
২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক সুধাকর চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অমর্ত্য সেনের দেওয়া ‘সুধাকর চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা’। বক্তৃতাটি ২০১৪ সালে কার্নেগি কাউন্সিল ফর এথিকস ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স থেকে প্রকাশিত জার্নাল এথিকস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর ২৮ নম্বর সংখ্যায় (পৃষ্ঠা ১৫-২৭) প্রকাশিত হয়। ঢাকার লার্নিং ডিজাইন স্টুডিওর সৌজন্যে পাওয়া বক্তৃতাটি গুরুত্ব বিচেনায় বাংলা অনুবাদ করেছেন নূরুননবী শান্ত।
আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ যে চিন্তা করেছেন, তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে এ বক্তৃতায় বুদ্ধের যুক্তি, মানবিকতা ও বিশ্বজনীনতা ব্যাখ্যা করেছেন অমর্ত্য সেন। তাঁর মতে, নৈতিকতা, সুশাসন ও মানব উন্নয়নে বুদ্ধের ধারণা আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে।
আজ প্রকাশিত হলো বক্তৃতাটির দ্বিতীয় পর্ব।
দ্বিতীয় পর্ব
এবার সুশাসন প্রসঙ্গে আসি।
গৌতম বুদ্ধ রাজকুমার হিসেবে জন্মেছিলেন, কিন্তু তিনি রাজ্য শাসনে আগ্রহী হননি। তবে তাঁর চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত বহু রাজা ও সম্রাট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্রাট অশোক, যিনি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ভারতের বৃহৎ অংশ শাসন করেছিলেন। অশোকের চিন্তাধারার কিছু বিশেষ দিক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও স্বাধীনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রচেষ্টা। অশোকের এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্র ও ব্যক্তির পারস্পরিক ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধি থেকে। অশোক যে কল্যাণমূলক সেবা ও ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, তা ভারতের সমাজজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং বিদেশি পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। যেমন তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে ভারতে আসা চীনা ভিক্ষু ও পণ্ডিত ফাসিয়নের কথা বলা যেতে পারে। অশোকের শাসনকালের (খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী) কয়েক শতক পরেও, ফাসিয়ন ভারতে অশোক-প্রবর্তিত সামাজিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করেন। বিশেষত, তিনি পাটলিপুত্র নগরের মানসম্মত ও মানবিক হাসপাতালের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সর্বসাধারণ বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পেত। আজকের পটভূমিতে বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভারত উপমহাদেশে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয়নি, এমনকি বিশ্বের অন্যতম ধনী অর্থনীতির যুক্তরাষ্ট্রেও (অন্তত সাম্প্রতিক অতীত পর্যন্ত) এই ঘাটতি বিদ্যমান। ফলে অশোকের শাসননীতি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।
সম্রাট অশোকের বিশাল সাম্রাজ্য শাসনব্যবস্থায় এমন কিছু সংযম লক্ষ করা যায়, যেখানে গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত মূল্যবোধের প্রতিফলন রয়েছে। অশোক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, সামাজিক লক্ষ্যগুলো অনেকাংশে নাগরিকদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদাচরণের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব, তার জন্য বলপ্রয়োগ বা চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তবিক অর্থেই মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সদাচরণ গড়ে তুলতে অশোক তাঁর জীবনের বেশির ভাগই ব্যয় করেছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যজুড়ে স্থাপিত শিলালিপিগুলো এর সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সম্রাট অশোকের মানবিক আচরণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান উপদেষ্টা এবং খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র রচয়িতা, কৌটিল্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক গুণাবলি বিকাশের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সেগুলোর কার্যকারিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানই কৌটিল্যের রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি। তিনি মনে