
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ছিলেন একজন আইরিশ বিপ্লবী, কবি ও জাতীয়তাবাদী। তাঁর জীবনকাল ছিল ১৮৮৭ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত। তিনি আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ১৯১৬ সালের ইস্টার বিদ্রোহের (ইস্টার রাইজিং) অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। সেই সঙ্গে তিনি আইরিশ সাহিত্যজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তাঁর সংক্ষিপ্ত; কিন্তু তীব্র জীবনে স্বদেশপ্রেম, আধ্যাত্মিক দর্শন এবং কবিতার জন্য তিনি আইরিশ ইতিহাস ও সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ১৮৮৭ সালের ২১ নভেম্বর ডাবলিনের এক ধনী ও সংস্কৃতিমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জর্জ নোবেল প্লাঙ্কেট একজন আভিজাত্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি পরবর্তী সময়ে আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থন দেন। প্লাঙ্কেটের মা জোসেফাইন ক্র্যানি ছিলেন একজন গভীর ধর্মপ্রাণ মহিলা, যাঁর প্রভাব প্লাঙ্কেটের আধ্যাত্মিক চিন্তায় দেখা যায়।
ছোটবেলা থেকেই জোসেফ অসুস্থ ছিলেন। বিশেষ করে টিউবারকিউলোসিসে (যক্ষ্মা) আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়। অসুস্থতার কারণে ঘরের মধ্যে অনেক সময় একা কাটাতেন। সেই সময়েই তিনি বই পড়া, লেখালেখি ও আত্মজিজ্ঞাসার চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তবে অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি লন্ডনের স্টোনিহার্স্ট কলেজ এবং পরে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনে পড়াশোনা করেন। সাহিত্য ও কবিতা ছাড়াও তিনি বিজ্ঞান, কৃষি ও দর্শন নিয়েও গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন।
প্লাঙ্কেটের রাজনৈতিক চেতনা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ জাতীয়তাবাদী। তিনি আইরিশ সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজ করতেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হবে। তিনি আইরিশ ভলান্টিয়ার্স ও আইরিশ রিপাবলিকান ব্রাদারহুডের (আইআরবি) সদস্য হন। ১৯১৫ সালে তিনি জার্মানিতে গিয়ে রজার কেসমেন্টের সঙ্গে আইরিশ স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যদিও এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ইস্টার বিদ্রোহ ছিল ১৯১৬ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘটিত একটি সশস্ত্র বিপ্লব, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি মূলত ডাবলিন শহরে সংঘটিত হলেও আয়ারল্যান্ডজুড়ে এর প্রভাব পড়ে। এই সময় জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই বিদ্রোহের একজন প্রধান নেতা ও সামরিক পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তিনি জেমস কনোলি ও প্যাট্রিক পিয়ার্সের মতো নেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। অসুস্থ শরীরে তিনি ডাবলিনের জেনারেল পোস্ট অফিসে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে মেরি প্লাঙ্কেটকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর জীবনে এক করুণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর বাগদত্তা গ্রেস গিফোর্ডকে বিয়ে করার অনুমতি পান। ১৯১৬ সালের ৪ মে প্লাঙ্কেটকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে কারাগারে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিয়ে ও তাঁর আত্মোৎসর্গে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা ও ট্র্যাজেডির মিশেল আছে, যা আইরিশ জাতীয় চেতনাকে আজও আন্দোলিত করে।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ছিলেন একজন প্রতিভাবান কবি। তাঁর লেখার মধ্যে মিল পাওয়া যায় উইলিয়াম ব্লেক, দান্তে ও খ্রিষ্টীয় সাধুদের মিস্টিক চেতনার। প্লাঙ্কেটের কবিতা তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তাঁর লেখার মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিকতা, দেশপ্রেম, মানবিক প্রেম ও মৃত্যুর মতো বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম দ্য সার্কল অ্যান্ড দ্য সোর্ড। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি তাঁর বিপ্লবী আদর্শ এবং আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে দ্য পোয়েমস অব জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট প্রকাশিত হয়।
প্লাঙ্কেটের প্রেমিকা ও ক্ষণকালীন স্ত্রী গ্রেস ইভলিন গিফোর্ড সম্পর্কে এখানে একটু সংযোজন থাকুক। আয়ারল্যান্ডে তাঁর জন্ম ১৮৮৮ সালে, মৃত্যু ১৯৫৫ সালে। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ শিল্পী, কার্টুনিস্ট ও স্বাধীনতাকামী সক্রিয় কর্মী।
