
• তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান
শার্ল বোদলেয়র রচিত ‘সুরুয়া আর মেউলা’ (লা সুপ এ লে নুয়াজ) কবিতাটি প্রথম ছাপা হইয়াছিল ১৮৬৯ সনে, কবির এন্তেকালের পর প্রকাশিত ‘পারির বিষাদ: গদ্যে লেখা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা’ (লো স্প্লিন দো পারি: পতি পোয়েম অঁ প্রোজ) নাম্নী সংকলিত গ্রন্থে। এই কবিতাটি ১৮৬৫ সালে ‘রেভ্যু নাসিওনাল এ এত্রঁজের’ (দেশি ও বিদেশি পর্যালোচনা) নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা ছাপাইতে অস্বীকার করিয়াছিল।
বীর তিরন্দাজ (লো গালঁ তিরর) কবিতাটির প্রথম প্রকাশও ১৮৬৯ সালের ‘পারির বিষাদ’ সংকলনযোগে। এইটাও ‘রেভ্যু নাসিওনাল এ এত্রঁজের’ পত্রিকা ১৮৬৫ সালে ছাপাইতে অস্বীকার করিয়াছিল।
— অনুবাদক
আমার প্রিয়তমা বিড়ালিনী আমাকে সান্ধ্যভোজ পরিবেশন করিয়াছেন, আর খোদ আল্লাহতায়ালা বাষ্পমণ্ডল দিয়া চলন্ত স্থাপত্যকলার, অধরা-মাধুরীর, যে অনবদ্য রূপ গড়িয়াছেন ভোজনকক্ষের খোলা জানালা দিয়া তাহা দেখিতে দেখিতে আমি কী যেন ভাবিতেছিলাম। মনে মনে বলিতেছিলাম: ‘সৌন্দর্যে-সৌকর্যে এই আকাশকুসুম আমার পরমাসুন্দরী প্রিয়তমার, আমার দানবীপ্রতিমা হরিতনয়না খুদে বিড়ালিনীর চক্ষুযুগলের সমতুল্য বৈ নয়।’
এহেন ভাবিতেই অকস্মাৎ চমকাইয়া উঠিলাম: ঠাহর করিলাম পৃষ্ঠদেশে আমার ভয়াবহ একটা কিল পড়িয়াছে। খসখসে, কামাতুর, উদ্বায়ু, আর কারণবারিসিঞ্চিত একটি কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম, কণ্ঠস্বরটা আমার মধুময়ী খুদে প্রিয়তমার। সে বলিতেছে: ‘তুমি কি আদপেই এই সুরুয়াটুক গিলিবে, নাকি গিলিবে না, কু (ত্তার)... বা (চ্চা)..., মেউলা-কারবারির ছাওয়ালটা?’
গাড়ি যখন বনভূমি পার হইতেছিল তখন একটি চাঁদমারির পাশে তিনি গাড়ি থামাইতে আদেশ করিলেন। বলিলেন, মনে হইতেছে সময় খুন করিবার মতলব থাকে তো কয়টা গুলি খরচ করিলেই হয়। আর ঐ দানব খুন করাই তো সাধারণের হিসাবে চরম স্বাভাবিক, পরম বিধিসম্মত কাজ! এই বলিয়াই তিনি আপনার প্রিয়তমা, অধরা মাধুরী, অসহনীয়া স্ত্রীরত্নের দিকে আপনার বীরপুরুষ হাতটি বাড়াইয়া দিলেন। এই বোধাতীত নারীরত্নের কাছে তিনি আপনকার যাবজ্জীবনব্যাপী আতত সুখের ঋণে, দুঃখের ঋণে, হয়তোবা আপন প্রতিভার বড় একটা হিস্সার ঋণেও ঋণী।
কয়েকটা গুলি উদ্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াইয়া বেশ খানিকটা দূরে আছড়াইয়া পড়িল; একটা এমনকি ছাদে গিয়াও বিঁধিল। স্বামীপুরুষ লক্ষ্যভেদে এহেন অক্ষম প্রমাণিত হওয়ায় মনোহর প্রাণীটি তো হাসিয়া কুটিকুটি। তাহার দিকে মুখ ঘুরাইয়া স্বামীজী আচমকা বলিয়া উঠিলেন: ‘ঐ তো, ঐ ডানের পুতুলটা, ঐ যে বাতাস বরাবর নাক-সিটকান আর অল্পবিস্তর উদ্ধত স্বভাবের পুতুলটা দেখিতেছ? আচ্ছা, প্রিয়তমা আমার—ধরিয়া লইলাম ঐটাই তুমি!’ দুই চোখ বন্ধ করিয়া তিনি ঘোড়া টিপিলে পুতুলের মাথা আচ্ছামত উড়িয়া গেল।
তাই তিনি আপনকার প্রিয়তমা, মিষ্টভাষ, অসহ্য স্ত্রীরত্নের—আপনকার অনিবার্য আর অনমনীয় কলাদেবীর—উদ্দেশ্যে মাথা নত করিয়া, শ্রদ্ধাভরে হস্তচুম্বন করিয়া উচ্চারণ করিলেন: ‘আহা! প্রিয়তমা পরিমণি আমার, এই অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে সাহায্য করিলে তুমি! তোমাকে ধন্যবাদ জানাই এমন ভাষা কোথায় গেলে পাই!’