করতেন, পুরস্কার, বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা এবং শাস্তি ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভালো কাজ করার সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখা হয়নি। মানব স্বভাবকে কৌটিল্য স্বার্থপর ও দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আজকের অনেক অর্থনীতিবিদও তাঁকে অনুসরণ করেন। তবে তা অশোকের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অশোকের বিশ্বাস ছিল, চিন্তাশীলতা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করা এবং ভুল চিন্তাজনিত খারাপ আচরণের ক্ষতিকর ফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের আচরণ উন্নত করা সম্ভব।
গৌতম বুদ্ধ ‘সুত্ত নিপাত’-এ অত্যন্ত জোরালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন। এই গ্রন্থে বুদ্ধ যুক্তি দেন, মানুষ হিসেবে আমরা অন্যান্য জীবের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাশালী এবং ক্ষমতার এই অসমতার কারণেই তাদের প্রতি আমাদের বৃহত্তর দায়িত্ব রয়েছে।
তবে সম্রাট অশোক আচরণগত সংস্কারের মাধ্যমে কী অর্জন করা সম্ভব, তা কিছুটা অতিমূল্যায়ন করেছিলেন। তিনি প্রথম দিকে ছিলেন কঠোর ও দৃঢ়চেতা শাসক। কিন্তু কলিঙ্গের (বর্তমান ওডিশা অঞ্চল) বিরুদ্ধে বিজয়যুদ্ধের সময় যে নির্মমতা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে, এবং তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায়। তিনি গৌতম বুদ্ধের অহিংস নীতি গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে সেনাবাহিনী ভেঙে দেন। দাস ও চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এক কঠোর সম্রাটের পরিবর্তে নৈতিক শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অশোকের মৃত্যুর কিছুকালের মধ্যেই তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। কিছু প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায় যে তাঁর জীবদ্দশায় এমনটা না ঘটার আংশিক কারণ হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা। তবে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও ছিল। ব্রুস রিচ উল্লেখ করেছেন, অশোক তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া কৌটিল্য-প্রবর্তিত শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেননি। যদিও তাঁর বিশ্বাস ক্রমে সেদিকেই অগ্রসর হয়েছিল যে সৎ চিন্তা থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ আচরণ জন্ম নেয় এবং তা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োগ ছাড়াই।
আমি বলছি না যে আধুনিক বিশ্ব আইন প্রয়োগ ছাড়াই চলতে পারে, বরং বলতে চাই, আজকের বাস্তবতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে মূল্যবোধভিত্তিক ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। আজকের দিনে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন—যেমন পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন গড়ে তোলা থেকে শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। তবে এসব ক্ষেত্রে সামাজিক শিক্ষা ও উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও নৈতিক আচরণ গড়ে তোলা এবং নৈতিকতার প্রভাব সম্পর্কে অশোকের ইতিবাচক ধারণা সম্পূর্ণ যৌক্তিক ছিল না, তবে সামাজিক নৈতিকতার মাধ্যমে শুভফল অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে কৌটিল্যের অতিরিক্ত সংশয়ও কি যথার্থ ছিল? আমি মনে করি, অশোক ও কৌটিল্য উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গিই এককভাবে অসম্পূর্ণ ছিল, তবে সমাজে ন্যায়প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে চিন্তা করতে গেলে, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিকেই আমাদের গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।
আমার আলোচনার তৃতীয় বিষয় রাজনৈতিক ও নৈতিক অগ্রাধিকার, যা আমাদের পরের জন্য কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করে। এখানে একটি চমকপ্রদ বৈপরীত্য রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে টমাস হবস ‘সামাজিক চুক্তি’ ধারণার সূচনা করেন। পরবর্তীকালে জ্যঁ-জাক রুশো, ইমানুয়েল কান্ট এবং আমাদের সময়ের জন রলসের মতো চিন্তাবিদেরা এই ধারণা বিকশিত করেন। ‘সামাজিক চুক্তি’ ভিত্তিক আধুনিক নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনে সাধারণত পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক সহায়তা ও সহযোগিতার কথা বলা হয়। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিকতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে বললে (এবং কিছুটা সরলীকরণের ঝুঁকি নিয়ে), যেহেতু আমরা পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে প্রত্যেকে উপকৃত হই, তাই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেকেরই সেই সহযোগিতায় অংশ নেওয়া উচিত।
তবে সামাজিক দায়বদ্ধতা বিষয়ে এটিই একমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি নয়। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিটি পারস্পরিকতার সঙ্গে নয়, বরং ক্ষমতার অধিকার বা অবস্থানের (যা একতরফাও হতে পারে) সঙ্গে সম্পর্কিত। গৌতম বুদ্ধ ‘সুত্ত নিপাত’-এ অত্যন্ত জোরালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন। এই গ্রন্থে বুদ্ধ যুক্তি দেন, মানুষ হিসেবে আমরা অন্যান্য জীবের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাশালী এবং ক্ষমতার এই অসমতার কারণেই তাদের প্রতি আমাদের বৃহত্তর দায়িত্ব রয়েছে।
যেমন খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার এবং অবশ্যই সব ধর্মের বিস্তারের মধ্যেই সর্বজনীনতা রয়েছে, যা অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়। তবে বৌদ্ধধর্মকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায় তার বৌদ্ধিক সংযোগ বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে, যা মূলত বুদ্ধের সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত—যেখানে আলোকপ্রাপ্তি মানব বিকাশের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান।
বুদ্ধ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করতে মা-সন্তান সম্পর্কের উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, সন্তানের প্রতি মায়ের দায়বদ্ধতা এই কারণে নয় যে তিনি সন্তানকে জন্ম দিয়েছেন, বরং এ কারণে যে মা এমন অনেক কিছু করতে পারেন, যা সন্তানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, অথচ সন্তান নিজে তা করতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সন্তানের প্রতি মায়ের সহায়তা কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা বা কোনো সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত নয়। মা উপলব্ধি করেন যে তিনি একতরফাভাবে এমন কিছু করতে পারেন, যা সন্তানের জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনতে সক্ষম, অথচ সন্তান নিজে তা করতে অক্ষম। নিজের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব বোঝার জন্য মায়ের কোনো বাস্তব বা কল্পিত পারস্পরিক উপকারের প্রয়োজন হয় না, কিংবা কোনো ‘যেন-যদি’ ধরনের চুক্তিরও দরকার পড়ে না। এই একতরফা দায়বদ্ধতার সঙ্গে সমসাময়িক নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনে বহুল আলোচিত পারস্পরিক উপকারভিত্তিক চুক্তিনির্ভর দায়বদ্ধতার স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে: ১. যদি কোনো কাজ কোনো ব্যক্তির পক্ষে স্বাধীনভাবে করা সম্ভব হয় (অর্থাৎ তা বাস্তবায়নযোগ্য হয়), এবং ২. যদি সেই ব্যক্তি মনে করেন যে ওই কাজটি বাস্তবায়ন করলে বিশ্বে অধিক ন্যায়সংগত প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হবে, তাহলে এই যুক্তির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি কী করা উচিত, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারেন। এখানে মূল বিষয়টি হলো যুক্তিসংগত আচরণ অনুসরণের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির অস্তিত্ব, যার সব কটিই পারস্পরিক উপকারভিত্তিক সহযোগিতার চূড়ান্ত সুবিধাবাদি যুক্তি নয়। আমার গ্রন্থ দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস-এ আমি যেমন যুক্তি দিয়েছি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না যদি না সেখানে ক্ষমতার দায়বদ্ধতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার দায়বদ্ধতা বুদ্ধের চিন্তাধারার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সম্পর্কিত।
পরিশেষে মানুষের প্রতি একটি সম্প্রদায়নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একত্র করতে বৌদ্ধধর্মের অবদান বিষয়ে কথা বলব। বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে দূরবর্তী নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন পথে—সমুদ্রপথে, স্থলপথে। এক অর্থে, এই বিস্তৃতিকে একটি ধর্মপ্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেমন খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার এবং অবশ্যই সব ধর্মের বিস্তারের মধ্যেই সর্বজনীনতা রয়েছে, যা অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়। তবে বৌদ্ধধর্মকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায় তার বৌদ্ধিক সংযোগ বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে, যা মূলত বুদ্ধের সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত—যেখানে আলোকপ্রাপ্তি মানব বিকাশের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ওপর অসাধারণ প্রভাব ফেলেছে—বিশেষত চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ দেশগুলোর ক্ষেত্রে—যা মূলত পারস্পরিক ধর্মীয় আগ্রহ থেকে শুরু হয়ে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বিজ্ঞান, গণিত, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, স্থাপত্য, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং সংগীত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চতুর্থ শতকে ফাসিয়ন এবং সপ্তম শতকে শুয়ানজাং ও ই-জিংয়ের মতো একাধিক চীনা পর্যটক ভারতের যে বিশদ বিবরণ রেখে গেছেন, তা থেকে বোঝা যায় যে তাঁদের আগ্রহ কেবল ধর্মগ্রন্থ-সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একইভাবে বিশেষত সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীকে যেসব ভারতীয় পণ্ডিত চীনে গিয়েছিলেন, তাঁরা ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ হলেও তাঁদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করেছিল।
আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা যখন পঞ্চম শতাব্দীর তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন ভিন্ন ও দূরবর্তী দেশগুলো এই একটি ধারণার প্রেরণায় মানবজ্ঞান ও শিক্ষার স্বার্থে পরস্পরের কাছে আসতে পারে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে এখনো অনেক শেখার আছে।
চীনে কয়েকজন ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ সেখানকার বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এমনকি অষ্টম শতাব্দীকে গৌতম সিদ্ধ (চীনা ভাষায় কুতান শিদা) নামে একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী চীনের সরকারি জ্যোতির্বিদ্যা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন। চীনা সভ্যতাকে অনেক সময় কিছুটা অন্তর্মুখী বলে বিবেচনা করা হলেও এ ধরনের নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল যে বিস্ময়কর মুক্তচিন্তার পরিবেশে, তা ছিল একধরনের বৌদ্ধিক বিশ্বজনীনতা। বিশ্বজনীনতার প্রতি বৌদ্ধধর্ম বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এখানে আমি বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করতে চাই। নালন্দা ছিল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা পঞ্চম শতাব্দীতে ব্যাপক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমৃদ্ধভাবে টিকে ছিল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছু পরে এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের কিছু আগে এটি ধ্বংস হয়। এখানে বহু বিদেশি ছাত্র অধ্যয়ন করেছেন—বিশেষত চীন থেকে। তবে কোরিয়া, জাপানসহ অন্যান্য দেশ থেকেও ছাত্ররা নালন্দায় আসতেন। তাঁরা শুধু ধর্ম, সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতি নয়, চিকিৎসাশাস্ত্র, জনস্বাস্থ্য ও জ্যোতির্বিদ্যাও অধ্যয়ন করতেন। যদিও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই কেবল বৌদ্ধধর্ম চর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তবু বুদ্ধের যে বৌদ্ধিক বিশ্বজনীনতা, তার গভীর প্রতিফলন নালন্দার ৭০০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চার মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
বৈশ্বিক বৌদ্ধিক সম্পর্কের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নিয়েছে। তবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এবং সহজভাবে বললে বৌদ্ধধর্ম-প্রভাবিত আন্তরাষ্ট্রীয় বৌদ্ধিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো শিক্ষাব্যবস্থায় বুদ্ধচিন্তার অগ্রণী ভূমিকা—এমনকি ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় বোলোনিয়ার সঙ্গে তুলনা করলেও। নালন্দা প্রকৃতপক্ষে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়েই ছয় শতাধিক বছরের পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। যদি এটি আজ পর্যন্ত টিকে থাকত, তবে নালন্দা বহু