পুরোনো পত্রিকা অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস
পুরোনো পত্রিকা অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

সুফিয়া কামালের স্মৃতিগদ্য

আমার দেখা নজরুল

সুফিয়া কামালের স্মৃতিগদ্য ‘আমার দেখা নজরুল’ ১৯৯৯ সালের ২১ মে প্রথম আলোর সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এত দিন লেখাটি শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়েই ছিল, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

আমার সঙ্গে কবি নজরুলের পরিচয় কী করে ঘটেছিল সেটা বলা বেশ কঠিন। সে শুধু অনুভব করার বস্তু। কিশোর বয়সে কঠিন অবরোধের অন্তরালে থেকে আল্লাহর দেওয়া দানে আমি নজরুলকে আত্মার আত্মীয়রূপে লাভ করেছি। নজরুল ভালোবাসতেন মাটি-মাতাকে; ভালোবাসতেন সুন্দরকে, সুন্দরের সৃষ্টিকে এবং ছিলেন সুন্দরের সাধক। মাটির মানুষ হয়ে তিনি জন্মেছিলেন। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার তিনি সহ্য করতে পারতেন না। দুঃখের মধ্য দিয়ে তিনি সুখ-দুঃখের সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাই মাটির সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার যোগাযোগ: এই ধরণির ধূলিতে যে ফুলের ফসল ফলাতে চেয়েছে, তাকেই তিনি আপন বলে নিজের কাছে টেনে নিয়ে সৃষ্টিশক্তিতে সাহায্য করে পৃথিবীকে করতে চেয়েছেন সুন্দর।

মনে পড়ে কোনো বর্ষামুখর দিনে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য–পত্রিকা’য় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘হেনা’ পড়ছিলাম বানান করে করে। প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল, তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে?

এর বেশ পরের কথা। আমরা তখনো বরিশালে আছি। আমার ছোট মামা সৈয়দ ফজলে রাব্বী সাহেব ঢাকায় পড়তে আসেন। এখানে তখন মোহাম্মদ কাশেম সম্পাদিত ‘অভিযান’ নামে একটি পত্রিকা বের হতো। মামা আমার খাতাটা সঙ্গে এনেছিলেন। তা থেকে কবিতা বেছে বেছে ‘অভিযান’-এ প্রকাশ করতে দিতেন। সেই সময়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় আসেন। ‘অভিযান’-এ লেখা দেখে তিনি নিজেই আমাকে উচ্ছ্বসিত ভাষায় প্রশংসা করে এবং উত্সাহ দিয়ে চিঠি লেখেন। আরও লেখেন যে কলকাতায় নাসিরউদ্দীন সাহেব ‘সওগাত’ বের করেছেন। সেখানে যেন অবশ্যই আমি লেখা পাঠাই। কবির স্নেহসিক্ত সে চিঠি আমার কাছে আজ আর নেই। কিন্তু সেই যে প্রথম লেখা কবিতা ‘সওগাত’-এ পাঠালাম, তা ছাপা হলো। তখনো না নাসিরউদ্দীন সাহেব, না কবি নজরুল ইসলাম—কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

এরপর আমরা চরভাঙা, ঘরভাঙা হয়ে এলাম কলকাতা। সেটা তিরিশের কথা। ‘সওগাত’-এ লেখা দিলাম। কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগরে থাকতেন। মাঝে মাঝে ‘সওগাত’ অফিসে আসতেন। একবার এসে শুনলেন আমি কলকাতায় আছি। হঠাৎ এক দুপুরে প্রাণোচ্ছ্বাসের প্লাবন ছড়িয়ে আমাদের বাসায় এসে তিনি উপস্থিত। বাসায় তখন আমার মা ও আমি ছাড়া কেউ ছিল না। আর তাঁর ‘সুফিয়া’ ডাক শুনে আমরা তো হতভম্ব। কোনো দিন বাইরের কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখা করিনি। কিন্তু তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে কি থাকতে পারি? কী আনন্দে, কী লজ্জায় বুক কাঁপা অবস্থায় তাঁর সামনে আসতেই তিনি বললেন, ‘আরে, এই তুমি! আমি তো ভেবেছিলাম কী জানি এক মস্ত বড় লেখিকা। এ তো দেখি একটা পুতুল। তোমাকে আমি লুফবো।’

কী ভয়ানক! আমি তো ভয়ে পিছিয়ে এলাম। নেবেন নাকি কোলেই তুলে! কী হাসি আর কী মমতাভরা কণ্ঠে লেখার তারিফ করলেন। এর মধ্যে আমার স্বামীও বাইরে থেকে এসে গেলেন। নাশতা তৈরি করে দিলাম। তাতেও খুশি। বললেন, ‘লেখার তারিফ বেশি করব, নাকি রান্নার তারিফ সেটা বুঝতে পারছি না। সুফু, আমার বোন নেই। তুমি আমাকে দাদু ডাকবে আর “তুমি” বলবে।’

এক দিনে এত অকপট স্নেহ-মমতা, উদারতায় কাছে টেনে নিলেন যিনি, তাঁকে ভক্তি না করে পারি!

নজরুল ছন্দে গানে মজলিশ জমিয়ে দিতেন। দিনে রাতে আমাদের বাড়ি তাঁর গানে আবৃত্তিতে উত্সবমুখর হয়ে উঠত। গান লিখে সুর দিতে তাঁর কিছুই দেরি হতো না। আত্মভোলা শিশুরূপে আমাদের সঙ্গে তিনি মিশতেন। বন্ধুবাত্সল্যে তাঁর তুলনা ছিল না। কোনো নতুন লেখক বা লেখিকা একবার তাঁর কাছে গেলে তিনি আদরে তাকে দুহাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিতেন, উত্সাহ দিতেন, প্রেরণা জোগাতেন তার লেখায়।

একদিন আমাদের বাড়িতেই আসর জমিয়ে বসেছেন নজরুল। আমরা সবাই আছি। গান শুনছি, কবিতা শুনছি। একসময় নজরুল গেয়ে উঠলেন, ‘তুমি টিকিটিকি, জানি ঠিক-ঠিকই...’

দেখি একজন লোক উঠে চলে গেল। পরে বুঝলাম সে ছিল সিআইডির লোক। নজরুলের পিছু নিয়ে এ বাড়ি ঢুকে পড়েছিল। আর নজরুলও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন এবং কায়দা করে মুখে মুখে গান বানিয়ে লোকটাকে তা জানিয়েও দিলেন।

আরেকটা ঘটনা মনে করে খুব কষ্ট পাই। প্রায় দিনের মতোই নজরুল একদিন এসেছেন আমাদের বাড়িতে। গল্প হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে, চলছে গান-আলোচনা। সঙ্গে চা-নাশতা তো আছেই। আমিও যথারীতি ওই উপভোগ্য আড্ডায়। এমন সময় আমার দুলাভাই এসে হাজির। মুসলমান মেয়ে একজন হিন্দু কাফেরের (!) সামনে গেছি, এটা তাঁর সহ্য হলো না। নজরুলের সামনেই তিনি আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভেতরে। খুব কষ্ট লেগেছিল সেদিন। সে ঘটনার পরও নজরুল ইসলাম খানিকক্ষণ ছিলেন সে সভাতেই। তারপর উঠে চলে যান। ওই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে তিনি আবার এসেছেন। তবে কিছু জিজ্ঞেস করেননি।

কী যে ভালোবাসতেন তিনি আমাকে! অনেক বই উপহার দিয়েছেন। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী—সব বই-ই নিজের হাতে লিখে উপহার দিয়েছেন আমাকে।

বিদ্রোহী কবিকে কতবার কত রূপে দেখলাম। পরিহাসপরায়ণ গেরুয়াবস্ত্র পরে হাতে একতারা যন্ত্রটা নিয়ে কত ভোরে বাউল গান গেয়ে তিনি আমাদের ঘুম ভাঙিয়েছেন। অনেকে হয়তো জানেন না, তিনি একজন ভালো দাবাড়ুও ছিলেন। আমার ভাইয়ের সঙ্গে দাবা খেলতে বসে রাত ভোর করে দিয়েছেন। নিজের হাতে করে তাঁকে সেই অবস্থায় মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছি, কিন্তু তা তখন তাঁর মনেও হয়নি। পরে বলেছেন, ‘তোদের মতো মায়ের বোনের মমতা না থাকলে এ দুনিয়ায় আমি বাঁচতাম না।’ কোনো শিল্পী কোনো কবিকে তিনি নর বা নারীরূপে পৃথক করে যেন দেখতে জানতেন না। তাঁর কাছে গেলে সবাই সমান হয়ে যেত। সাদরে বাহু বাড়িয়ে তিনি কাছে টেনে নিতেন। এই কাছে যাওয়ায় অন্তত আমার মনে কোনো কুণ্ঠা বা লজ্জা-দ্বিধার ভাব জাগেনি কোনো দিন।

আমি নজরুলকে দেখেছি হঠাৎ অন্তহীন দিগন্তে চেয়ে থাকা এক ধ্যানমূর্তিরূপে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ যেন কী দেখতে পেতেন তিনি দূর দিগন্তসীমায়। অপলক চোখে কতক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ গেয়ে উঠতেন কোনো একটা নতুন গানের ছন্দ। তক্ষুনি কাগজ-কলম নিয়ে তা লিখে সুর দিয়ে গেয়ে যেতেন। শরীর-স্বাস্থ্য তাঁর ছিল অপূর্ব। এত অনিয়ম-অত্যাচারেও তাঁর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়নি। পান ও চা খেয়ে তিনি কত দিন কাটিয়ে দিয়েছেন, নিজের মুখে বলতেন সে কথা। মোটরে চড়া তাঁর একটা নেশা ছিল। আমিরি মেজাজে তিনি মাটির কোলে লুটিয়ে থাকতে লজ্জা পেতেন না। এই তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কবি নজরুলের মাধ্যমেই ‘সওগাত’ সম্পাদক নাসিরউদ্দীন সাহেবের বাড়ি ১১ নং ওয়েলেসলি স্ট্রিটে আমার যাওয়া-আসার সূত্রপাত। সেই থেকে নাসিরউদ্দীন সাহেব আমার সুখে-দুঃখে, বিপদে-শোকে অগ্রজের ভূমিকা পালন করে সদাসতর্ক স্নেহদৃষ্টি দিয়ে সাহিত্য-সাধনায় আমাকে নিযুক্ত রেখেছেন। এ কথা আমি কখনো ভুলব না।

কৃষ্ণনগর থেকে নজরুলকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন ‘সওগাত’ সম্পাদক নাসিরউদ্দীন। ‘সওগাত’ অফিসেই তখন তিনি থাকতেন। সে সময় ‘সওগাত’-এ যখন যেতাম, তখনই দেখা হতো তাঁর সঙ্গে। ওখানেই কত গল্প করেছি, রান্না করে খাইয়েছি।

নজরুল ইসলাম গান-কবিতা-গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে সঙ্গে তখন রাজনীতিতেও জড়িয়েছেন ভালোমতো। কিন্তু তখন থেকেই যে তিনি একটু একটু করে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন সেটা বুঝতে পেরেছি পরে। তবে সে সময়ের একটা ঘটনা বেশ মনে পড়ে। আমরা ‘সওগাত’ অফিসে বসে। নজরুল ইসলামও আছেন। তখন কে একজন এসে নজরুলকে বললেন, ‘মেটেবুরুজ থেকে লোক এসেছে আপনাকে নিতে। সেখানে নাকি মিটিং আছে?’

এ কথা কটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেগে গিয়ে নজরুল বললেন, ‘কে বলেছে মিটিং...কোথায় মিটিং... না, আমি যাবো না। আমি স্বাধীন, আমি আজাদ। আমি কোথাও যাবো না।’

কিছুক্ষণ পর নাসিরউদ্দীন সাহেব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি যাওয়ার কথা? ওখানকার লোকজন এসে তো বসে আছে।’

‘লোক এসেছে?’ জিজ্ঞেস করলেন নজরুল।

নাসিরউদ্দীন বললেন, ‘হ্যাঁ’।

নজরুল বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার তো ওদের ওখানে যাওয়ার কথা। কই লোক কই?’

এ কথা বলে চলে গেলেন ওদের সঙ্গে। সেদিন ওখানে ছিলেন অনেকক্ষণ। শুনেছি তিনি নাকি ফিরেছেন রাত বারোটায়।

কবিজীবনের বাইরে নজরুলের সাংসারিক জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল। তিনি ছিলেন প্রেমময় স্বামী, স্নেহময় পিতা, প্রীতিময় বান্ধব। অসুস্থ পত্নী প্রমীলার চিকিত্সা যথাসাধ্য করার পরও রোগ যখন আরোগ্যের দিকে না গিয়ে আরও বেড়ে চলল, তখন নজরুল কলকাতার মৌলা আলীর দরগা থেকে শুরু করে যত পীর-ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীকে পেলেন তাঁদের দিয়ে দোয়া, তাবিজ, পানিপড়া, ঝাড়-ফুঁক অনেক করালেন। কিন্তু তারপর আল্লাহর কাছে পত্নীর রোগমুক্তির প্রার্থনায় লেগে গেলেন। আন্তরিক আকুলতা নিয়ে তিনি শুরু করলেন ইসম কালাম। পাতার পর পাতা উলটিয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলেন। রাতে-দিনে তাঁর মন পত্নীর প্রতি সানুরাগ একাগ্রতায় সন্ধানী আলো জ্বালিয়ে খুঁজতে লাগল সেই ইসম, যা পড়ে ফুঁ দেওয়ামাত্র তাঁর জীবনসঙ্গিনী আবার সুস্থ হয়ে উঠে তাঁর জীবন ও সংসার আনন্দময় করে তুলবেন। কিন্তু বহুদিন অস্থির মন নিয়ে সন্ধান করেও সেই পরশমণির সন্ধান তিনি পেলেন না।