গ্রেস ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত প্রটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্ম নেওয়া স্বাধীনচেতা নারী। তিনি জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের প্রেমে পড়েন। তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক ও রাজনৈতিক স্তরে। তাঁরা বিয়ে করতে চেয়েছিলেন ১৯১৬ সালের গ্রীষ্মে। কিন্তু ইস্টার বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে প্লাঙ্কেটকে বন্দী করে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ৪ মে ১৯১৬ সালে প্লাঙ্কেটের মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে তাঁকে কারাগারে, একজন প্রিজন চ্যাপলিনের সামনে বিয়ে করেন গ্রেস গিফোর্ড। এটি আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ; কিন্তু সবচেয়ে গৌরবময় বিয়েগুলোর একটি।
গ্রেস জীবনের বাকিটা সময় প্লাঙ্কেটের স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। ১৯২৩ সালে তিনি রাজবন্দী হিসেবে গ্রেপ্তার হন এবং জেলে ‘দ্য ম্যাডোনা অব দ্য কে’ নামে একটি বিখ্যাত চিত্র আঁকেন।
আয়ারল্যান্ডে গ্রেস গিফোর্ড ও জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের প্রেম ও আত্মত্যাগকে এক পবিত্র ইতিহাসের অংশ মনে করা হয়। তাঁদের ভালোবাসা ও বিয়ের মুহূর্ত আধুনিক আইরিশ সংস্কৃতিতে গান, নাটক ও চলচ্চিত্রে অমর হয়ে আছে।
ইস্টার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় মাত্র ছয় দিনের মাথায়। প্লাঙ্কেটসহ ১৬ জন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শুরুতে জনমত নেতাদের বিপক্ষে থাকলেও তাঁদের আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী চেতনার আগুন জ্বালায়। ১৯২১ সালে আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলন সফল হয় তাঁদের আত্মবলিদানের ভিত্তিতেই। ইস্টার বিদ্রোহ ছিল আয়ারল্যান্ডের ২০ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের জীবনদর্শন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ক্যাথলিক মিস্টিসিজম। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আত্মার মুক্তি ও ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনই মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাঁর কবিতায় খ্রিষ্টের ক্রুশ, পবিত্র আত্মত্যাগ ও ব্যথা উপলব্ধিকে ঘন ঘন দেখা যায়।
জাতীয়তাবাদ ও আত্মোৎসর্গ ছিল প্লাঙ্কেটের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবাদর্শ। তাঁর মনে বিশ্বাস ছিল, আয়ারল্যান্ডের জন্য জীবন দেওয়া কোনো দুঃখের বিষয় নয়; বরং পবিত্র দায়িত্ব। দেশকে মাতৃমূর্তিতে কল্পনা করে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন ‘আয়ারল্যান্ডের জন্য, ঈশ্বরের নামে’।
প্লাঙ্কেটের ভাবুকতার আরেকটি স্তম্ভ হলো প্রেম। তিনি প্রেমকে দেখতেন আত্মার পবিত্রতায় উত্তরণ ঘটানোর একটি মাধ্যম হিসেবে। প্রেম, মৃত্যু ও মুক্তির ধারণা তাঁর লেখায় ও জীবনে একাত্ম হয়ে যায়। জাগতিক প্রেমকে তিনি আধ্যাত্মিক প্রেমের সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা করতেন।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ছিলেন একজন প্রতিভাবান কবি। তাঁর লেখার মধ্যে মিল পাওয়া যায় উইলিয়াম ব্লেক, দান্তে ও খ্রিষ্টীয় সাধুদের মিস্টিক চেতনার। প্লাঙ্কেটের কবিতা তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তাঁর লেখার মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিকতা, দেশপ্রেম, মানবিক প্রেম ও মৃত্যুর মতো বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম দ্য সার্কল অ্যান্ড দ্য সোর্ড। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি তাঁর বিপ্লবী আদর্শ এবং আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে দ্য পোয়েমস অব জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট প্রকাশিত হয়।
মেরি প্লাঙ্কেটের জীবন ও কাব্য আমাদের শেখায়—আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না আর কবিতার ভাষায় বিপ্লবের বাণীও উচ্চারণ করা যায়। তাঁর কবিতা আজও পাঠকদের নিয়ে যায় আত্মার গভীর গহন অরণ্যে, যেখানে প্রেম, ব্যথা, ঈশ্বর, জাতির মুক্তি, সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গ—সব একে অপরের প্রতিচ্ছবি।
মেরি প্লাঙ্কেটের কিছু কবিতার মধ্যে রহস্যময় ও ধর্মীয় ভাবধারার প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে তিনি তাঁর বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় ঈশ্বরকে পাওয়া যায় প্রকৃতির প্রতিটি কণায়। এটি একপ্রকার প্যানএনথিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আবার কিছু কবিতায় তিনি প্রেমের কথা লিখেছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল সাবলীল ও প্রতীকী। তিনি ইংরেজি ভাষাকে এক রহস্যময় সংগীতের রূপে রূপান্তর করেন, যা পাঠকের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
