটো নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবে। প্রতিদিনই তো এই রকম ঘটছে দেশের কোথাও না কোথাও। কপালে ভাঁজ পড়ল সোবহানের। মাথা নেড়ে বলল, ‘না ভাই, যাব না।’ ঠিক সেই মুহূর্তে তার বাঁ চোখটা চিড়িক দিয়ে উঠল। কিসের লক্ষণ এটা? বুঝতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু বুঝতে পারল না। তবে বুঝতে পারল, ঘণ্টাচুক্তিতে হিসাব করলে বেশ ভালোই ভাড়া পাওয়া যাবে। সারা দিনে তেমন ভাড়া ওঠেনি।
এভাবেই শুরু। এরপর প্রায়–প্রায়ই কল দেয়। এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে। কোনো কোনো দিন পদ্মার পাড়ে গিয়ে ঘাসে বসে থাকে। সোবহানকে পাশে বসিয়ে এটা–সেটা গল্প করে। গল্পে গল্পে সোবহান বুঝতে পারে, তার চোখে দেখা আর সব মানুষের মতো নয় মানুষটি। জগৎ-সংসারের প্যাঁচ খুব একটা বোঝে না। যতটা সম্ভব সরল সাদামাটা জীবন কাটাতেই তার আনন্দ।
লোকটা ততক্ষণে আরেকটি অটোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সোবহান ডাকল, ‘ভাই, শোনেন।’
লোকটা দাঁড়িয়ে ঘাড় ফেরাল।
সোবহান বলল, ‘ঘণ্টায় তিন শ টাকা দিবেন। রাজি থাকলে উঠে বসেন।’
লোকটা কিছু বলল না। চুপচাপ উঠে বসল। সোবহান অটো স্টার্ট দিল। লোকটা বলল, ‘শুনেছি এখানে পদ্মার পাড় আছে। কত দূর এখান থেকে?’
‘তেমন দূরে নয়। আধঘণ্টা লাগবে যেতে। সেখানে যাবেন?’
‘চলেন যাই।’
‘এলাকায় আপনাকে নতুন মনে হচ্ছে!’
‘জি ভাই। গত পরশু এখানে এসেছি। ইয়াকুব মুনশির বাড়ির নিচতলায় ভাড়াটে হিসেবে উঠেছি। আপনি তো স্থানীয়, তাই না?’
‘জি, মহিলা কলেজের পেছনের গলিতে আমার বাড়ি।’
‘ও আচ্ছা। তাহলে তো ভালোই।’
‘কী ভালো?’ সোবহান জানতে চাইল।
লোকটা বলল, ‘ভালো মানে আপনার অটোতে চড়ে মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়ানো যাবে। এই জন্যই ভালো।’
‘এখানে কী করেন? চাকরি নাকি ব্যবসা?’
‘চাকরি করি, ভাই। আপনাদের মহিলা কলেজে মেয়েদের বাংলা পড়াই।’
‘ও, তাইলে আপনি ছার মানুষ।’
লোকটা হাসল, ‘ওই আরকি!’
এভাবেই শুরু। এরপর প্রায়–প্রায়ই কল দেয়। এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে। কোনো কোনো দিন পদ্মার পাড়ে গিয়ে ঘাসে বসে থাকে। সোবহানকে পাশে বসিয়ে এটা–সেটা গল্প করে। গল্পে গল্পে সোবহান বুঝতে পারে, তার চোখে দেখা আর সব মানুষের মতো নয় মানুষটি। জগৎ-সংসারের প্যাঁচ খুব একটা বোঝে না। যতটা সম্ভব সরল সাদামাটা জীবন কাটাতেই তার আনন্দ।
আজ সারা দিন বৃষ্টি। থামার নামগন্ধ নেই। অবস্থা বেগতিক দেখে আজ আর বেরোয়নি সোবহান। দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংস রাঁধল বউ। সাথে খিচুড়ি। জম্পেশ আয়োজন। খেয়েদেয়ে বেশ আয়েশ করে ভাতঘুম দিচ্ছিল সোবহান। কয়েক দিন ধরে হুটহাট বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চলে একটানা। তারপর আবার ঝিরিঝিরি ঝরতেই থাকে। বৃষ্টি-বাদলায় যাত্রী তেমন পাওয়া যায় না। চায়ের দোকানগুলোয় তাস খেলার মজমা বসে। আমগাছের নিচে দু-তিনটের বেশি অটো-রিকশা থাকে না। কী আর করা। ভাতঘুমের ফাঁকে ফাঁকে সোবহান দেখল, মেঝের ওপর দুই পা ছড়িয়ে বউ কাঁথা সেলাই করছে। মোটাসোটা তার বউটা। ভারী নিতম্ব। হাঁটুর ওপর শাড়ি-শায়া উঠে থাকায় দেখা যাচ্ছে মাংসল ঊরু। একটা ঢেকুর তুলে সোবহান চেয়ে রইল ধবধবে মাংসের ঢিবির দিকে। একবার তাকাল বউটার মুখের দিকে। গোলগাল ভরাট মুখ। ঠোঁট দিয়ে সুই কামড়ে ধরে কাঁথার সুতো টান টান করে আবার সেলাই করতে লাগল। শিহরণ খেলে গেল সোবহানের নাভির নিচে। ঝমঝম বৃষ্টির দুপুর! পাশের ঘরে মেয়েটা মুঠোফোনে হয়তো কার্টুন দেখছে। দুপুরে ভাত খেয়ে মেয়েটা কখনোই ঘুমোয় না। বসে বসে মুঠোফোন টেপে। খুব বেশি বকাঝকা করলে পড়তে বসে। বছর ঘুরলেই এসএসসি পরীক্ষা। তবু মেয়েটার গা নেই।
বেজে উঠল মোবাইলের রিংটোন। পাগলা মাস্টার। ‘হ্যালো ছার,’ বলতেই ওই প্রান্তে পাগলা মাস্টারের কণ্ঠস্বর, ‘সোবহান ভাই, কই আছেন?’
