
জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির আফটার দ্য কোয়েক—১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের ছায়ায় লেখা ছয়টি গল্পের সংকলন। আফটার দ্য কোয়েক বইয়ের পঞ্চম গল্প ‘হানি পাই’-এর বাংলা রূপ ‘মধু মাখানো কেক’।
• ভাষান্তর: জিয়া হাশান
‘তাই মধুতে মাসাকিচির থাবা ভরে যায়—এত বেশি মধু যে সে একা খেয়েও শেষ করতে পারে না। সে তাই মধুগুলো একটা বালতিতে ভরে নেয়। তারপর তা বিক্রি করার জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে সরাসরি শহরের দিকে যায়। মাসাকিচি আসলে সর্বকালের সর্বসেরা মধু-ভালুক।’
‘ভালুকদের কি বালতি থাকে?’ সালা জিজ্ঞেস করে।
‘ঘটনাচক্রে মাসাকিচির একটা বালতি ছিল,’ জুনপেই ব্যাখ্যা করে বলে। ‘বালতিটা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে একদিন কোনো না কোনো কাজে লাগতে পারে ভেবে নিয়ে এসেছিল।’
‘আর সত্যিই কাজে লেগে যায়।’
‘সত্যিই কাজে লাগে। কারণ, তাতে করেই মধু নিয়ে ভালুক মাসাকিচি শহরে আসে এবং এক চত্বরে নিজের জন্য একটা জায়গা খুঁজে নেয়। সেখানে একটা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়—‘খাঁটি সুস্বাদু মধু। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। প্রতি কাপ ২০০ ইয়েন।’
‘ভালুক কি লিখতে পারে?’
‘না, অবশ্যই না,’ জুনপেই বলে। ‘তার পাশে পেনসিল হাতে বয়স্ক এক লোককে বসা দেখে তাকে বললে সে ওটা লিখে দেয়।’
‘ভালুক কি টাকা গুনতে পারে?’
‘অবশ্যই পারে। মাসাকিচি যখন একেবারে ছোট্ট ভালুকছানা ছিল, তখন সে মানুষের সঙ্গে কিছুদিন বসবাস করেছে, আর তারাই তাকে কথা বলা, টাকা গোনা আর এসব শিখিয়ে দিয়েছে। যা–ই হোক, সে আদতে খুবই প্রতিভাবান এক ভালুক।’
‘ওহ, তাই বুঝি সে সাধারণ ভালুকদের থেকে একটু আলাদা।’
‘হ্যাঁ, বলতে গেলে তা-ই। মাসাকিচি একটু স্পেশাল ভালুক। তাই যারা তার মতো এতটা স্পেশাল না, সেসব ভালুকেরা তাকে এড়িয়ে চলে।’
‘এড়িয়ে চলে?’
‘হ্যাঁ, তারা বলে, ‘এই ভালুকের আবার কী হয়েছে, এমন বিশিষ্ট হয়ে ঘোরে কেন?’—এই বলে তার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে। বিশেষ করে টঙ্কিচি নামের এক দাঙ্গাবাজ ভালুক, সে তো মাসাকিচিকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না।’
‘বেচারা মাসাকিচি!’
‘হ্যাঁ, সত্যিই। এদিকে মাসাকিচি দেখতে একেবারে সাধারণ ভালুকের মতোই, তাই মানুষজন বলে, ‘আচ্ছা, সে টাকা গুনতে পারে, কথা বলতে পারে—সব ঠিক আছে, কিন্তু শেষ অবধি তো সে একটা ভালুকই।’ তাই মাসাকিচি আসলে কোনো দুনিয়াতেই, না ভালুকদের জগতে, না মানবের জগতে ঠিকঠাকমতো জায়গা পায় না।’
‘হায়! বেচারা মাসাকিচি! তার কি কোনো বন্ধুও নাই?’
‘একটাও না। জানো তো ভালুকেরা স্কুলে যায় না। তাই তাদের বন্ধু বানানোর মতো কোনো জায়গাও নেই।’
‘প্রি-স্কুলে আমার বন্ধু আছে,’ সালা বলে।
‘তা ঠিক তোমার বন্ধু আছে।’
‘তোমার কি বন্ধু আছে, জুন?’
‘আঙ্কেল জুনপেই’ বলতে সালার খুব লম্বা লাগে, তাই সে শুধু ‘জুন’ বলেই ডাকে।
‘তোমার বাবা আমার অনেক অনেক দিন ধরেই সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আর তোমার মা–ও তাই।’
‘বন্ধু থাকা ভালো।’
‘হ্যাঁ, ভালো,’ জুনপেই বলে। ‘এ ব্যাপারে তুমি ঠিকই বলেছ।’
সালা যখন ঘুমোতে যায়, তখন তার জন্য জুনপেই প্রায়ই বানিয়ে বানিয়ে এ রকম গল্প বলে। আর এসব গল্পের যেটা সালা বুঝতে পারে না, সেটা জুনপেইকে জিজ্ঞেস করে। জুনপেই অনেক ভেবে উত্তরগুলো তৈরি করে নেয়। সালার প্রশ্নগুলো সব সময়ই তীক্ষ্ণ আর মজাদার হয়, আর সেগুলোর উত্তর নিয়ে ভাবতে ভাবতেই জুনপেই গল্পের নতুন নতুন মোড়ও ঘুরিয়ে দেয়।
সায়োকো এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে আসে।
‘জুন আমাকে মাসাকিচি ভালুকের গল্প বলছে,’ সালা বলে। ‘সে সর্বকালের নাম্বার ওয়ান মধু-ভালুক, কিন্তু তার কোনো বন্ধুই নেই।’
‘ও তাই নাকি? ভালুকটা কি অনেক বড়?’ সায়োকো জিজ্ঞেস করে।
সালা একটু অস্বস্তি নিয়ে জুনপেইর দিকে তাকিয়ে বলে—‘মাসাকিচি কি বড়?’
‘এতটা বড় নয়’ জুনপেই বলে। ‘আসলে, ভালুক হিসেবে সে একটু ছোটই বলা যায়। সালা, প্রায় তোমার মতোই আকার। আর সে খুবই শান্ত স্বভাবের ছোট্ট ভালুক। যখন সে গান শোনে, তখন রক বা পাঙ্ক বা ওই ধরনের কিছু শোনে না। সে একা একা বসে শাস্ত্রীয় সংগীতের সুরকার শুবের্টের গান শুনতে ভালোবাসে।’
সায়োকো আস্তে করে শুবের্টের ‘ট্রাউট’ গানের সুরটা গুনগুন করে গায়।
‘মাসাকিচি গান শোনে?’ সালা জিজ্ঞেস করে—‘তার কি সিডি প্লেয়ার বা এ রকম কিছু আছে?’
‘একদিন সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা বুমবক্স খুঁজে পায়। গান শোনার সে বক্সটা নিয়ে বাড়িতে রেখে দেয়।’
‘পাহাড়ে এসব জিনিস এভাবে পড়ে থাকে কেন?’ সালা একটু সন্দেহের সুরে জিজ্ঞেস করে—
‘আসলে পাহাড়টা খুবই খাড়া। আর যারা হাঁটতে যায় তাদের অনেকেই মাথা ঘুরে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই তাদের যেসব জিনিস দরকার হয় না, সেগুলো অনেক সময় ফেলে দেয়। রাস্তার ধারে এভাবে—যেমন ‘উফ্, এই ব্যাগটা কত ভারী, মনে হচ্ছে আমি মরে যাব! এই বালতিটা আর দরকার নেই। এই বুমবক্সটাও আর দরকার নেই।’ এই রকম। তাই মাসাকিচি তার দরকারি সবকিছুই রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে নেয়।’
‘ভারী বোঝা কেমন লাগে তা মায়েরা সবচেয়ে ভালো বোঝে।,’ সায়োকো বলে। ‘ ভারের কারণে কখনো কখনো সবকিছুই ফেলে দিতে ইচ্ছা করে।’
‘আমার এ রকম মনে হয় না।’ সালা বলে।
‘কারণ, তুমি তো একবারে লোভী ছোট্ট একটা মেয়ে,’ সায়োকো বলে।
‘আমি লোভী নই,’ সালা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে।
জুনপেই বিষয়টাকে সহজ করে দিতে বলে—‘না, তুমি লোভী নও। তুমি তো কেবল ছোট আর শক্তি-সামর্থ্যে ভরপুর একটা মেয়ে, সালা। এখন তাড়াতাড়ি দুধ খাও, যাতে আমি তোমাকে গল্পের বাকিটা বলতে পারি।’
‘ঠিক আছে,’ সালা বলে। ছোট ছোট দুই হাত দিয়ে গ্লাসটাকে মুড়ে ধরে সে যত্নের সঙ্গে গরম দুধটা খেয়ে নেয়। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘মাসাকিচি কেন মধুর কেক বানিয়ে বিক্রি করে না? শুধু শুধু মধু খাওয়ার চেয়ে আমার মনে হয় শহরের মানুষেরা সে কেক খুশিমনে খাবে।’
‘চমৎকার প্রশ্ন,’ সায়োকো হাসিমুখে বলে। ‘তাতে মুনাফাও বেশি হবে!’
‘আহ, হ্যাঁ, নতুন পণ্য হিসেবে দ্রুতই তা বাজারে ছড়িয়ে পড়বে।’ জুনপেই বলে। ‘এই মেয়েটি একদিন সত্যিই একজন বড় উদ্যোক্তা হবে।’
প্রায় রাত দুইটার দিকে সালা বিছানায় যায়। জুনপেই আর সায়োকো তারপর যখন নিশ্চিত হয় যে সে ঘুমিয়ে গেছে, তখন তারা রান্নাঘরের টেবিলে বসে মাত্র একটা বিয়ারের ক্যান ভাগাভাগি করে খায়। কারণ, সায়োকো বেশি পান করতে ভালোবাসে না, আর জুনপেইকে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরতে হবে।
‘মধ্যরাতে তোমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য দুঃখিত,’ সায়োকো বলে, ‘কিন্তু আর কিছু করার কথা আমার মাথাতেই আসেনি। আমি পুরোপুরি ক্লান্ত, আর তুমি একমাত্র যে সালাকে শান্ত করতে পারো। তাকাতসুকিকে কল করার কোনো উপায়ই ছিল না।’
জুনপেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বিয়ারে আরেকটা চুমুক দেয়। তারপর তাদের দুজনের মাঝখানে প্লেটে রাখা বিস্কুট থেকে একটা মুখে নেয়।
‘আমার ব্যাপারে চিন্তা করো না,’ সে বলে। ‘আমি সূর্য ওঠা পর্যন্ত জাগব, আর সে সময়ে রাস্তা ফাঁকা থাকে। এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়।’
‘তুমি কি কোনো গল্পের কাজ করছিলে?’
জুনপেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
‘কেমন চলছে তোমার লেখা?’
‘সচরাচরের মতোই। আমি লিখি। তারা ছাপে। তবে মনে হয় না কেউ পড়ে।’
‘আমি সবগুলোই পড়ি।’
‘ধন্যবাদ। তুমি খুব ভালো’ জুনপেই বলে। ‘কিন্তু ছোটগল্প ধীরে ধীরে শেষের পথে। যেমন স্লাইড রুল। যা–ই হোক, সালার কথা বলি। সে কি আগে এমন করেছে?’
সায়োকো মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
‘অনেকবার করেছে?’
‘প্রায় প্রতি রাতেই। মাঝরাতের কিছু পরে তার এমন হিস্টিরিয়ার মতো খিঁচুনি শুরু হয়, আর সে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। তার কাঁপুনি কিছুতেই থামে না। আমি সব রকম চেষ্টা করে দেখেছি। তার কান্না কিছুতেই থামাতে পারি না।’
‘কোনো ধারণা আছে, কী কারণে এমন হয়?’
সায়োকো তার গ্লাসের বাকি বিয়ারটুকু শেষ করে খালি গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘আমার মনে হয় ভূমিকম্প নিয়ে অনেকগুলো রিপোর্ট সে দেখেছে। চার বছরের একটা শিশুর জন্য এটা খুব বেশি হয়ে গেছে। ভূমিকম্পটা যে সময় হয়, ঠিক সেই সময়ের কাছাকাছি সে ঘুম থেকে ওঠে। সে বলে, তাকে একজন অজানা-অচেনা লোক জাগিয়ে তোলে। যাকে সে ‘ভূমিকম্পের মানব’ নামে ডাকে। সে সালাকে একটা ছোট্ট বাক্সের ভেতর ঢোকাতে চায়। কিন্তু বাক্সটা এতটাই ছোট যে সেখানে কারও ঢোকাই সম্ভব নয়। তখন লোকটাকে সালা বলে যে সে ভেতরে ঢুকতে চায় না, কিন্তু লোকটা সালার হাত টানতে শুরু করে—এত জোরে যে হাতের জোড়াগুলো যেন কট কট করে ওঠে। তারপরও তাকে জোর করে সেই বাক্সে গুঁজে দিতে চায়। তখনই সালা চিৎকার করে ওঠে আর ঘুম ভেঙে যায়।’
‘ভূমিকম্পের মানব?’
‘সে মানবটা লম্বা, রোগা আর বয়স্ক। স্বপ্নটা দেখার পর সালা বাড়ির সব আলো জ্বালিয়ে দিয়ে ‘ভূমিকম্পের মানব’কে খুঁজতে থাকে। আলমারির ভেতর, সামনের হলঘরের জুতার র্যাক, বিছানার তলা, ওয়ার্ডরোবের সব ড্রয়ারেও খোঁজাখুঁজি করে। আমি তখন সালাকে বলি ওটা শুধু একটা স্বপ্ন, কিন্তু সে আমার কথা শোনে না। বরং ‘ভূমিকম্পের মানব’ যেসব জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারে, এমন সব জায়গায় ঘণ্টা দুই ধরে খুঁজে দেখা শেষ করে তবেই সালা আবার বিছানায় যায়। ততক্ষণে আমারও ঘুমের বারোটা বাজে। ফলে আমার ঘুমের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। তাই কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, আমার দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।’
আগে সায়োকো কখনোই এভাবে নিজের অনুভূতিগুলো উজাড় করে বলেনি।
‘খবর দেখা বাদ দাও,’ জুনপেই বলে। ‘টিভিটাও চালিয়ো না। আজকাল টিভিগুলো শুধু ভূমিকম্পের খবরই দেখায়।’
‘আমি তো এখন টিভি প্রায় দেখিই না। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। সালার কাছে ‘ভূমিকম্পের মানব’ আগের মতোই আসে। সালাকে ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু সে আমাকে শান্ত করার জন্য কেবল একটা ঘুমের ওষুধ দিয়েছে।’
জুনপেই কিছুক্ষণ চিন্তা করে নেয়।
‘রোববার আমাদের চিড়িয়াখানায় গেলে কেমন হয়? সালা বলছে সে নাকি একটা সত্যিকারের ভালুক দেখতে চায়।’
সায়োকো চোখ কুঁচকে জুনপেইর দিকে তাকায়।
‘হতে পারে। এতে হয়তো সালার মেজাজ একটু বদলাবে। চল, তাই করি—আমরা চারজনই যাই। অনেক দিন হয়ে গেছে যাওয়া হয়নি। তুমি তাকাতসুকিকে ফোন করে বলো?’
জুনপেইর বয়স ছত্রিশের মতো। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ‘হিয়োগো প্রিফেকচার’ প্রদেশের নিশিনোমিয়া শহরের শুকুগাওয়া এলাকার এক শান্ত ও নিরিবিলি আবাসিক পাড়ায়। তার থেকে ছয় বছরের ছোট একটা বোন আছে। তার বাবা ওসাকা ও কোবেতে দুটি গয়নার দোকান চালায়।
কোবের একটা বেসরকারি হাইস্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর জুনপেই টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। ব্যবসা এবং সাহিত্য—এ দুটো বিভাগেই সে পাস করে।
কিন্তু এতটুকু দ্বিধা না করে সে সাহিত্য বিভাগই বেছে নেয়, আর মা–বাবাকে জানায় যে সে ব্যবসা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। তারা কখনোই জুনপেইকে সাহিত্য পড়ার জন্য টাকা দিত না, আর অর্থনীতির কার্যপ্রণালি পড়ে চারটি মূল্যবান বছর নষ্ট করার কোনো ইচ্ছাই জুনপেইর হয়নি।
তার শুধু পড়ার ইচ্ছা সাহিত্য। আর তারপর একজন ঔপন্যাসিক হওয়ার ইচ্ছা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সে দুজনকে বন্ধু হিসেবে পায়। তার একজন তাকাতসুকি আরেকজন সায়োকো।
তাকাতসুকি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে নাগানোর পাহাড়ি অঞ্চল থেকে। লম্বা ও প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী সে তার হাইস্কুলের ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিল। ভর্তি পরীক্ষায় পাস করার জন্য তাকে দুই বছর একটানা পড়াশোনা করতে হয়, তাই সে বয়সে জুনপেইর চেয়ে এক বছরের বড়।
বাস্তববাদী এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী তাকাতসুকির চেহারায় এমন আকর্ষণ আছে যে মানুষ তাকে সহজেই পছন্দ করে ফেলে এবং যেকোনো দলে সে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নেয়। কিন্তু পড়াশোনার ব্যাপারে তার সমস্যা রয়েছে। সাহিত্য বিভাগে সে ভর্তি হয়; কারণ এ বিভাগের পরীক্ষাটাতেই সে কেবল পাস করতে পারে। ‘যাহোক,’ সে তার স্বভাবসিদ্ধ ইতিবাচক ভঙ্গিতে বলে, ‘আমি তো একদিন পত্রিকার রিপোর্টার হবই, তাই ওদেরকেই বলব আমাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নাও।’
জুনপেই প্রথমে বুঝতে পারেনি যে তার সঙ্গে কেন তাকাতসুকি বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী। কারণ, জুনপেই নিজের ঘরে বসে একা একা বই পড়তে বা গান শুনতে পছন্দ করে, আর খেলাধুলায় সে একেবারেই অপটু। তা ছাড়া অপরিচিত কারও সঙ্গে চলাফেরা করতে সে মোটেই স্বস্তি পায় না। তাই তার বন্ধুর সংখ্যা খুবই নগণ্য। তবু কোনো এক কারণে, ক্লাসে প্রথম দিন জুনপেইকে দেখেই তাকাতসুকি যেন ঠিক করে ফেলে যে সে জুনপেইর সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে। তাই তাকাতসুকি সেদিনই জুনপেইর কাঁধে টোকা দিয়ে বলে, ‘এই, চলো কিছু খেয়ে আসি।’ আর সেদিনটা শেষ হওয়ার আগেই তারা একে অপরের কাছে নিজেদের মন খুলে দেয়।
জুনপেইকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় একইভাবে সায়োকোর সঙ্গে তাকাতসুকি পরিচিত হয়। সে সায়োকোর কাঁধে টোকা দিয়ে বলে, ‘এই, আমরা তিনজন একসঙ্গে কিছু খেতে গেলে কেমন হয়?’ এভাবেই তাদের ছোট্ট কিন্তু ঘনিষ্ঠ গ্রুপটা তৈরি হয়ে যায়। জুনপেই, তাকাতসুকি আর সায়োকো—তিনজন সবকিছুই একসঙ্গে করে। তারা একে অপরের সঙ্গে লেকচারের নোট ভাগ করে নেয়, ক্যাম্পাসের ডাইনিং হলে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খায়, ক্লাসের ফাঁকে কফি খেতে খেতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে, একই জায়গায় পার্টটাইম কাজ করে, সারা রাত চলা সিনেমা দেখতে আর রক কনসার্ট শুনতে যায়, টোকিও শহরজুড়ে হেঁটে বেড়ায়, আর এত বেশি বিয়ার খায় যে কখনো কখনো একসঙ্গেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অন্য কথায়, তারা পৃথিবীর যেকোনো জায়গার ভার্সিটির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মতোই আচরণ করে যায়।
অপর দিকে সায়োকো খাঁটি ও নির্ভেজাল টোকিওর মেয়ে। সে শহরের যে পুরোনো এলাকায় শত শত বছর ধরে বণিকেরা বসবাস করে আসছে, সেখানকার বাসিন্দা। তার বাবা সে এলাকায় একটা দোকান চালায়। এ দোকানে ঐতিহ্যবাহী জাপানি পোশাকের সঙ্গে পরার জন্য সূক্ষ্ম ও সুন্দর ছোট ছোট অলংকার বিক্রি করা হয়। এই ব্যবসা তাদের পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। সাধারণত অভিজাত ও খ্যাতনামা লোকজন এ দোকানে কেনাকাটার জন্য আসে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ঐতিহ্যবাহী ‘কাবুকি’ নাটকের অভিনেতাও রয়েছে। সায়োকোর দুজন বড় ভাই আছে। বড় ভাইকে ছোটবেলা থেকেই দোকানের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, আর দ্বিতীয় ভাই কাজ করে স্থাপত্যের নকশার নিয়ে।
সায়োকো অভিজাত মেয়েদের একটা প্রিপারেটরি স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ওয়াসেদা ভার্সিটিতে সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়। সে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে একাডেমিসিয়ান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়। তার প্রস্তুতি হিসেবেই হয়তোবা সে পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী। তাই সে জুনপেইর সঙ্গে ভাগাভাগি করে একে অপরের কাছে নিয়ে গল্প-উপন্যাস পড়ে। পরে সেগুলো নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন হয়।
সায়োকোর চুল সুন্দর, আর চোখ বুদ্ধিদীপ্ততায় ভরা। সে এমনিতে কথা বলে শান্তভাবে ও সহজ–সরল ও সততার সঙ্গে কিন্তু তার ভেতরে থাকে প্রবল আত্মবিশ্বাস। তার অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখে যেন সেই আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। তবে তার পোশাক-আশাক সাদামাটা। আবার কোনো মেকআপ নেয় না। কিন্তু তার রসবোধে একেবারে আলাদা ধরনের রস ধরা দেয়। তাই যখন সে কোনো মজার কথা বলে, তার মুখে দুষ্টু ভঙ্গির ভাঁজ চোখে পড়ে। তার এ অভিব্যক্তিটা জুনপেইর খুব পছন্দ। এমনকি তখন সে বুঝতে পারে যে এ-ই সেই মেয়ে, যাকে সে এত দিন ধরে খুঁজে আসছে। সায়োকোর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে জুনপেই কখনো প্রেমে পড়েনি। সে পড়াশোনা করেছে একটা ছেলেদের হাইস্কুলে, তাই মেয়েদের সঙ্গে তার পরিচিত হওয়ার তেমন কোনো সুযোগই মেলেনি।
কিন্তু জুনপেই কখনোই নিজের মনে কথাগুলো সায়োকোকে বলার মতো সাহস জোগাড় করে উঠতে পারেনি। সে জানে, একবার যদি কথাগুলো তার মুখ থেকে বের হয়ে যায়, তবে আর ফিরে আসার উপায় থাকবে না। আর সায়োকো হয়তো নাগালের অনেক দূরে কোথাও সরে যেতে পারে। তা যদি না–ও হয়, নিশ্চয়ই তাদের তিনজন—জুনপেই, তাকাতসুকি আর সায়োকোর মধ্যে যে নিখুঁত ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছন্দ সম্পর্ক চলে আসছে, সেটাতে একটা পরিবর্তন এসে দাঁড়াবে। তাই জুনপেই নিজেকে বোঝায় যে এখন আপাতত সবকিছু যেমন আছে তেমনই থাক; বরং আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা যাক।
জুনপেই বলে, না সে রকম কিছু নয়। আর এটা কোনো মিথ্যাও তো না। তার খারাপ লাগেনি না, রাগও হয়নি না। সত্যি বলতে যদি জুনপেই যদি রাগ করেই থাকে, তবে তা নিজের ওপরই। তাকাতসুকি আর সায়োকোর প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে ওঠাটা তো আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা। তাকাতসুকির সব যোগ্যতাই আছে। তার নিজের তেমন কিছুই নেই। ব্যাপারটা এ রকমই সহজ।
কিন্তু শেষ অবধি প্রথম পদক্ষেপটা তাকাতসুকিই নেয়। সে জুনপেইকে একদিন বলে ‘হঠাৎ করে এটা বলছি বলে খারাপ লাগছে, কিন্তু আমি সায়োকোর প্রেমে পড়ে গেছি। আশা করি, এতে তোমার কোনো আপত্তি নেই।’
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তাকাতসুকি তার প্রেমে পড়ার কথা সায়োকোকে বলে। তখন জুনপেই গরমের ছুটিতে কাঁসাই অঞ্চলে বাড়িতে ছিল। তাকে তাকাতসুকি বোঝা যে, সে ও সায়োকো প্রায় এক দুর্ঘটনাবশত জড়িয়ে গেছে।
জুনপেই তাকাতসুকির দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ সময় লাগে ঘটনাটা বোঝার জন্য, কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে, তখন যেন তা সিসার ওজনের মতো ভার তার মনে নেমে আসে। আর এখন তার সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই বলে, ‘না, আমার কোনো আপত্তি নেই।’
‘তোমার কথা শুনে আমি খুব খুশি!’ তাকাতসুকি বড়সড় হাসি দিয়ে বলে,‘ একমাত্র তোমাকে নিয়েই আমি চিন্তিত ছিলাম। মানে, আমাদের তিনজনের সম্পর্কটা ভালো চলছে, মনে হচ্ছিল যেন আমি তোমাকে ছাড়াই এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু যা–ই হোক, জুনপেই, এটা কোনো না কোনো সময় ঘটতই। তোমাকে এটা বুঝতে হবে। এখন না হলেও দ্রুতই বা দেরিতে এটা হতোই। তবে মূল কথা হলো, আমি চাই আমাদের তিনজন বন্ধুত্বের সম্পর্কটা টিকে থাকুক। ঠিক আছে না?’
