নিমা ইউশিজের ছবি: সংগৃহীত। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
নিমা ইউশিজের ছবি: সংগৃহীত। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ইরানের কবিতা

ছোট চুলো শীতল ছাই নিয়ে স্থিত

নিমা ইউশিজ (১৮৯৫-১৯৬০) ইরানের কবি, যিনি সে দেশে আধুনিকতার জনক। পুরোনো ধারা ভেঙে তিনি মুক্তছন্দ, নতুন চিত্রকল্প ও সামাজিক বিষয়ের অবতারণা করেন। নিমা প্রথাগত ফারসি কবিতার কঠোর কাঠামোকে ভেঙে কবিতার আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু—উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন। শুরুতে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও তাঁর ‘শের-ই–নিমায়ি’ (নিমায়ি কবিতা) আধুনিক ইরানি সাহিত্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এটি সোহরাব সেপেহরি ও ফোরুগ ফাররোখজাদের মতো বিখ্যাত কবিদের অনুপ্রাণিত করেছে।

ভাষান্তর: আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী

ওহে তোমরা শুনছ

ওহে তোমরা শুনছ
তোমরা যারা তীরে বসে আছ, হাসছ—
জলে ডুবে কেউ একজন মারা যাচ্ছে,
কেউ একজন যে এই ক্রুদ্ধ, কালো সাগরের
সাথে বাঁচার জন্য লড়ছে—
যখন তোমরা শত্রুকে পরাজিত করার
নেশায় রয়েছ বুঁদ,
যখন তোমরা বৃথাই ভাবছ
তোমরা দুর্বলের দিকে বাড়িয়েছ হাত;
আমি কখন তোমাদের জানাব যে বৃথাই
একজন জলে নিজের জীবন উৎসর্গ করছে?

ওহে তোমরা শুনছ
তোমরা যারা নিশ্চিন্তে তীরে বসে আছ,
তোমাদের টেবিলে খাবার, পরনে দামি পোশাক—
কেউ একজন জল থেকে তোমাদের ডাকছে,
ক্লান্ত হাতে সে ঢেউয়ের সাথে লড়ছে,
তার মুখ হাঁ হয়ে আছে, চোখ বিস্ফারিত,
দূর থেকে সে তোমাদের ছায়া দেখতে পেয়েছে,
ঢোক গিলে জল খাচ্ছে,
প্রতিমুহূর্তে তার অধীরতা বাড়ছে,
জল থেকে কখনো সে তার পা দেখাচ্ছে, কখনো মাথা।
ওহে তোমরা শুনছ,
দূর থেকে সে এখনো পুরোনো পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে,
সাহায্যের জন্য সে চিৎকার করছে।
ওহে তোমরা শুনছ
তোমরা যারা তীর থেকে শান্তভাবে দেখছ—
ঢেউ শান্ত তীরে আছড়ে পড়ছে,
মাতালের মতো সংজ্ঞাহীন শুয়ে পড়ে,
আবার ফিরে যায় গর্জন করে;
ওহে তোমরা কি
তার ডাক শুনতে পাচ্ছ?

এবং বাতাসের গর্জন
এখন আরও বেশি হৃদয়বিদারক;
তার কণ্ঠ বাতাসের চেয়ে ক্ষীণ,
তবে কাছ থেকে, দূর থেকে
তার কণ্ঠ শোনা যায়,
ওহে তোমরা শুনছ।

নদীর ধার ঘেঁষে

নদীর তীর ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায় বুড়ো কচ্ছপ,
আজ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন,
মনোরম ধানখেতের দৃশ্য।

বুড়ো কচ্ছপ রোদের উষ্ণ কোলে আশ্রয় নেয়,
আয়াসে ঘুমার নদীর ধারে।

নদীর ধারে শুধু আমি
বাসনার যাতনায় ক্লান্ত,
অপেক্ষমাণ সূর্যের জন্য;
কিন্তু আমার দৃষ্টি
মুহূর্তের জন্য তাকে দেখতে পায় না।

আমার সূর্য আমার কাছ থেকে
দূরবর্তী জলে মুখ লুকিয়েছে,
চারপাশের সবকিছু আমার কাছে স্বচ্ছ,
আমার স্থিরতায়, আমার চলমানতায়।
শুধু আমার সূর্য স্বচ্ছ নয়
নদীর ঘার ঘেঁষে।

একটি ছোট চুলো

দূরবর্তী রাতের কাছ থেকে রক্ষা পেয়ে
অরণ্যের দিকে একটি নীরব পথে স্থাপিত
পাথরের তৈরি একটি ছোট চুলো
শীতল ছাই নিয়ে স্থিত হয়ে আছে।

ধুলোর গভীরে মেশানো আমার বিষণ্ন ভাবনা
সবকিছুর ছবি এঁকে নেয়,
এবং একটি গল্প যার পরিণতি শুধু বেদনা।

আমার মনের মতো একটি মিষ্টি দিন
সংগতিহীন চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে,
শীতল পাথর হয়ে পড়েছে,
আমার জীবন থেকে উৎসারিত নিশ্বাস
বসন্তের মুখ হরিদ্রাভ করেছে।