ব্যবধানে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হতো। আরেকটি সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ও ধারাবাহিক অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনি। সেটা হলো কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, যা নালন্দা প্রতিষ্ঠার ৫০০ বছরেরও বেশি পরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যাকে অনেক সময় নালন্দার সঙ্গে তুলনা করা হয়। আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা যখন পঞ্চম শতাব্দীর তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন ভিন্ন ও দূরবর্তী দেশগুলো এই একটি ধারণার প্রেরণায় মানবজ্ঞান ও শিক্ষার স্বার্থে পরস্পরের কাছে আসতে পারে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে এখনো অনেক শেখার আছে।
শেষ করছি নালন্দার অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র, সপ্তম শতাব্দীর চীনা পর্যটক সুয়ানজাংকে নিয়ে একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে। ঘটনাটি তাঁর ভারতে শিক্ষা সমাপ্ত করে চীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। নালন্দা কর্তৃপক্ষ সুয়ানজাংকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে থেকে যেতে অনুরোধ করেন। এমনকি তাঁকে একটি উচ্চস্তরের শিক্ষা পদবি গ্রহণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। হুই-লি তাঁর ‘সুয়ানজাংয়ের জীবনী’তে উল্লেখ করেছেন, সুয়ানজাংকে ভারতে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে রাজি করানোর জন্য নানা ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাঁরা যুক্তি দেন যে বসবাসের জন্য ভারত চীনের তুলনায় বেশি মনোরম দেশ। কিন্তু এরপর তাঁরা বিশেষভাবে জোর দেন ভারতের একটি অনন্য মর্যাদার ওপর—দেশটি স্বয়ং বুদ্ধের জন্মভূমি: নালন্দার ভিক্ষুরা যখন [সুয়ানজাংয়ের চীনে ফিরে যাওয়ার কথা] শুনলেন, তখন তাঁরা তাঁকে থেকে যেতে অনুরোধ করলেন।
এই প্রবন্ধে আমি বলার চেষ্টা করেছি যে বুদ্ধের চিন্তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের ভূমিকা, শিক্ষা ও যোগাযোগের গুরুত্ব (যা বিশেষভাবে মুদ্রণ প্রযুক্তির প্রাথমিক বিকাশকে অনুপ্রাণিত করেছিল), অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার দায়বদ্ধতা এবং বৌদ্ধিক বিশ্বজনীনতার তাৎপর্য।
তাঁরা বললেন: ‘ভারত হলো বুদ্ধের জন্মভূমি। যদিও তিনি এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন, তবু তাঁর বহু চিহ্ন এখানে রয়েছে। …তাহলে এত দূর এসে আপনি কেন ফিরে যেতে চান?’
এর জবাবে সুয়ানজাং চীনের প্রশংসা করে বলেন যে সেটিও একটি সুন্দর দেশ। ফলে দুই পক্ষের আলোচনায় একধরনের বৌদ্ধিক ‘জাতীয়তাবাদ’-এর সুর তৈরি হয়। তবে সুয়ানজাংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি ছিল, বুদ্ধের বার্তাকে যদি সঠিকভাবে বুঝতেন তাহলে নালন্দার ভিক্ষুরা কখনোই চাইতেন না যে শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত মানুষ কেবল বুদ্ধের জন্মভূমিতেই থেকে যাক। বরং চাইতেন যে তারা যা শিখেছে, তা অন্যত্র ছড়িয়ে দিক। সুয়ানজাং বলেন: ‘বুদ্ধ তাঁর ধর্ম এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাতে তা সর্বত্র বিস্তার লাভ করতে পারে। যারা এখনো আলোকপ্রাপ্ত হয়নি তাদের ভুলে গিয়ে কেবল নিজেদের মধ্যেই তা ভোগ করতে কে চাইবে?’ সুয়ানজাং এই যুক্তির বলেই বিতর্কে জয়ী হন। কারণ, তিনি বুদ্ধের মূল চেতনা—যোগাযোগ, বৌদ্ধিক যুক্তিবিনিময় এবং আলোকপ্রাপ্তির অসীম বিস্তারের বিষয়গুলো ভারতীয় শিক্ষক ও সহচরদের চেয়ে বেশি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
এই প্রবন্ধে আমি বলার চেষ্টা করেছি যে বুদ্ধের চিন্তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের ভূমিকা, শিক্ষা ও যোগাযোগের গুরুত্ব (যা বিশেষভাবে মুদ্রণ প্রযুক্তির প্রাথমিক বিকাশকে অনুপ্রাণিত করেছিল), অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার দায়বদ্ধতা এবং বৌদ্ধিক বিশ্বজনীনতার তাৎপর্য। বুদ্ধের যুগান্তকারী চিন্তাধারা আজও আমাদের বাসযোগ্য বিশ্বের প্রকৃতি এবং তার চাহিদা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বৌদ্ধ হওয়া, কোনো মতবাদে কঠোরভাবে আবদ্ধ থাকা বা ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করা—এসবের কোনোটাই অপরিহার্য নয়। তবু আড়াই হাজার বছর পরও এই মহামানবের চিন্তা ও যুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত, আলোকিত ও সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব।