ছবি: সংগৃহীত। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
ছবি: সংগৃহীত। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বিশ্বসাহিত্য

ডেনিস লিভারটভ: যুদ্ধ, যন্ত্রণা, সংশয়, অধ্যাত্মবাদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্র যেসব কবিকে সেলিব্রেট করেছে, তাঁদের এক অপ্রতিম কণ্ঠস্বর ডেনিস লিভারটভ (২৪ অক্টোবর ১৯২৩—২০ ডিসেম্বর ১৯৯৭)। দীর্ঘ আর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যিনি রেখে গেছেন ঈর্ষণীয় এক কবিতার পৃথিবী। শিল্পী ও মানবতাবাদী হিসেবে অভিহিত এই কবির ক্যানভাসে একই সঙ্গে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে প্রকৃতি, প্রেম, প্রার্থনা, যুদ্ধ, যন্ত্রণা, দর্শন, মৃত্যু আর মরমি মূর্ছনা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞানচর্চায় ডেনিসের অবস্থান ঠিক কোথায়; সেটার একটা অনুমান পাওয়া যায় দেশটির আরেক বিশ্রুত কবি অ্যামি গার্স্টলারের (১৯৫৬) লেখায়, ‘লিভারটভকে মূল্যায়ন করতে গেলে মর্যাদা, ভক্তি আর শক্তি—এই শব্দগুলোই প্রথমে মাথায় আসে। স্বচ্ছ ও ঋজু কণ্ঠে; মর্ত্যের রূপরহস্য আর যন্ত্রণাগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তিনি দেখতে জানতেন।’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তোলপাড় সাংস্কৃতিক আবহে ডেনিস আসেন এক আগ্নেয়গিরি হয়ে; সঙ্গে করে ব্যক্তিগত উপলব্ধি আর সমাজচিন্তার এক নজিরবিহীন সংমিশ্রণ। তখনকার চলমান রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট—বিশেষ করে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও নাগরিক অধিকার আন্দোলন নিয়ে তিনি ছিলেন খোলামেলা এক প্রতিবাদী।

প্রকৃতি, নগরজীবন আর সংসারের নৈমিত্তিক দৃশ্য থেকে কাব্যের নির্যাস চুষে আনতেন লিভারটভ। আর তাই এই সুতীব্র বিবমিষা আর একঘেয়েমির কংক্রিট নগরজীবনও তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে সংগীত, হয় চিত্রকলা। গবেষকেরা ডেনিসের কবিতাশৈলীতে দুটি আলাদা বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন—সরাসরি প্রকাশ ও স্পষ্টতা; আর সেটিই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশাল এক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে। সেখানে মুক্তক ছন্দের পাশেই রয়েছে টুকরো চিত্র; আর এমন এক ছন্দময় সংগীতধারা, তাঁরা তাতে বয়ে যেতে দেখেন অনায়াসে, যা মানুষকে নিয়ে যায় তাঁর আবেগের কেন্দ্রভূমিতে। তাঁর কবিতার তাৎপর্য হলো ব্যক্তি ও রাজনীতি উভয়ই সেখানে সমানভাবে উপস্থিত; প্রাথমিক পাঠে সরল মনে হলেও তা অন্তর্নিহিত এক বৈভবে পূর্ণ।

কবির বাইরে প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন লিভারটভ। না, সময়ের ট্রেন্ড ‘আধুনিকতাবাদী নিরীক্ষা’কে তিনি একেবারে বাদ দেননি; আবার পুরোটা গ্রহণেরও পক্ষে ছিলেন না। মনোযোগ দিয়েছেন কবিতার সহজবোধ্যতার ওপর; আর খুব করে চাইতেন তাঁর লেখা যেন সর্বস্তরের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দাগ রেখে যেতে পারে। জীবদ্দশাতেই সেই সাধ অবশ্য পূর্ণ হয়েছিল; চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি প্রথম কবিতার বই দ্য ডাবল ইমেজ দিয়ে যে পরিচিতির অভিষেক; মাত্র পরের দশকেই সেটা সাফল্যের চূড়ায় গিয়ে ঠেকবে; আর একই সময়ে ইংল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হলে ক্রমশ হয়ে উঠবেন আধুনিক মার্কিন কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তোলপাড় সাংস্কৃতিক আবহে ডেনিস আসেন এক আগ্নেয়গিরি হয়ে; সঙ্গে করে ব্যক্তিগত উপলব্ধি আর সমাজচিন্তার এক নজিরবিহীন সংমিশ্রণ। তখনকার রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট—বিশেষ করে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও নাগরিক অধিকার আন্দোলন নিয়ে তিনি ছিলেন খোলামেলা এক প্রতিবাদী।

ডেনিসের মা বিয়াট্রিস অ্যাডিলেড স্পুনার-জোন্স ছিলেন ওয়েলশ বংশোদ্ভূত; আর বাবা পল ফিলিপ লেভারটফ একজন রুশ ‘হাসিদিক ইহুদি’। আঠারো শতকে পূর্ব ইউরোপে উদ্ভূত এই ইহুদি মরমি গোষ্ঠীটি ধর্মের কঠোর আইন-কানুনের চেয়ে আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তিগীতি এবং পবিত্রতা ও আনন্দের সঙ্গে ঈশ্বরের উপাসনায় অধিক গুরুত্ব দিতেন। ‘হাসিদিক’ পরিচয়ের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পলকে ‘ভিনদেশি শত্রু’ (এনিমি এলিয়েন) হিসেবে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। মুক্তি পেয়ে পরে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে আসেন; সেখানে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়ে হয়ে ওঠেন একজন অ্যাংলিকান যাজক। পাশাপাশি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেনও। চার্চ কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, তিনি হয়তো ইহুদি–অধ্যুষিত কোনো অঞ্চলে ধর্মপ্রচার করতে চাইবেন; এ কারণে তাঁরা ইলফোর্ডে পলের আবাসনের ব্যবস্থা করে দেয়। ওই শহরেই লিভারটভের জন্ম; আর শৈশবের বড় একটা অংশ অতিবাহিত হয়। সেখানেই শেখেন ব্যালে, আর্ট, পিয়ানো আর ফ্রেঞ্চ; বড় বোন ওলগার সঙ্গে বাড়িতে মায়ের কাছেই হাতেখড়ি নেন; আর মাঝেমধ্যে ধর্মীয় পাঠ দিতেন বাবা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চার দেয়াল ডেনিসকে কখনোই আটকে রাখতে পারেনি; শুরুর দিকের সাহিত্যিক চেতনার পুরোটাই গড়ে ওঠে পারিবারিক আবহে। ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের (১৮১২-১৮৮৯) শিক্ষার সঙ্গে তুলনা করে মার্কিন গবেষক ক্যারোলিন ম্যাটলেন (১৯৩৯-২০২১) যাকে বলেন ‘একদম অর্ডার দিয়ে তৈরি করা’ এক পরিবেশ। মা বিয়াট্রিস সবাইকে শোনাতেন উনিশ শতকের সেরা সব কথাসাহিত্য আর টেনিসনের লিরিকধর্মী কবিতা। অন্যদিকে বাবা ছিলেন হিব্রু, রুশ, জার্মান ও ইংরেজি ভাষার দক্ষ একজন লেখক। দরকারি কোনো বইয়ের খোঁজে তিনি প্রায়ই একগাদা পুরোনো বই কিনে আনতেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই লিভারটভ এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে চারপাশে সারাক্ষণ বই আর বই নিয়ে চলত বহুভাষিক আলাপচারিতা।