প্লাঙ্কেটের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা হলো ‘আই সি হিজ ব্লাড আপন দ্য রোজ’। কবিতাটি তাঁর আধ্যাত্মিকতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে তিনি যিশুর আত্মত্যাগকে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। গোলাপের লালে যিশুর রক্তের প্রতীক, সাদা লিলি ফুলে তাঁর পবিত্রতা এবং সূর্যালোকে তাঁর দীপ্তি দেখা যায়।
‘আমি গোলাপের পাপড়িতে তাঁর রক্ত দেখেছি।
সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় তাঁর মুখ দেখেছি।
প্রতিটি পাতায়, নদীর কলধ্বনিতে, আকাশের নক্ষত্রে—
সর্বত্র তিনি বিরাজ করছেন, অনন্ত এবং গভীরভাবে।’
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট মাত্র ২৮ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, কবিতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে আইরিশ জাতীয়তাবাদে এক চিরন্তন প্রভাব রেখে গেছেন। তাঁর কবিতা ও জীবন আজও আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট কেবল একজন বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন একজন ‘শহীদ কবি’, যাঁর জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তাঁর আত্মত্যাগ আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাসংগ্রামে এক অনন্ত প্রেরণা, আর তাঁর কবিতা বিশ্বসাহিত্যে ক্যাথলিক মিস্টিক কাব্যের এক উজ্জ্বল ধারা।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের জীবন এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ—কবিতা ও বন্দুকের, প্রেম ও যুদ্ধের, মিস্টিক ও বিপ্লবীর। তাঁর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে ও ঈশ্বরের উদ্দেশে আত্মোৎসর্গ তাঁকে এক আধুনিক সন্ন্যাসী-যোদ্ধা-কবি হিসেবে চিহ্নিত করে।
মেরি প্লাঙ্কেটের জীবন ও কাব্য আমাদের শেখায়—আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না আর কবিতার ভাষায় বিপ্লবের বাণীও উচ্চারণ করা যায়। তাঁর কবিতা আজও পাঠকদের নিয়ে যায় আত্মার গভীর গহন অরণ্যে, যেখানে প্রেম, ব্যথা, ঈশ্বর, জাতির মুক্তি, সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গ—সব একে অপরের প্রতিচ্ছবি।
অ্যা নে ক ডো ট
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের সংক্ষিপ্ত কিন্তু নাটকীয় জীবনটি এমন কিছু ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক অ্যানেকডোট বা গল্পে ভরপুর, যা তাঁর কবিসত্তা, বিপ্লবী চরিত্র এবং মানবিক দিকটিকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। তাঁর জীবনের কয়েকটি স্মরণীয় ঘটনা তুলে ধরা যাক।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঠিক আগে, যখন তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন প্লাঙ্কেট একজন ব্রিটিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: ‘আইরিশ ইতিহাসের এই চমৎকার সময়ে এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে মরতে পারার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।’ এমনকি মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তেও তাঁর মুখের শান্ত ভাব এবং সাহসিকতা দেখে উপস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যরাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কবি হিসেবে জীবনের শেষ মুহূর্তটিকেও তিনি এক মহৎ কাব্যের মতো আলিঙ্গন করেছিলেন।
১.
প্লাঙ্কেটের জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং হৃদয়স্পর্শী অ্যানেকডোটটি তাঁর বিয়ের ঘটনা। ১৯১৬ সালের ইস্টার রাইজিং ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে (৩ মে ১৯১৬), ডাবলিনের কিলমেইনহ্যাম জেলে (Kilmainham Gaol) প্লাঙ্কেট ও তাঁর বাগদত্তা গ্রেস গিফোর্ডের বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়।
জেলখানার এক অন্ধকার চ্যাপেলে, মাত্র দুজন ব্রিটিশ সৈন্যের উপস্থিতিতে মোমবাতির আলোয় তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। প্লাঙ্কেটের হাতে তখন হাতকড়া পরানো ছিল। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর তাঁদের মাত্র ১০ মিনিট কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা–ও আবার ১৫ জন সেন্ট্রির কড়া নজরদারিতে। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই, ৪ মে ভোরে, মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্লাঙ্কেটকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয়। ঘটনাটি আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে এক ট্র্যাজিক রোমান্টিসিজমের প্রতীক হয়ে আছে।
২.
প্লাঙ্কেট ছোটবেলা থেকেই যক্ষ্মা এবং গ্রন্থিজনিত মারাত্মক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ১৯১৬ সালের ইস্টার রাইজিং শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগে ডাবলিনের এক হাসপাতালে তাঁর গলায় একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়। ডাক্তাররা তাঁকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার এই চূড়ান্ত মুহূর্তে ঘরে বসে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। অপারেশনের ব্যান্ডেজ এবং ক্ষতস্থান নিয়েই তিনি হাসপাতাল থেকে সোজা চলে আসেন জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও) ভবনে, যা ছিল বিপ্লবীদের মূল আস্তানা। বলা হয়ে থাকে, তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার কারণে অনেক সময় তাঁকে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকতে হয়েছিল; কিন্তু সেই অবস্থাতেই তিনি সামরিক কৌশল সাজাচ্ছিলেন এবং তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
৩.
প্লাঙ্কেট শুধু একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অভিজাত ও রুচিশীল কবি। যুদ্ধের ময়দানেও তাঁর এই শৈল্পিক রূপটি প্রকাশ পেয়েছিল। ইস্টার রাইজিংয়ের সময় যখন অন্য নেতারা সাধারণ সামরিক বা আধা সামরিক পোশাকে ছিলেন, প্লাঙ্কেট তখন হাজির হয়েছিলেন একটি লম্বা আইরিশ সামরিক কোট পরে, যার কলারের এক পাশে ছিল একটি বড় ‘আইরিশ ক্রিসেন্ট পিনেট’ (ঐতিহ্যবাহী অলংকার) এবং চোখে ছিল তাঁর এক চোখের চশমা বা মনোকল। তাঁর এই অদ্ভুত কিন্তু রাজকীয় উপস্থিতি জেমস কনোলিসহ অনেক সহযোদ্ধাকেই চমৎকৃত করেছিল।
৪.
অসুস্থতার কারণে প্লাঙ্কেটকে প্রায়ই গরম আবহাওয়ার দেশে সময় কাটাতে হতো। ১৯১১-১২ সালের দিকে তিনি কিছুকাল আলজেরিয়ায় ছিলেন। সেখানে থাকার সময় তিনি শুধু আরবি ভাষাই শেখেননি; বরং মাঝেমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতো পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতেন। ডাবলিনের বন্ধুদের কাছে চিঠিতে তিনি মজা করে লিখতেন, ছদ্মবেশে থাকার কারণে ব্রিটিশ গুপ্তচরেরা তো দূর, তাঁর নিজের পরিচিত লোকেরাও তাঁকে চিনতে পারতেন না। এই ভ্রমণ তাঁর কবিতায় একধরনের প্রাচ্যদেশীয় বা মরূদ্যান-সদৃশ রহস্যময়তার জন্ম দিয়েছিল।
৫.
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঠিক আগে, যখন তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন প্লাঙ্কেট একজন ব্রিটিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: ‘আইরিশ ইতিহাসের এই চমৎকার সময়ে এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে মরতে পারার চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।’
এমনকি মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তেও তাঁর মুখের শান্ত ভাব এবং সাহসিকতা দেখে উপস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যরাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কবি হিসেবে জীবনের শেষ মুহূর্তটিকেও তিনি এক মহৎ কাব্যের মতো আলিঙ্গন করেছিলেন।
প্লাঙ্কেটের মৃত্যুর পর তাঁর বোন জেরাল্ডিন প্লাঙ্কেট ভাইয়ের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে তাঁর কোটের পকেট থেকে একটি চিরকুট পান। তাতে একটি অসমাপ্ত কবিতার দুটি লাইন লেখা ছিল, যা তিনি সম্ভবত জেলে বসে তাঁর শেষ দিনগুলোতে লিখেছিলেন। লাইন দুটি ছিল অনেকটা এ রকম: ‘আমি যে পথ বেছে নিয়েছি, তা রক্তের; কিন্তু এর শেষ প্রান্তে রয়েছে এক চিরন্তন আলো।’ প্লাঙ্কেট জানতেন তাঁর পরিণতি কী হতে চলেছে; কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর কবিহৃদয় এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস কতটা অবিচল ছিল, এই চিরকুট তারই প্রমাণ দেয়।
৬.
১৯১৫ সালে, ইস্টার রাইজিংয়ের ঠিক এক বছর আগে, আইরিশ বিপ্লবী ব্রাদারহুড (আইআরবি) প্লাঙ্কেটকে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গোপন মিশনে জার্মানিতে পাঠায়। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য জার্মানি থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলায় তখন ইউরোপজুড়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারি ছিল।
প্লাঙ্কেট এই যাত্রায় নিজেকে আড়াল করতে একজন সুইজারল্যান্ডীয় বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন, যিনি গবেষণার কাজে ভ্রমণ করছেন। তাঁর শারীরিক অসুস্থতা ও চশমা পরা তাত্ত্বিক চেহারা এই ছদ্মবেশকে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল যে ব্রিটিশ কাস্টমস ও গোয়েন্দারা তাঁকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেননি। তিনি সফলভাবে বার্লিনে পৌঁছান এবং রজার কেসমেন্টের সঙ্গে মিলে অস্ত্র আমদানির চুক্তি সম্পন্ন করেন।
৭.
মৃত্যুর আগের রাতে গ্রেস গিফোর্ডের সঙ্গে প্লাঙ্কেটের যে ঐতিহাসিক বিয়ে হয়েছিল, এর পেছনের আংটি কেনার গল্পটিও বেশ নাটকীয়। ডাবলিন শহরে তখন সামরিক আইন চলছে, চারদিকে ব্রিটিশ সৈন্যদের টহল। প্লাঙ্কেটের ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে শোনার পর, গ্রেস গিফোর্ড মরিয়া হয়ে ডাবলিনের রাস্তায় জুয়েলারির দোকান খুঁজতে বের হন।
শহরের প্রায় সব দোকান বন্ধ ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য গ্রেসের অবস্থা দেখে মাঝরাতে একটি দোকান খুলে দেন। গ্রেস তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃখের এবং সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তটির জন্য একটি সাধারণ বিয়ের আংটি কিনে সোজা জেলের দিকে রওনা হন।
৮.
প্লাঙ্কেট যখন তাঁর কবিতা সম্পাদনা ও প্রকাশের কাজ করতেন, তখন তিনি আয়ারল্যান্ডের প্রখ্যাত লেখক ও কবি জেমস স্টিফেনসের সঙ্গে প্রায়ই আড্ডা দিতেন। প্লাঙ্কেটের স্বভাব ছিল নিজের কবিতা নিয়ে ভীষণ খামখেয়ালি করা। কোনো ডায়েরি বা খাতায় গুছিয়ে লেখার চেয়ে যখন যা মনে আসত, তা সিগারেটের প্যাকেটের পেছনে, ট্রামের টিকিটে কিংবা পুরোনো চিঠির খামে লিখে রাখতেন।
একবার জেমস স্টিফেনস তাঁর এই এলোমেলো কাগজের স্তূপ দেখে হেসে বলেছিলেন, ‘জোসেফ, তোমার কবিতাগুলো আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার মতোই—বিচ্ছিন্ন, কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান। এগুলোকে এক সুতায় না বাঁধলে আয়ারল্যান্ড স্বাধীন হলেও তোমার কবিতা হারিয়ে যাবে!’ এই মন্তব্যের পরেই প্লাঙ্কেট তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য সার্কল অ্যান্ড দ্য সোর্ড’ প্রকাশের জন্য কবিতাগুলো গোছাতে শুরু করেন।
৯.
খুব কম মানুষই জানেন যে প্লাঙ্কেট সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞানের, বিশেষ করে নতুন উদ্ভাবিত রেডিও প্রযুক্তির (ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি) একজন বড় অনুরাগী ছিলেন। ইস্টার রাইজিংয়ের সময় তাঁর এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিপ্লবীদের দারুণ কাজে এসেছিল।
বিদ্রোহের শুরুতে প্লাঙ্কেটের নির্দেশনায় একদল তরুণ আইরিশ স্বেচ্ছাসেবক ডাবলিনের একটি টেকনিক্যাল স্কুল থেকে কিছু ওয়্যারলেস যন্ত্রাংশ নিয়ে একটি অস্থায়ী রেডিও স্টেশন স্থাপন করেন। সেখান থেকেই আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণা বাতাসে সম্প্রচার করা হয়েছিল। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রথম ‘পাইরেট রেডিও ব্রডকাস্ট’, যার নেপথ্যের মস্তিষ্ক ছিলেন এই কবি।
১০.
প্লাঙ্কেটের মৃত্যুর পর তাঁর বোন জেরাল্ডিন প্লাