অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

হারুকি মুরাকামির গল্প

থাইল্যান্ড সফর

জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির আফটার দ্য কোয়েক—১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের ছায়ায় লেখা ছয়টি গল্পের সংকলন। আফটার দ্য কোয়েক বইয়ের চতুর্থ গল্প ‘থাইল্যান্ড’-এর বাংলা রূপ ‘থাইল্যান্ড সফর’।

ভাষান্তর: জিয়া হাশান

‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের প্রথম গল্প
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের তৃতীয় গল্প

ঘোষণা ভেসে আসে—‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন। আমরা বাতাসের ঝাপটার মধ্যে পড়ে গেছি। তাই দয়া করে সবাই নিজ নিজ আসনে ফিরে যান এবং সিটবেল্ট বেঁধে নিন।’ সাতসুকি তখন নিজের ভাবনার মাঝে ছিল, তাই তার থাই বিমানবালার কাঁপা কাঁপা জাপানি উচ্চারণের বলা ঘোষণাটা বুঝে নিতে খানিকটা সময় লাগে।

সাথে সাথে সাতসুকি ভীষণ গরমে কাহিল হয়ে পড়ে। গা ঘেমে একাকার হয়ে যায়। মনে হয় যেন বাষ্পে ভরা গোসলখানার ভেতর বসে আছে—পুরো গা জ্বলে ওঠে আগুনের মতো। আর পায়ের নাইলনের লম্বা মোজা ও গায়ের ব্রা এতটাই অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায় যে সবকিছু ছুড়ে ফেলে নিজেকে মুক্ত করে দিতে ইচ্ছা করে তার। সে গলা বাড়িয়ে চারপাশের বিজনেস ক্লাসের আর সব যাত্রীদের দিকে তাকায়। কিন্তু দেখে, না, আর কেউ-ই নয়, কেবল সে একাই গরমে মরছে। অন্যরা সবাই কুঁকড়ে ঘুমানো। এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা সামলাতে তাদের কাঁধের ওপর কম্বল ছড়ানো।

হঠাৎ আবার আরেকটা গরমের ঝলক আসে। সাতসুকি তাই ঠোঁট কামড়ে ধরে এবং গরমের কথা ভুলে থাকতে মনটা অন্যদিকে ফেরাতে চায়। তাই ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে যেখানে পড়া আগে থামেছিল সেখান থেকে আবার পড়তে শুরু করে। কিন্তু গরমের কথাটা ভুলে থাকা যায় না। কারণ, গরমটা সাধারণ কোনো গরম নয়। আর তা থেকে বাঁচার জন্য ব্যাংককে নামতে তো এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি। তাই সে পাশ দিয়ে যাওয়া এক বিমানবালার কাছে একটু পানি চায়। তারপর হ্যান্ডব্যাগের ভেতর পিলের কেসটা খুঁজে পেয়ে যে হরমোনের ওষুধটা খেতে ভুলে গিয়েছিল, সেটার এক ঢোঁক পানি দিয়ে গিলে নেয়।

সাতসুকি নিজেকে অসংখ্যবার বলেছে যে মেনোপজ হচ্ছে মানুষের কৃত্রিমভাবে আয়ু বাড়িয়ে দেওয়ার ফলেই যেন দেবতাদের দেওয়া এক ব্যঙ্গাত্মক সতর্কবার্তা (অথবা সোজাসাপ্টাভাবে বলা যায়, এক নিষ্ঠুর কৌতুক)। মাত্র এক শ বছর আগেও গড় আয়ু ছিল পঞ্চাশের কম, আর ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পরও আরও কুড়ি-তিরিশ বছর বেঁচে থাকত—এমন নারী ছিল বিরল। ডিম্বাশয় বা থাইরয়েড গ্রন্থি যখন স্বাভাবিক মাত্রায় হরমোন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়, তখন সেই টিস্যুগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন বা মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার সাথে আলঝেইমারের প্রকোপের সম্ভাব্য সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় তখন কারও ছিল না। বরং তার চেয়ে তখন বেশির ভাগ মানুষের কাছে অনেক বেশি জরুরি ছিল প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের জন্য সংগ্রাম করা। তাহলে কি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি আসলে মানবপ্রজাতির সমস্যাগুলো সমাধান না করে কেবল সেগুলোকে উন্মোচিত করেছে, খণ্ডিত করেছে এবং আরও জটিল করে তুলেছে?

সাতসুকি নিজেকে অসংখ্যবার বলেছে যে মেনোপজ হচ্ছে মানুষের কৃত্রিমভাবে আয়ু বাড়িয়ে দেওয়ার ফলেই যেন দেবতাদের দেওয়া এক ব্যঙ্গাত্মক সতর্কবার্তা। মাত্র এক শ বছর আগেও গড় আয়ু ছিল পঞ্চাশের কম, আর ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পরও আরও কুড়ি-তিরিশ বছর বেঁচে থাকত—এমন নারী ছিল বিরল।

তখনই বিমানের লাউডস্পিকারে ইংরেজিতে আরেকটা ঘোষণা আসে—বিমানে যদি কোনো ডাক্তার থাকেন, প্লিজ, কেবিন ক্রুদের কাছে নিজের পরিচয় দিন।

নিশ্চয়ই কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একমুহূর্তের জন্য সাতসুকি মনে হয় সে স্বেচ্ছায় এগিয়ে যাবে, তবে সাথে সাথেই আবার সিদ্ধান্ত বদলায়। কারণ, আগে যে দুইবার সে যখন এমন করেছে, তখন বিমানে নিজস্ব পেশাদার চিকিৎসকদের সাথে তার অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপকারই হয়নি। সেই পুরুষেরা এমন এক ভঙ্গি করেছে, যেন তারা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পরিচালনাকারী অভিজ্ঞ কোনো জেনারেল। এমনকি একই সাথে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে যে তার এক নজরেই তারা বুঝে নিয়েছে যে সাতসুকি একজন পেশাদার প্যাথলজিস্ট হলেও বাস্তবে তার চিকিৎসা দেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ‘সব ঠিক আছে, ডাক্তার,’ শীতল এক হাসি দিয়ে তাকে বলা হয়েছে, ‘আমরা নিজেরাই এটা সামলাতে পারব। আপনি আরাম করুন।’ সাতসুকি তখন একটা বোকা অজুহাত বিড়বিড় করে বলে নিজের আসনে ফিরে গিয়ে কোনো হাসির সিনেমার বাকি অংশ দেখতে বসেছে।

তবু সে ভাবে, হয়তো এই বিমানে একমাত্র ডাক্তার আমিই। আর রোগীটা হয়তো থাইরয়েডজনিত কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর সমস্যায় ভুগছে। যদিও এমন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি বলে মনে হয় না। তারপরও যদি সত্যিই তা-ই হয় তাহলে তো এ অবস্থায় আমারও কিছুটা কাজ করার সুযোগ থাকতে পারে। সে গভীর শ্বাস নেয় এবং কেবিনের বিমানবালাকে ডাকার বোতামটা চাপে।

ব্যাংককের ম্যারিয়টে চার দিনের ওয়ার্ল্ড থাইরয়েড কনফারেন্সটাকে আসলে কনফারেন্সের চেয়ে বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড বিশেষজ্ঞদের এক পারিবারিক পুনর্মিলনই বলা ভালো। অংশগ্রহণকারীরা সবাই থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ এবং তারা সবাই একে অপরকে আগে থেকেই চেনে। না চিনলেও খুব দ্রুতই পরিচিত হয়ে নেয়। দুনিয়াটা সত্যিই ছোট।

দিনের বেলায় চলে বক্তৃতা ও প্যানেল আলোচনা আর রাতের বেলায় ব্যক্তিগত পার্টি। বন্ধুরা একত্র হয়। পুরোনো সম্পর্ক ঝালিয়ে নেয়, অস্ট্রেলিয়ার মদ খায়, থাইরয়েড–সংক্রান্ত গল্প বলে যায়, ফিসফিসিয়ে গসিপ করে, নিজেদের পেশাগত অগ্রগতি জানায়, ডাক্তারদের অশালীন কৌতুক বলে আর পানশালায় বেজে যাওয়া ‘সার্ফার গার্ল’ গানের সাথে নিজেদের গলা মেলায়।

ব্যাংককে সাতসুকি মূলত তার ডেট্রয়েটে থাকার সময় গড়ে ওঠা বন্ধুদের সাথেই সময় কাটায়। তাদের সাথেই সে নিজেকে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। থাইরয়েড গ্রন্থির রোগপ্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রায় দশ বছর সে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে কাজ করেছে।

শেষ অবধি তার সাথে তার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ স্বামীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। স্বামীর মদ্যপানের মাত্রা বছর বছর বেড়েই চলছিল; তার ওপর আবার সে সাতসুকি ভালোই চেনে এমন এক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাই স্বামীর কাছ থেকে সাতসুকি আলাদা হয়ে যায়। এ নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের এক তিক্ত আইনি বিরোধ পুরো এক বছর ধরে চলে। স্বামী তখন দাবি করেছিল যে ‘শেষ অবধি আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি, তার কারণ হলো—তুমি সন্তান নিতে চাইতে না।’

তিন বছর আগে তারা তাদের বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্তভাবে শেষ করে। কয়েক মাস পরে, হাসপাতালে পার্কিং লটে কে বা কারা যেন সাতসুকির ‘হোন্ডা অ্যাকর্ড’ গাড়ির হেডলাইট ভেঙে ফেলে এবং হুডে সাদা অক্ষরে লিখে রাখে যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি গাড়ির প্রতি বিদ্ধেষমূলক শব্দ ‘জাপ-কার’। সাতসুকি পুলিশকে ফোন করে। বিশালদেহী এক পুলিশ কর্মকর্তা এসে ক্ষতির রিপোর্ট ফরম পূরণ করে নিয়ে সাতসুকিকে বলে, ‘ম্যাডাম, এটা ডেট্রয়েট গাড়ি। পরেরবার “ফোর্ড টরাস” গাড়ি কিনবেন।’

একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় সাতসুকির জন্য আমেরিকায় বাস করা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। তাই জাপানে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। টোকিওর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে গবেষণাসংশ্লিষ্ট চাকরিরও ব্যবস্থা করে ফেলে।

কিন্তু তার গবেষণা দলের ভারতীয় এক সদস্য বাদ সাধে, ‘আপনার চলে যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের বছরের পর বছর ধরে করা গবেষণা এখন ফল দিতে চলছে। আমাদের নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও করা হতে পারে। এ ধরনের আশা এখন আর পাগলামি নয়।’ সে সাতসুকিকে আমেরিকায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু সাতসুকি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলে। মনে হয়, তার ভেতরের কিছু একটা যেন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।

ব্যাংককে সাতসুকি মূলত তার ডেট্রয়েটে থাকার সময় গড়ে ওঠা বন্ধুদের সাথেই সময় কাটায়। তাদের সাথেই সে নিজেকে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। থাইরয়েড গ্রন্থির রোগপ্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রায় দশ বছর সে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরের একটা হাসপাতালে কাজ করেছে।

কনফারেন্স শেষ হওয়ার পর সাতসুকি ব্যাংককের এক হোটেলে একা থাকার পর বন্ধুদের বলে ‘আমি নিজের জন্য কয়েক দিনের একটা ছুটি নিয়েছি। এখানকার কাছাকাছি একটা রিসোর্টে যাচ্ছি। পুরো এক সপ্তাহ শুধু পড়াশোনা, সাঁতার আর পুলের ধারে ঠান্ডা সুস্বাদু ককটেল খেয়ে পুরোপুরি বিশ্রাম করব।’

‘দারুণ,’ তারা বলে। ‘সবার কখনো কখনো একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। তা তোমার থাইরয়েডের জন্যও ভালো!’ হাত মেলানো, আলিঙ্গন এবং আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতির সাথে সাতসুকি তার বন্ধুদের বিদায় জানায়।

প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন ভোরে একটা লিমুজিন হোটেলের গেটে এসে দাঁড়ায়। লিমুজিনটা নেভি নীল রঙের পুরোনো একটা মার্সিডিজ গাড়ি। তা রত্নের মতো নিখুঁত ও ঝকঝকে আর নতুন কোনো গাড়ির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। গাড়িটা যেন অন্য এক জগতের কোনো কিছু, কারও কল্পনা থেকে সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে হঠাৎ করে এখানে নেমে এসেছে বলে মনে হয়।

সম্ভবত ষাটের গোড়ার দিকের বয়সী, ছিপছিপে গড়নের এক থাই পুরুষ গাড়িটার চালক। তার পরনে শক্ত করে ইস্ত্রি করা সাদা ছোট হাতার শার্ট, কালো সিল্কের টাই এবং চোখে গাঢ় রঙের সানগ্লাস। তার মুখ রোদে পোড়া, গলা লম্বা ও সরু। সাতসুকির কাছে নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় তার সাথে সে হাত মেলায় না; বরং দুই হাত জোড় করে প্রায় জাপানি কায়দায় হালকা একটু মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানায়।

‘আমাকে “নিমিত” বলেই ডাকবেন। আমার সৌভাগ্য যে আগামী এক সপ্তাহ আমি আপনার সাথে থাকব।’

‘নিমিত’ তার নামের প্রথম অংশ নাকি শেষ অংশ তা বোঝা যায় না। যাহোক, তার নাম ‘নিমিত’। সে যখন কথাটা বলে ভদ্র, সহজবোধ্য ইংরেজিতে। তাতে যেমন নেই আমেরিকান ঢিলেঢালা ভাব, না আছে ব্রিটিশ ভঙ্গির কোনো কৃত্রিমতা। আসলে তার কথায় কোনো লক্ষণীয় উচ্চারণভঙ্গিই ধরা পড়ে না। এভাবে বলা ইংরেজি সাতসুকি আগে শুনেছে, কিন্তু কোথায় শুনেছে তা মনে করতে পারে না।

তবে বলে, ‘সৌভাগ্যটা আমারই।’

একসঙ্গে তারা ব্যাংককের কোলাহলময় কুৎসিত ও দূষিত রাস্তাগুলো পার হয়ে যায়। সামনে যানজট যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগোয়, লোকজন একে অপরকে গালাগালি করে আর গাড়ির হর্নের শব্দ আকাশ ফুঁড়ে এয়ার-রেইড সাইরেনের মতো বেজে ওঠে। তার ওপর রাস্তায় দেখা দেয় মন্থর গতির হাতি। একটা–দুইটা নয়, অনেকগুলো। এ রকম একটা শহরে হাতিরা কী করছে? সাতসুকি নিমিতকে জিজ্ঞেস করে।

‘ওদের মালিকেরা গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে,’ নিমিত বুঝিয়ে বলে, ‘আগে কাঠ কাটার কাজে ওগুলো ব্যবহার করা হতো, কিন্তু সেই কাজ এখন আর এতটা নেই। তা দিয়ে এখন আর তাদের জীবিকা চলে না। তাই পর্যটকদের সামনে নানা কসরত দেখিয়ে টাকা রোজগার করার জন্য মালিকেরা হাতিগুলো শহরে নিয়ে এসেছে। এখন এখানে হাতির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, এতে করে শহরের মানুষের জীবন খুবই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কখনো কখনো কোনো হাতি ভয় পেয়ে দিশাহারা হয়ে তাণ্ডব চালায়। কয়েক দিন আগে তাদের এমন তাণ্ডবে অনেক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ অবশ্যই এসব বন্ধ করার চেষ্টা করে, কিন্তু তারা হাতিগুলো তাদের মাহুতদের কাছ থেকে জব্দ করতে পারে না। জব্দ করলে সেগুলো রাখার কোনো জায়গা যেমন নেই তেমনি আবার তাদের খাবারের খরচও বিপুল। তারা তাই ওগুলোকে যেমন আছে তেমনই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।’

শেষে সাতসুকির গাড়ি শহর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসে। এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে আর উত্তর দিকে চলতে থাকে।

নিমিত ড্যাশবোর্ডের নিচে থেকে একটা ক্যাসেট টেপ বের করে গাড়ির স্টেরিওতে ঢুকিয়ে দেয়, তবে ভলিউম নিচু করে রাখে। তার জ্যাজ সংগীতটা সাতসুকির যেমন চেনাজানা তেমনি আবেগের সাথে জড়িত। তাই সে বলে ‘ভলিউমটা একটু বাড়ানো যায়।’

‘জি, ডাক্তার’, বলে নিমিত আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়।

‘আই ক্যান্ট গেট স্টার্টেড’ গানটা বেজে যায়। এ গান সাতসুকির আগেকার দিনে অসংখ্যবার শোনা। তাই তার পুরোনো দিনের জ্যাজ-স্মৃতি জেগে ওঠায় সে নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে ‘ট্রাম্পেটে হাওয়ার্ড ম্যাকগি, টেনর স্যাক্সোফোনে লেস্টার ইয়াং।’

নিমিত রিয়ারভিউ মিররে সাতসুকির দিকে একবার তাকিয়ে বলে, ‘খুবই চমৎকার, ডাক্তার। আপনি কি জ্যাজ পছন্দ করেন?’