পারিবারিক এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডল ডেনিসকে অতি অল্প বয়সেই লেখালেখির দিকে টেনে নেয়; মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি ঘোষণা দেন: বড় হয়ে লেখক হতে চান। নিজের কাব্যপ্রতিভা নিয়েও ছিল তাঁর অটল আত্মবিশ্বাস; আর তাতে আস্থা রাখেন ওই সময়ের প্রথিতযশা অনেক কবি-সাহিত্যিকও। মার্কিন লেখক ও জীবনীকার জিন গোল্ডের (১৯০৯-১৯৯৩) বয়ানে জানা যায়: তখনকার আধুনিকতাবাদী কাব্যসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব টি এস এলিয়টকে (১৮৮৮-১৯৬৫) লিভারটভ যখন নিজের লেখা কবিতা পাঠান, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর। প্রত্যুত্তরে, এলিয়টও তাঁকে ‘চমৎকার সব পরামর্শ’ দিয়ে দুই পাতার টাইপ করা একটা দীর্ঘ চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠি তাঁকে কবিতা লেখা আর সেটা প্রকাশের ব্যাপারে অদম্য এক স্পৃহা এনে দেয়। আর এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৪০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তৎকালীন প্রভাবশালী পোয়েট্রি কোয়ার্টারলি–তে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা।

শুরুর দিকে ডেনিসের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সমালোচক হার্বার্ট রিড (১৮৯৩-১৯৬৮); সম্পাদক চার্লস রে গার্ডিনার (১৯০১-১৯৮১) আর কবি কেনেথ রেক্সরথের (১৯০৫–১৯৮২) মতো ব্যক্তিত্বরা। প্রথম কবিতা প্রকাশের পর বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী মার্কিন কবি রেক্সরথ, পরে যিনি লিভারটভের ‘সাহিত্যিক অভিভাবক’ও হয়ে উঠবেন, মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন: ‘অল্প সময়ের মধ্যেই হার্বার্ট রিড, তাম্বিমুত্তি, চার্লস রে গার্ডিনার আর আমি—আমরা সবাই তাঁকে নিয়ে উত্তেজিত হয়ে চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু করি। তিনি ছিলেন ‘নব্য রোমান্টিকতাবাদের’ কনিষ্ঠতম সদস্য। তাঁর কবিতায় এমন এক বিষণ্ন আর তন্দ্রালু ঘোর ছিল; যা ম্যাথিউ আর্নল্ডের ডোভার বিচ ছাড়া ইংরেজি সাহিত্যের আর কোথাও তেমন দেখা যায়নি। তাঁর এই সৃষ্টিকে রিলকের শুরুর দিকের কবিতা কিংবা ব্রহ্মসের করুণ কোনো সুরের মূর্ছনার সঙ্গেও তুলনা করা চলে।’ অনেকের মতে, প্রথাগত শিক্ষার অভাবই লিভারটভের কবিতাকে করে তুলেছে অসম্ভব স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট আর সহজবোধ্য। বিশিষ্ট মার্কিন অনুবাদক ও কবি ডরিস আর্নশ (১৯২৪) যেমন বলেন, ‘লিভারটভকে কখনোই পাণ্ডিত্যপূর্ণ জটিলতা বা দুর্বোধ্য সাহিত্যিক সংকেতের বোঝা বহন করতে হয়নি; যে ধরনের “বন্ধ” বা ছদ্ম-গম্ভীর শৈলীকে “প্রোভেন্সাল কবি”রা “ক্লোজড” বলে ডাকতেন।’

জীবনীকার জিন গোল্ডের বয়ানে জানা যায়: তখনকার আধুনিকতাবাদী কাব্যসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব টি এস এলিয়টকে লিভারটভ যখন নিজের লেখা কবিতা পাঠান, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর। প্রত্যুত্তরে, এলিয়টও তাঁকে ‘চমৎকার সব পরামর্শ’ দিয়ে দুই পাতার টাইপ করা একটা দীর্ঘ চিঠি প্রেরণ করেন।

ইহুদি, জার্মান, ওয়েলশ আর ব্রিটিশ পরিচয়ের এক হাইব্রিড প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠলেও কোনোটার সঙ্গেই ডেনিস ঠিক খাপ খাওয়াতে পারেননি; আর এই ‘বিচ্ছিন্নতা’ ও অস্তিত্বের সংকট থেকে তাঁর মনে ‘এক বিশেষত্বের’ অনুভূতি জন্ম নেয়; নিজেকে ভাবতে শুরু করেন একজন স্বতন্ত্র ও ‘একক’ মানুষ হিসেবে। তাঁর জবানিতে, ‘দশ বছর পেরোনোর আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি আর কিচ্ছু না, একজন শিল্পী; আর বিশেষ একটা এজেন্ডা নিয়ে আমার জন্ম, সেটা হলো লেখালেখি।’ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের এই দৃঢ় অবস্থান থেকে পিতার পদবি ‘লিভারটফ’ বানানকে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে লিখতেন ‘লিভারটভ’। অচিরেই তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আবির্ভূত হবে ‘রাজনীতি’। বাবা পলকে দেখতেন মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বক্তৃতা দিচ্ছেন; স্পেনের প্রতি ব্রিটেনের উদাসীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হচ্ছেন বাবা ও বোন দুজনেই; আর মা বিয়াট্রিস কাজ করছিলেন ‘লিগ অব নেশনস ইউনিয়নে’র হয়ে। ডেনিস নিজেও ইলফোর্ড লেনের শ্রমজীবী পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী সংবাদপত্র ডেইলি ওয়ার্কার। ত্রিশের দশকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা চরম অর্থনৈতিক মন্দায় শ্রমিকদের বেকারত্ব, অনাহার ও অধিকার আদায় এবং চল্লিশের দশকে নাৎসিবিরোধী প্রচারণা ও শ্রমিকদের যুদ্ধে সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রে পত্রিকাটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।

অন্যদিকে বড় বোন ওলগা ছিলেন কট্টর ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠন ‘ইয়েলো স্টার মুভমেন্ট’–এর সম্পাদক। অবশ্য ১৯৩৩ সাল থেকেই লিভারটভের পরিবার জার্মানি ও অস্ট্রিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছিল। পরে, রাজনীতি ও যুদ্ধ উভয়ই তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে; ষাটের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী সক্রিয়তাকে মেশাবেন নারীবাদী চেতনার সঙ্গে। মডার্ন আমেরিকান উইমেন পোয়েটস (১৯৮০) বইয়ে গবেষক জিন গোল্ড তাঁকে আখ্যা দেবেন, ‘স্পষ্ট রাজনৈতিক আর সামাজিক দায়বদ্ধতার এক কবি’ হিসেবে। কিন্তু বিশেষ কোনো পরিচয়ে কোনো দিনই ডেনিস আটকা পড়তে চাননি। রেক্সরথ যেমন বলেন, ‘প্রকৃত অর্থেই ও ছিল স্বাধীন এক চিন্তার কবি; নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।’ ‘বিটসদের জনক’ হিসেবে পরিচিত এই রেক্সরথই প্রথম লিভারটভের কাব্যপ্রতিভাকে চিনতে পারেন; আর সেটাকে পরিচয় করিয়ে দেন মার্কিন পাঠকদের কাছে।

কেনেথ রেক্সরথ (১৯০৫—১৯৮২)

নানা নাটকীয় মোড় ছিল ডেনিসের জীবনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন; একজন সিভিলিয়ান নার্স হিসেবে প্রায় তিন বছর সেবা প্রদান করেন লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে। লন্ডনজুড়ে তখন চলছিল ভয়াবহ বিমান হামলা; উৎকণ্ঠার সেই সব দিনে পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর কবিতা লেখা থেমে থাকেনি। যুদ্ধের ঠিক পরপর, ১৯৪৬ সালে বের হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই দ্য ডাবল ইমেজ। গবেষকেরা মনে করেন, এই সংকলনের কিছু কবিতায় যুদ্ধের ছায়া থাকলেও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের সরাসরি কোনো ছাপ সেখানে ছিল না। বরং রেক্সরথের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বইটিতে চল্লিশের দশকের ব্রিটিশ ‘নব্য রোমান্টিকতাবাদের’ প্রভাবই ছিল অধিক; আর ছিল ‘প্রথাগত কিছু পদ্য’ যা সমসাময়িক অনেকের কাছেই কিছুটা ‘কৃত্রিম’ আর ‘অতি আবেগপ্রবণ’ বলে মনে হয়েছিল। অন্যদিকে, জিন গোল্ড মনে করতেন, ‘দ্য ডাবল ইমেজ একটা বিষয় অন্তত নিশ্চিত করে যে, তরুণ এই কবির ভেতর প্রবল সামাজিক সচেতনতা যেমন আছে; তেমনি রয়েছে ভবিষ্যতে একজন “আপসহীন শান্তিবাদী” হয়ে ওঠার ইঙ্গিত।’

আমেরিকাকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করার পর, সেখানকার কথ্যভাষার ভঙ্গি লিভারটভকে দারুণভাবে টান মারে। এ সময় প্রথম যে কবিগোষ্ঠী তাঁকে আকর্ষণ করেন তাঁরা হলেন ‘ব্ল্যাক মাউন্টেন’; যাতে যুক্ত ছিলেন আধুনিক আমেরিকান কবিতার অন্যতম দুই দিকপাল চার্লস ওলসন ও রবার্ট ক্রিলির মতো কবিরা।
মিচেল গুডম্যান ও ডেনিস লিভারটভ, প্যারিস, ১৯৪৮

১৯৪৭ সালে ডেনিস বিয়ে করেন মার্কিন লেখক মিচেল গুডম্যানকে (১৯২৩-১৯৯৭); পরের বছরই চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৫৫ সালে দেশটি লিভারটভকে নাগরিকত্ব দেয়। আর সেখানেই তিনি খুঁজে পান তাঁর ‘নিজস্ব স্টাইল’; যেটা পরে তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একজন মার্কিন কবির মর্যাদা এনে দেবে। ১৯৫৭ সালে বের হয় তাঁর দ্বিতীয় কবিতা সংকলন এবং প্রথম তথাকথিত ‘আমেরিকান’ বই হিয়ার অ্যান্ড নাউ। বেশির ভাগ সমালোচকই মনে করেন, বইটিতে তাঁর সে-ই পুরাতন ‘অতি আবেগপ্রবণতা’র রেশ থেকে গিয়েছিল। তবে অনেকের চোখে এটা ছিল তাঁর নতুন ‘আমেরিকান কণ্ঠস্বর’ খুঁজে পাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। গবেষকদের মতে, লিভারটভের এই ‘আমেরিকান কণ্ঠস্বর’ এক অর্থে উইলিয়ামসের সেই সরল ও নিরেট ভাষা, চিত্রকল্প আর প্রত্যক্ষ অনুভূতির কাছে ঋণী। এ প্রসঙ্গে মার্কিন অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী রালফ জে মিলস জুনিয়র (১৯৩১-২০০৭) তাঁর পোয়েটস ইন প্রোগ্রেস (১৯৬৭) গ্রন্থে মন্তব্য করেন, ‘লিভারটভের কবিতা আমাদের পরিচিত ও সাধারণ জগতের মধ্য দিয়ে এমনভাবে পথ চলে, যেন সেই চেনা জগতের অচেনা আর অপার্থিব রূপটি আমাদের হঠাৎ করে চমকে দেয়। ...প্রাত্যহিক জীবনের যে বাস্তবতাকে আমরা উপেক্ষা করি; কিংবা যা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাই; ডেনিস সেখানেই আনন্দ খুঁজে পান; আর পরম মমতায় সেই আটপৌরে জীবনকেই খোদাই করে গড়ে তোলেন এক নিখুঁত সৌন্দর্যের লিরিক।’

প্রথাগত ভাষা ও ছকে প্রথম দুটি বই লিখলেও আমেরিকাকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করার পর, সেখানকার কথ্যভাষার ভঙ্গি লিভারটভকে দারুণভাবে টান মারে। এ সময় প্রথম যে কবিগোষ্ঠী তাঁকে আকর্ষণ করেন তাঁরা হলেন ‘ব্ল্যাক মাউন্টেন’; যাতে যুক্ত ছিলেন আধুনিক আমেরিকান কবিতার অন্যতম দুই দিকপাল চার্লস ওলসন (১৯১০-১৯৭০) ও রবার্ট ক্রিলির (১৯২৬-২০০৫) মতো কবিরা। স্বামী মিচেলের সূত্রে তাঁরা ছাড়াও লিভারটভের সঙ্গে এ সময় আরও পরিচয় হয় এই গোষ্ঠীরই আরেক কবি রবার্ট ডানকানের (১৯১৯-১৯৮৮)। ক্রিলির সম্পাদনায় পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশ্যে আসে ব্ল্যাক মাউন্টেন রিভিউ; প্রভাবশালী এই সাহিত্য পত্রিকাটি আধুনিকতাবাদী কবিতার প্রথা ভেঙে, নতুন ধারার কাব্যচর্চাকে প্রোমোট করছিল। প্রথাগত ছন্দের বাইরে তাঁরা জোর দিতেন কবিতার গঠন আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের ওপর; পরে যেটা আধুনিক আমেরিকান কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেবে। পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে ডেনিসের কবিতা প্রকাশ করলেও আত্মজৈবনিক লেখাপত্রে তিনি দাবি করেন, ‘এই গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে সেখান থেকে তিনি এর প্রভাবগুলোকে কবিতার কাজে লাগিয়েছেন।’

‘ব্ল্যাক মাউন্টেন রিভিউ’র সাতটি সংখ্যা। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ থেকে ’৫৭—এই তিন বছরে

পঞ্চাশের দশকের প্রথম সারির সম্পাদক, মার্কিন কবি ও অনুবাদক সিড করম্যান (১৯২৪-২০০৪) তাঁর সম্পাদিত অরিজিন পত্রিকায় লিভারটভের কবিতা প্রকাশ করা শুরু করেন। শুরুর দিকের সেই ছকবাঁধা পদ্যরীতি থেকে বেরিয়ে ডেনিস তখন ‘ব্ল্যাক মাউন্টেন’ যুগের ‘প্রোজেক্টিভ ভার্স’ বা অভিক্ষিপ্ত কাব্যরীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন—কবিতার ছন্দ বা কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন বিষয়বস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশকে। এ সময় ওলসনের মরমিবাদও তাঁকে টেনে ধরে; গবেষকেরা হিয়ার অ্যান্ড নাউ বইয়ে এই বিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ দেখতে পান। বিশেষ করে, রেক্সরথ তাঁর প্রবন্ধ সংকলন অ্যাসেস (১৯৬১)-এ জোর দিয়ে বলেন, ‘আগের সেই থরথর আবেগ আর শিথিলতা এখন উধাও। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে শব্দের এক সহজাত সাবলীলতা; বিড়ালের নিঃশব্দ পদচারণ কিংবা গাঙচিলের ডানা ঝাপটানির মতো অনন্য এক ছন্দ। এ যেন সজাগ ঘরোয়া প্রেমের এক তীব্র সজীবতা—যেখানে বিষয় আর আঙ্গিকের এক সার্থক সঙ্গম ঘটে। ...কবিতার কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী-ইবা চাওয়ার থাকতে পারে? এর চেয়ে বেশি কিছুর দাবি আর সম্ভবও নয়।’ আবার মিডওয়েস্ট কোয়ার্টারলি–র এক পর্যালোচনায় মার্কিন সমালোচক জুলিয়ান লি গিটজেন (১৯৩৬-২০০৩) ব্যাখ্যা করেন, ‘বাস্তব খুঁটিনাটির প্রতি লিভারটভের এই তাকানো তাঁকে কবিতার বিষয়বস্তুর বিশাল এক ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। কারণ, উইলিয়ামসের মতো তিনিও অতি তুচ্ছ, সাধারণ কিংবা ছোট ছোট বিষয় থেকে প্রেরণা নিতে পারতেন। সেটা হোক সাধারণ একটা ফুল, বৃষ্টির মধ্যে দুই কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া কোনো মানুষ, বা রাস্তার আবর্জনার ওপর ঝিকমিক করতে থাকা রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক দুপুর। এর সবকিছুকে অনুষঙ্গ করে তিনি অসামান্য একেকটা কবিতা লিখতেন; যার অন্তর্দৃষ্টি ছিল প্রখর।’

ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপ লিভারটভের ব্যক্তিজীবন ও কবিতা উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন এনে দেয়; যুদ্ধবিরোধী সক্রিয়তা তাঁর কবিতায় গাম্ভীর্য আর রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত করে। লিভারটভ মনে করতেন, ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যায্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, একজন কবির নৈতিক দায়িত্ব।’

এজরা পাউন্ডের (১৮৮৫-১৯৭২) কাব্যনিরীক্ষা ও উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের (১৮৮৩-১৯৬৩) শৈলী অনুসরণের পাশাপাশি লিভারটভ ওই সময়ে হেনরি ডেভিড থরো (১৮১৭-১৮৬২) ও রালফ ওয়াল্ডো এমারসনের (১৮০৩-১৮৮২) ‘ট্রান্সেন্ডেন্টালিজম’ বা অতীন্দ্রিয়বাদের সান্নিধ্যেও আসেন। তবে ডেনিস তাঁর মেন্টর বা দীক্ষাগুরু হিসেবে মানতেন কার্লোসকে; অনুসরণ করতেন তাঁর প্রবর্তিত কবিতার ‘মুক্ত ও জৈব গঠনরীতি’কে। কার্লোসের মরমি আর শান্ত আবেগের কবিতাগুলো মূলত একধরনের সংহতি বা মিলনের খোঁজ করত; যা লিভারটভকে ব্যাপকভাবে প্রাণিত করে। সমকালীন অনেক মার্কিন কবি-লেখকের প্রভাব থাকলেও ম্যাটলেন মনে করতেন, ‘একজন কবি হিসেবে লিভারটভের উত্তরণ নির্দিষ্ট কোনো কাব্য-ইশতেহার মেনে হয়নি; বরং হয়েছে তাঁর নিজস্ব বিষয়বস্তু; অতি একান্ত চারপাশ; আর কবিতার সহজাত সুরের প্রতি তাঁর যে প্রখর সংবেদনশীলতা, সেটার ওপর ভিত্তি করে।’ ম্যাটলেন আরও ব্যাখ্যা করেন, ১৯৫৯ সালে তিনি যে ‘নিউ ডিরেকশনসে’র লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, সেটার প্রধান কারণ ছিল মার্কিন প্রকাশক ও সম্পাদক জেমস লাফলিন (১৯১৪-১৯৯৭) তাঁর লেখার মধ্যে এক স্বতন্ত্র ও মৌলিক কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন।

ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপ লিভারটভের ব্যক্তিজীবন ও কবিতা উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন এনে দেয়; বিশেষ করে ব্যক্তিগত বিয়োগব্যথা আর যুদ্ধবিরোধী সক্রিয়তা তাঁর কবিতায় একধরনের গাম্ভীর্য আর রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত করে; এতে এর চিরচেনা মেজাজটা পাল্টে যায়। লিভারটভ মনে করতেন, ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যায্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, একজন কবির নৈতিক দায়িত্ব।’ এই উৎসারণ থেকেই মার্কিন কবি ও রাজনৈতিক কর্মী মুরিয়েল রুকেসার (১৯১৩-১৯৮০) এবং আরও কিছু কবিকে সঙ্গে করে তিনি প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মোর্চা ‘রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস প্রটেস্ট’ গঠন করেন। যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ-সমাবেশে সক্রিয় অংশ নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেসহ নানা জায়গায় দেদার পাঠ করতে থাকেন নিজের লেখা কবিতা; আইন অমান্য করার কারণে তাঁকে জেলও খাটতে হয় কয়েকবার। ১৯৫৯ সালে বের হয় ডেনিসের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘উইথ আইজ অ্যাট দ্য ব্যাক অব আওয়ার হেডস’; জিন গোল্ডের দাবি মোতাবেক এই বইটিই তাঁকে ‘খাঁটি আমেরিকান কবি’ হিসেবে পোক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়; সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করে মার্কিন কবিতায়।

উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস (১৮৮৩—১৯৬৩)

পরের দশকগুলো ডেনিস সোচ্চার হয়ে ওঠেন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা; এল সালভাদরে মার্কিন হস্তক্ষেপ; আর পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বই দ্য সরো ড্যান্স (১৯৬৭), রিলার্নিং দ্য অ্যালফাবেট (১৯৭০), টু স্টে অ্যালাইভ (১৯৭১) এবং অনেকাংশে ক্যান্ডেলস ইন ব্যাবিলন (১৯৮২)—ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ডেট্রয়েট দাঙ্গা আর পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে মুখর ছিল। সাধারণ মানুষকে এসব বিষয়ে সচেতন করে তোলা, বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও পরিবেশগত সংকটের মতো নানা বিষয়ে জনমত গড়ে তোলাই ছিল যার মৌলিক উদ্দেশ্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী চিঠি, সংবাদ-বুলেটিন, ডায়েরির পাতা ও কথোপকথন নিয়ে ১৯৭১ সালে প্রকাশ পায় টু স্টে অ্যালাইভ; সংকলনটিতে ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব; সেই সঙ্গে গণসংস্কৃতির ভিড়ে ‘ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বর’ খুঁজে পাওয়ার টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার। সমালোচকদের মতে, ‘লিভারটভ তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত কল্পনাশক্তির মাধ্যমে সামষ্টিক পরিবর্তনের কথা বলতেন; আর এর কারিগর হিসেবে জোর দিতেন ব্যক্তির ক্ষমতার ওপর।’ এভাবেই তাঁকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সামাজিক ন্যায়বিচার আর সংস্কারের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথতে দেখা যায়।

‘মানবিক যন্ত্রণা’ ডেনিসের যুদ্ধবিষয়ক লেখাপত্রের আরেকটি বড় দিক। পোয়েট্রি, প্রফেসি, সারভাইভাল, প্যারাডক্স অ্যান্ড ইকুইলিব্রিয়াম, পোয়েট্রি অ্যান্ড পিস: সাম ব্রডার ডাইমেনশনস—এসব রচনার মূল ভিত্তিই ছিল যুদ্ধ, অন্যায় আর কুসংস্কার। ষাটের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশিত তাঁর লাইফ অ্যাট ওয়ার অত্যন্ত শক্তিমান ও প্রভাবশালী এক কবিতা হিসেবে সমাদৃত; যার পরতে পরতে রয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের নৃশংসতা; পরে কবিতাটি তাঁর দ্য সরো ড্যান্স (১৯৬৭) বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে তাঁর আরেক বিখ্যাত কবিতা ‘স্টেইং অ্যালাইভ’-এ তিনি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে রাখেন একদম কেন্দ্রে। গবেষকেরা মনে করেন, ‘তাঁর কবিতার একদিকে রয়েছে সহিংসতা আর বর্বরতার ছবি; অন্যদিকে সেই ভয়াবহতার সঙ্গে ভাষার সৌন্দর্য মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভারসাম্য বা “গ্রেস” বানানোর চেষ্টা।’ তাঁর প্রখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন দ্য পোয়েট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৭৩)-এ লিভারটভ উল্লেখ করেন, ‘সহিংসতা হলো একধরনের বহিঃপ্রকাশ।’ তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তাঁর প্রথম সফল কবিতার বই হিসেবে স্বীকৃতি পায় দ্য ফ্রিইং অব দ্য ডাস্ট—উত্তর ভিয়েতনামের মানুষের অভিজ্ঞতা, আর মানুষের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা ছিল বইটির মূল প্রতিপাদ্য। বইটিতে তিনি মার্কিন বিমানচালকদের বোমাবর্ষণের বিষয়টির কঠোর সমালোচনা করেন, সরাসরি। তাঁর সময়ের সমালোচকেরা মনে করতেন, ‘সামগ্রিকভাবে, লিভারটভের কবিতায় যন্ত্রণার যে ছবি, সেটা প্রমাণ করে সহিংসতা এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

২.

‘সাধারণ প্রশংসা’ থাকলেও ডেনিসের সরাসরি রাজনৈতিক কবিতাগুলো সমসাময়িক অনেকের চোখেই তীব্র নেতিবাচকভাবে ধরা পড়েছে। অনেকের এ অভিযোগও ছিল যে এসব লেখা যতটা না কবিতা, তারও অধিক গদ্য। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী একাডেমিক জার্নাল কনটেম্পোরারি লিটারেচার-এ আধুনিক এবং সমসাময়িক কবিতা ও নন্দনতত্ত্বের অন্যতম প্রভাবশালী পণ্ডিত মার্জরি জি. পারলফের (১৯৩১–২০২৪) এ প্রসঙ্গে হতাশা ব্যক্ত করেন টু স্টে অ্যালাইভ বইটি প্রকাশের পরপরই, ‘লিভারটভের নতুন বইয়ে বেশ কিছু স্বীকারোক্তিমূলক পদ্য রয়েছে; যেটা আমি মনে করি নিচু মানের; আর তাঁর ডায়েরির ধাঁচে লেখা—ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী কবিতাগুলোকে মনে হয় স্রেফ পদ্যে রূপান্তর; অনেকটা নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস–এর আদলে।’ তবে এর বিপরীত মন্তব্য করেন ম্যাটলেন, ‘এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বইটি সমকালীন মানুষ আর ঘটনাকে ধারণ করে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে যুদ্ধের স্মৃতি যখন ফিকে হয়ে আসবে, তখন এই অগোছালো আর ভাসা ভাসা কবিতাগুলোকেই হয়তো মনে হবে সত্য আর ন্যায়সংগত। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই পক্ষ নেয়, যারা স্পষ্ট অবস্থান নিতে জানে।’

ডেনিস লিভারটভের ‘টু স্টে অ্যালাইভ’

ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে শিকাগোর প্রাচীন ও প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকা পোয়েট্রি ম্যাগাজিন–এ বিশিষ্ট মার্কিন কবি ও সমালোচক পল ব্রেসলিন (১৯৪৫–) উল্লেখ করেন, ‘শুরুর দিকের কবিতায়ও লিভারটভের মধ্যে একধরনের নীতিকথা শোনানোর প্রবণতা ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি ‘সৎ পরামর্শদাতা’র বদলে যেন একজন ‘আধিপত্যবাদী’তে পরিণত হন। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের সঙ্গে আমিও একমত, কিন্তু তাঁর এই ধারণা মেনে নিতে পারি না যে কবি হওয়ার কারণে তাঁরা নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ আর “সংবেদনহীন” ভাবা সাধারণ মানুষকে নীতিশিক্ষা দেওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।’ এসব সমালোচনাকে অবশ্য সহজভাবেই নিয়েছিলেন ডেনিস। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস বুক রিভিউ–র এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি তিনি স্বীকারও করেন যে তাঁর ‘রাজনৈতিক লেখাপত্র পুরোপুরি কবিতা হয়ে ওঠেনি, সেটা ঠিক, কিন্তু সেগুলো অন্তত “বাজে পদ্য” নয়।’ তবে সব সমালোচক যে লিভারটভের এই ‘আধা কবিতা’র খুঁত ধরেছেন, ব্যাপারটা এমন নয়। যেমন, নিউইয়র্কের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রভাবশালী ত্রৈমাসিক পত্রিকা হাডসন রিভিউ-তে বিশ্রুত মার্কিন কবি হেইডেন ক্যারু (১৯২১–২০০৮) লেখেন, ‘লিরিক্যাল ছন্দের পাশে গদ্যধর্মী চিঠিপত্র বা নথির ব্যবহার সমালোচকদের বিরক্ত করেছিল ঠিকই; কিন্তু উইলিয়ামসনের প্যাটারসন–এর (পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত মহাকাব্যিক কবিতা) পর এটা নিয়ে নতুন করে সাফাই দেওয়ার কিছু নেই।’ ক্যারু এটাও মনে করতেন, ‘উইলিয়ামসনের চেয়েও তিনি গদ্যের ব্যবহার করেছেন সার্থক আর পরিমিতভাবে; আর তৎকালীন মার্কিন কবিদের রাজনৈতিক ধারার শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি—টু স্টে অ্যালাইভ।’

লম্বা একটা সময় রাজনৈতিক কবিতা লেখার পর, একটা পর্যায়ে ডেনিস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ‘সৌন্দর্য, কবিতা আর রাজনীতি আসলে একসঙ্গে চলতে পারে না।’ এই উপলব্ধি তাঁর কবিতায় নতুন এক মোচড় নিয়ে আসে—ধর্ম তাঁর রচনার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও বড়সড় একটা পরিবর্তন আসে; ১৯৭৫ সালে শেষ হয় লিভারটভ-মিচেলের ২৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের স্থিতিকাল। একমাত্র ছেলে নিকোলাইকে নিয়ে তিনি নিউইয়র্কেই থাকতেন। ১৯৮৪ সালে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর লিভারটভের লেখায় ধর্মীয় প্রভাব আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, পূর্ণ মনোযোগ দেন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কবিতার দিকে। নিজের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রচুর মরমি আর মেটাফিজিক্যাল কবিতা লিখতে থাকেন। অবশ্য শৈশব থেকেই ডেনিসের ওপর ধর্মের প্রভাব ছিল গভীর, যা তাঁর প্রথম জীবনের কবিতার অন্যতম প্রধান উপজীব্যও। বাবা পলের মাধ্যমে তিনি ইহুদি ও খ্রিষ্টান—উভয় ধর্মের ভাবধারার সঙ্গেই পরিচিত হয়েছিলেন। ডেনিস বিশ্বাস করতেন, তাঁর পারিবারিক শিকড় আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটা সহজাত মূল্য রয়েছে; যা তাঁর লেখালেখিকেও সমৃদ্ধ করেছে। আর এই উত্তরাধিকারের কারণেই, তাঁর ও তাঁর বোনের (ওলগা) ভাগ্যে ‘বিশেষ কিছু নির্ধারিত’ হয়ে আছে।

ডেনিস লিভারটভ
১৯৭৫ সালে শেষ হয় লিভারটভ-মিচেলের ২৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের স্থিতিকাল। একমাত্র ছেলে নিকোলাইকে নিয়ে তিনি নিউইয়র্কেই থাকতেন। ১৯৮৪ সালে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর লিভারটভের লেখায় ধর্মীয় প্রভাব আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, পূর্ণ মনোযোগ দেন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কবিতার দিকে।

শুরুর দিকের ধর্মীয় কবিতায় দেখা যায় কবি তাঁর জীবনের অর্থ খুঁজে ফিরছেন। শূন্যতা থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের সবকিছুর সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক কী রূপ হতে পারে; সেটাও তিনি পরীক্ষা করে দেখছেন। কিন্তু ঠিক এর পরপরই গবেষকেরা তাঁর কবিতায় একটা স্পষ্ট পরিবর্তন চিহ্নিত করেন। ১৯৮৭ সালে বের হয় তাঁর ১৪তম কবিতার বই ব্রিদিং দ্য ওয়াটার; বইটির আলোচনায় ধর্মীয় উপাদানের দিকে জোর দিয়ে প্রখ্যাত মার্কিন কবি ও প্রাবন্ধিক ডায়ান ওয়াকোস্কি (১৯৩৭–) বলেন, ‘বেশির ভাগ মার্কিন মরমিবাদের মতো লিভারটভের কবিতাও দাঁড়িয়ে থাকে খ্রিষ্টধর্মের বানানো ভিতের ওপর। তবে হুইটম্যান আর অন্য সব মার্কিন মরমিবাদীর মতো তিনিও স্রষ্টাকে খুঁজে পেয়েছেন নিজের অভ্যন্তরে; বুঝতে চেয়েছেন তাঁর এই “সত্তা”টা কী করে জগতের এক স্বাভাবিক অংশ হয়ে সর্বেশ্বরবাদ, বাস্তুসংস্থান, সমাজ আর ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যায় আর লিভারটভের ক্ষেত্রে এই সংশ্লেষ সব সময় প্রকাশ পায় গীতিময়তার মাধ্যমে।’ একই টোনে, ডেনিসের আরেক বই ডোর ইন দ্য হাইভ (১৯৮৯) নিয়ে ‘ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে’র এক পর্যালোচনায় বিশিষ্ট মার্কিন শিক্ষাবিদ ও তুলনামূলক সাহিত্যের পণ্ডিত ডরিস আর্নশ-র (১৯২৪–২০২১) বলেন, ‘লিভারটভের কবিতারা রাজনীতি ও ধর্ম নিয়ে কথা বললেও সেগুলো মূলত লিরিক্যাল।’

ডেনিসের কবিতার আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দিক নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন ডরিস; ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গুণগ্রাহী হিসেবে নিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকারও। বইটির মূল অংশ—‘এল সালভাদর: রিকুয়েম অ্যান্ড ইনভোকেশন’ মূলত একটা অপেরার পাণ্ডুলিপি; আশির দশকের প্রারম্ভে যা এল সালভাদরে ডেথ স্কোয়াডের হাতে নিহত আর্চবিশপ রোমেরো ও চারজন মার্কিন নারীর স্মরণে শোকগাথা হিসেবে লেখা হয়েছিল। হাডসন রিভিউ–তে মার্কিন দার্শনিক ও কবি এমিলি গ্রোশোলজ (১৯৫০–) মন্তব্য করেন, ‘ঠিক কবিতা না বলে এটাকে একটা জনপ্রিয় দীর্ঘ গান ভাবা যেতে পারে; সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ ত্রাণ আর জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।’ তিনি আরও মনে করতেন, ‘এ–জাতীয় লেখাকে লিভারটভের শ্রেষ্ঠ কবিতার পাশেই স্থান দেওয়া সমীচীন।’ বিশেষ করে, ডোর ইন দ্য হাইভ বইয়ে এই লেখার দুই পাশে এমন কিছু কবিতা রাখা ছিল, যেটা বিষয়বস্তুর গুরুত্বকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে।

১৯৯০ সালের ১৮ নভেম্বর লিভারটভ চলে আসেন সিয়াটলে; সেখানে সেন্ট এডওয়ার্ডস প্যারিসে গ্রহণ করেন ক্যাথলিক ধর্ম। সমাজ আর সংস্কৃতিকে একসূত্রে গাঁথার অভিপ্রায়ে এ সময় তিনি খ্রিষ্টীয় আদর্শকে ব্যবহার করা শুরু করেন। তাঁর প্রখ্যাত ‘মাস’—যা ক্যাথলিকদের বিশেষ খ্রিষ্টীয় উপাসনা—কবিতায় তিনি দেখান, কী করে ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই সংজ্ঞায়িত হন। তাঁর এই ফেইজের লেখাপত্রে বারবার হাজির হয় প্রকৃতি আর ব্যক্তিমানুষ। ১৯৯৭ সালে তাঁর আগের সাতটি কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত ৩৮টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় দ্য স্ট্রিম অ্যান্ড দ্য স্যাফায়ার। বইটির মুখবন্ধে ডেনিস ব্যাখ্যা করেন: ‘এই সংকলনটির উদ্দেশ্য ছিল “সংশয়বাদ” থেকে “খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে” আমার ধীর রূপান্তরের পথটাকে চিহ্নিত করা; সে যাত্রায় প্রচুর দ্বিধা যেমন ছিল, ছিল প্রশ্ন আর তেমনি ছিল সত্যের স্বীকৃতিও।’ এ সময় সাহিত্য সমালোচক ও ক্যাথলিক নান এম বার্নেটা কুইনের (১৯১৫–২০০৩) সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান হতো, যিনি লিভারটভের সাহিত্যকর্মেরও পর্যালোচনা করতেন।

১৯৯২ সালে বের হয় লিভারটভের আরেক কবিতার বই ইভনিং ট্রেন; যা বার্ধক্য ও বোধের নতুন এক দিগন্তকে উন্মোচন করে দেয়। মার্কিন কবি ও অভিনেত্রী ডেইজি অলড্যান (১৯২৩–২০০১) বিশ্বাস করতেন, ‘এ সংকলনটি কবির এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকে তুলে ধরে। বার্ধক্যে পৌঁছানোর পর এক বিশেষ চেতনা—অনেকে যাকে ‘অন্তিম মালভূমি’ বলে আখ্যা দেন—সেটা তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা আর গরিমার সঙ্গে অনুভব ও প্রকাশ করেছেন।’ আরও বলেন, ইভনিং ট্রেন–এর কবিতাগুলো নতুন এক বিনয়, মার্জিত বোধ, সৃষ্টিশীল প্রজ্ঞা, মমতা আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে হাজির হয়।’ সমকালীন কবি মার্ক জারম্যান (১৯৫২–) হাডসন রিভিউ-তে এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘বার্ধক্য নিয়ে লেখা এই বইটি যেন এক দীর্ঘ ধারাবাহিক; যার শেষটা অত্যন্ত চমৎকার।’ তাঁর মতে, ‘এটি লিভারটভের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে লেখা শ্রেষ্ঠ কোনো কাজ।’ এ বইয়ের কবিতাগুলো খাড়া পাহাড়, প্রান্তসীমা বা সীমানার রূপকে ঠাসা; মূলত যা জীবনে পরিবর্তনের ডাক দেয়। এখানেও ডেনিস রূপকের আশ্রয়েই দেখাচ্ছেন যে মৃত্যুতেও প্রশান্তি থাকতে পারে। সেই সঙ্গে এই ধারণাও পোষণ করেন, ‘শূন্যতা’ও বস্তুত স্রষ্টারই অংশ; তখন ‘শূন্যতা’ বা ‘অন্ধকার’ কেবল আর সংশয় বা যন্ত্রণার কারণ হয়ে থাকে না; বরং সেটা এক গভীরতর সত্যের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তাঁর ‘সেন্ট থমাস ডিডিমাস’ ও ‘মাস’ কবিতায় এই মানসিক উত্তরণের ছাপ স্পষ্ট—যেখানে আগের সেই খিটখিটে কৌতূহল বা উৎকণ্ঠার আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

ইভনিং ট্রেন বইটি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামের বেশ কিছু খণ্ডে বিভাজিত; যার শুরুটা প্রকৃতি ও গ্রামীণ আবহে ঘেরা ‘লেক মাউন্টেন মুন’ কবিতা দিয়ে; আর শেষ হয় আধ্যাত্মিক ভাবধারার ‘দ্য টাইড’-এর মাধ্যমে। এই দুইয়ের মধ্যখানে—লিভারটভ একদিকে তুলে ধরেছেন ব্যক্তিগত বিবেকবোধের সংকট; অন্যদিকে এইডস, উপসাগরীয় যুদ্ধ, পরিবেশদূষণ আর পারমাণবিক তাণ্ডবের অব্যাহত হুমকির মতো নানা সামাজিক ইস্যু। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস বুক রিভিউ-তে মার্কিন কবি ও লেখক অ্যামি গার্স্টলার (১৯৫৬–) মনে করেন, ‘এ বইয়ের প্রতিটি কবিতা একটা আরেকটার সঙ্গে মিশে যেন দীর্ঘ এক কবিতায় রূপ নেয়।’ ডেনিসের প্রশংসা করে এই সমালোচক আরও বলেন, ‘কবিতা বলার ক্ষেত্রে পাঠক আর বিষয়ের সঙ্গে ঠিক কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখা উচিত—সে বিষয়ে কবির সহজাত দক্ষতা নিখুঁত। এমনকি কবিতায় তাঁর নিজের ভূমিকা কী পরিমাণ হবে, সেটাও তিনি ঠিক করেন দারুণ মুনশিয়ানার সঙ্গে।’

কবিতার বাইরে লিভারটভ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অনুবাদ করেছেন বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম, যার মধ্যে ফরাসি কবি জ্যঁ জুবের (১৯২৮–২০১৫) কাজগুলো বিশেষভাবে সমাদৃত। এ ছাড়া তিনি দ্য নেশন (১৯৬১–৬২) ও মাদার জোন্স (১৯৭৬-৭৮) পত্রিকার কবিতা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যেও তাঁর বিচরণ ছিল সমানঘনিষ্ঠ; তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনগুলোর মধ্যে দ্য পোয়েট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, লাইট আপ দ্য কেভ (১৯৮১) ও নিউ অ্যান্ড সিলেক্টেড এসেস (১৯৯২) ব্যাপকভাবে আলোচিত। গবেষকেরা মনে করেন, তাঁর প্রবন্ধগুলোয় কাব্যতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব আর রাজনীতির এক বিস্তৃত প্রতিফলন ঘটেছে। সমালোচক কারুথ যেমন বলেন, দ্য পোয়েট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড বইটি বিচিত্র সব বিষয়ের সংকলন, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত হওয়ার কারণে কখনো এর মেজাজ মার্জিত, আবার হঠাৎ কিছুটা পাণ্ডিত্যপূর্ণ। বইটিতে শিক্ষক হিসেবে কবির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উইলিয়াম কার্লোসকে নিয়ে লেখা চমৎকার এক তাৎক্ষণিক শোকগাথা এবং অন্য লেখকদের কাজ নিয়ে সমালোচনা ও প্রশংসা স্থান পেয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে কবিতার রহস্য; এর নির্মাণকৌশল; আর জীবনের সঙ্গে লিভারটভের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কথা। কবিতাকে যারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন, তাঁদের সবার এই বইটি পড়া উচিত, এ বিষয়ে অধিকাংশ সমালোচক একমত।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক যাজক ও কবি ড্যানিয়েল বেরিগান (১৯২১–২০১৬) আমেরিকান বুক রিভিউ–র এক সমালোচনায় লাইট আপ দ্য কেভ বইয়ের প্রবন্ধগুলোকে অভিহিত করেন—‘আমাদের অবহেলিত আত্মার এক দিনলিপি’ হিসেবে। তিনি মনে করেন, ‘বিতর্কিত মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক নরম্যান মেইলার (১৯২৩–২০০৭) ষাটের দশকে এ ধরনের কিছু কাজ করেছিলেন; তবে উত্তাল সেই দিনরাত্রির পর অধিকাংশ লেখক ও আন্দোলনকারীর মতো তাঁরও ভিন্ন বিষয়ের দিকে মন ঘুরে যায়। অথচ লিভারটভ আজও সেই মিছিলে শামিল; আজও সেই মিছিলের ইতিহাস লিখে চলছেন।’ বইটির আলোচনায় ডেনিসের সামাজিক আর রাজনৈতিক সচেতনতা প্রসঙ্গে বেরিগান মন্তব্য করেন: ‘[টালমাটাল এই পৃথিবীতে] আমাদের সামনে বিকল্পগুলো, সত্যি বলতে, খুব একটা বড় নয়। আমরা হয়তো কিছুই না করার পথ বেছে নিতে পারি; যার অর্থ—নিভৃতে বা দিশাহারা হয়ে স্রেফ পাগল হয়ে যাওয়া; ভয়কে নিজের ওপর চড়ে বসতে দেওয়া; আর তুচ্ছতা দিয়ে দিন পার করা। অথবা লিভারটভের মতো উন্নত-শির প্রাণের সঙ্গে মিলে সুস্থ কাণ্ডজ্ঞান বেছে নিতে পারা। আর সেটা সম্ভব—সংহতি, বিবেকবোধ আর মানবজীবনের কঠিন অগ্নিপরীক্ষাদের পার হয়ে আসার মাধ্যমেই।’

অন্যদিকে নিউ অ্যান্ড সিলেক্টেড এসেস সংকলনটিতে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯২ সাল নাগাদ লেখা লিভারটভের নানা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছে রাজনীতি, ধর্ম, তাঁর ওপর অন্য কবিদের প্রভাব এবং মুক্তছন্দের কাব্যতত্ত্বের মতো বিষয়গুলো। কবিতার বিষয়বস্তুর সীমারেখা ঠিক কতটুকু হওয়া উচিত; আর কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা আসলে কী—সেটা নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। অন্য কবিদের প্রভাববিষয়ক প্রবন্ধগুলোয় তিনি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, রবার্ট ডানকান ও জার্মান কবি রেইনার মারিয়া রিলকের (১৮৭৫–১৯২৬) প্রসঙ্গে এনেছেন। ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে–তে সংকলনটি সম্পর্কে সমালোচক মেরি কাইজার লেখেন, ‘তিন দশকের চিন্তাভাবনা আর বহুমাত্রিক বিষয়ের সম্মিলন ঘটলেও লিভারটভের প্রবন্ধগুলোয় এক অসাধারণ সংগতি, যৌক্তিকতা আর কাব্যিক সততার প্রতিফলন রয়েছে।’ অন্যদিকে বুকলিস্ট–এর লেখক রে ওলসেন বলেন, ‘স্বয়ং কবিতার পরে এটাই হতে পারে কাব্যমোদীদের জন্য শ্রেষ্ঠ এক পাঠ্য।’

১৯৬৭ সালে বিশ্রুত ভারততত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড সি ডিমক জুনিয়রের (১৯২৯-২০০১) সঙ্গে যৌথ অনুবাদে বের করেন ইন প্রেজ অব কৃষ্ণা: সংস ফ্রম দ্য বেঙ্গলি, মধ্যযুগীয় বাংলার বৈষ্ণব পদাবলির এই সংকলনটির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের অমর এই সৃষ্টি ইংরেজি পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।
ইন প্রেজ অব কৃষ্ণা: সংস ফ্রম দ্য বেঙ্গলি

১৯৯৫ সালে বের হয় লিভারটভের আরেক গদ্য-প্রবন্ধের সংকলন টেসেরি: মেমোরিজ অ্যান্ড সাপোজিশনস; ২৭টি আত্মজীবনীমূলক রচনা নিয়ে। শিরোনামে ‘টেসেরি’ মূলত মোজাইক বানানোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোকে নির্দেশ করলেও ভূমিকায় কবি স্পষ্ট করেই বলছেন, ‘এই টুকরোগুলো পূর্ণাঙ্গ কোনো মোজাইক হয়ে ওঠার দাবি রাখে না।’ জীবনীর প্রথাগত ছাঁচে না ফেলে, তিনি বইটিতে তাঁর বাবা-মা, শৈশব আর এক কবির জীবন নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু স্মৃতির প্রসঙ্গ টানেন। সমালোচকেরা এই বইয়ে ডেনিসের গদ্যের গীতিময়তা; আর তাঁর সংযত ও সংক্ষিপ্ত স্মৃতিরোমন্থনের প্রশংসা করেছেন। পাবলিশার্স উইকলি–র এক সমালোচকের মতে, কোনো ঘটনাকে বর্ণনা করার তাঁর যে ক্ষমতা, ‘সেটা একই সঙ্গে শাশ্বত ও তাৎক্ষণিক; সীমানাহীন অথচ গভীরভাবে ব্যক্তিগত।’

লিভারটভ ২৪টি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি সমালোচনা ও অনুবাদও প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু সংকলন; সম্মাননা ও পুরস্কারের ঝুলিতে তাঁর অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ; যার মধ্যে রয়েছে—শেলি মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, রবার্ট ফ্রস্ট মেডেল, লেনোর মার্শাল প্রাইজ, ল্যানান অ্যাওয়ার্ড, ক্যাথরিন লাক মেমোরিয়াল গ্রান্ট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস-এর অনুদান এবং গুগেনহেইম ফেলোশিপ। বেঁচে থাকতেই এসবের অধিকাংশ পুরস্কার আর সম্মাননা তাঁকে ‘লিভিং লিজেন্ড’-এর খেতাব এনে দেয়; কালক্রমে যা তাঁকে করে তোলে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ‘অপরিহার্য এক কবি’। তা ছাড়া ১৯৬৭ সালে বিশ্রুত ভারততত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড সি ডিমক জুনিয়রের (১৯২৯-২০০১) সঙ্গে যৌথ অনুবাদে বের করেন ইন প্রেজ অব কৃষ্ণা: সংস ফ্রম দ্য বেঙ্গলি, মধ্যযুগীয় বাংলার বৈষ্ণব পদাবলির এই সংকলনটিতে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার দিব্য প্রেমের আধ্যাত্মিক গানগুলোকে তাঁরা নিপুণভাবে উপস্থাপন করেন। যার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের অমর এই সৃষ্টি ইংরেজি পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। পাশাপাশি বইটিতে আরও ছিল এডওয়ার্ড ডিমকের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভূমিকা আর অঞ্জু চৌধুরীর নান্দনিক অলংকরণ; যা এটিকে এক দুর্লভ সংগ্রহের মর্যাদাও এনে দেয়।

এজরার প্রথম জীবনের প্রেমিকা এইচ ডির (হিল্ডা ডুলিটল) (১৮৮৬–১৯৬১) মতো ইমেজকে ‘অর্থের প্রধান বাহন’ বানানো এই কবি; আর মানুষের অভিজ্ঞতার সারবত্তাকে যিনি ধারণ করতেন একপ্রকার নির্যাসিত আর ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষায়, যার একদিকে থাকত ব্যক্তির চেতনার জটিল মনস্তত্ত্ব আর অন্যদিকে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট—৭৪ বছর বয়সে, লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখে গেছেন; যার প্রায় ৪০টি কবিতা তাঁর মরণোত্তর কাব্যগ্রন্থ দিস গ্রেট আননোয়িং: লাস্ট পোয়েমস (১৯৯৯)-এ প্রকাশিত হয়। সোজারনারস পত্রিকার এক সমালোচক মনে করেন, বইটিতে শোকের আবহের সঙ্গে একত্রে মিশে গেছে ‘আবেগ, গীতিময় দক্ষতা আর আধ্যাত্মিক উল্লাস’, আর এসবই ছিল তাঁর শেষ জীবনের চালিকাশক্তি। বইটির বিষয়বস্তু—নিভৃত ব্যক্তিগত আলাপন থেকে গভীর রহস্যবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত—এটি উল্লেখ করে, পাবলিশার্স উইকলি–র এক সমালোচক মন্তব্য করেন, ‘এই সৃষ্টি লিভারটভের মানবিক দর্শনের অনন্য মহিমাকে স্পর্শ করেছে।’ মরণোত্তর প্রকাশিত তাঁর অন্যান্য সংকলনের মধ্যে রয়েছে পোয়েমস: ১৯৭২-১৯৮২ (২০০১); ও ক্রিস্টোফার ম্যাকগোয়ানের (১৯৪২–) সম্পাদনায় দ্য লেটারস অব ডেনিস লিভারটভ অ্যান্ড উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস (১৯৯৮)। এ ছাড়া রবার্ট জে বার্থলফ ও অ্যালবার্ট গেলপির সম্পাদনায় প্রকাশিত দ্য লেটারস অব রবার্ট ডানকান অ্যান্ড ডেনিস লিভারটভ (২০০৩) গ্রন্থটি চিঠিপত্রের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ হিসেবে লাভ করে ‘মর্টন এন কোহেন অ্যাওয়ার্ড’।

শুধু রাজনৈতিক কবিতার মধ্যে লিভারটভের সুনাম সীমাবদ্ধ থাকেনি; কবিতার আঙ্গিক নিয়ে তাঁর ‘অর্গানিক ফর্ম’ তত্ত্বটি আজও বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। টালমাটাল আর অস্থির এ সময়ে বর্তমানের পাঠকেরা তাঁর শেষ জীবনের আধ্যাত্মিক আর প্রকৃতিনির্ভর কবিতাগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন, নানা সূত্র সেটা সমর্থন করে। বিশেষ করে, মৃত্যুর পরে প্রকাশিত কবিতার বইটি নতুন প্রজন্মের পাঠকেরা ছিনিয়ে নেয়; যা তাঁকে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। বর্তমানে ডেনিসকে দেখা হয় এক ‘গভীর মিস্টিক বা রহস্যবাদী’ কবি হিসেবে। জীবনের শেষ দিকের কাজগুলোয় তিনি খ্রিষ্টধর্মকে ব্যক্তি আর সমাজের মধ্যবর্তী এক সেতু হিসেবে উপস্থাপন করেন; আর একটা প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশকে কী করে খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে পাল্টে দেওয়া সম্ভব; সেটাও হয়ে ওঠে তাঁর মূল অন্বেষণ।