
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘তাজকিরাত আল-আউলিয়া’ ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকর গ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত, কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫-১৯৬৯) এই বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রকাশ করেছেন। ২০০০ সালে ইংরেজি ভাষায় এটি ‘মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস’ নামে বের হয়। বইটিতে ৩৮টি এপিসোডে ভাগ করে সুফি সাধক ও তাঁদের জীবনের নানা লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি এপিসোড বাগদাদের প্রখ্যাত সুফিসাধক মারুফ আল-কারখির নামে। সেখান থেকে এই অধ্যায়টি মূলানুগ অনুবাদ করা হয়েছে।
• ভাষান্তর: রাব্বী আহমেদ
মারুফ আল-কারখির পুরো নাম আবু মাহফুজ মারুফ ইবনে ফিরুজ আল-কারখি। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়—তিনি খ্রিষ্টান পিতামাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; শিয়া ইমাম আলী ইবনে মুসা আল-রেজার মাধ্যমে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনিটি সাধারণত বিশ্বাস করা হয় না। তিনি ছিলেন বাগদাদ সুফি ধারার একজন বিশিষ্ট মরমি সাধক। ২০০ হিজরিতে (৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন।
মারুফ-ই কারখির মা–বাবা দুজনই ছিলেন খ্রিষ্টান। তাঁরা যখন তাঁকে স্কুলে পাঠালেন, তাঁর শিক্ষক তাঁকে বললেন, ‘বলো, ঈশ্বর তিনের মধ্যে তৃতীয়।’ ‘না,’ মারুফ জবাব দিলেন, ‘বরং এর উল্টো, তিনিই আল্লাহ্, এক উপাস্য।’ শিক্ষক তাঁকে প্রহার করলেন, কিন্তু লাভ হলো না কোনো। একদিন স্কুলশিক্ষক তাঁকে মারধর করলেন প্রচণ্ড। মারুফ তখন পালিয়ে গেলেন; আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না। ‘যদি সে ফিরে আসে, তাহলে যে ধর্মই সে অনুসরণ করতে চাইবে, আমরা তাতেই সম্মত থাকব’, তাঁর মা-বাবা বললেন।
মারুফ এলেন আলী ইবনে মুসা আল-রেজার কাছে। আর তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিছুকাল অতিক্রান্ত হলো। এরপর একদিন তিনি নিজের বাড়ির পথে রওনা হলেন, আর কড়া নাড়লেন তাঁর বাবার ঘরের দরজায়। ‘কে ওখানে?’ তাঁরা জানতে চাইলেন। ‘মারুফ,’ তিনি উত্তর দিলেন। ‘তুমি কোন ধর্ম গ্রহণ করেছ?’ ‘মুহাম্মদ (স.), যিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল, তাঁর ধর্ম।’ তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বাবা আর মা দুজনই মুসলমান হয়ে গেলেন। এরপর মারুফ আসেন দাউদ-ই-তায়ির সান্নিধ্যে। আর কঠিন অনুশাসনের ভেতর দিয়ে যান। নিজেকে তিনি এতটাই ধর্মপরায়ণ প্রমাণ করেন, আর এমন কঠোর তপস্যা করেন যে তাঁর দৃঢ়তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
মুহাম্মদ ইবনে মনসুর তুসি এই কাহিনিই বর্ণনা করেছেন—
তাঁর সঙ্গে মারুফের বাগদাদে সাক্ষাৎ হয়েছিল। ‘আমি তাঁর মুখে একটা দাগ দেখতে পেলাম। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “গতকালও তো আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু এই দাগ তো তখন দেখিনি। এটা কীসের দাগ?” “যে বিষয় তোমার কোনো উপকারে আসবে না, সে সম্পর্কে প্রশ্ন কোরো না,” তিনি জবাব দিলেন। “শুধু সে সম্পর্কেই জিজ্ঞেস কোরো, তোমার জন্য যা মঙ্গলজনক।” “আমরা যার ইবাদত করি, তাঁর শপথ, আমাকে বলুন,” আরজি জানালাম। তখন মারুফ বললেন, “গত রাত্রে আমি নামাজ পড়ছিলাম, আর মনে হলো এক্ষুনি যদি মক্কায় পৌঁছানো যেত আর কাবা ঘর তাওয়াফ করতে পারতাম! একটু পানি পান করার আকাঙ্ক্ষায় আমি জমজম কূপের নিকটে গেলাম। হঠাৎ তখন আমার পা পিছলে গেল, আর কূপের সঙ্গে মুখ আঘাত খেল। এভাবেই আমি এই দাগটি পেলাম।”’
একবার অজু করার জন্য মারুফ দজলায় (টাইগ্রিস নদী) গেলেন, তাঁর কুরআন আর জায়নামাজ রেখে গিয়েছিলেন মসজিদে। এক বৃদ্ধা নারী চুরি করতে আসে আর নিভৃতে সেসব নিয়ে চলে যায়। মারুফ তাদেরকে অনুসরণ করলেন। তিনি তার পিছনে ছুটে গেলেন আর যখন বৃদ্ধাকে ধরে ফেললেন, তিনি তাকে মাথা নিচু করে এমনভাবে সম্বোধন করলেন, যাতে তাঁর চোখ কোনোভাবেই বৃদ্ধার ওপর না পড়ে। ‘তোমার কি এমন কোনো ছেলে আছে, যে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারে?’ ‘না,’ বৃদ্ধা উত্তর দিল। ‘তাহলে কোরআনটি আমাকে ফিরিয়ে দাও। জায়নামাজটি তুমি রেখে দিতে পারো।’ তাঁর এমন অনুকম্পায় বৃদ্ধা বিস্মিত হলো, আর কোরআন ও জায়নামাজ দুটিই রেখে দিল। ‘নাহ, তুমি জায়নামাজটি নিয়ে যাও,’ পুনরায় মারুফ বললেন। ‘আইনত এটা তোমার।’ বৃদ্ধা লজ্জা আর বিভ্রান্তিতে দ্রুত দূরে সরে গেল।
একদিন মারুফ তাঁর শিষ্যদের একটা দলকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটছিলেন, হঠাৎ সে পথে কিছু তরুণ এসে পড়ল। তারা দজলা পর্যন্ত সব পথ অত্যধিক উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করল। মারুফের সঙ্গীরা তাঁর কাছে অনুনয় করলেন, ‘গুরু, সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি এদের সবাইকে ডুবিয়ে দেন, যাতে পৃথিবী তাদের এই নোংরা উপস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পারে।’ ‘তোমরা তোমাদের হাত ওঠাও’, মারুফ নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি দোয়া করলেন। ‘হে আল্লাহ, যেমন তুমি তাদেরকে এই দুনিয়াতে সুখী জীবন দান করেছ, তেমনই পরকালেও ওদের সুখী জীবন দান করো।’ ‘দয়াল, আমরা তো এই দোয়ার রহস্য কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না,’ তাঁর সঙ্গীরা আশ্চর্য হয়ে বললেন। ‘যাঁর সঙ্গে আমি কথা বলছি, তিনি এর রহস্য জানেন,’ মারুফ জবাব দিলেন। ‘একটু অপেক্ষা করো, এখনই এর রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।’ যখন তরুণেরা শাইখকে দেখতে পেল, তারা তাদের বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলল আর যে মদ পান করছিল, তা ঢেলে দিল। তাদের মধ্যে কম্পন দেখা দিল, আর তারা শাইখের সামনে লুটিয়ে পড়ল ও অনুশোচনা করল। ‘দেখলে তো,’ মারুফ তাঁর সঙ্গীদের বললেন। ‘তোমাদের মনোবাঞ্ছা কানায় কানায় পূর্ণ হলো, কাউকে না ডুবিয়ে আর কাউকে না ভুগিয়েই।’
সারি-ই সাকাতি এই গল্প বর্ণনা করেছেন।
এক উৎসবের দিনে আমি মারুফকে খেজুরের বীজ কুড়াতে দেখলাম। ‘আপনি কী করছেন?’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। ‘আমি দেখলাম এই শিশুটি কাঁদছে’, তিনি আমাকে বললেন। ‘আমি বললাম, “তুমি কাঁদছ কেন?” ছেলেটি বলল, “আমি একজন এতিম। আমার না আছে বাবা, না মা। অন্য শিশুদের নতুন পোশাক আছে, কিন্তু আমার নেই। তাদের কাছে বাদাম আছে, আমার কাছে নেই।” তাই আমি এই বীজগুলো জমা করছি, যাতে এসব বিক্রি করতে পারি আর তাকে বাদাম কিনে দিতে পারি। এরপর সে দৌড়ে বেড়াতে আর খেলা করতে পারবে।’ ‘এই কাজটি আমাকে করতে দিন, আপনি আর কষ্ট করবেন না,’ আমি বললাম। সারি বলতে থাকলেন, ‘আমি শিশুটিকে সঙ্গে নিলাম ও তাকে পোশাক পরিয়ে দিলাম, আর তাকে বাদাম কিনে দিলাম, ও তাকে খুশি করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি দেখতে পেলাম আমার হৃদয়ে এক প্রকাণ্ড আলো বিচ্ছুরিত হলো, আর আমি রূপান্তরিত হলাম।’
একদিন মারুফের আচারিক পবিত্রতা ভঙ্গ হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বালি দিয়ে তায়াম্মুম করা শুরু করলেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই তো সামনেই দজলা নদী। আপনি বালি দিয়ে তায়াম্মুম করছেন কেন?’ ‘হতে পারে সেখানে পৌঁছানোর আগেই আমি আর বেঁচে না–ও থাকতে পারি’, জবাবে তিনি বললেন।
মারুফের এক চাচা ছিলেন শহরের প্রশাসক। একদিন তিনি এক পরিত্যক্ত জমির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন দেখতে পেলেন মারুফ সেখানে বসে রুটি খাচ্ছেন। তাঁর সামনে একটি কুকুর, আর মারুফ এক লোকমা নিজের মুখে দিচ্ছেন, আরেক লোকমা কুকুরটির মুখে। ‘একটা কুকুরের সঙ্গে রুটি খেতে তোমার লজ্জাবোধ হয় না?’ তাঁর চাচা আর্তনাদ করে উঠলেন। ‘দরিদ্রকে আমি রুটি দিচ্ছি, এ তো আমার জন্যই লজ্জার’, মারুফ উত্তর দিলেন। এরপর তিনি তাঁর মাথা তুললেন আর আকাশে উড়তে থাকা একটা পাখিকে ডাকলেন। পাখিটি উড়ে নেমে এল, আর তাঁর হাতে এসে বসল, তাঁর মাথা ও চোখ ঢেকে দিল তার ডানা দিয়ে। ‘যে আল্লাহর সামনে লজ্জাবনত হয়’, মারুফ বললেন, ‘সমগ্র সৃষ্টিই তার সামনে লজ্জাবনত হয়।’ মুহূর্তে তাঁর চাচা হকচকিত হয়ে গেলেন।
একদিন মারুফের আচারিক পবিত্রতা ভঙ্গ হলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বালি দিয়ে তায়াম্মুম করা শুরু করলেন। ‘এ কী কাণ্ড দেখছেন!’ লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল। ‘এই তো সামনেই দজলা নদী। আপনি বালি দিয়ে তায়াম্মুম করছেন কেন?’ ‘হতে পারে সেখানে পৌঁছানোর আগেই আমি আর বেঁচে না–ও থাকতে পারি’, জবাবে তিনি বললেন।
একদিন রেজার (ইমাম রেজা) দরজায় শিয়াদের একটা দল ধাক্কাধাক্কি করছিল, আর তারা মারুফ-ই কারখির পাঁজরের হাড় ভেঙে ফেলল, এ কারণে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সারি-ই সাকাতি তাঁকে বললেন, ‘আপনার চূড়ান্ত ইচ্ছাটা আমাকে বলুন।’ ‘যখন আমি মারা যাব, আমার জামাটি নিয়ে তা সাদকা করে দেবে। যেমন নগ্ন অবস্থায় আমি মায়ের গর্ভ থেকে এসেছিলাম, তেমনই নগ্ন হয়ে এই জগৎ ত্যাগ করতে চাই’, মারুফ বললেন।
তাঁর মানবতা আর বিনয়ের খ্যাতি এতটাই ছিল যে যখন তাঁর মৃত্যু হলো, ইহুদি, খ্রিষ্টান আর মুসলমান—সব ধর্মের মানুষই তাঁকে নিজেদের একজন বলে দাবি করল। তাঁর খাদেম জানিয়েছিলেন, মারুফ বলেছিলেন, ‘যে কেউ আমার খাটিয়া মাটি থেকে তুলতে পারবে, আমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ খ্রিষ্টানরা তা পারল না। ইহুদিরাও একইভাবে তা তুলতে পারল না। এরপর মুসলিমরা এল আর তা তুলল। তারা তাঁর জানাজা পড়ল, আর সেই স্থানেই তাঁকে সমাহিত করল।
সারি নিচের ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন:
‘মারুফ মারা যাওয়ার পর আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি আরশের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখ দুটি বিস্ফারিত, যেন বিস্ময়ে হতবাক আর অভিভূত। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের প্রতি এক আদেশ এল: ‘ইনি কে?’ ‘হে পরম প্রভু, আপনিই সর্বাধিক জানেন,’ ফেরেশতারা জবাব দিলেন। আদেশ এল, ‘ইনি মারুফ। আমাদের ভালোবাসার কারণে সে দিশেহারা আর হতভম্ব হয়ে পড়েছে। একমাত্র আমাদের দর্শনেই সে চেতনা ফিরে পাবে। কেবল আমাদের মিলনেই সে পুনরায় নিজেকে খুঁজে পাবে।’