‘আমার বাবা জ্যাজের জন্য পাগল ছিলেন,’ সাতসুকি বলে, ‘আমি যখন ছোট মেয়ে ছিলাম, তখন বাবা আমার জন্য বারবার একই রেকর্ড বাজাতেন আর শিল্পীদের নাম মুখস্থ করতে বলতেন। ঠিকভাবে বলতে পারলে তিনি আমাকে চকলেট দিতেন। এখনো বেশির ভাগই আমার মনে আছে। তবে শুধু পুরোনো জ্যাজটাই। নতুন জ্যাজ শিল্পীদের সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। লায়নেল হ্যাম্পটন, বাড পাওয়েল, আর্ল হাইনস, হ্যারি এডিসন, বাক ক্লেটন…।’

‘আমিও কেবল পুরোনো জ্যাজই শুনি,’ নিমিত বলে, ‘আপনার বাবার পেশা কী ছিল?’

‘তিনিও একজন ডাক্তার ছিলেন,’ সাতসুকি বলে, ‘একজন শিশুরোগবিশেষজ্ঞ। আমি হাইস্কুলে ঢোকার ঠিক পরেই বাবা মারা যান।’

‘দুঃখিত,’ নিমিত বলে, ‘আপনি কি এখনো জ্যাজ শোনেন?’

আমার স্বামী জ্যাজ একদমই সহ্য করতে পারত না। ওর পছন্দ ছিল শুধু অপেরা। আমাদের বাড়িতে খুব ভালো একটা স্টেরিও ছিল, কিন্তু অপেরা ছাড়া অন্য কিছু চালাতে চাইলে সে আমাকে এমন কটমট করে তাকাত যে সাহসই হতো না অন্য কিছু বলার। আমার মনে হয়, অপেরা-ভক্তরাই পৃথিবীর সবচেয়ে সংকীর্ণমনা মানুষ।

সাতসুকি ডানে–বাঁয়ে মাথা নেড়ে বলে, ‘না, তেমন নয়। বহু বছর ধরে নয়। আমার স্বামী জ্যাজ একদমই সহ্য করতে পারত না। ওর পছন্দ ছিল শুধু অপেরা। আমাদের বাড়িতে খুব ভালো একটা স্টেরিও ছিল, কিন্তু অপেরা ছাড়া অন্য কিছু চালাতে চাইলে সে আমাকে এমন কটমট করে তাকাত যে সাহসই হতো না অন্য কিছু বলার। আমার মনে হয়, অপেরা-ভক্তরাই পৃথিবীর সবচেয়ে সংকীর্ণমনা মানুষ। যদিও আমি আমার স্বামীকে ছেড়ে দিয়েছি। জীবনে আর কখনো অপেরা না শুনলেও আমার আপত্তি নেই।’

নিমিত একটু মাথা নাড়ে, কিন্তু কিছু বলে না। হাত দুটো মার্সিডিজ গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের ওপর রেখে চুপচাপ সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে হুইল স্টিয়ারিং ঘোরাতে তার হাতগুলো ঠিক একই জায়গায় আর একই কোণে রাখে, যাতে একধরনের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

একসময় এরোল গার্নার ‘আই উইল রিমেম্বার এপ্রিল’ গানটা বাজে। এ গানে সাতসুকির আরও অনেক স্মৃতি ফিরে আসে। গার্নারের ‘কনসার্ট বাই দ্য সি’ গানটা ছিল সাতসুকির বাবার প্রিয় রেকর্ডগুলোর মধ্যে একটা। সাতসুকি তাই চোখ বন্ধ করে এবং নিজে পুরোনো স্মৃতিতে ডুব দেয়। তার বাবা ক্যানসারে মারা না যাওয়া অবধি সাতসুকির সবকিছু ঠিকঠাকমতো একদম নিখুঁতভাবে চলেছে। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই জীবন অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং যখন সে বোঝে যে তার বাবা চিরতরে তার জীবনের বাইরে চলে গেছেন, তখন সবকিছু ভুল পথে এগোতে থাকে। যেন সম্পূর্ণ নতুন প্লট নিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন গল্প শুরু হয়েছে। কারণ, তার বাবার মৃত্যু এক মাসও পেরোতে না পারতেই তার মা বড় স্টেরিও এবং বাবার জ্যাজ সংগ্রহ বিক্রি করে দেন।

‘আপনি জাপানের কোথা থেকে এসেছেন, ডাক্তার, যদি বলতে কোনো সমস্যা না হয়?’

‘আমি কিয়োটো থেকে এসেছি,’ সাতসুকি উত্তর দেয়, ‘কিন্তু আমি কেবল আঠারো বছর বয়স অবধি সেখানে বসবাস করেছি। তার পর থেকে প্রায় কখনোই যাইনি।’

‘কিয়োটো কি কোবের ঠিক পাশেই নয়?’

‘খুব দূরে নয়, আবার ঠিক পাশেও নয়। তাই সম্ভবত ভূমিকম্প সেখানে খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি।’

নিমিত পাশের লেন ধরে। তখন বেশ কয়েকটা পশু বোঝাই ট্রাক পাশ দিয়ে চলে যায়। তারপর নিমিত আবার মেইন লেনে ফিরে আসে।

‘আপনার কথা শুনে ভালো লাগল’, নিমিত বলে, ‘গত মাসের ভূমিকম্পে অনেক মানুষ মারা গেছে। আমি সংবাদে দেখেছি। খুব দুঃখজনক। কোবেতে থাকে এমন কাউকে আপনি চেনেন?’

‘না, কেউ নয়। আমার মনে হয় না কোবেতে থাকে এমন কাউকে আমি চিনি,’ সাতসুকি বলে। কিন্তু তার এ কথা সত্য নয়, কারণ তার স্বামী ওখানেই বাস করত।

নিমিত কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর ঘাড়টা সামান্য সাতসুকির দিকে ঝুঁকিয়ে বলে, ‘ভূমিকম্প এক অদ্ভুত আর রহস্যময় জিনিস, তাই না? আমরা ধরে নিই আমাদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত আর স্থির। এমনকি আমরা বলি, কেউ “মাটিতে পা রেখে চলে” বা “তার পা শক্ত করে মাটিতে গাঁথা।” কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখি—তা সত্য নয়। যে মাটি, যে পাথরগুলোকে আমরা এত শক্ত বলে ভাবি, সেগুলো আচমকাই তরলের মতো নরম হয়ে যায়। টিভির খবরে শুনেছি—এটাকে নাকি বলে তরলে রূপান্তর হওয়া। ভাগ্য ভালো, থাইল্যান্ডে বড় ভূমিকম্প খুব কমই হয়।’

পেছনের সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে সাতসুকি চোখ বুজে ফেলে এবং এরোল গার্নারের বাজনায় মন ডুবিয়ে দেয়। আর সে মনে মনে ভাবে—হ্যাঁ, লোকটা কোবেতেই থাকত। আশা করি কোনো বড়, ভারী কিছুর নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে সে। অথবা তরল হয়ে যাওয়া মাটি তাকে গিলে ফেলেছে। এই বহু বছর ধরে তার জন্য আমি ঠিক এ ধরনের পরিণতিই চেয়ে এসেছি।

বেলা তিনটায় লিমুজিন গন্তব্যে পৌঁছায়। তার আগে ঠিক দুপুর বারোটায় হাইওয়ের পাশের রেস্তোরাঁয় তারা থেমেছে। তার ক্যাফেটেরিয়ায় সাতসুকি সস্তা দরের একটা কফি খেয়েছে এবং একটা ডোনাটের কেবল আধাটুকু খেতে পেরেছে।

তার এক সপ্তাহের বিশ্রাম কাটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে পাহাড়ের কোলের এক ব্যয়বহুল রিসোর্টে। তার কটেজগুলো এমন জায়গায় যে যেখান থেকে উপত্যকার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া চঞ্চলা ঝরনার মতো নদীটা দেখা যায়। আর উপত্যকার ঢালজুড়ে ফুটে রয়েছে উজ্জ্বল রঙের অসাধারণ সব ফুল। পাখিদের তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকাডাকি যেমন শোনা যায় তেমনি তাদের এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যাওয়াও চোখে পড়ে। সাতসুকির থাকার জন্য আগে থেকেই একটা কটেজ রেডি করা ছিল। তাতে রয়েছে বড় ও আলোময় বাথরুম, একটা রুচিশীল ক্যানোপি খাট আর চব্বিশ ঘণ্টার রুম সার্ভিস। লবির পাশের লাইব্রেরিতে বই, সিডি ও ভিডিও পাওয়া যায়। জায়গাটা একেবারে নিখুঁত—পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। প্রতিটি খুঁটিনাটির পেছনে বিপুল যত্নের পাশাপাশি অনেক টাকা-পয়সা খরচ করার নমুনাও চোখে পড়ে।

‘এত বড় জার্নিতে নিশ্চয়ই আপনি এখন খুব ক্লান্ত, ডাক্তার,’ নিমিত বলে, ‘এখন আপনি রেস্ট নিন। আগামীকাল সকাল দশটায় আমি এসে আপনাকে নিয়ে সুইমিং পুলে নিয়ে যাব। তখন শুধু একটা তোয়ালে আর সাঁতারের পোশাক সাথে নিলেই হবে।’

‘পুল?’ সাতসুকি জিজ্ঞেস করে, ‘ কিন্তু এ হোটেলেই তো বেশ বড় একটা পুল আছে, তাই না? আমাকে তো তাই বলেছিল।’

‘হ্যাঁ, তা আছে বটে, কিন্তু হোটেলের পুলে খুব ভিড় থাকে। মিস্টার র‍্যাপাপোর্ট আমাকে বলেছেন আপনি একজন দারুণ সাঁতারু। তাই আপনার জন্য কাছেই একটা পুল খুঁজে পেয়েছি, যেখানে আপনি নিরিবিলিতে সাঁতার কাটতে পারবেন। অবশ্য তার জন্য কিছু টাকা দিতে হবে, তবে খুব সামান্য। আমার মনে হয় আপনার ভালোই লাগবে।’

আমেরিকান বন্ধু জন র‍্যাপাপোর্টই সাতসুকির থাইল্যান্ড ভ্রমণের সব আয়োজন করে দিয়েছে। খেমার রুজ বাহিনী কম্বোডিয়ায় তাণ্ডব চালানোর পর থেকে সে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে সাংবাদিকতা করে বেড়ায় আর থাইল্যান্ডেও তার বহু পরিচিতজন রয়েছে। তার সুপারিশেই সাতসুকি গাইড ও ড্রাইভার হিসেবে নিমিতকে নেয়। তখন দুষ্টুমি ভরা চোখ টিপে তাকে বলেছে, ‘তোমাকে কোনো কিছুই নিয়ে ভাবতে হবে না। চুপ করে থাকো আর সব সিদ্ধান্ত নিমিতকে নিতে দাও। তাহলে দেখবে সবকিছু একেবারে ঠিকঠাক চলবে। লোকটা সত্যিই খুব চমৎকার।’

‘ঠিক আছে,’ সাতসুকি শেষে নিমিতকে বলে, ‘সবকিছু তোমার ওপরই ছেড়ে দিলাম।’

‘তাহলে কাল সকাল দশটায় আমি আপনাকে নিতে আসব…’

সাতসুকি চোখ বুজে ফেলে এবং এরোল গার্নারের বাজনায় মন ডুবিয়ে দেয়। সে মনে মনে ভাবে—হ্যাঁ, লোকটা কোবেতেই থাকত। আশা করি কোনো বড়, ভারী কিছুর নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে সে। অথবা তরল হয়ে যাওয়া মাটি তাকে গিলে ফেলেছে। এই বহু বছর ধরে তার জন্য আমি ঠিক এ ধরনের পরিণতিই চেয়ে এসেছি।

সাতসুকি তার ব্যাগ খুলে, একটা ড্রেস আর একটা স্কার্টের ভাঁজ ঠিক করে আলমারিতে ঝুলিয়ে দেয়। তারপর সাঁতারের পোশাক পরে হোটেলের পুলে যায়। নিমিত যেমনটা বলেছিল, সত্যিই এটা নিরিবিলিতে সাঁতার কাটার মতো কোনো পুল নয়। কলসির মতো গোল আকৃতির পুলটার মাঝখানে সুন্দর একটা জলের ধারা। দেখে তার অগভীর অংশে কয়েকটা শিশু বল ছুড়ে খেলায় মগ্ন। সাঁতার কাটার চিন্তা পুরোপুরি বাদ দিয়ে সে একটা ছাতার নিচে চেয়ারে শুয়ে পড়ে আর এক গ্লাস ওয়াইন ও কড়া স্বাদের এক বোতল পানির অর্ডার করে এবং তারপর জন লে কার-এর নতুন উপন্যাসটার যতটুকু পড়েছিল তার পর থেকে আবার পড়া শুরু করে। পড়তে পড়তে যখন তার ক্লান্তি আসে সে টুপিটা মুখের ওপর নামিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন তার চোখে একটা খরগোশের স্বপ্ন নেমে আসে—স্বপ্নটা খুবই ছোট। খরগোশটা যেন তারের জাল দিয়ে ঘেরা একটা খাঁচার ভেতরে গভীর রাতে কোনো অজানা কিছুর আগমনের আভাস পেয়ে কাঁপছে। প্রথমে সাতসুকি খাঁচার বাইরে থেকে খরগোশটা দেখে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে নিজেই খরগোশে পরিণত হয়। অন্ধকারের মধ্যে সেটাকে সে খুব সামান্যই দেখতে পায়। তবে জেগে ওঠার পরও তার মুখে একধরনের বিচ্ছিরি স্বাদ লেগে রয়।

স্বামীর বসবাস ছিল কোবে শহরে। তার বাড়ির ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর সাতসুকির জানা। আগে যতবার চেষ্টা করেছে একবারও তাকে খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়নি। তবে ভূমিকম্পের ঠিক পরে তার বাড়িতে ফোন করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সংযোগ কখনোই হয়নি। তাই তার মনে হয় কী যেন হয়েছে, জায়গাটা হয়তো ধ্বংস হয়ে গেছে। সারা পরিবার হয়তো ধনহীন হয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করছে। তুমি আমার জীবনের সঙ্গে যা করেছ, মানে যে সন্তানগুলো আমার হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তোমার কারণে হয়নি, সেগুলোর কথা ভাবলে মনে হয় এটাই তোমার প্রাপ্য সবচেয়ে কম শাস্তি।

নিমিত যে সুইমিংপুলটার কথা বলেছিল তাতে যেতে হোটেল থেকে একটা পাহাড় পার হয়ে আধা ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালাতে হয়। পাহাড়ের মাথার কাছে এক বনভূমিতে অনেকগুলো ধূসর বানর চোখে পড়েছে। তারা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে বসে চলন্ত গাড়ির দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে ছিল। মনে হয়েছে যেন দ্রুতগামী গাড়িগুলোর নিয়তি পাঠ করে নিচ্ছে।

সুইমিংপুলটা বেশ বড়সড় আর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা কিছুটা রহস্যময় এলাকার কাছেই তার অবস্থান। শক্তপোক্ত লোহায় বানানো ভাব-গম্ভীরে ভরা তার গেট। নিমিত গাড়ির জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে নিজের পরিচয় বলে। গার্ড আর কোনো কথা না বলে সাথে সাথে গেট খুলে দেয়। তা থেকে ঢুকে ছোট ছোট পাথর বিছানো পথের মাথায় একটা পুরোনো ও পাথরে তৈরি দুই তলা ভবন পার হতেই লম্বা ও চিকনাচাকনা ধরনের সুইমিং পুলটা চোখে পড়ে। সেটা কতটা পুরোনো তা বোঝা যায় না। তবে এটা কেবল সাঁতার কাটার জন্যই বানানো। এতে তিনজন একসাথে সাঁতার কাটতে পারে। আয়তাকার জলের অংশটি সুন্দর, চারপাশে লন আর গাছপালা। পুলে আর কোনো সাঁতারু না থাকায় পুরো এলাকা নীরব এবং মানুষের কোনো উপস্থিতির ছায়াও চোখে পড়ে না। কয়েকটি পুরোনো কাঠের ডেক চেয়ার পুলের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা।

‘জায়গাটা কেমন মনে হয় আপনার?’ নিমিত জিজ্ঞেস করে।

‘অসাধারণ,’ সাতসুকি বলে, ‘এটা কি কোনো অ্যাথলেটিক ক্লাব?’

‘না, সে রকমই কিছু,’ নিমিত বলে, ‘কিন্তু এখন প্রায় কেউ-ই এটা ব্যবহার করে না। আপনার ইচ্ছেমতো যত খুশি এখানে একাই সাঁতার কাটার ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি।’

‘ওহ, তোমাকে সত্যিই অনেক ধন্যবাদ, নিমিত। তুমি তো সত্যিই একজন অসাধারণ লোক।’

‘আপনি আমাকে বাড়তি সম্মান দিচ্ছেন,’ পুরোনো ধাঁচের ভদ্রতায় ভাবলেশহীন মুখে সামান্য নত হয়ে নিমিত বলে, ‘ওখানে যে কটেজটা আছে, সেটাই পোশাক বদলানোর ঘর। সেখানে টয়লেট ও শাওয়ার আছে। সব সুবিধা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করবেন। আমি গাড়ির কাছেই অপেক্ষা করছি। আপনার যদি কিছু লাগে, দয়া করে আমাকে কল দেবেন।’

সাতসুকি সব সময়ই সাঁতার কাটা ভালোবাসে আর সুযোগ পেলেই সে জিমের পুলে যায়। একজন কোচের কাছ থেকে সে সাঁতারের সঠিক ভঙ্গি শিখেছে। সাঁতার কাটার সময় সে তার মন থেকে সব অস্বস্তিকর স্মৃতি ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। যথেষ্ট সময় ধরে সাঁতার কাটলে সে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত মনে হয়—আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির মতো।

দীর্ঘদিন নিয়মিত শরীরচর্চার কারণে সে কখনো অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়নি, কিংবা শরীরের কোনো অসংগতিও টের পায়নি। তার ওজনও বাড়েনি। অবশ্যই, সে আর তরুণী নয়, ছিপছিপে শরীর ধরে রাখা আর এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে নিতম্বের কাছে সামান্য মেদ জমা প্রায় এড়ানোই যায় না। তা তো মেনে নিতেই হয়। সে কোনো ফ্যাশন মডেল হতে চায়নি। আসল বয়সের তুলনায় তাকে সম্ভবত পাঁচ বছর কম বয়সী দেখায়। তা তার নিজেকে মোটামুটি ভীষণ ভালোই লাগে বলা যায়।

নিমিত দুপুরে পুলের ধারে রুপার একটা ট্রেতে সাতসুকিকে আইস-টি আর স্যান্ডউইচ পরিবেশন করে। সবজি ও চিজের ছোট ছোট স্যান্ডউইচ, নিখুঁতভাবে কাটা ত্রিভুজের মতো তার আকার। তা দেখে সাতসুকি বিস্মিত হয়—‘এগুলো কি তুমি বানিয়েছ?’

প্রশ্ন শুনে নিমিতের ভাবশূন্য মুখে ক্ষণিকের জন্য একটুখানি পরিবর্তন দেখা যায়।

‘আমি না, ডাক্তার। আমি খাবার প্রস্তুত করি না। কাউকে দিয়ে বানানো হয়েছে।’

সাতসুকি প্রায় জিজ্ঞেসই করে ফেলে সেই ‘কেউটা’ আসলে কে, কিন্তু নিজেকে থামায়। কারণ, জন রাপাপোর্ট বলেছে, ‘চুপ করে থাকবে, সব সিদ্ধান্ত নিমিতকে নিতে দিয়ো, তাহলেই সব নিখুঁতভাবে চলবে।’

স্যান্ডউইচগুলো সত্যিই বেশ সুস্বাদু। দুপুরের খাবারের পর সাতসুকি একটু বিশ্রাম নেয়। তার ওয়াকম্যানে সে শোনে বেনি গুডম্যান সেক্সটেটের গান, তার ক্যাসেটটা তাকে নিমিত ধার দিয়েছে। তারপর সে আবার নিজের বই পড়া শুরু করে। বিকেলে সে আরও কিছুক্ষণ সাঁতার কাটে এবং তিনটার সময় হোটেলে ফিরে আসে।

সাতসুকি টানা পাঁচ দিন ঠিক একই রুটিন মেনে চলে। মন ভরে সাঁতার কাটে, সবজি আর চিজের স্যান্ডউইচ খায়, গান শোনে আর বই পড়ে। পুলে যাওয়া ছাড়া সে আর কখনোই হোটেলের বাইরে পা রাখেনি। তার একমাত্র চাওয়া নিখুঁত বিশ্রাম, এমনকি কিছুই না ভাবা।

পুলটা ব্যবহার করেছে একমাত্র সাতসুকিই। তার পানিটা সব সময়ই বরফশীতল, যেন পাহাড়ের নিচে বয়ে চলা কোনো ভূগর্ভস্থ ঝরনা থেকে তোলা। প্রথমবার ডুব দিতেই তার নিশ্বাস আটকে যায়, কিন্তু কয়েক চক্কর কাটার পর শরীর গরম হয়ে ওঠে, আর তখন পানির তাপমাত্রা একেবারে জুতসই লাগে। ক্রল সাঁতারে ক্লান্ত হয়ে পড়লে সে গগলস খুলে ব্যাকস্ট্রোকে সাঁতার কেটেছে। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়িয়েছে, আর তার ফাঁক গলে পাখি আর ফড়িং উড়ে গেছে। তখন সাতসুকির ইচ্ছে হয়েছে এভাবেই চিরকালটা কাটিয়ে দেওয়া।

পুল থেকে ফেরার পথে সাতসুকি একদিন নিমিতকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি ইংরেজি কোথায় শিখেছ?’

‘ব্যাংককে একজন নরওয়ের রত্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ৩৩ বছর চালক হিসেবে কাজ করেছি, আর তার সঙ্গে সব সময় ইংরেজিতেই কথা বলেছি।’

এ কথায় তার ইংরেজি বলার পরিচিত ভঙ্গিটার ব্যাখ্যা মিলে যায়। কারণ, বাল্টিমোরের যে হাসপাতালে সাতসুকি একসময় কাজ করেছে, সেখানে তার এক ডেনিশ কলিগ ঠিক এভাবেই ইংরেজিতে কথা বলেছে: নিখুঁত ব্যাকরণ, হালকা স্বদেশি টানওয়ালা উচ্চারণভঙ্গি, কোনো স্ল্যাং নেই। খুব পরিষ্কার, খুব সহজবোধ্য, যদিও রংঢং কিছুটা কম। থাইল্যান্ডে বসে নরওয়েজীয় ধাঁচের ইংরেজি শোনা—কী অদ্ভুতই তাই না!

কখনোই বিয়ে করিনি। ৩৩ বছর ধরে ছিলাম আরেকজন মানুষের ছায়া। সে যেখানে যেত, আমিও সেখানেই যেতাম, সে যা করত, সবকিছুতেই আমি তাকে সাহায্য করতাম। এক অর্থে যেন তারই একটা অংশ ছিলাম। এভাবে দীর্ঘদিন জীবন কাটালে জীবন থেকে সে নিজে আসলে কী চায়, তা ধীরে ধীরে মানুষ ভুলে যেতে বসে।

‘নরওয়ের সে রত্ন ব্যবসায়ী জ্যাজ গান খুব ভালোবাসত। সে যখনই গাড়িতে চলত, সব সময় একটা টেপ চালু থাকত। তাই তার চালক হিসেবে আমি স্বাভাবিকভাবেই জ্যাজ গানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠি। তিন বছর আগে সে মারা যাওয়ার আগে গাড়িটা এবং তার সব টেপ আমাকে দিয়ে গেছে । আমরা এখন যে টেপটি শুনছি, সেটিও তারই দেওয়া একটা।’

‘তাহলে সে মারা যাওয়ার পর তুমি বিদেশিদের জন্য একজন স্বাধীন ড্রাইভার কাম গাইড হয়ে গেছ, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই,’ নিমিত বলে, ‘থাইল্যান্ডে অনেক ড্রাইভার কাম গাইড আছে, কিন্তু নিজস্ব মার্সিডিজ আছে এমন হয়তো একমাত্র মানুষ আমিই।’

‘নিশ্চয়ই সে তোমার ওপর অনেক আস্থা রেখেছিল।’

নিমিত অনেকক্ষণ ধরে নীরব হয়ে থাকে। যেন সাতসুকির মন্তব্যের সঠিক জবাব খুঁজে বেড়ায়। শেষে বলে, ‘জানেন তো, ডাক্তার, আমি ব্যাচেলর। কখনোই বিয়ে করিনি। ৩৩ বছর ধরে ছিলাম আরেকজন মানুষের ছায়া। সে যেখানে যেত, আমিও সেখানেই যেতাম, সে যা করত, সবকিছুতেই আমি তাকে সাহায্য করতাম। এক অর্থে যেন তারই একটা অংশ ছিলাম। এভাবে দীর্ঘদিন জীবন কাটালে জীবন থেকে সে নিজে আসলে কী চায়, তা ধীরে ধীরে মানুষ ভুলে যেতে বসে।’

সে গাড়ির স্টেরিওর ভলিউমটা একটু বাড়ায়। গভীর, ভারী কণ্ঠের টেনর স্যাক্সোফোনের একক বাজনা বেজে চলে।

‘এই সংগীতটাই উদাহরণ হিসেবে ধরুন। এ গান নিয়ে নরওয়ের সে রত্ন ব্যবসায়ী আমাকে ঠিক কী বলেছিলেন, তা আমার স্পষ্ট মনে আছে। ‘শোনো, নিমিত। কোলম্যান হকিন্স-এর করা সুরের রেখাগুলো খুব মন দিয়ে শুনবে। সে এগুলো দিয়ে আমাদের কিছু বলতে চাইছে। খুব মনোযোগ দাও। সে তার ভেতরে বন্দী যে মুক্ত আত্মা তা যেন সর্বশক্তি দিয়ে পালিয়ে বেরোতে চাইছে, তার গল্প বলছে। সেই একই ধরনের আত্মা আমার ভেতরেও আছে, তোমার ভেতরেও আছে। এই যে তুমি নিশ্চয়ই শুনতে পাচ্ছ: উত্তপ্ত নিশ্বাস, হৃদয়ের শিহরণ।’ একই সংগীত বারবার শুনতে শুনতে আমি মন দিয়ে শোনা শিখে যাই, আত্মার সেই শব্দ শুনতে শিখি। কিন্তু তবু আমি নিশ্চিত হতে পারি না, আমি সত্যিই কি নিজের কান দিয়ে সেটা শুনেছি কি না। যখন আপনি দীর্ঘদিন কারও সঙ্গে থাকবেন এবং তার আদেশ মেনে চলবেন, এক অর্থে তার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো এক হয়ে যাবেন। আমি কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছেন, ডাক্তার?’

‘আমি মনে হয় বুঝতে পারছি,’ উত্তর দেয় সাতসুকি।

হঠাৎ করেই তার মনে হয়, নিমিত আর তার নরওয়েজীয় বস হয়তো প্রেমিক ছিল। এই ধারণার পক্ষে তার কাছে শুধু একঝলক অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া আর কোনো প্রমাণ নাই বটে তবে এতে বোঝা যেতে পারে, নিমিত আসলে কী বলতে চাইছে।

‘তবু, ডাক্তার, আমার কোনো সামান্য অনুতাপও নেই। যদি আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাই, তাহলে সম্ভবত ঠিক একই কাজই করব। আপনি কী করতেন?’

‘আমি জানি না, নিমিত। সত্যিই জানি না।’

এবার নিমিত আর কিছু বলে না। তারা ধূসর বানরদের পাহাড় পেরিয়ে আবার হোটেলে ফিরে আসে।

জাপানে রওনা হওয়ার আগের শেষ দিন, নিমিত সোজা হোটেলে ফিরে না গিয়ে সাতসুকিকে কাছের একটা গ্রামে নিয়ে যায়।

‘আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে,’ রিয়ারভিউ আয়নায় তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে। ‘একটা ব্যক্তিগত অনুরোধ।’

‘কী তা?’

‘আপনি আমাকে এক ঘণ্টা সময় দেবেন? আপনাকে আমি একটা জায়গা দেখাতে চাই।’

সাতসুকির কোনো আপত্তি করে না। এমনকি এটাও জিজ্ঞেস করে না তাকে নিমিত কোথায় নিয়ে যেতে চায়। কেননা তার আগেই ঠিক করা যে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিমিতের হাতে সঁপে দেবে।

ওই নারী গ্রামটার একেবারে শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট বাড়িতে থাকে। বাড়িটার চেহারা-সুরতে গ্রাম্য দরিদ্রের ছাপ। পাশে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে স্তরে স্তরে গাদাগাদি করা অসংখ্য ক্ষুদ্র ধানখেত। নোংরা, কঙ্কালসার গৃহপালিত পশু। কাদায় ভরা, গর্তে গর্তে ভাঙাচোরা রাস্তা। বাতাস ভর করা জলমহিষের গোবরের গন্ধ। তাদের পাশ দিয়ে জননাঙ্গ দোলাতে দোলাতে একটা ষাঁড় হাঁটতে থাকে। আবার দুদিকে কাদা ছিটিয়ে একটা ৫০ সিসি মোটরসাইকেল ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে পাশ দিয়ে চলে যায়। প্রায় নগ্ন কয়েকটা শিশু রাস্তার ধারে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে মার্সিডিজটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সাতসুকি বিস্ময়ে ভাবে যে তার বসবাসের এত উচ্চমানের রিসোর্ট হোটেলের কাছেই এমন শোচনীয় একটা গ্রাম কীভাবে থাকতে পারে!

বৃদ্ধা মহিলাটার বয়স সম্ভবত আশির কোঠায়। তার ত্বক পুরোনো চামড়ার মতো কালচে, গভীর ভাঁজগুলো যেন খাঁজ কেটে কেটে শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তার পিঠ কুঁজো দেওয়া। ফুলছাপওয়ালা ঢিলেঢালা একটা বড়সড় পোশাক তাঁর কঙ্কালসার দেহে নিস্তেজভাবে ঝুলে আছে। তাঁকে দেখে নিমিত দুহাত জোড় করে সম্ভাষণ জানায়। মহিলাও একইভাবে হাত জোড় করে।

সাতসুকি ও সেই বৃদ্ধা মহিলা টেবিলের দুপাশে বসে, আর নিমিত গিয়ে বসে আরেক প্রান্তে। শুরুতে কেবল বৃদ্ধা আর নিমিতই কথা বলে নেয়। তারা নিজেদের মধ্যে কী বলে, তার কিছুই সাতসুকি বুঝতে পারে না, তবে লক্ষ করে দেখে, এত বয়স হওয়া সত্ত্বেও বৃদ্ধার কণ্ঠ বেশ প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী। মনে হয়, তার দাঁতও সব কটি অটুট রয়েছে। কিছুক্ষণ পর মহিলা নিমিতের দিক থেকে ঘুরে সরাসরি সাতসুকির চোখের দিকে তাকায়। তার সে অন্তর্ভেদী দৃষ্টির কারণে সে যেন একবারও পলক ফেলতে পারে না। সাতসুকির মনে হয়, সে যেন পালানোর কোনো পথ নেই এমন একটা ঘরে আটকা পড়া কোনো ছোট প্রাণী। টের পায় যে তার সারা শরীর ঘামছে। মুখ জ্বলে উঠছে, এমনকি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাই একটা ওষুধ খেতে চায়, কিন্তু মিনারেল জলের বোতলটা গাড়িতেই রেখে এসেছে।

‘প্লিজ, আপনার হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখুন,’ নিমিত বলে। তার নির্দেশমতো সাতসুকি তা-ই করে। বৃদ্ধা সামনে ঝুঁকে সাতসুকির ডান হাতটা ধরে। বৃদ্ধার হাত ছোট হলেও আশ্চর্য রকমের শক্তিশালী। পুরো ১০ মিনিট ধরে (যদিও সেটি দুই-তিন মিনিটও হতে পারে), বৃদ্ধা কোনো কথা না বলে হাত চেপে ধরে রেখে সাতসুকির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাতসুকি নিজের কোঁচকানো চোখে সে তীব্র তাকানোটা সামলাতে চেষ্টা করে, আর বাঁ হাতে ধরা রুমাল দিয়ে মাঝে মাঝে কপালের ঘাম মুছে নেয়। শেষ পর্যন্ত, এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধা সাতসুকির হাত ছেড়ে দেয়। তারপর তিনি নিমিতের দিকে ফিরে থাই ভাষায় কিছু বলে। নিমিত তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনায়।

‘সে বলছে, আপনার শরীরের ভেতরে একটা পাথর আছে। কঠিন, সাদা পাথর। প্রায় একটা শিশুর মুষ্টির আকারের। তবে বলতে পারছে না যে পাথরটা কোথা থেকে এসেছে।’

‘পাথর?’ সাতসুকি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে।

‘পাথরের ওপর কিছু লেখা আছে, কিন্তু উনি তা পড়তে পারেন না, কারণ তা জাপানি ভাষায় লেখা ছোট ছোট কালো অক্ষরে। পাথর ও তার লেখাটি প্রাচীন—খুব পুরোনো। আপনি দীর্ঘদিন ধরে এটি আপনার শরীরের ভেতরে নিয়ে বসবাস করছেন। আপনাকে এই পাথরটা ফেলে দিতে হবে। অন্যথায় আপনার মারা যাওয়ার পর দেহ দাহ করা হলে, কেবল পাথরটাই রয়ে যাবে।’

এবার বৃদ্ধা ঘুরে সাতসুকির দিকে মুখ ফেরায় এবং ধীরে ধীরে অনেকক্ষণ থাই ভাষায় কথা বলে। তার কণ্ঠস্বরের ভঙ্গিতেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছে। আবারও নিমিত তার কথা অনুবাদ করে বলে—‘শিগগিরই আপনি একটা বড় সাপ স্বপ্নে দেখবেন। সবুজ, আঁশে-ঢাকা সাপটা ধীরে ধীরে একটা দেয়ালের গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে দেখতে পাবেন। যখন সেটা দেয়াল থেকে প্রায় ৩ ফুট বেরিয়ে আসবে, তখন আপনাকে তার ঘাড় চেপে ধরতে হবে এবং কোনোভাবেই ছাড়বেন না। সাপটা দেখতে খুব ভয়ংকর লাগবে, কিন্তু আসলে সে আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তাই আপনাকে ভয় পেতে হবে না। দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখবেন। একে নিজের জীবনের মতো ভেবে, সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে থাকবেন। স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত ধরে রাখবেন। সাপটা আপনার পাথরটা গিলে নেবে। আপনি কি বুঝতে পারছেন?’

‘এটা আবার কী ধরনের প্রশ্ন?’ সাতসুকি জানতে চায়।

‘আপনি শুধু বলেন যে বুঝেছেন,’ অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল নিমিত।

‘আমি বুঝেছি,’ বলে সাতসুকি।

বৃদ্ধা এবার হালকা করে মাথা নেড়ে আবার সাতসুকির সাথে কথা বলে।

‘লোকটা মারা যায়নি,’ নিমিত অনুবাদ করে বলে যায়, ‘তার শরীরে একটা আঁচড়ও লাগেনি। এটা হয়তো আপনার চাওয়ার মতো নয়, কিন্তু সে আহত না হওয়াটাই আসলে আপনার জন্য খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। এই সৌভাগ্যের জন্য আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।’

বৃদ্ধা কয়েকটা ছোট ছোট শব্দ উচ্চারণ করে।

‘কথা এখানেই শেষ,’ নিমিত বলে, ‘এবার আমরা হোটেলে ফিরে যেতে পারি।’

গাড়িতে ফিরে আসার পর সাসুকি জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে আমার এক ধরনের ভাগ্যগণনা করলে?’

‘না, ডাক্তার। ওটা ভাগ্যগণনা নয়। আপনি যেমন মানুষের শরীরের চিকিৎসা করেন, মহিলা তেমনি মানুষের আত্মার চিকিৎসা করে। সে মূলত মানুষের স্বপ্নের ভবিষ্যদ্বাণী করে।’

এখন থেকে, অল্প অল্প করে, আপনাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। যদি আপনি আপনার ভবিষ্যতের সমস্ত শক্তি শুধু বেঁচে থাকার পেছনেই ব্যয় করেন, তবে আপনি ভালোভাবে মরতে পারবেন না। ধীরে ধীরে আপনাকে গতি বদলাতে শুরু করতে হবে। এক অর্থে, বাঁচা আর মারা—দুটোরই মূল্য সমান।

‘তাহলে আমার উচিত ছিল তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে তাকে কিছু দিয়ে আসা। পুরো ঘটনাটা আমার কাছে এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে কিছু দিয়ে আসার কথাটাই মাথায় আসেনি।’

পাহাড়ি রাস্তায় একটি তীক্ষ্ণ মোড় ঘুরতে ঘুরতে নিমিত তার চেনা নিখুঁত ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ঘোরায়।

‘আমি তাকে টাকা দিয়েছি,’ সে বলে। ‘অল্পই। এমন কিছু নয় যে আপনাকে তা নিয়ে ভাবতে হবে। একে শুধু আপনার প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ভাবুন, ডাক্তার।’

‘তুমি কি তোমার সব ক্লায়েন্টকেই ওখানে নিয়ে যাও?’

‘না, ডাক্তার, শুধু আপনাকেই নিয়েছি।’

‘আমাকে কেন নিলে?’

‘আপনি একজন সুন্দর মানুষ, ডাক্তার। স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী। শক্ত মনের। কিন্তু মনে হয় আপনি সব সময় আপনার হৃদয়টাকে মাটির সাথে টেনে নিয়ে চলেছেন। এখন থেকে, অল্প অল্প করে, আপনাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। যদি আপনি আপনার ভবিষ্যতের সমস্ত শক্তি শুধু বেঁচে থাকার পেছনেই ব্যয় করেন, তবে আপনি ভালোভাবে মরতে পারবেন না। ধীরে ধীরে আপনাকে গতি বদলাতে শুরু করতে হবে। এক অর্থে, বাঁচা আর মারা—দুটোরই মূল্য সমান।’

‘একটা কথা বলো তো, নিমিত,’ সানগ্লাস খুলে যাত্রীর আসনের পেছনে ঝুঁকে সাতসুকি বলে।

‘কী কথা, ডাক্তার?’

‘তুমি কি মৃত্যুর জন্য রেডি?’

‘আমি তো অর্ধেক আগেই মরে গেছি,’ স্পষ্ট সত্যের মতো করে বলে নিমিত।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

সেই রাতে, প্রশস্ত ও ঝকঝকে পরিষ্কার বিছানায় শুয়ে সাতসুকি কেঁদে ওঠে। বুঝতে পারে, সে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে চলেছে। বুঝতে পারে, তার ভেতরে একটা কঠিন, সাদা পাথর রয়েছে। বুঝতে পারে, আঁশে-ঢাকা সবুজ একটা সাপ অন্ধকারের কোথাও লুকিয়ে আছে। সে সেই শিশুটার কথা ভাবে, যাকে সে কখনো জন্ম দেয়নি। সে সেই শিশুটাকে ধ্বংস করেছে, এক অতল কূপে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আর তারপর সে ত্রিশ বছর ধরে একজন মানুষকে ঘৃণা করে এসেছে। সে চেয়েছিল, লোকটা যন্ত্রণায় মারা যাক। সেই কামনা পূরণ করার জন্য সে নিজের হৃদয়ের গভীরতম স্তর অবধি একটা ভূমিকম্প কামনা করেছে। এক অর্থে, সে নিজেকে বলে, সেই ভূমিকম্পের কারণ তো আমিই। সে আমার হৃদয়কে পাথর বানিয়েছে, সে আমার শরীরকেও পাথর করে দিয়েছে। দূরের পাহাড়ে ধূসর রঙের বানরগুলো নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়েছে। এক অর্থে, বাঁচা আর মারা—দুটোরই মূল্য সমান।

এয়ারলাইনের কাউন্টারে সাতসুকি নিজের ব্যাগগুলো চেক-ইন করার পর নিমিতের হাতে একটা খাম তুলে দেয়, যার ভেতরে ১০০ ডলারের একটা নোট।

‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, নিমিত। তোমার কারণেই আমি এত সুন্দরভাবে বিশ্রাম নিতে পেরেছি। এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাকে দেওয়া একটা ব্যক্তিগত উপহার।’

খামটা গ্রহণ করে নিমিত বলে, ‘এটা আপনার খুবই সৌজন্যমূলক কাজ, ডাক্তার। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এক কাপ কফি খাওয়ার সময় আছে?’

‘হ্যাঁ, তা খাওয়া যেতে পারে।’

তারা একসঙ্গে একটা ক্যাফেতে যায়। সাতসুকি নিজে দুধ-চিনি ছাড়া কালো কফি নেয়। নিমিত নিজের কফিতে প্রচুর ক্রিম ঢেলে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে সাতসুকি কাপটা তার পিরিচের ওপর ঘোরাতে থাকে।

‘জানো,’ শেষে সে বলে, ‘আমার একটা গোপন কথা আছে, যা আমি কখনো কাউকে বলিনি। এ নিয়ে কথা বলার সাহস আমার কখনো হয়নি। এত দিন ধরে আমি একে নিজের ভেতর তালাবদ্ধ করে রেখেছি। কিন্তু এখন আমি তোমাকে বলতে চাই। কারণ, সম্ভবত আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। আমার বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ার পর, আমার মা আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি—।’

নিমিত দুহাত তুলে তালু সাতসুকির দিকে করে ফিরিয়ে মাথা নেড়ে বলে, ‘প্লিজ, ডাক্তার। আর কিছু বলবেন না। বৃদ্ধা যেমন বলেছে, আপনাকে সেই স্বপ্নটাই দেখতে হবে। আমি বুঝতে পারছি আপনি কেমন বোধ করছেন, কিন্তু সে অনুভূতিগুলোকে যদি কথায় রূপ দেন, তাহলে সেগুলো মিথ্যা হয়ে যাবে।’

সাতসুকি নিজের কথাগুলো গিলে নেয়, তারপর নীরবে চোখ বন্ধ করে গভীর ও পূর্ণ একটা শ্বাস নিয়ে আবার ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেয়।

‘স্বপ্নটা দেখুন, ডাক্তার,’ সদয় উপদেশের ভঙ্গিতে বলে নিমিত, ‘এখন আপনার সবচেয়ে বেশি দরকার শৃঙ্খলা। ফাঁপা কথাবার্তা ঝেড়ে ফেলুন। কথা শেষ পর্যন্ত পাথর হয়ে যায়।’

নিমিত হাত বাড়িয়ে সাতসুকির হাত দুটোর মাঝে নিজের হাতটা রাখে। তার হাতগুলো অদ্ভুত রকমের মসৃণ ও তরুণ মনে হয়। তা যেন সব সময়ই দামি চামড়ার দস্তানায় সুরক্ষিত ছিল। সাতসুকি চোখ খুলে নিমিতের দিকে তাকায়। সে তখন হাত সরিয়ে নেয় এবং আঙুলগুলো জড়িয়ে টেবিলের ওপর রেখে দেয়।

‘আমার নরওয়েজিয়ান বস আসলে একটা শীতল, নির্জন এলাকার মানুষ ছিল,’ সে বলে, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এলাকাটা নরওয়ের একেবারে উত্তর প্রান্তে, উত্তর মেরুর কাছাকাছি। সেখানে অনেক রেইনডিয়ার জাতের হরিণ থাকে। গ্রীষ্মকালে সেখানে রাত হয় না, আর শীতকালে দিন হয় না। সম্ভবত ঠান্ডা তার সহ্যের বাইরে চলে যাওয়াতেই সে থাইল্যান্ডে এসেছিল। বলা যায়, এই দুটো জায়গা একেবারেই পরস্পরের বিপরীত। সে থাইল্যান্ডকে খুব ভালোবাসত, আর এখানেই নিজের হাড়গোড় সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। তবু মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সে জন্মভূমির সেই শহরটার ভুলতে পারেনি। সে প্রায়ই আমাকে সে জায়গার কথা বলত। অথচ তা সত্ত্বেও, ৩৩ বছরে একবারের জন্যও নরওয়েতে ফিরে যায়নি। নিশ্চয়ই সেখানে এমন কিছু ঘটেছিল, যা তাকে দূরে রেখেছে। তার ভেতরেও ছিল একটা পাথর।’

নিমিত তার কফির কাপটা তুলে এক চুমুক দেয়, তারপর কোনো শব্দ না করে খুব যত্নে আবার কাপটা তার পিরিচের ওপর রাখে।

‘একবার সে আমাকে একাকী প্রাণী শ্বেতভালুকের কথা বলেছে। তারা বছরে কেবল একবারই জোড়া বাঁধে। পুরো বছরের মধ্যে একবার মাত্র। তাদের দুনিয়ায় কোনো স্থায়ী পুরুষ-মহিলা বন্ধন নেই। এক পুরুষ শ্বেতভালুক আর এক স্ত্রী শ্বেতভালুক হঠাৎ করে কোথাও বরফে ঢাকা বিশাল এলাকায় দেখা হয়, এবং তারা মিলিত হয়। খুব বেশি সময় নেয় না। আর একবার শেষ হয়ে গেলে, পুরুষটা যেন প্রাণভয়ে দৌড়ে পালায়। সেই জায়গা থেকে দূরে সরে যায় যেখানে তারা মিলিত হয়েছিল। কখনো পেছনে তাকায় না—সত্যিই। বছরের বাকি সময়টা সে গভীর একাকিত্বে কাটায়। পারস্পরিক যোগাযোগ—দুটো হৃদয়ের সংস্পর্শ—তাদের মধ্যে নেই। সুতরাং হয়তোবা শ্বেতভালুকের আসল গল্প অথবা অন্তত আমার বস আমাকে এভাবে বানিয়ে বলেছে।’

‘খুবই অদ্ভুত ব্যাপার,’ বলে সাতসুকি।

‘হ্যাঁ’ মুখ গুরুগম্ভীর করে বলে নিমিত, ‘এটা সত্যিই অদ্ভুত। আমার মনে আছে, বসকে তখন জিজ্ঞেস করেছি, ‘তাহলে শ্বেতভালুকরা কেন আছে?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই,’ সে বড় একটা হাসি দিয়ে বলেছে। ‘তাহলে আমরা কেন আছি, নিমিত?’

বিমান অনেক উঁচুতে ওঠার পর সিটবেল্ট বাঁধার সাইন নিভে গেলে সাতসুকির মনে পড়ে আমি জাপানে ফিরছি। তারপর সামনে যা আছে, তা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে হাল ছেড়ে দেয়। ‘কথা শেষ পর্যন্ত পাথর হয়ে যায়,’ নিমিতের বলা কথা মনে পড়ে।

সাতসুকি এবার গভীরভাবে আসনে বসে চোখ বন্ধ করে। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই আকাশের ছবি, যা সে পিঠ-সাঁতার কাটার সময় দেখেছিল আর কানে ভেসে আসে এরল গার্নারের গান ‘আই’ল রিমেম্বার এপ্রিল’। তখন সাতসুকি মনে মনে চায়—আমাকে ঘুমাতে দাও, শুধু আমাকে ঘুমাতে দাও। আর স্বপ্নকে আসতে দাও।