পরের কয়েক দিন জুনপেই যেন গভীর বালুর মধ্যে হেঁটে বেড়ায়। সে ক্লাস ও কাজ এড়িয়ে চলে। তার এক রুমের বাসার মেঝেতে শুয়ে রেফ্রিজারেটর থেকে খারাপ কিছু খাবার খেয়ে দিন পার করে দেয় এবং মনে চাইলেই হুইস্কি খেয়ে নেয়।
একবার তার মনে হয় সে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে তাকে কেউ চেনে না এমন দূরের কোনো শহরে চলে যাবে এবং বাকি জীবনটাই কায়িক শ্রম করে কাটাবে। এমনকি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে সেটাই তার জীবনযাপনের সবচেয় ভালো উপায় হবে। কিন্তু ক্লাসে না যাওয়ার পঞ্চম দিনে সায়োকো এসে জুনপেইর বাসায় হাজির হয়। সে পরনে তখন ফুল হাতাওয়ালা হাতার নেভি ব্লু গেঞ্জি আর সুতির সাদা প্যান্ট আর তার চুল ক্লিপ দিয়ে পেছনে বাঁধা।
‘তুমি কেমন আছ?’ সে জিজ্ঞেস করে। ‘সবাই ভাবছে তুমি হয়তো তোমার ঘরে মারা পড়ে আছ। তাকাতসুকি আমাকে বলেছিল তোমার খবর নিতে। মনে হয় সে নিজে লাশটা দেখতে চায়নি তাই নিজে আসেনি। তাকে দেখতে যতটা শক্তপোক্ত লাগে, আসলে সে ততটা শক্ত নয়।’
জুনপেই বলে, আমি অসুস্থ হয়ে আছি।
‘হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি’ সায়োকো বলে, ‘আমার মনে হয় তুমি একটু শুকিয়ে গেছ।’ সে একদৃষ্টে জুনপেইর দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘তুমি কি কিছু খাবে। তোমার জন্য কিছু রান্না করব?’
জুনপেই মাথা নেড়ে বলে, তার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।
সায়োকো ফ্রিজ খুলে ভেতরে তাকালে চেহারায় বিরক্ত ভাব আসে। কারণ, আছে কেবল দুই ক্যান বিয়ার, একটা শুকনা শসা, আর কিছু দুর্গন্ধনাশক।
জুনপেইর পাশে এসে সায়োকো বসে পড়ে—‘কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না, জুনপেই, তাকাতসুকি আর আমাকে নিয়ে কি তোমার খারাপ লাগছে?’
জুনপেই বলে, না সে রকম কিছু নয়। আর এটা কোনো মিথ্যাও তো না। তার খারাপ লাগেনি না, রাগও হয়নি না। সত্যি বলতে যদি জুনপেই যদি রাগ করেই থাকে, তবে তা নিজের ওপরই। তাকাতসুকি আর সায়োকোর প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে ওঠাটা তো আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা। তাকাতসুকির সব যোগ্যতাই আছে। তার নিজের তেমন কিছুই নেই। ব্যাপারটা এ রকমই সহজ।
‘একটা বিয়ার ভাগাভাগি করে খাব?’ সায়োকো প্রস্তাব দেয়।
‘ঠিক আছে।’ জুনপেই রাজি হয়।
সায়োকো ফ্রিজ থেকে বিয়ারের একটা ক্যান বের করে তার ভেতরের পানীয়টা দুটি গ্লাসে ভাগ করে ঢালে এবং একটা গ্লাস জুনপেইর হাতে দেয়। তারপর তারা দুজন আলাদা আলাদাভাবে নীরবে বসে বিয়ার পান করে যায়।
‘কথাটা বলা একটু লজ্জার, তারপরও বলি’ সায়োকো বলে, ‘আমি কিন্তু চাই তোমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা বজায় থাকুক, জুনপেই। শুধু এখন নয়, আমরা যখন বয়সে অনেক বড় হয়ে উঠব তখনো। তাকাতসুকিকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু তোমাকেও আমার দরকার—অন্য একভাবে। এতে কি আমি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি?’
জুনপেই কীভাবে তার জবাব দেবে বুঝতে পারে না, তবে সে কেবল মাথা নাড়ে।
সায়োকো তাই বলে, ‘কোনো কিছু বোঝা আর সেই বোঝাটাকে এমন ভাবে বলা যে তা তুমি নিজের চোখে দেখতে পাবে—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। তবে যদি তুমি দুটোই জুতসই ও সমানভাবে করতে পার, তাহলে বেঁচে থাকা অনেক সহজ হয়ে যায়।’
জুনপেই তার মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সে মোটেই বুঝতে পারছে না সায়োকো কী বলতে চাইছে। ‘আমার মাথাটা সব সময় এত ধীরে কাজ করে কেন?’—সে মনে মনে ভাবে। এবার সে ওপরের দিকে তাকায়, আর আধা মনোযোগে অনেকক্ষণ ধরে চোখে ছাদের ওপরের একটা দাগের ওপর থির করে রাখে। যদি সে তাকাতসুকির আগে সায়োকোর কাছে নিজের ভালোবাসার কথা বলে দিত, তাহলে কী হতো? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর জুনপেই খুঁজে পায় না। সে শুধু নিশ্চিতভাবে জানে যে এখন সে রকম কোনো ঘটনা আর কখনোই ঘটবে না। কখনোই না।
সে তার চোখ বেয়ে নিচের মেঝের মাদুরে অশ্রুর ফোঁটা পড়ার শব্দ শুনতে পায়। অদ্ভুতভাবে সে শব্দ যেন বড় হয়ে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য সে ভাবে, হয়তো সে নিজেই অজান্তে কাঁদছে। কিন্তু তারপর সে বুঝতে পারে, কাঁদছে সায়োকো। সে হাঁটুর ফাঁকে মাথা নিচু করে রেখেছে, আর এখন কোনো শব্দ ছাড়াই তার কাঁধ কাঁপছে।
প্রায় অচেতনভাবেই জুনপেই হাত বাড়িয়ে সায়োকোর কাঁধে হাত রাখে। তারপর তাকে আলতো করে নিজের দিকে টেনে নেয়। তবে সায়োকো বাধা দেয় না। জুনপেই হাত দিয়ে সায়োকোকে জড়িয়ে ধরে এবং তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। সায়োকো চোখ বন্ধ করে নেয় এবং তার ঠোঁট একটু খুলে দেয়। জুনপেই এবার অশ্রুর গন্ধ পায়, আর সায়োকোর মুখ থেকে নিশ্বাস টেনে নেয়। জুনপেই তার বুকে সায়োকোর স্তনের নরম ছোঁয়া পায়। জুনপেইর মাথার ভেতর যেন বড় কোনো কিছু জায়গা বদল করে নেয়। এমনকি সে যেন সে বদলের শব্দটাও শুনতে পায়—যেন সেটা পৃথিবীর সব কটি জয়েন্ট একসঙ্গে কড়মড় করে ওঠার শব্দ। কিন্তু সে কড়মড় করাটুকুই, আর কিছু নয়। তখন হঠাৎ যেন চেতনা ফিরে পেয়ে সায়োকো মুখটা সরিয়ে নিচের দিকে নামায় এবং জুনপেইকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়।
‘না,’ সায়োকো শান্ত গলায় মাথা নেড়ে বলে। ‘আমরা এটা করতে পারি না। এটা ভুল।’
জুনপেই ক্ষমা চায়। কিন্তু সায়োকো কিছু বলে না। তারা অনেকক্ষণ সেইভাবেই নীরবে বসে থাকে। খোলা জানালা দিয়ে হালকা বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসে একটা রেডিওর আওয়াজ। তাতে বাজে একটা জনপ্রিয় গান। জুনপেইর মনে হয় সে গানটা সে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে পরে যতই চেষ্টা করুক না কেন, সে আর কখনো সেই গানের শিরোনাম বা সুর মনে করতে পারেনি।
‘তোমার ক্ষমা চাইতে হবে না,’ সায়োকো বলে। ‘এটা তোমার দোষ নয়।’
‘আমার মনে হয় আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি,’ জুনপেই সততার সঙ্গে স্বীকার করে নেয়।
আর সায়োকো হাত বাড়িয়ে জুনপেইর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বলে ‘ভার্সিটিতে ফিরে যাওয়া শুরু করো। কাল যাবে? তোমার মতো বন্ধু আমি আগে কখনো পাইনি। তুমি আমাকে অনেক কিছু দাও। আশা করি তুমি সেটা বুঝতে পারো।’
‘অনেক কিছু দিই বটে তবে তা যথেষ্ট নয়,’ জুনপেই বলে।
সায়োকা মাথা একটু নত করে ক্লান্ত স্বরে বলে, ‘তা সত্যি নয়। একদমই সত্যি নয়।’
পরের দিন জুনপেই তার ক্লাসে যায়, এবং জুনপেই, তাকাতসুকি আর সায়োকো—এই তিনজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের গ্রুপটা গ্র্যাজুয়েশন অবধি একসঙ্গেই বয়ে চলে।
কিছুক্ষণের জন্য জুনপেইর মনে যে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জেগেছিল, সেটাও যেন প্রায় জাদুর মতো কাজ করে তার ভেতরে। তাই সেদিন তার বাসায় যখন সে সায়োকোকে বাহুডোরে নিয়েছে এবং তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়েছে, তখন তার ভেতরের কিছু একটা যেন নিজের ঠিক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে গেছে। তাই তার পর থেকে সে আর বিভ্রান্ত বোধ করে না। যদিও সিদ্ধান্তটা সে নিজে নেয়নি তারপরও তা থির হয়ে যায়।
সায়োকো মাঝেমধ্যে তার পুরোনো হাইস্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে জুনপেইর পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের সঙ্গে নিয়ে চারজন মিলে তারা মাঝেমধ্যে বেড়াতেও বের হয়। মেয়েদের একজনের সঙ্গে জুনপেই বেশ ঘন ঘন দেখাও করে। এমনকি তার সঙ্গেই নিজের বিশতম জন্মদিনের ঠিক আগে—জুনপেই প্রথমবারের মতো যৌন সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু তার মন সব সময় যেন অন্য কোথাও পড়ে থাকে। মেয়েটার প্রতি সে ভদ্র, দয়ালু এবং কোমল আচরণ করে ঠিকই, কিন্তু সত্যিকারের আবেগপ্রবণ বা মনপ্রাণ ঢেলেও দেয় না কখনোই। জুনপেই কেবল তখনই সত্যিকারের আবেগপ্রবণ ও নিবেদিত হয়ে ওঠে, যখন সে একা বসে গল্প লেখে। শেষ অবধি তার সে প্রেমিকা সত্যিকারের উষ্ণতার খোঁজে অন্য কোথাও চলে যায়। এমন ঘটনা জুনপেইর জীবনে একের পর এক ঘটতে থাকে।
যখন জুনপেইর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর তার মা–বাবা যখন জানতে পারে যে সে ব্যবসা নয়, বরং সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে, তখন পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। কারণ, তার বাবা চায় জুনপেই তাদের বসবাসের এলাকা কানসাইতে ফিরে গিয়ে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরুক কিন্তু জুনপেইর নিজের সে রকম কোনো প্ল্যান নেই। সে টোকিওতেই থাকতে এবং গল্প লেখা চালিয়ে যেতে চায়। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয় না। ফলে এ নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক দেখা দেয়। এমন কিছু কথা বলা হয়, যা বলা উচিত হয়নি। তারপর জুনপেই আর কখনোই তার মা–বাবার সঙ্গে দেখা করতে যায়নি। এটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত বলে সে নিশ্চিত হয়।
তবে তার বোন ভিন্নভাবে চলে। সে সব সময় সমঝোতা করে বাবা-মার সঙ্গে ভালো হয়ে থাকে। জুনপেই শৈশব থেকেই তাদের সবার সঙ্গে বিরোধ করে আসছে। তাই সে কষ্টমিশ্রিত হাসি নিয়ে নিশ্চিত হয় যে অবশেষে সে বাবা-মায়ের কাছে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। ১৯২০-এর দশকে যেমন বাবা-মায়ের কথা না মানায় ছেলেদের পরিত্যক্ত করা হতো জুনপেইর জীবনে ঠিক তা-ই হয়।
জুনপেই কখনো নিয়মিত চাকরির জন্য আবেদন করেনি, তবে কিছু পার্টটাইম চাকরি করে জীবিকা চলায়। তাই সে গল্প লেখা চালিয়ে যেতে পারে। যখনই সে কোনো গল্প শেষ করে, সেটা সায়োকোকে দেখায় এবং তার সৎ মতামত নেয়। তারপর তার পরামর্শ অনুযায়ী গল্পটা পুনরায় লেখে। যতক্ষণ না সায়োকো কোনো গল্পকে ‘ভালো’ বলে, জুনপেই ধৈর্য ও যত্নের সঙ্গে বারবার তা পুনর্লিখন করে। লেখালেখির ব্যাপারে তার অন্য কোনো গুরু বা মেন্টর নেই এবং সে কোনো লেখক দলের সদস্যও নয়। তার একমাত্র মৃদু আলো, যা তাকে পথ দেখায়, তা ছিল সায়োকোর পরামর্শ।
চব্বিশ বছর বয়সে জুনপেইয়ের তার একটা গল্প এক সাহিত্য পত্রিকার ‘নতুন লেখক’ পুরস্কার পায় এবং সে গল্পটা ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কারের’ জন্যও মনোনীত হয়। এ পুরস্কার যে পায় তার ঔপন্যাসিক হওয়ার দরজা খুলে যায় বলে সাহিত্যসমাজে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। কিন্তু পরের পাঁচ বছরে জুনপেইয়ের গল্প চারবার ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কারের জন্য মনোনীত’ হলেও কখনোই সে জিততে পারেনি। সে চিরকালই ‘প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থী’ হিসেবে রয়ে যায়। পুরস্কার কমিটির একজন বিচারকের ‘সাধারণ মতামত’ হলো: ‘জুনপেইয়ের মতো একজন তরুণ লেখকের লেখার তুলনায় তার গল্পের মান অত্যন্ত উঁচু, তার লেখায় দৃশ্য তৈরি করার এবং মানসিক বিশ্লেষণের ‘অসাধারণ উদাহরণ’ কিছু দেখা যায়। কিন্তু তার লেখায় মাঝে মাঝে “অনুভূতিতে ছেয়ে যাওয়ার প্রবণতা” প্রকট হয়ে ওঠে এবং রচনায় “নতুনত্ব ও ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনার অভাব” রয়েছে।’
এমন মন্তব্য দেখে তাকাতসুকি হাসিতে ফেটে পড়ে—‘এই বিচারকগুলো পুরো পাগল হয়ে গেছে। “উপন্যাসসুলভ ব্যাপ্তি” বলতে আবার কী বোঝায়? বাস্তব মানুষ তো এমন শব্দ ব্যবহার করে না। যেমন—“আজকে সুকিয়াকি বাজারে গরুর মাংসের মতো ব্যাপ্তি কম ছিল।” কখনো কি কাউকে এমন কথা বলতে শুনেছ?’
ত্রিশে পা দেওয়ার আগেই জুনপেই ‘হাউস ইন দ্য রেইন’ ও ‘গ্রেপস’ নামের দুটি ছোটগল্পের বই বের করে ফেলে। প্রথম বইটা প্রায় ১০ হাজার আর ‘গ্রেপস’ ১২ হাজার কপি বিক্রি হয়। জুনপেইয়ের সম্পাদক জানায়, একজন নতুন লেখকের ছোটগল্পের জন্য এ বিক্রি খারাপ নয়। আর বই নিয়ে আলোচনাকেরাও সাধারণভাবে ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করে। কিন্তু তার কোনোটাতেই জুনপেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেনি।
জুনপেইয়ের বেশির ভাগ গল্পেই একতরফা তরুণ বয়সের একতরফা প্রেমের গতিপথ তুলে ধরা হয়। তার গল্পগুলোর সমাপ্তিটা সব সময়ই অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। পাঠকমাত্রই স্বীকার করে যে গল্পগুলো খুবই সুন্দরভাবে লেখা, তবু সেই সময়ের বেশি জনপ্রিয় ও ফ্যাশনেবল সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হওয়া আর সব লেখা থেকে একেবারেই আলাদা। জুনপেইয়ের লেখার ধরন গীতিময় আর কাহিনির বিন্যাস কিছুটা পুরোনো ঢঙের। তবে বর্তমান প্রজন্মের পাঠকেরা চায় আরও নতুন ও উদ্ভাবনী লেখা এবং আরও কঠিন ও বাস্তবঘন কাহিনি। কারণ, আদতে এ তো ভিডিও গেম আর র্যাপ সংগীতের যুগ।
জুনপেই কেবল ছোটগল্পই লিখে যেতে থাকায় তার লেখা বারবার একই উপাদান ঘুরপাক খায়, আর তার কল্পনার জগৎ ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসে। জুনপেইকে তাই তার সম্পাদক একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ জুগিয়ে যায়। কারণ, একটা উপন্যাস লেখা একজন লেখকের জন্য সম্পূর্ণ নতুন নতুন জগৎ খুলে দিতে পারে। বাস্তব দিক থেকেও উপন্যাস ছোটগল্পের তুলনায় অনেক বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদি সে দীর্ঘ সাহিত্যজীবন গড়তে চায়, তবে তাকে বুঝতে হবে যে শুধু ছোটগল্প লিখে জীবিকা নির্বাহ করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
কিন্তু জুনপেই যেন জন্মগতভাবেই একজন ছোটগল্প লেখক। তাই গল্প লিখতে গিয়ে সে নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে ফেলে, অন্য সবকিছুকে ‘যাক গে’ বলে ছেড়ে দেয়, আর তিন দিনের গভীর মনোযোগী পরিশ্রমে প্রথম খসড়া লিখে ফেলতে সক্ষম হয়। আরও চার দিন ধরে তাতে ঘষামাজা করার পর গল্পটা সায়োকো এবং তার সম্পাদককে পড়তে দেয়। তারপর তাদের মন্তব্য অনুযায়ী আবারও কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন করে নেয়। এভাবে এক সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণত তার গল্প লেখার লড়াইটা চলে। তখনই গল্পের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গড়ে ওঠে।
তাই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যে সব শক্তি ও মনোযোগ ঢেলে দিয়ে, কল্পনা আর ভাষার ওপর সম্পূর্ণ মনঃসংযোগ স্তূপ করে নিয়ে গল্প লেখাটা তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উপন্যাস লেখার জন্য তো মাসের পর মাস ধরে এ রকম মানসিক মনোযোগ ধরে রাখতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ভেবে জুনপেই উপন্যাস লেখার কথা উঠলেই ক্লান্ত বোধ করে। তাই এ ধরনের ধীর ও দীর্ঘগতির কোনো কাজ করা তার নাগালের বাইরে বলে তার মনে হয়।
তারপরও সে চেষ্টা করে। বেশ কয়েকবারই করে। কিন্তু প্রতিবারই পরাজিত হয়। অবশেষে সে হাল ছেড়ে দেয়। তাই নিজে নিজেই ঠিক করে নেয় ভালো লাগুক বা না লাগুক, সে ছোটগল্প লেখক হিসেবেই জীবিকা নির্বাহ করে যাবে। কারণ, তার মনে হয় যতই চেষ্টা করি না কেন নিজের ব্যক্তিত্ব বদলানো সম্ভব নয়। যেমন বেসবল খেলায় একজন দুর্দান্ত ‘সেকেন্ড বেসম্যান’কে ‘হোম-রান হিটার’ বানানো যায় না।
তারপর দুই বছর কেটে যায়। সায়োকো আর কখনো শিক্ষকতায় ফিরে যায় না। জুনপেই তার এক সম্পাদক বন্ধুকে দিয়ে সায়োকোর জন্য একটা লেখা অনুবাদের কাজ পাঠায়, আর সে কাজটা বেশ দক্ষতার সঙ্গে করে ফেলে। তাতে ভাষার ওপর তার দারুণ দখল বোঝা যায়, আর সে ভালো লিখতেও পারে। আর সে কাজও করে দ্রুততার সঙ্গে। তা ছাড়া সে কাজের ব্যাপারে বেশ, সতর্কও। এতে সম্পাদক এতটাই মুগ্ধ হন যে পরের মাসেই তাকে আরেকটা লেখা অনুবাদ করতে দেন। যেটা উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়।
জুনপেইয়ের নিরেট ব্যাচেলর জীবনের জন্য খুব বেশি টাকার প্রয়োজন হয় না। তাই এক মাসের জন্য যতটুকু টাকা তার দরকার হয়, তা হাতের মুঠায় এসে গেলে সে মাসে সে আর টাকা কামাইয়ের কোনো কাজ আর হাতে নেয় না। তবে তার একটা বোবা বিড়ালের ভরণপোষণ দিতে হয়। আর জুনপেইয়ের জীবনে যেসব প্রেমিকা সে পায়, তাদের সাধারণত তেমন কোনো চাহিদা থাকে না। তবু একসময় তারা তার স্নায়ুর ওপর যেন চেপে বসে, আর তখন সে সম্পর্ক শেষ করার জন্য কোনো না কোনো অজুহাত সে বের করে নেয়।
মাঝে মাঝে—হয়তো মাসে এক-দুবার রাতের কোনো অদ্ভুত সময়ে তার ঘুম ভেঙে যায়, আর তার মনে আতঙ্কের কাছাকাছি একধরনের অনুভূতি জেগে ওঠে। সে নিজেকে তখন বলে, ‘আমি কোথাও পৌঁছাতে পারছি না। যতই লড়াই করি না কেন, আমি কোথাও পৌঁছাতে পারব না।’ তারপর সে হয় নিজেকে জোর করে ডেস্কে বসিয়ে লিখতে শুরু করে, নয়তো ঘুম না আসা অবধি মদ খেয়ে যায়। এই সময়গুলো ছাড়া তার জীবন শান্ত ও উদ্বেগবিহীন হয়ে থাকে।
তাকাতসুকি নিজের চাওয়া অনুযায়ী দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিবেদক হিসেবে যে চাকরি চেয়েছিল সেটা একদিন পেয়ে যায়। ভার্সিটির পড়াশোনায় সে তেমন ভালো করেনি, তাই তার রেজাল্ট খুব গর্ব করার মতো হয় না। কিন্তু ইন্টারভিউতে সে এমন দারুণ প্রভাব ফেলে। ফলে অনায়াসেই তার চাকরিটা হয়ে যায়। তাই সায়োকো তার প্ল্যান মোতাবেক মাস্টার্সে ভর্তি হয়। তাদের জীবনে সবকিছুই যেন মসৃণভাবে এগিয়ে চলে।
তার আগে অনার্স শেষ করার ছয় মাস পর তারা বিয়ে করে নেয়। বিয়ের অনুষ্ঠানটা তাকাতসুকির মতোই হাসিখুশি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে। তারা হানিমুনে ফ্রান্সে যায়, আর টোকিও শহরের কেন্দ্র থেকে অল্প দূরত্বে সহজে যাতায়াত করা যায়—এমন একটা জায়গায় দুই কক্ষের একটা ফ্ল্যাট কিনে নেয়।
তখন জুনপেই সপ্তাহে দু-একবার নবদম্পতির বাসায় যায়। ডিনার করে তবে ফেরে। তখন তারা তাকে আন্তরিকতার সঙ্গেই গ্রহণ করে। এমনকি মনে হয় তারা একা থাকলে যতটা স্বচ্ছন্দ থাকে, তার চেয়ে জুনপেই পাশে থাকলে যেন আরও বেশি স্বস্তিকর হয়ে ওঠে নবদম্পতির মধ্যকার সম্পর্কটা।
পত্রিকার কাজ করে তাকাতসুকি বেশ আনন্দ পায়। প্রথমে তাকে সিটি ডেস্কে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাই সে একের পর এক দুর্ঘটনা ও ট্র্যাজেডির স্পটে ছুটে যায়। এ কাজ করতে গিয়ে সে অনেক মৃতদেহ দেখে ফেলে। শেষে একদিন বলে, ‘কোনো লাশ দেখলে এখন আর আমার কোনো অনুভূতি হয় না।’
ট্রেনে কাটা পড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া, আগুনে পুড়ে ঝলসে যাওয়া, সময়ের কারণে রং বদল নেওয়া, পানিতে ডুবে মরে ফুলে ওঠা, শটগানের গুলিতে মস্তিষ্ক ছিটকে পড়া, কিংবা করাত দিয়ে মাথা ও হাত কেটে আলাদা করে ফেলা দেহ এত দিনে তাকাতসুকির দেখা হয়ে গেছে। তাই সে বলে, ‘আমরা বেঁচে থাকলে একেকটা দেহকে অন্য দেহ থেকে আলাদা করে চেনা গেলেও মরার পর সবাই যেন একই চেহারায় গিয়ে দাঁড়ায়। তখন আমরা ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া জিনিসের মতো কেবল খোলস হয়ে যাই।’
কখনো কখনো তাকাতসুকি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার বাসায় ফিরতে ফিরতে পরের দিন সকাল হয়ে যায়। তখন সায়োকো ফোন করে জুনপেইকে। সে জানে যে জুনপেই প্রায়ই সারা রাত জেগে থাকে।
‘তুমি কি কাজ করছ? একটু কথা বলা যাবে?’ তাকাতসুকি জিজ্ঞেস করে।
জুনপেই বলে, ‘অবশ্যই কথা বলা যাবে। আমি তো বিশেষ কিছু করছি না।’
তারা তখন পড়া বইগুলো নিয়ে আলোচনা করে, কিংবা নিত্যদিন জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলে। তারপর ধীরে ধীরে তাদের আলাপ গড়ায় সেই পুরোনো দিনের দিকে—যখন তারা সবাই ছিল মুক্ত, উচ্ছ্বাসে ভরা আর স্বতঃস্ফূর্ত।
এ ধরনের কথাবার্তা অবধারিতভাবেই জুনপেইয়ের মনে ফিরিয়ে আনে সেই সময়ের স্মৃতি, যখন সে সায়োকোকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে ধরেছিল—তার মসৃণ ঠোঁটের ছোঁয়া, তার চোখের জলের গন্ধ, তার বুকে লেগে থাকা স্তনের কোমলতা, আর তার বাসার মেঝের মাদুরে ওপর ঝরে পড়া শরতের স্বচ্ছ ও শুভ্র সূর্যালোক—এই সব স্মৃতিকে সে কখনোই তার ভাবনা থেকে খুব একটা দূরে রাখতে পারে না।
ত্রিশে পা দেওয়ার কিছুদিন পর সায়োকোর গর্ভে সন্তান আসে। তখন সে মাস্টার্স ক্লাসের এক শিক্ষকের সহকারী হিসেবে কাজ করে, কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য সে কাজ থেকে বিরতি নেয়। তিনজন মিলে অনাগত সন্তানের জন্য অনেক নাম ভেবে রাখে কিন্তু শেষ অবধি জুনপেইয়ের দেওয়া ‘সালা’ নামটাই বেছে নেওয়া হয়।
সায়োকো বলে, ‘নামটার ধ্বনি আমার খুব ভালো লাগে।’
প্রসবের সময় কোনো জটিলতা হয়নি। আর সেদিন রাতেই অনেক দিন পর জুনপেই আর তাকাতসুকি সায়োকো ছাড়া একসঙ্গে বসে। উদ্যাপন করার জন্য জুনপেই একটা সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কির বোতল নিয়ে আসে, আর তারা রান্নাঘরের টেবিলে বসে সেটি দুজনে মিলে শেষ করে।
তাকাতসুকি আগে কখনো নিজের গভীর আবেগ খুব একটা প্রকাশ না করলেও সেদিন বলে, ‘সময় এভাবে ছুটে চলে কেন? মনে হয় যেন সেদিনই আমি ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছিলাম। তারপর তোমার সঙ্গে দেখা হয় তারপর সায়োকোর সঙ্গে। আর এখন দেখি আমি একজন বাবা হয়ে গেছি। ব্যাপারটা অদ্ভুত। মনে হয় যেন আমি দ্রুতগতিতে চালা কোনো সিনেমা দেখছি।’
‘কিন্তু তুমি এসব বুঝবে না, জুনপেই। তুমি তো এখনো ঠিক সেইভাবেই জীবন কাটাচ্ছ, যেমনটা কলেজে কাটাতে। যেন তুমি কখনো ছাত্রত্বই ছাড়োনি। তাই তুমি যেন এখনো এক “ভাগ্যবান বদমাশ” হয়ে আছ।’
‘তেমন ভাগ্যবান না,’ জুনপেই বলে। তবে এ কথায় তাকাতসুকি কী মনে করছে, তা জুনপেই বুঝতে পারে। সায়োকো এখন একজন মা। তা তাকাতসুকির মতোই জুনপেইয়ের জন্যও বড় এক ধাক্কা। জীবনের চাকা যেন খট করে একটা আওয়াজ তুলে হঠাৎ এক ধাপ এগিয়ে গেছে। আর জুনপেই বুঝতে পারে অতীতের আর কিছু কখনো আগের মতো করে ফিরে যাবে না। শুধু একটা ব্যাপারেই সে এখনো নিশ্চিত নয় যে এ নিয়ে তার ঠিক কী মনোভাব গড়ে তোলা দরকার।
‘আগে তোমাকে কখনো বলা হয়নি,’ তাকাতসুকি বলে, ‘আমার মনে হয় সায়োকো আমার চেয়ে তোমার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট ।’ এখন সে বেশ মাতাল বটে, তবে তার চোখে অ-মাতাল অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর এক ঝিলিক দেখা যায়।
‘এখন এসব কথা বলা তো পাগলামির সমান’ জুনপেই হাসতে হাসতে বলে।
‘মোটেই পাগলামি নয়। আমি জানি আমি কী বলছি। তুমি হয়তো কাগজে সুন্দর সুন্দর শব্দ সাজাতে জানো, কিন্তু একজন নারীর বোধ সম্পর্কে তোমার কিছুই জানা নেই। ডুবে যাওয়া একটা লাশও তোমার চেয়ে ভালো বোঝে। সে তোমাকে কীভাবে অনুভব করে, সে বিষয়ে তোমার কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু আমি ভেবেছি, যাক গে, আমি তো তাকে ভালোবাসি, আর তার চেয়ে ভালো কাউকে খুঁজেও পাইনি, তাই তাকেই আমার আঁকড়ে ধরতে হয়। এখনো আমি মনে করি, সে পৃথিবীর সেরা নারী। আর এখনো মনে করি, তাকে পাওয়ার অধিকার আমারই।’
‘কেউ তো বলছে না যে তোমার নেই।’ জুনপেই বলে।
তাকাতসুকি মাথা নেড়ে বলে ‘তবু তুমি ব্যাপারটা ধরতে পারোনি। সত্যিই না। কারণ, তুমি ভীষণ বোকা। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। তুমি বোকা হলে আমার আপত্তি নেই। তুমি মোটেও খারাপ লোক নও। মানে দেখো আমার মেয়ের নামটা তোমারই দেওয়া।’
“হ্যাঁ, তা ঠিক,” জুনপেই বলে, ‘তবে সিরিয়াস বিষয়টা কী, তা আমি এখনো বুঝতে পারিনি।’
‘একদম ঠিক। অল্প একটু সিরিয়াস কিছু হলেই তুমি তার কিছুই ধরতে পারো না। আমার তো অবাক লাগে তুমি কী করে একটা কল্পকাহিনি গুছিয়ে লিখে ফেলো!’
‘হ্যাঁ, কিন্তু ওটা তো একেবারে আলাদা ব্যাপার।’
‘যা–ই হোক, এখন আমরা চারজন,’ তাকাতসুকি একরকম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে। ‘তবে ভাবছি—চারজন। চার সংখ্যাটা কি ঠিক হলো?’
২.
সালার দ্বিতীয় জন্মদিনের ঠিক আগে জুনপেই জানতে পারে যে তাকাতসুকি আর সায়োকোর সম্পর্ক ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েছে। তাকে যখন সায়োকো এই খবরটা জানায় তখন তার মধ্যে একধরনের অপরাধবোধের আভাস দেখা দেয়।
সে বলে, সে যখন প্রেগন্যান্ট ছিল, তখন থেকেই তাকাতসুকি অন্য এক মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আর এখন সে প্রায় বাড়িতেই আসে না। মেয়েটা নাকি তার অফিসেরই কেউ।
সায়োকো যতই বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুক না কেন, জুনপেই কিছুতেই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে সে কী শুনছে। তাকাতসুকির আবার অন্য একটা মেয়ে খুঁজে নেওয়ার দরকার হলো কেন? সালার জন্মের রাতে তো সে সায়োকোকে পৃথিবীর সেরা মেয়ে বলে ঘোষণা করেছে। আর সেই কথা তো তার অন্তরের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা কথা বলেই মনে হয়েছে।
তার ওপর, সে তো সালাকে ভীষণ ভালোবাসে। তা সত্ত্বেও কেন তাকে নিজের পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হলো?
‘মানে, আমি তো প্রায়ই তোমাদের বাড়িতে থাকি, তোমাদের সঙ্গেই রাতে খাওয়াদাওয়া করি? কিন্তু কই! আমি তো কিছুই টের পাইনি। তোমরা একেবারে নিখুঁত একটা পরিবার, যেন সুখেরই প্রতিমূর্তি।’
মৃদু হাসি দিয়ে সায়োকো বলে, ‘সত্যিই তাই। আমরা তোমার কাছে মিথ্যে বলিনি বা কোনো অভিনয়ও করিনি। কিন্তু তার সবকিছুর পাশাপাশি, সে আরেকজন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করে ফেলে। আর তাই আমরা আগের অবস্থায় আর কখনোই ফিরে যেতে পারব না। এখন আমরা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা নিয়ে তুমি খুব বেশি চিন্তা কোরো না। আমার মনে হয়, এখন থেকে অনেক দিক দিয়েই সবকিছু আরও ভালোভাবে গুছিয়ে যাবে।’
জুনপেই মনে মনে ভাবে, সায়োকোর বলা কথা ‘অনেক দিক দিয়ে’-এর মানে কী? এই পৃথিবী এমন সব দুর্বোধ্য কথায় ভরা, যেগুলোর মানে বোঝা সত্যিই কঠিন।
কয়েক মাস পর সায়োকো ও তাকাতসুকির বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। বেশ কিছু নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে তারা কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই সমঝোতায় পৌঁছায়। কোনো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নয়, কোনো বিতর্কিত দাবিদাওয়াও তোলো না কেউ। তাকাতসুকি গিয়ে তার প্রেমিকার সঙ্গে থাকতে শুরু করে সে সপ্তাহে একদিন সালাকে দেখতে আসে, আর তারা সবাই ঠিক করে যে সেই সময়ে জুনপেইও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করবে।
‘তাতে আমাদের দুজনেরই সুবিধা হবে,’ সায়োকো জুনপেইকে বলে।
সুবিধা? জুনপেইর হঠাৎ মনে হয় যেন সে একলহমায় অনেক বেশি বয়স্ক হয়ে গেছে, অথচ তার বয়স তখন মাত্র তেত্রিশে পা দিয়েছে।
সালা তাকাতসুকিকে ‘পাপা’ আর জুনপেইকে ‘জুন’ বলে ডাকে। চারজন মিলে তারা যেন অদ্ভুত এক ছদ্ম-পরিবার। যখনই তারা একসাথ হয়, তাকাতসুকি তার স্বভাবসিদ্ধ বাকপটুতা দেখায়, আর সায়োকোর আচরণও একেবারে স্বাভাবিক—যেন কিছুই ঘটেনি। বরং জুনপেইর চোখে মনে হয় আগের চেয়েও সে যেন আরও স্বাভাবিক। সালা তো বুঝতই না যে তার বাবা-মায়ের বিয়ে ভেঙে গেছে।
জুনপেই কোনো আপত্তি ছাড়াই তাকে দেওয়া ভূমিকাটা নিখুঁতভাবে পালন করে। আগের মতোই তিনজন মজা-ঠাট্টা করে যায়, পুরোনো দিনের কথা বলে। এই সবকিছুর মধ্যে জুনপেই কেবল একটা বিষয়ই বুঝতে পারে যে এটা এমন কিছু দরকার, যা তাদের তিনজনেরই দরকারি।
‘এই যে, জুনপেই, একটা কথা বলি,’ জানুয়ারির এক রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাকাতসুকি বলে। ঠান্ডা বাতাসে তাদের নিশ্বাস সাদা হয়ে ওঠে। ‘তুমি কি কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবছ?’
‘এখন বিয়ে! না তো,’ জুনপেই বলে।
‘তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই?’
‘না, তাও তো নেই।’
‘তাহলে তুমি আর সায়োকো জুটি বেঁধে নাও না কেন?’
যেন খুব উজ্জ্বল কোনো কিছুর ওপর নজর পড়েছে জুনপেই এমনভাবে চোখ কুঁচকে তাকাতসুকির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘কেন?’
‘কেন’ মানে? কী বলতে চাও ‘কেন’? এটা তো একেবারেই স্পষ্ট! অন্তত অন্য কিছু না হলেও সালার বাবা হিসেবে আমি তোমাকেই দেখতে চাই।’
‘তুমি কি শুধু এই কারণেই মনে করো যে আমার সায়োকোকে বিয়ে করা উচিত?’
তাকাতসুকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং তার মোটা হাতটা জুনপেইর কাঁধের ওপর রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘কী ব্যাপার? সায়োকোকে বিয়ে করার ভাবনাটা কি তোমার ভালো লাগছে না? নাকি আমার পরে এসে সেই জায়গা নেওয়ার কথাটা ভাবতে অস্বস্তি হচ্ছে?’
‘ওটা সমস্যা নয়,’ জুনপেই বলে। ‘আমি শুধু ভাবছি এভাবে কি কোনো ধরনের বোঝাপড়া বা চুক্তি করা যায়? এটা আসলে ভদ্রতা বা শালীনতার ব্যাপার।’
‘এটা কোনো রকমের চুক্তি নয়,’ তাকাতসুকি বলে। ‘আর এর সঙ্গে শালীনতারও কোনো সংযোগ নেই। তুমি সায়োকোকে ভালোবাসো, তাই না? সালাকেও ভালোবাসো, তাই না? সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমি জানি তোমার নিজের কিছু অদ্ভুত সংকোচ বা জটিলতা আছে। ঠিক আছে, সেটা আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমার কাছে তো মনে হয় তুমি যেন প্যান্ট না খুলেই শর্টস খুলে ফেলতে চাইছ।’
জুনপেই কিছু বলে না, আর তাকাতসুকি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নীরব হয়ে থাকে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা স্টেশনের দিকে হেঁটে যায়। রাতের ঠান্ডা বাতাসে তাদের নিশ্বাস সাদা হয়ে ওঠে।
‘যা–ই হোক,’ জুনপেই বলে ‘তুমি একেবারে আস্ত একটা বোকা।’
‘এই কথাটা বলার জন্য তোমাকে কৃতিত্ব দিতেই হয়,’ তাকাতসুকি বলে। ‘তুমি একেবারে ঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছ। আমি অস্বীকার করছি না। আমি নিজের জীবনটাই নষ্ট করে ফেলছি। কিন্তু বলছি, জুনপেই, আমি কিছুই করতে পারিনি। এটাকে থামানোর কোনো উপায়ই নেই। কেন এটা ঘটতেই গেল, সেটা আমি তোমার মতোই বুঝতে পারি না। এর পক্ষে কোনো যুক্তিও দাঁড় করানো যায় না। এটা শুধু ঘটেছে। আর যদি এখন না ঘটত, তাহলে আগে বা পরে—কোনো একসময় ঠিকই ঘটে যেত।’
জুনপেইর মনে হয়, সে যেন এই কথাগুলো আগেও কোথাও শুনেছে।
‘সালার জন্মের রাতে তুমি আমাকে কী বলেছিলে, মনে আছে? তুমি বলেছিলে, সায়োকো পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ নারী, আর তার জায়গা নেওয়ার মতো কাউকে তুমি কখনোই খুঁজে পাবে না।”
‘এখনো সেটাই সত্যি। ওই ব্যাপারে কিছুই বদলায়নি। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই কখনো কখনো জিনিসগুলো খারাপ দিকেও গড়াতে পারে।’
‘তুমি কী বোঝাতে চাইছ, আমি বুঝতে পারছি না,’ জুনপেই বলে।
‘তুমি কোনো দিনই বুঝবে না,’ তাকাতসুকি মাথা নেড়ে শেষ কথা বলার মতো করে বলে।
তারপর দুই বছর কেটে যায়। সায়োকো আর কখনো শিক্ষকতায় ফিরে যায় না। জুনপেই তার এক সম্পাদক বন্ধুকে দিয়ে সায়োকোর জন্য একটা লেখা অনুবাদের কাজ পাঠায়, আর সে কাজটা বেশ দক্ষতার সঙ্গে করে ফেলে। তাতে ভাষার ওপর তার দারুণ দখল বোঝা যায়, আর সে ভালো লিখতেও পারে। আর সে কাজও করে দ্রুততার সঙ্গে। তা ছাড়া সে কাজের ব্যাপারে বেশ, সতর্কও। এতে সম্পাদক এতটাই মুগ্ধ হন যে পরের মাসেই তাকে আরেকটা লেখা অনুবাদ করতে দেন। যেটা উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়। তাতে অবশ্য সে খুব বেশি সম্মানী পায় না বটে তবে কিন্তু তাকাতসুকি যে টাকা পাঠায় তার সঙ্গে যোগ হয়ে সেটাতেই সায়োকো ও সালার জীবনযাপন স্বচ্ছন্দে চলে যায়।
তারা আগের মতোই অন্তত সপ্তাহে একবার দেখা করে। কখনো জরুরি কোনো কাজে তাকাতসুকি আসতে না পারলে, সায়োকো, জুনপেই আর সালা একসাথে খেয়ে নেয়। তাকাতসুকি না থাকলে টেবিলটা যেন কিছুটা নীরব হয়ে পড়ে, আর কথাবার্তা ঘুরে যায় অদ্ভুতভাবে সাধারণ সব বিষয়-আশয়ের দিকে। তখন কোনো অপরিচিত মানুষ দেখলে হয়তো ভাববে যে, তারা তিনজন মিলে একেবারে সাধারণ একটা পরিবার।
জুনপেই নিয়মমতো তার গল্প লেখা চালিয়ে যায়। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তার চতুর্থ গল্পসংকলন ‘সাইলেন্ট মুন’ বের হয়। বইটি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের জন্য নির্ধারিত একটা পুরস্কারও বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এমনকি বইয়ের নাম গল্পটা থেকে একটা সিনেমাও তৈরি হয়ে যায়।
তাকাতসুকি আত্মবিশ্বাসভরা হাসি দিয়ে নিজের কপালে টোকা মেরে বলেছে, ‘ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায়, ঠিক বন্ধুকে বেছে নেওয়ার একটা প্রতিভা আমার আছে।’ সে সেদিন ঠিকই বলেছে, রান্নাঘরের টেবিলে কফির মগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে জুনপেই ভাবে। তাকাতসুকির সত্যিই নিজের সঠিক বন্ধু বেছে নেওয়ার এক স্বাভাবিক দক্ষতা রয়েছে।
জুনপেই সংগীত সমালোচনার আরও কয়েকটা বই লেখে। সঙ্গে বের হয় শৌখিন বাগান সাজানোর ওপর একটা বই। এবং আবার মার্কিন লেখক জন আপডাইকের ছোটগল্পের একটা সংকলনও জাপানিতে অনুবাদ করে। এগুলোর সবই পাঠকদের কাছে ভালো সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়।
সে ধীরে ধীরে নিজের একটা স্বতন্ত্র লিখনশৈলী গড়ে তোলে—যার মাধ্যমে সে গভীর প্রতিধ্বনিময় শব্দের অনুভূতি এবং আলো-রঙের সূক্ষ্ম তারতম্যকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য গদ্যে রূপ দাঁড় করায়।
এভাবে একটু একটু করে একজন লেখক হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে করতে সে একদল স্থায়ী পাঠকও তৈরি করে ফেলে। ফলে তার আয়ও মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
জুনপেই তখন সায়োকোকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেবে কি না, তা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা শুরু করে। একাধিকবার সে চিন্তায় পুরো রাত জেগে কাটিয়ে দেয়। আবার এ ভাবনায় সে কখনো কখনো কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তবু সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যত বেশি ভারে, তত বেশি মনে হয় যে তার সায়োকোর সঙ্গে সম্পর্ক সব সময় অন্যরা নিয়ন্ত্রণ করে। তার অবস্থান সব সময়ই যেন প্যাসিভ।
কারণ, তাকাতসুকিই প্রথম জুনপেইকে তার ক্লাস থেকে বেছে নিয়ে দুজনকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। তারপর তিনজনের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তারপর তাকাতসুকি সায়োকোকে নিয়ে নেয়, তার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে যুক্ত হয়, এমনকি তারা একসঙ্গে সন্তানও নেয়। শেষে গিয়ে তারা বিয়েতে ইতি টানে। আর তাকাতসুকিই এখন আবার সায়োকোকে বিয়ে করার জন্য জুনপেইকে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছে।
তবে এটা নিশ্চিত, জুনপেই সায়োকোকে ভালোবাসে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এখনই তাদের একসঙ্গে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত সময়। সম্ভবত সে তাকে প্রত্যাখ্যান করতেও পারবে না। কিন্তু জুনপেইর মনে হয়, সবকিছু যেন একটু বেশিই নিখুঁত হয়ে যাচ্ছে। তার কি আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আছে? এভাবেই সে ভাবতে থাকে। ফলে তার কোনো স্থির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। ঠিক তখনই ভূমিকম্প ঘটে।
ভূমিকম্পের সময়ে জুনপেই বার্সেলোনায়, একটা এয়ারলাইন ম্যাগাজিনের জন্য গল্প লেখায় ব্যস্ত। সন্ধ্যায় সে হোটেলে ফিরে এসে দেখে টিভির খবরজুড়ে ভেসে উঠছে ধসে পড়া পুরো শহরের ব্লক, আর আকাশে ভেসে বেড়ানো কালো ধোঁয়ার মেঘের ছবি। দৃশ্যটা দেখে কোনো বিমান হামলার পরের অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ঘোষক স্প্যানিশ ভাষায় যা বলে তা বুঝতে জুনপেইর একটু সময় লাগে। তবে পর্দায় যে দৃশ্য দেখা যায়, সেটা যে জাপানের কোবে শহর তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। কয়েকটা পরিচিত জায়গা জুনপেই চোখে পড়ে। আশিয়া দিয়ে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়েটার ধসে পড়ার দৃশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়।
‘তুমি তো কোবের লোক, তাই না?, তার সঙ্গে থাকা ফটোগ্রাফার জিজ্ঞেস করে।
‘অবশ্যই আমি কোবের লোক,’ জুনপেই বলে। তবে সে তার বাবা-মাকে ফোন করার চেষ্টা করে না। তার ও তার মা–বাবার মধ্যে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা এতটাই গভীর ও এত দিন ধরে চলে আসছে যে এখন পুনর্মিলনের কোনো আশাই আর অবশিষ্ট নাই। সে তাই টোকিওতে ফিরে এসে আগের মতো স্বাভাবিক জীবন শুরু করে।
সে আর টেলিভিশন দেখে না, আর প্রায়ই কোনো খবরের কাগজও পড়ে না। কেউ যখনই ভূমিকম্পের কথা তোলে সে চুপ হয়ে যায়। এটা যেন তার অতীতের কোনো প্রতিধ্বনি, যেটাকে সে অনেক আগে থেকেই মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছে। তবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর থেকে সে আর কখনো সেই রাস্তাগুলোতে পা রাখেনি, তারপরও ধ্বংসস্তূপের সেই দৃশ্য তার ভেতরের কোথাও লুকিয়ে থাকা কাঁচা ক্ষতগুলো যেন উন্মুক্ত করে দেয়। ভয়াবহ রকমের সেই বিশাল বিপর্যয় যেন নীরবে, কিন্তু একেবারে ভেতর থেকে তার জীবনের কিছু দিক বদলে করে ফেলে। জুনপেই তাই নিজের মধ্যে একেবারে নতুন একধরনের নিঃসঙ্গতা অনুভব করে। তার মনে নয়া ভাবনা জায়গা পায় যে আমার কোনো শিকড় নেই। আমি কোনো কিছুর সঙ্গেই আর যুক্ত নই।
যেদিন তাদের সবাই মিলে সালাকে ভালুক দেখাতে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করা সে-ই রোববার সাতসকালেই তাকাতসুকি ফোন করে জানায় যে সে যেতে পারবে না। অনেক চেষ্টা-তদবির করার পর একান্ত সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য গভর্নর এক ঘণ্টার সময় দিয়েছে। তাই সে সাক্ষাৎকার নিতে তাকে ওকিনাওয়ায় উড়ে যেতে হবে। ‘সরি, কিন্তু তোমাদের আমাকে ছাড়া চিড়িয়াখানায় যেতে হবে। আমি না গেলে ভালুক মিয়া খুব একটা দুঃখ পাবে বলে তো মনে হয় না।’
তাই জুনপেই আর সায়োকো সালাকে নিয়ে ‘উয়েনো’ চিড়িয়াখানায় যায়। জুনপেই সালাকে কোলে তুলে ভালুকগুলো দেখায়। সে সবচেয়ে বড় আর ঘন কালো ভালুকটার দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করে ‘ওটা কি মাসাকিচি?’
‘না না, ওটা মাসাকিচি নয়,’ জুনপেই বলে। ‘মাসাকিচি ওটার চেয়ে ছোট, আর দেখতে আরও বুদ্ধিমান। ওটা হলো দারুণ দাপুটে লোক—টোনকিচি।’
‘টোনকিচি!’ সালা বারবার চিৎকার করে ডাকে। কিন্তু ভালুকটা কোনো দিকেই তাকায় না। তারপর সালা জুনপেইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘টোনকিচি সম্পর্কে একটা গল্প বলো তো।’
‘এটা কিন্তু কঠিন প্রশ্ন,’ জুনপেই বলে। ‘টোনকিচি সম্পর্কে তেমন কোনো মজার গল্প নেই। সে তো একেবারেই সাধারণ একটা ভালুক। মাসাকিচির মতো সে কথা বলতে বা টাকা গুনতেও পারে না।’
‘কিন্তু আমি বাজি ধরতে পারি, তুমি ওর সম্পর্কে অন্তত একটা ভালো কথা বলতে পারবে। সেটা বলো।’
‘তুমি একেবারে ঠিক বলেছ,’ জুনপেই বলে। ‘সবচেয়ে সাধারণ ভালুকের সম্পর্কেও অন্তত একটা ভালো কথা বলা যায়। ও হ্যাঁ, আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তাহলে, টোনচিকি—’
‘টোনচিক’ নয় ‘টোনকিচি!’ সালা একটু অধৈর্য ভঙ্গিতে নামটা ঠিক করে দেয়।
“আচ্ছা হ্যাঁ, সরি। তো, টোনকিচির একটা কাজ হলো যেটা সে ভীষণ ভালো পারে-সেটা হচ্ছে স্যামন মাছ ধরা। সে নদীর ধারে যায়, একটা বড় পাথরের আড়ালে বসে থাকে, আর-ঝট্!-একটা স্যামন মাছ ধরে ফেলে। এমন কাজ করতে হলে খুব দ্রুত হতে হয়। পাহাড়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ভালুক না হলেও, টোনকিচি অন্য সব ভালুকের চেয়ে বেশি স্যামন ধরতে পারে-তার নিজের খাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি। কিন্তু কথা বলতে না জানার কারণে সে বাড়তি স্যামন শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারে না।’
‘ওটা তো খুব সহজ,’ সালা বলে। ‘সে তার বাড়তি স্যামনগুলো মাসাকিচির বাড়তি মধুর সাথে বদল করে নিলেই তো হয়।’
‘তুমি ঠিক বলেছ,’ জুনপেই বলে। ‘আর টোনকিচিও সেটাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। তোমার আর তার ঠিক একই রকম মনের ভাব। তাই টোনকিচি আর মাসাকিচি স্যামন মাছের বদলে মধু বিনিময় করতে শুরু করে, আর কিছুদিনের মধ্যেই তারা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনে ফেলে। টোনকিচি বুঝতে পারে, মাসাকিচি আসলে তেমন অহংকারী ভালুক নয়। আর মাসাকিচিও বোঝে, টোনকিচি শুধু একটা দাপুটে ভালুকই নয়। এভাবে একে অপরকে বুঝতে বুঝতেই তারা সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে যায়।
তারা সবকিছু নিয়েই কথা বলে। নিজেদের অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। একজনে আরেকজনকে কৌতুকও শোনায়। টোনকিচি মন দিয়ে স্যামন মাছ ধরার কাজ করে, আর মাসাকিচি মন দিয়ে মধু জোগাড় করে আনে।
কিন্তু তারপর একদিন হঠাৎ—আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো—নদী থেকে স্যামন মাছগুলো উধাও হয়ে যায়।
‘আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো মানে?’
‘মানে পরিষ্কার নীল আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝিলিক দেখা দেওয়ার মতো,’ সায়োকো ব্যাখ্যা করে। ‘একেবারে হঠাৎ করে, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই।’
‘হঠাৎ করে সব স্যামন মাছ উধাও হয়ে যায়? কিন্তু কেন?’ সালা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে।
‘আসলে পৃথিবীর সব স্যামন মাছ একসঙ্গে জড়ো হয়ে ঠিক করে যে তারা আর ওই নদীতে সাঁতরাবে না। কারণ, সেখানে টোনকিচি নামে একটা ভালুক ওত পেতে আছে, আর সে স্যামন ধরতে ভীষণ পারদর্শী। তার পর থেকে টোনকিচি আর কখনো কোনো স্যামন ধরতে পারেনি। বেশি খুদা লাগলে সে মাঝেমধ্যে কোনো রোগা ব্যাঙ ধরে খেয়ে নেয়। কিন্তু এ ব্যাঙ পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে স্বাদের খাবারগুলোর একটা।’
‘হায়, বেচারা টোনকিচি!’ সালা বলে।
‘আর তাই কি তাকে চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়ছে?’ সায়োকো জিজ্ঞেস করে।
‘আচ্ছা, সে এক লম্বা কাহিনি,’ গলা খাঁকারি দিয়ে জুনপেই বলে। ‘তবে মোটামুটি বলতে গেলে, হ্যাঁ, এ কারণেই চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়।’
‘মাসাকিচি কি টোনকিচিকে সহায়তা করেনি?’ সালা জিজ্ঞেস করে।
‘অবশ্যই করেছে। তারা তো সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বন্ধুরা তো এমনই করে। মাসাকিচি তার মধু টোনকিচিকে একদম বিনা মূল্যে দিয়ে দিয়েছে! কিন্তু টোনকিচি বলেছে, ‘আমি তো পয়সা ছাড়া নিতে পারি না। নিলে তো মনে হবে আমি তোমার কাছ থেকে সুযোগ নিচ্ছি।’
মাসাকিচি বলছে, টোনকিচি, আমার সাথে পর মানুষের মতো আচরণ করার দরকার নেই। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, তুমিও নিশ্চয়ই আমার জন্য একই কাজ করতে। তাই না?’
‘অবশ্যই করত,’ সালা বলে।
‘কিন্তু তাদের মধ্যে এই অবস্থা বেশি দিন থাকে না,’ সায়োকো মাঝখান থেকে বলে।
‘হ্যাঁ, তাদের মধ্যে এই অবস্থা বেশি দিন থাকে না,’ জুনপেই সায় দেয়। ‘টোনকিচি একদিন মাসাকিচিকে বলে, ‘আমরা তো বন্ধু ঠিকই, তবে একজন বন্ধু সব সময় শুধু দেবে আর আরেকজন শুধু নেবে, এটা ঠিক নয়; এটা সত্যিকারের বন্ধুত্বও নয়। আমি এখন এই পাহাড় ছেড়ে চলে যাচ্ছি। অন্য কোথাও গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করে নেব। আর যদি কোনো দিন আবার আমাদের দেখা হয়, তাহলে আমরা আবার সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে উঠব।’
‘তারপর তারা হাত মেলায় এবং আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু টোনকিচি পাহাড় থেকে নেমে আসে ঠিকই তবে বাইরের পৃথিবীতে কীভাবে সাবধানে চলতে হয়, তা ভালো করে জানা না থাকায় এক শিকারি তাকে ফাঁদে ধরে ফেলে। সেখানেই টোনকিচির স্বাধীন জীবনের শেষ হয়। তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চিড়িয়াখানায়।’
‘হায়, বেচারা টোনকিচি,’ সালা বলে।
‘তুমি কি এ গল্পের এর চেয়ে ভালো কোনো সমাপ্তি ভাবতে পারো নাই? যেমন সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে?’ পরে সায়োকো জুনপেইকে জিজ্ঞেস করে।
‘এখনো তেমন কোনো সমাপ্তি ভাবতে পারিনি।’
তিনজন প্রতিদিনের মতো সেদিনও চিড়িয়াখানা থেকে ফিরে সায়োকোর অ্যাপার্টমেন্টে একসঙ্গে রাতের খাবার খায়। ‘ট্রাউট’ সুরটা গুনগুন করতে করতে সায়োকো এক হাঁড়ি পাস্তা রান্না করে এবং টমেটো সস মাখিয়ে নেয়, আর জুনপেই সবুজ শিম আর পেঁয়াজ দিয়ে সালাদ বানায়। তারা রেড ওয়াইনের একটা বোতল খোলে এবং সালাকে এক গ্লাস কমলার জুস ঢেলে দেয়।
খাওয়া আর গুছিয়ে নেওয়া শেষ হলে জুনপেই সালাকে আরেকটা ছবির বই পড়ে শোনায়। কিন্তু ঘুমানোর সময় হলে সে যেতে চায় না। বরং বলে, ‘প্লিজ, মাম্মি, ব্রা খুলে আবার পরার খেলাটা দেখাও।’
সায়োকো লজ্জা পেয়ে বলে ‘এখন না, এখন বাসায় গেস্ট আছে।’
‘কই, কেউ নেই। আর জুন তো গেস্ট না।’
এবার জুনপেই জিজ্ঞেস করে, ‘খেলাটা কী?’
‘এটা শুধু একটা বোকা বোকা খেলা,’ সায়োকো বলে।
‘মাম্মি কাপড়ের নিচে থেকেই ব্রা খুলে ফেলে, তারপর সেটা টেবিলের ওপর রাখে, আবার পরে নেয়। কিন্তু পুরো সময়টায় এক হাত টেবিলের ওপর রাখা থাকে। আর আমি সময় দেখি। মাম্মি কত দ্রুতই তা পারে। খেলাটা দারুণ!’ সালা বলে।
‘সালা!’ সায়োকো মাথা নাড়িয়ে ধমকের সুরে বলে, ‘এটা শুধু আমাদের ঘরের একটা ছোট্ট খেলা। অন্য কাউকে দেখানোর জন্য না।’
‘খেলাটা তো মজার বলে মনে হচ্ছে,’ জুনপেই বলে।
‘প্লিজ, মাম্মি, জুনকে দেখাও। শুধু একবার। তুমি খেলাটা দেখালে আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘুমাতে যাব।’
‘আহ, আর কীই–বা করার আছে,’ সায়োকো বিড়বিড় করে। সে নিজের ডিজিটাল ঘড়িটা খুলে সালার হাতে দেয়। ‘এবার কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার ব্যাপারে আর ঝামেলা করবে না, ঠিক আছে? আচ্ছা, আমি তিন গোনা শুরু করলে তুমি সময় ধরা শুরু করবে।’
সায়োকোর গায়ে একটা গোল গলার ঢিলেঢালা কালো সোয়েটার। সে দুই হাত টেবিলের ওপর রাখে এবং গোনা শুরু করে, ‘এক… দুই… তিন!’ তারপরেই কচ্ছপের খোলের ভেতর মাথা গুটিয়ে নেওয়ার মতো করে সে ডান হাতটা হাতার ভেতর দিয়ে টেনে নেয়। তারপর হালকা পিঠ চুলকানোর মতো তাকে একটু নড়াচড়া করতে দেখা যায়। ডান হাতটা আবার বেরিয়ে আসে, আর বাঁ হাতটা ঢুকে যায় হাতার ভেতর।
সায়োকো একটু মাথা ঘোরায়, শেষে তার বাঁ হাতে বেরিয়ে আসে ছোট একটা সাদা ব্রা। একটুও অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া না করে, হাত আর ব্রা–টা আবার হাতার ভেতরে চলে যায়, তারপর হাতটা আবার বেরিয়ে আসে। এরপর ডান হাতটা ভেতরে ঢুকে পেছনের দিকে একটু নাড়াচাড়া করে এবং আবার বেরিয়ে আসে।
‘শেষ।’ সায়োকো টেবিলের ওপর ডান হাতটা এনে বাঁ হাতের ওপর রাখে।
‘পঁচিশ সেকেন্ড,’ সালা বলে। ‘দারুণ হয়েছে, মাম্মি, নতুন রেকর্ড! এর আগে তোমার রেকর্ড ছিল ছত্রিশ সেকেন্ড।’
জুনপেই হাততালি দেয়, ‘অসাধারণ! যেন জাদু।’
সালাও হাততালি দেয়। সায়োকো উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে, “আচ্ছা, শো শেষ। এবার বিছানায় যাও, লিটল লেডি। তুমি কথা দিয়েছিলে।’
সালা জুনপেইয়ের গালে চুমু খেয়ে ঘুমাতে চলে যায়। আর ঘুমিয়ে না পড়া অবধি তার কাছে সায়োকো থাকে। শেষে যখন সালার শ্বাসপ্রশ্বাস গভীর ও স্থির হয়, তারপর সায়োকো ফিরে এসে সোফায় জুনপেইয়ের পাশে আবার বসে বলে, ‘আমার একটা স্বীকারোক্তি আছে। আমি ফাঁকি দিয়েছি।’
‘ফাঁকি?’
‘আমি ব্রা–টা আবার পরিনি। শুধু পরার ভান করেছি। সোয়েটারের নিচ থেকে সেটা বের করে মেঝেতে ফেলে দিয়েছি।’
জুনপেই হেসে ওঠে, ‘কী ভয়ানক মা তুমি!’
সায়োকো চোখ সরু করে হেসে বলে, ‘আমি একটা নতুন রেকর্ড করতে চেয়েছি।’ অনেক দিন পর জুনপেই তাকে এত সহজ, স্বাভাবিকভাবে হাসতে দেখে।
তার ভেতরে সময় যেন নিজের কোটরে টলমল করে ওঠে, যেন হাওয়ায় পর্দা দোলে। সে হাত বাড়িয়ে সায়োকোর কাঁধ ছোঁয়, আর সায়োকো তার হাত ধরে ফেলে। তারা সোফার ওপর এক শক্ত আলিঙ্গনে মিলিত হয়। একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে এবং চুমু খায়। যেন উনিশ বছর বয়সের পর থেকে এত দিনেও কিছুই বদলায়নি। সায়োকোর ঠোঁটে এখনো সেই একই মিষ্টি সুবাস লাগানো।
‘শুরু থেকেই আমাদের এমন হওয়া উচিত ছিল,’সোফা থেকে তার বিছানায় যাওয়ার পর সায়োকো ফিসফিস করে বলে। ‘কিন্তু তুমি সেটা বুঝতে পারনি। একেবারেই বুঝতে পারনি। নদী থেকে স্যামন মাছগুলো হারিয়ে যাওয়া পর্যন্তও না।’
তারা কাপড় খুলে একে অপরকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। তাদের হাতের স্পর্শ কিছুটা অপ্রস্তুত, যেন জীবনে প্রথমবারের মতো তারা এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। তারা ধীরে ধীরে সময় নেয়। যখন নিজেদের প্রস্তুত মনে হয় অবশেষে তখন তারা একে অপরের আরও কাছাকাছি হয়ে যায়।
এসবের কিছুই জুনপেইয়ের কাছে বাস্তব বলে মনে হয় না। আধো আলোয় তার মনে হয়, যেন সে একটা নির্জন সেতু পার হচ্ছে, যে সেতুর শেষ নেই। সে নড়ে, আর সায়োকোও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নড়ে। বারবার তার মনে হয় এখনই চূড়ান্ত আবেগে পৌঁছে যাবে, কিন্তু সে নিজেকে থামিয়ে রাখে—ভয় হয়, একবার তা হয়ে গেলে স্বপ্নটা ভেঙে পড়বে, আর সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
তারপর হঠাৎ জুনপেই তার পেছনে হালকা কড়মড় শব্দ শুনতে পায়। শোবার ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়। করিডরের আলো দরজার আকৃতি ধরে এলোমেলো বিছানার চাদরের ওপর এসে পড়ে। জুনপেই উঠে ফিরে তাকিয়ে দেখে, আলোয়ের বিপরীতে সালা দাঁড়িয়ে।
সায়োকো নিশ্বাস আটকে ফেলে এবং একটু সরে যায়। চাদর টেনে বুক ঢেকে সে এক হাতে চুল ঠিক করে।
সালা কাঁদে না, চিৎকারও জুড়ে দেয় না। ডান হাতে দরজার হাতল চেপে ধরে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। সে তাদের দুজনের দিকেই তাকায়, কিন্তু যেন কিছুই দেখে না—তার চোখ শূন্যতার দিকে স্থির হয়ে যায়।
তার নাম ধরে সায়োকো ডাকে।
‘লোকটা আমাকে এখানে আসতে বলেছে,’ কাউকে ঘুম থেকে তোলার পর সে যেমন সমতল, আবেগহীন কণ্ঠে বলে সালা তেমনিভাবে বলে যায়।
‘লোকটা কে?’ সায়োকো জিজ্ঞেস করে।
‘ভূমিকম্পের লোকটা। সে এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলেছে। সে বলেছে তোমাকে এটা বলতে। সে বলেছে, সবার জন্য বাক্সটা রেডি করে রেখেছে। ঢাকনা খুলে সে অপেক্ষা করছে। সে বলেছে, আমি যেন তোমাকে এটা বলি, তাহলেই তুমি বুঝে যাবে।’
সে রাতে সালা সায়োকোর বিছানাতেই ঘুমায়। জুনপেই একটা কম্বল নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে পড়ে, কিন্তু তার ঘুমে আসে না। টিভিটা সোফার দিকেই ফেরানো, আর সে অনেকক্ষণ ধরে দরজার পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘ওরা’ সে ঘরের ভেতর। খোলা বাক্স নিয়ে অপেক্ষা করছে। তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যায়, আর সময় এগিয়ে গেলেও সে অনুভূতি কাটে না। শেষ পর্যন্ত ঘুমানোর চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে জুনপেই রান্নাঘরে যায়। নিজের জন্য কফি বানিয়ে টেবিলে বসে খেতে থাকে। কিন্তু তার পায়ের কাছে গোটানো কিছু একটা অনুভব হয়। তুলে দেখে সেটা সায়োকোর ব্রা।
সে সেটা একটা চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে দেয়। সাধারণ, প্রাণহীন সাদা অন্তর্বাস, তবে খুব বড়ও নয়। ভোরের আগের অন্ধকারে রান্নাঘরের চেয়ারের ওপর সেটা এমনভাবে ঝুলে থাকে যেন তা বহু আগের কোনো সময় থেকে হেঁটে আসা নামহীন এক নীরব সাক্ষী।
সে কলেজজীবনের শুরুর দিনের কথা ভাবে। এখনো তার কানে ভাসে ক্লাসে প্রথম দেখা হওয়ার সময় তাকাতসুকির স্বভাবসুলভ উষ্ণ ভঙ্গিতে বলা সেই কথা, ‘এই, চলো কিছু খেয়ে আসি।’ আর জুনপেই যেন এখনো দেখতে পায় তাকাতসুকির সেই বন্ধুসুলভ হাসি, আর শুনতে পায় তার স্বর, ‘আরে, আরাম করো। পৃথিবী তো শুধু আরও ভালো আর ভালোই হতে থাকবে।’
সেদিন তারা কোথায় খেতে গিয়েছিল? জুনপেই ভাবে। আর কী খেয়েছিল? সে মনে করতে পারে না, যদিও সে নিশ্চিত যে খুব বিশেষ তারা খায়নি।
‘তোমার সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে যাওয়ার জন্য তুমি আমাকেই কেন বেছে নিলে?’ মনে আছে সেদিন জুনপেই তাকে জিজ্ঞেস করেছে।
তাকাতসুকি আত্মবিশ্বাসভরা হাসি দিয়ে নিজের কপালে টোকা মেরে বলেছে, ‘ঠিক সময়ে, ঠিক জায়গায়, ঠিক বন্ধুকে বেছে নেওয়ার একটা প্রতিভা আমার আছে।’
সে সেদিন ঠিকই বলেছে, রান্নাঘরের টেবিলে কফির মগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে জুনপেই ভাবে। তাকাতসুকির সত্যিই নিজের সঠিক বন্ধু বেছে নেওয়ার এক স্বাভাবিক দক্ষতা রয়েছে।
কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় ভালোবাসার জন্য একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া আর বন্ধু বেছে নেওয়া—এই দুই বিষয় একেবারেই আলাদা। জুনপেই চোখ বন্ধ করে তার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের কথা মনে করে। সে চায় না এটাকে এমন কিছু হিসেবে ভাবতে, যা সে শুধু অর্থহীনভাবে শেষ করে ফেলেছে।
সকালবেলা সায়োকো যখন ঘুম থেকে উঠবে, সে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। এখন সে নিশ্চিত। আর এক মিনিটও নষ্ট করা যাবে না।
কোনো শব্দ না করার সতর্কতা নিয়ে সে শোবার ঘরের দরজা খুলে দেখে, সায়োকো আর সালা কমফোর্টারের ভেতর ঘুমাচ্ছে। সালা সায়োকোর দিকে পিঠ দিয়ে শোয়া, আর সায়োকোর এক হাত সালার কাঁধের ওপর রাখা।
জুনপেই ভাবে: আমি এমন গল্প লিখতে চাই, যা আমি এত দিন যা লিখেছি তার থেকে আলাদা। আমি এমন মানুষদের নিয়ে লিখতে চাই, যারা স্বপ্ন দেখে এবং রাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করে, যারা আলোর জন্য আকুল হয়ে থাকে, যাতে তারা যাদের ভালোবাসে তাদের জড়িয়ে ধরতে পারে।
জুনপেই বালিশের ওপর ছড়িয়ে পড়া সায়োকোর চুলে হাত দেয়। আর আঙুলের ডগা দিয়ে সালার ছোট্ট গোলাপি গালটা আলতো করে ছোঁয়। তারা কেউই নড়ে না। সে বিছানার পাশে কার্পেটের ওপর নেমে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে, আর তাদের ঘুমের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তাদের পাহারা দিচ্ছে।
দেয়ালের ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ স্থির রেখে জুনপেই সালার জন্য বাকি গল্পটা নিয়ে ভাবে, মাসাকিচি আর টোনকিচির কাহিনি। তাকে একটা উপায় বের করতেই হবে। সে টোনকিচিকে চিড়িয়াখানায় একা ফেলে রাখতে পারে না। তাকে উদ্ধার করতেই হবে।
সে শুরু থেকে আবার গল্পটা মনে করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মাথায় একধরনের অস্পষ্ট ধারণার রূপরেখা জন্ম নিতে শুরু করে, আর ধীরে ধীরে সেটা স্পষ্ট আকার পেতে থাকে।
টোনকিচিরও সালার মতোই একই ভাবনা হলো: সে মাসাকিচির সংগ্রহ করা মধু দিয়ে মধুর কেক বানাবে। খুব বেশি সময় লাগল না তার বুঝতে, মজাদার ও কুড়মুড়ে মধুর কেক বানানোর ব্যাপারে তার সত্যিই প্রতিভা আছে।
মাসাকিচি সেই মধুর কেকগুলো শহরে নিয়ে গিয়ে লোকদের কাছে বিক্রি করে। মানুষ টোনকিচির বানানো কেক এতটাই পছন্দ করে যে তারা একের পর এক ডজন করে কিনতে থাকে।
ফলে টোনকিচি আর মাসাকিচিকে আর কখনো আলাদা হতে হয় না। তারা পাহাড়ে চিরদিনের সেরা বন্ধু হয়ে সুখে–শান্তিতে বসবাস করে যায়।
সালা গল্পের এই নতুন সমাপ্তিটা নিশ্চয়ই খুব পছন্দ করবে। আর সায়োকোও।
জুনপেই ভাবে: আমি এমন গল্প লিখতে চাই, যা আমি এত দিন যা লিখেছি তার থেকে আলাদা। আমি এমন মানুষদের নিয়ে লিখতে চাই, যারা স্বপ্ন দেখে এবং রাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করে, যারা আলোর জন্য আকুল হয়ে থাকে, যাতে তারা যাদের ভালোবাসে তাদের জড়িয়ে ধরতে পারে।
কিন্তু এখন আমাকে এখানে থাকতে হবে এবং এই নারী আর এই মেয়েটাকে পাহারা দিতে হবে। আমি কখনোই কাউকে-কাউকে না-এদেরকে সেই পাগলাটে বাক্সের ভেতর ঢোকাতে দেব না—আকাশ ভেঙে পড়লেও বা পৃথিবী গর্জন করে ফেটে গেলেও না।