
বরাবরের মতোই সাম্প্রতিক মাজার-আক্রমণের প্রেক্ষাপটে লালসালুকে ঘিরে যে জনচর্চা তৈরি হয়, তার ভেতরের বিভ্রান্তি ও জটিলতাকে বিশ্লেষণ করেছে মোস্তাক আহমাদ দীনের এই লেখাটি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসকে অনেকেই সরলীকৃতভাবে মাজারবিরোধী পাঠ হিসেবে ব্যবহার করলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ‘ভুঁইফোঁড়’ পীরের মিথ্যা ক্ষমতাকেন্দ্র নির্মাণের কাহিনি, বাস্তব মাজারের প্রতিনিধিত্ব নয়।
বাউল-ফকিরদের কোনো মাজারে আক্রমণ হলে নানা মাধ্যমের আলোচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস ‘লালসালু’র প্রসঙ্গও সামনে চলে আসে। তার মানে এই নয় যে যাঁরা মাজারে আক্রমণ করেন বা যাঁরা মাজার ভেঙে ফেলার পক্ষে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ পড়ার কারণে কাজটি করেন। তবে ওয়ালীউল্লাহ যেহেতু একটি মাজারকে কেন্দ্রে রেখে এক ভুঁইফোড়ের ক্ষমতা বিস্তারের আখ্যানটি তৈরি করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যতালিকাভুক্ত থাকার কারণে সেই আখ্যানের কিছু পাঠক তা পড়েই তার নিজের চিন্তাজগতে প্রবেশ করে, আবার আক্রমণকারী দলের পাঠকদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ আছেন যাঁরা সরলভাবে মনে করেন যে মাজার থাকলেই সেখানে সেই লালসালু উপন্যাসের মতোই নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। এর বাইরে, আক্রমণকারীদের দলে মূলত তাঁরাই বেশি যাঁরা মনে করেন মাজারে মূলত শরিয়তবিরোধী কাজই হয়, ফলে শরিয়তের অনুসারী হিসেবে তার প্রতিবাদ করাটাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কেউ চাইলে তাদের এই প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে শরিয়ত অনুসারেও জ্ঞান-জাগতিক প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু এখানে এ কথাও মনে রাখতে হয় যে যাঁরা মাজার ভাঙেন তাঁরা মনে করেন এর মাধ্যমে তাঁরা মূলত ধর্মপ্রতিষ্ঠার কাজই করে যাচ্ছেন। এখানে সাবধানতার জন্য এই কথাটি স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো, মাজার ভাঙার মধ্য দিয়ে বা তাকে উছিলা করে যে অশনাক্ত/অচিহ্নিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা করে, তাদের সম্পর্কে কিছু বলা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়, আমাদের উদ্দেশ্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মাজারকে কেন্দ্রে রেখে আসলে কী বলতে চেয়েছেন, তার খোঁজ করা। এর কারণ, ওয়ালীউল্লাহ ইতিমধ্যে তাঁর সাহিত্যের বিষয় ও ভাষার জগতের মাধ্যমে আমাদের চেতনায় নিবিড়ভাবে সাড়া জাগিয়েছেন এবং ধীরে ধীরে তা আমাদের অনেকের যৌথ স্মৃতিতে পরিণত হতে চলেছে, ফলে সেই বিষয়কেন্দ্রিক যেকোনো সাড়াজাগানো ঘটনায় তিনি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন, তা প্রত্যাশিত। আর এ ক্ষেত্রে তাঁর পাঠক হিসেবে, আমাদের নীরব থাকাটাও কম অপ্রত্যাশিত নয়।
মাজার ভাঙার ঘটনায় যাঁরা লালসালুর মূল বক্তব্যটা সামনে নিয়ে আসেন, তাঁদের সৈয়দ আলী আহসানের সতত স্বাগত (১৯৮৩ : ইউপিএল, ঢাকা) বইয়ের ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’ শিরোনামের স্মৃতিগদ্যটি স্মরণ করতে বলি।
মাজার ভাঙার মধ্য দিয়ে বা তাকে উছিলা করে যে অশনাক্ত/অচিহ্নিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা করে, তাদের সম্পর্কে কিছু বলা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়, আমাদের উদ্দেশ্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মাজারকে কেন্দ্রে রেখে আসলে কী বলতে চেয়েছেন, তার খোঁজ করা।
ওয়ালীউল্লাহর প্রথম গল্পগ্রন্থ নয়নচারা আদৃত হওয়ার পর সৈয়দ আলী আহসান তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি উপন্যাস লেখেন না কেন? জবাবে তাঁর উত্তর ছিল: ‘একটি উপন্যাসের বিষয় নিয়ে অনেক দিন ধরে ভাবছি। একজন গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ—যার সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, সে ব্যবসা হিসেবে বেছে নিল কবর-পূজা। এ লোকটি কী রকম আচরণ করে তা আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। চট্টগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ীর কাছে এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন লোক হঠাৎ উঁচু একটি মাটির ঢিবির উপর চুনকাম করে তার উপর লালসালু বিছিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে পয়সা নিতে লাগল। সরল বিশ্বাসী পথচারীরা চিরন্তন বিশ্বাসের ভারে এতই অভিভূত যে তারা নানাবিধ কামনায় সেখানে পয়সা দিতে লাগল।’ এতে বোঝা যায়, লালসালু দেখা সত্য ঘটনার তাড়নায় লিখিত এবং তা লিখতে গিয়ে তিনি তাঁর নিজের বোধবুদ্ধির জায়গা থেকে একটি আখ্যানকেই বিন্যাস বা উপন্যাস করে তুলেছেন, যার নেপথ্য ভিত্তি একজন গৃহস্থ (যার ছেলেমেয়ে ও সংসার আছে), ‘কবর-পূজা’র ব্যবসা এবং সরল বিশ্বাসী ‘অভিভূত’ মানুষ।
তবে এই ভিত্তি অবলম্বন করে তিনি যে আখ্যান দাঁড় করিয়েছেন, সেটি আর সোজাসাপটা থাকেনি, বিষয়বস্তুর কারণে তা জটিল হয়েছে, ফলে উপন্যাসের অন্তর্গত কাঠামোও আর নিখুঁত থাকেনি।
ওয়ালীউল্লাহ আইডিয়াপ্রধান লেখক বলে তিনি বিষয়বস্তুকে আইডিয়ার পক্ষেই দাঁড় করান, অন্য চারটি উপন্যাসেও তা করেছেন। চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসে একটি নির্মম খুনের ঘটনা ঘটে, যেকোনো পাঠক পড়া শুরু করে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারেন খুনকে কেন্দ্র করে কাহিনি এগোচ্ছে, কিন্তু এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ফরাসি প্রকাশককে বলেছিলেন: ‘আমি যেটা বলতে চাই তা হলো, সেই অশুভ কর্মটি বা সেই অপকর্মের হোতা, কেউই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সবচেয়ে জরুরি হলো এ রকম একটি অপকর্মের বাইরের মানুষটির আচরণ। এটি এমন এক সমস্যা যা ভয়ংকর মাত্রা পাচ্ছে। যুবক শিক্ষকটি এই অপরাধের কাছ থেকে পালায় না, সে পালায় তার আবশ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব থেকে।’ এ কারণে আরেফের মনোজগতে যে ভাবনা তৈরি হয়েছে, বলা উচিত, লেখক আরেফকে দিয়ে তাঁর আইডিয়া অনুযায়ী যা যা ভাবিয়েছেন, তা স্থানে স্থানে অতিভাবনা মনে হলেও দার্শনিক চিন্তার জায়গা থেকে তা সমস্যাজনক নয়, কিন্তু লালসালুর ক্ষেত্রে তাঁর আইডিয়া বা অভিপ্রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদের অমাবস্যায় খুনের চাইতেও বড় করে দেখানো হয়েছে খুন হওয়া মহিলার প্রতি মিথ্যা দরবেশ খুনি কাদেরের ‘মায়ামহব্বত’ না থাকার বিষয়টিকে। কিন্তু লালসালুর বিষয়বস্তুর আড়ালে দর্শনসূক্ষ্ম মনোবৃত্তির বিবেচনা প্রধান হয়ে ওঠেনি, এতে মজিদের প্রতি তাঁর ‘মমতা’ দেখানোর পূর্ব-অভিপ্রায় থাকলেও তা-ও বাস্তবায়িত হয়নি, এখানে ধর্ম ও তার দুই তরিকা এবং তার ব্যবহারটা প্রধান হয়ে ওঠার কারণে উপন্যাসের বিস্তার অন্য দিকে ঘটেছে। এখানেই সমস্যার সৃষ্টি। মজিদ-চরিত্রের ওপর একই সঙ্গে শরিয়ত-মারফতপন্থীদের যে মনোভাব আরোপ করেছেন, তা বাস্তবানুগ হয়নি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জ্ঞান বহুমাধ্যমে বিস্তৃত হলেও ইসলামের এই দুই তরিকার মতপার্থক্য বিষয়ে তিনি যে খুব ওয়াকিবহাল ছিলেন এই আখ্যান তা প্রমাণ করে না। ফলে যেসব কারণে এই দুই তরিকার অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক বিরুদ্ধতা জারি রয়েছে, মজিদ–চরিত্রে তা নেই। একটি মিথ্যাকে সত্যরূপে সামনে এনে গ্রামের মানুষদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে মজিদ তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে। এখানে এই মিথ্যাটাকে সরল বিশ্বাসী মানুষেরা মোদাচ্ছের পীর নামক কারও নাম স্মরণ করতে না পারলেও অজ্ঞতাজাত ভয় থেকে মজিদ-কল্পিত এই মাজারটিকে সত্য বলে মেনে নেয়। কিন্তু মাজারটিকে সত্য বলে মানা না মানার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাজারটি সম্পর্কে মজিদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং লালসালুর পাঠকেরা তা মানেন কি না।
পাঠকেরা লালসালুর এই মাজারটির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, লেখক-অভিপ্রায়ও তা নয়, কারণ লেখকের দেওয়া তথ্য থেকেই বোঝা যায়, এখানে কোনো মাজারের অস্তিত্ব নেই, মোদাচ্ছের পীর বলে আসলে কেউ ছিল না, লালসালুর নিচে কাউকে কবর দেওয়া হয়নি, তাই এই কল্পিত মিথ্যা মাজারটিকে মানার প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু এখানে এ কথা মাথায় রাখতে হয় যে সত্য মাজারের প্রতি মারফতপন্থীরা অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাশীল, তবে তারা শরিয়তের আচারের প্রতি উদাসীন এবং এ ক্ষেত্রে তাঁদের ভিন্ন রকম ব্যাখ্যাও রয়েছে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জ্ঞান বহুমাধ্যমে বিস্তৃত হলেও ইসলামের এই দুই তরিকার মতপার্থক্য বিষয়ে তিনি যে খুব ওয়াকিবহাল ছিলেন এই আখ্যান তা প্রমাণ করে না। ফলে যেসব কারণে এই দুই তরিকার অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক বিরুদ্ধতা জারি রয়েছে, মজিদ–চরিত্রে তা নেই।
কিন্তু ধর্মতত্ত্বগতভাবে যাঁরা পাক্কা শরিয়তের অনুসারী, তাঁরা মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন কি না, তা নির্ভর করে মাজারে কাকে কবর দেওয়া হয়েছে, তার ওপর। যদি সেখানে শরিয়তবিরোধী কাউকে কবর দেওয়া হয়, তাহলে তরিকাগত বিশ্বাসের কারণে সেই কবর বা মাজারের প্রতি তাদের আর শ্রদ্ধা থাকে না। অথচ আমরা লালসালুতে লক্ষ করি, মজিদ একই সঙ্গে মাজারপন্থী এবং শরিয়তের আচারের প্রতি নিষ্ঠাবানও। সে নিজে নামাজ তো পালন করেই এবং অন্যদেরও নামাজ পড়তে আদেশ দেয়। অন্যদিকে, শরিয়তের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পালনের ক্ষেত্রে মারফতপন্থীরা শরিয়তপন্থীদের বাধা না দিলেও তা নিজে পালন না করার ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে ভিন্নমত, বাউল-ফকিরদের গানে যার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। লালন-পূর্ব শেখ মদন বাউল, সৈয়দ শাহনূর থেকে শুরু করে লালন-পরবর্তী একালের বাউল-ফকিরদের অসংখ্য গানেও তার প্রমাণ রয়েছে। এসব গান এবং নানা ধরনের আধ্যাত্মিক গানগুলো মাজার-অনুসারীদের পছন্দ, অনেকের সাধনায় নিত্যসঙ্গী এবং অধ্যাত্ম-ক্ষুধা লাঘবের উপায়ও বটে। কিন্তু লালসালুতে আমরা দেখি, ‘কাতারে কাতারে সারবন্দী হয়ে দ্বিতীয়ার চাঁদের মত কাস্তে নিয়ে মজুররা যখন ধান কাটে আর বুক ফাটিয়ে গীত গায় তখনো মজিদ দূরে দাঁড়িয়ে দেখে আর ভাবে। কিসের এত গান, এত আনন্দ?’ তার মনে হয়, ‘ঝালরওয়ালা সালু কাপড়ে আবৃত মাজারটিকে তাদের হাসি আর গীত অবজ্ঞা করে যেন।’ এসব লোকায়ত মানুষের সামনে মজিদ-প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কেন্দ্র বা তন্ত্র ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে পড়ে। ফলে যে বাস্তব অভিজ্ঞতার তাড়নায় তিনি এই উপন্যাসটি লিখুন না কেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর উপন্যাসের এই চরিত্রটি একটি কল্পিত পীরের চরিত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের মনে পড়বে লালসালুর ইংরেজি অনুবাদটির কথা, যার নাম ট্রি উইদাউট রুট, বিষয়বস্তু আর কাঠামোর কারণে উপন্যাসের যে পরিণতি, অনূদিত বইয়ের নাম সমর্থন করে তিনি যেন পরবর্তী সময়ে একটি স্থির পরিণতির দিকেই পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মূল উপন্যাসটি কেন এমন নিখুঁত পরিণতি পায়নি, তার কারণ লেখকের উপন্যাসগত অভিপ্রায় নির্দ্বন্দ্ব ছিল না। তার কারণ বোঝা যাবে সৈয়দ আলী আহসানের প্রশ্নের জবাবে বলা বাকি অংশটুকু পড়ে নিলে। তার দেখা ওই পীর লোকটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন:
এ মত অস্বীকার করা কঠিন যে এই উপন্যাস মূলত এক ভুঁইফোড় পীরের মিথ্যা বয়ানের আখ্যান, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ফলে শরিয়তপন্থী অধিকাংশ মানুষের কাছে মাজার মানে হলো, মজিদের মতো পীর ও তার অনুসারীদের আস্তানা, যেখানে শরিয়তবিরোধী কাজই হয়।
‘আমাদের দেশে এ রকম দরগা কিন্তু অনেক গড়ে উঠেছে। ইসলাম এটাকে সমর্থন করে না জানি, তবু এ ব্যবসা ক্রমান্বয়ে প্রসারের পথে। এ রকম একজন ব্যবসায়ীর চাতুর্যকে আমি আবিষ্কার করতে চাই, মিথ্যাচারকেও আবিষ্কার করতে চাই। আবার মমতার মধ্যেও তাকে পেতে চাই। এটা কী করে সম্ভব হবে, আমি জানি না কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।’
উপন্যাসটি লেখকের অভিপ্রেত ‘মমতা’ময় পরিণতির দিকে না এগিয়ে তারই নির্মিত চরিত্র আর বাস্তবতার অভিঘাতে আপাত-অনভিপ্রেত তৃতীয় পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে। এখানে আপাত-অনভিপ্রেত বলার কারণ, তরিকাগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আর লোকায়ত মানুষের জীবনাচরণগত বাস্তব অভিজ্ঞতার দৈন্যের কারণে তাঁকে আর্থসামাজিক তত্ত্ব-অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন: ‘আমি যখন ধর্মীয় কুসংস্কার, মোল্লাদের হাতে গরীব মানুষের শোষণকে আক্রমণ করি, তখন আমি গোটা ব্যবস্থাটাকেই আক্রমণ করি।’ সাধারণত যেকোনো তত্ত্ব অনেকের মিলিত লক্ষ্যের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপায় হয়, আইডিয়াভিত্তিক উপন্যাসে তা করাই যায়, তাঁর অন্য চারটি উপন্যাসের ক্ষেত্রে যা-ই হোক, কিন্তু লালসালুর ক্ষেত্রে তা অভিপ্রেত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। কথাটিতে অনেকেরই ভিন্নমত থাকতে পারে, কারণ বাস্তবে, জনমানসে, লালসালুর পীর মজিদ ভণ্ড পীরের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ মত অস্বীকার করা কঠিন যে এই উপন্যাস মূলত এক ভুঁইফোড় পীরের মিথ্যা বয়ানের আখ্যান, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ফলে শরিয়তপন্থী অধিকাংশ মানুষের কাছে মাজার মানে হলো, মজিদের মতো পীর ও তার অনুসারীদের আস্তানা, যেখানে শরিয়তবিরোধী কাজই হয়।
অথচ সরলভাবে দেখলে মাজার তো তাকেই বলে যেখানে কারও কবর দেওয়া হয়েছে, আরবিতে যাকে ‘মাকবারা’ বা কবরস্থান বলা হয়, ফারসিতে যা ‘দরগাহ’ বলে খ্যাত। সাধারণত প্রয়াত ব্যক্তি বিশিষ্ট কেউ হলে অনুসারীদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের স্মারকরূপে সেটি ধীরে ধীরে মাজার (আরবি শব্দ) বলে খ্যাত হয়। এই মাজারে নানা রকম কাজই হতে পারে, কারণ কিছু কিছু মাজার বহু মত ও বহু পথ-অবলম্বনকারী বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। কারও দৃষ্টিতে যদি মনে হয় কোনো মাজারে মন্দ কাজ হচ্ছে, চাইলে তিনি তার নিজের আদর্শের জায়গা থেকে তার প্রতিবাদ করতে পারেন, সেই প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে সেই কাজের ত্রুটি নিরূপণ করে নিজের আদর্শের প্রচার করে দায়িত্ব পালন করা। কারণ, ইতিহাস তো সেই সাক্ষ্যই দেয় যে কোনো মাজার, কোনো মসজিদ-মন্দির, কোনো স্থাপনা ভেঙে যেমন কোনো আদর্শকে শেষ করে দেওয়া যায় না, তেমনই কোনো আদর্শকে কোথাও বা কারও ওপর চাপিয়ে দিয়ে তা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠাও করা যায় না।