‘এই তো ছার, বাড়িতেই। দাঁড়ান, আসতেছি।’
উঠে কাপড় পরে নিল সোবহান। বউ বলল, ‘কই যাও?’
‘মাস্টার ছার কল দিছে। একটু ঘুইরে আসি।’
অথচ সেই মানুষটাই বাড়িতে গিয়ে তার শিশুসন্তানকে বুকে নিয়ে আদর করে। এটুকুই হয়তো তার বেঁচে থাকার আনন্দ। কিন্তু হিসাব করে দেখলে তার জীবনে দুঃখের ভাগটাই বেশি। কী হাস্যকর একটা জীবন মানুষ কাটিয়ে দিচ্ছে! ভাবলেই আমার হাসি পায়, বুঝলেন সোবহান ভাই। আমি হিসাব মেলাতে পারি না। ওই যে ওই দিন আপনি বলছিলেন, মাঝেমধ্যে আপনার বাঁ চোখ চিড়িক দিয়ে ওঠে, সেই রহস্য আপনি জানেন না। জীবনের এই রহস্যও আমি বুঝতে পারি না। তবে বুঝতে পারি, আমরা আসলে জীবনের ছকে আটকে আছি। চিড়িয়াখানায় গেছেন কখনো?
পাশেই আকতারের গ্যারেজ। সেখানে দৈনিক ভাড়ায় রাতে অটো রাখে সোবহান। রাতভর চার্জ হয়। অটোর চারদিকে পর্দা নামিয়ে বেঁধে নিয়ে অটো স্টার্ট দিল সে। বাসার সামনে পৌঁছাতেই ছাতা মাথায় এগিয়ে এল পাগলা মাস্টার। ছাতা গুটিয়ে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে বসল। বলল, ‘কী বৃষ্টি শুরু হইছে, দেখছেন ভাই? মনে হয় নুহ নবীর প্লাবন হয়ে যাবে।’
‘জি ছার,’ বলেই অটো টান দিল সোবহান। ভাবল, কথা সত্য। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় পানি জমে গেছে। মাটির রাস্তায় প্যাচপেচে কাদা। অটোর চাকা আটকে যায়। পায়ে হাঁটা খুবই মুশকিল।
তারা যখন পদ্মার পাড়ে গিয়ে পৌঁছাল, তখন বৃষ্টি অনেকটাই হালকা হয়ে এসেছে। একটা গাছের নিচে অটো দাঁড় করাল সোবহান। ছাতা মাথায় দিয়ে পর্দা খুলে গুটিয়ে ওপরে বেঁধে ফেলল। তারপর ভেতরে এসে বসল। চারদিক শূন্য। রাস্তার এক পাশে দূরে দূরে কয়েকটা পুরোনো আমলের গাছ। রাস্তার আরেক পাশে কয়েক হাত দূরেই প্রমত্ত পদ্মা। পদ্মার বুক ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ধারা। ঝমঝম শব্দ ছাড়া প্রকৃতির বুকে আর কোনো শব্দ নেই। বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে অটোর ভেতরটা। সামনের একদিকে ছাতা দিয়ে আটকে রেখেছে সোবহান। কিন্তু মাস্টারের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। অটোর যেদিকটা নদীর দিকে, সেদিকে ঘেঁষে সে বসে আছে। ভিজছে, ভিজতেই যেন তার আনন্দ। একসময় বলল, ‘জীবন খুব আনন্দের, তাই না সোবহান ভাই?’
সোবহান কী বলবে বুঝতে পারল না। তার জীবনে অত আনন্দ কোথায়? কিন্তু সেসব কথা কি আর এখন বলা যায়। তাই বলল, ‘জি ছার। কিন্তু জীবনে আবার কষ্টও আছে।’
‘তা তো থাকবেই। দুঃখ-আনন্দ মিলিয়েই তো মানুষের জীবন। তাই না?’
‘জি ছার।’
‘আমি ভাবি, জানেন ভাই, জীবনে কষ্ট যেমন আছে, তেমনি আনন্দও আছে। তবু মানুষ আনন্দটাই বড় করে দেখে। তাই বেঁচে থাকতে পারে। যদি দুঃখ-কষ্টকে বড় করে দেখত, তাহলে বেঁচে থাকতে পারত না। এ জন্যই অনেকে আত্মহত্যা করে। ভেবেছেন এ রকম কখনো?’
‘আপনার মতো করে ভাবিনি। কিন্তু বুঝি যে খুব বেশি দুঃখে না পড়লে কেউ আত্মহত্যা করে না।’
দুই হাত বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে তালুতে বৃষ্টি নিয়ে খেলতে খেলতে মাস্টার বলল, ‘আচ্ছা সোবহান ভাই, আপনার জীবনে দুঃখের ভাগ বেশি নাকি আনন্দের ভাগ?’
‘ওইভাবে হিসাব করে বলতে পারব না, ছার। তবে মনে হয় দুঃখের ভাগটাই বেশি। কী জানি, সব মানুষেরই বোধ হয় এমন!’
‘তবু মানুষ বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য নানা অপকর্ম করে। বেঁচে থাকার নানা সুবিধা পেতে আরেকজনকে খুন করে। কী, করে না?’
‘জি ছার। তা তো করেই।’
‘অথচ সেই মানুষটাই বাড়িতে গিয়ে তার শিশুসন্তানকে বুকে নিয়ে আদর করে। এটুকুই হয়তো তার বেঁচে থাকার আনন্দ। কিন্তু হিসাব করে দেখলে তার জীবনে দুঃখের ভাগটাই বেশি। কী হাস্যকর একটা জীবন মানুষ কাটিয়ে দিচ্ছে! ভাবলেই আমার হাসি পায়, বুঝলেন সোবহান ভাই। আমি হিসাব মেলাতে পারি না। ওই যে ওই দিন আপনি বলছিলেন, মাঝেমধ্যে আপনার বাঁ চোখ চিড়িক দিয়ে ওঠে, সেই রহস্য আপনি জানেন না। জীবনের এই রহস্যও আমি বুঝতে পারি না। তবে বুঝতে পারি, আমরা আসলে জীবনের ছকে আটকে আছি। চিড়িয়াখানায় গেছেন কখনো?’
‘গেছি ছার একবার। ঢাকার মিরপুরে তো?’
‘হ্যাঁ। প্রত্যেক মানুষের জীবনও আসলে এক-একটা চিড়িয়াখানা। কিন্তু মানুষ সেটা বুঝতে পারে না। কারণ, জীবনের চিড়িয়াখানায় থাকতে থাকতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই বাইরের কোনো অচেনা জীবনকে মানুষ ভয় পায়। তাই হয়তো সব মানুষ আত্মহত্যা করে না। হাজার দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও বেঁচে থাকে।’
কথা বলল না সোবহান। মাস্টারের কথাগুলো ভাবতে লাগল। বুঝতে পারল, আসলেই জীবনটা একটা চিড়িয়াখানা। সবকিছু সেই একই রকম। কী রকম যেন আটকা আটকা লাগে!
মাস্টার বলল, ‘দ্যাখেন ভাই, নদীর ওই পাড়ে যত দূর চোখ যায় চেয়ে দেখেন। ওই দূরে আকাশ আর নদী এক সাথে মিলে গেছে। কী বিশাল তাদের সীমানা! প্রকৃতির এই বিশালতা আপনি লোকালয়ে দেখতে পাবেন না। গাছপালা আর বাড়িঘরে আপনার দৃষ্টি আটকে যাবে। নদী কিংবা সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালেই কেবল আপনি দেখবেন, কী বিশালতার ভেতরে আমরা বাস করি।’
ছাতা গুটিয়ে রাখল সোবহান। সিটের ওপর পা তুলে বসে বলল, ‘জি ছার। চেয়ে থাকলে ভালো লাগে। আবার বুকের ভিতর কী রকম যেন একা একা লাগে।’
‘একা একা লাগে কেন, জানেন? ওই বিশালতা আমাদের অবচেতনে মনে করিয়ে দেয়, বিশাল এই মহাবিশ্বে আমরা খুবই তুচ্ছ, ছোট্ট একটা বিন্দুর মতো। কিন্তু আমি কী ভাবি, জানেন ভাই? এই বিশাল প্রকৃতির ভেতর আমি আছি মানে আমি ওই বিশালতার একটা অংশ। সুতরাং আমি ছোট্ট বিন্দুর মতো নই। আমিও বিশাল। যখন এ রকম ভাবি, তখন বেঁচে থাকার আনন্দ পাই। এই আনন্দ উপভোগ করতেই মাঝেমধ্যে আপনার অটোতে বেরিয়ে পড়ি।’
সোবহান কথা বলল না, চেয়ে রইল দূরে। বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আছে পদ্মার বুক। দৃষ্টি বেশি দূরে যায় না। কিন্তু সে তো অনেকবার এখানে এসেছে। চারপাশের সবকিছুই তার দেখা। মনের চোখে সোবহান দেখতে পেল, বহুদূরে আকাশের সাথে মিশে গেছে পদ্মার জল থই থই বুক। মাঝখানে কী বিশাল শূন্যতা!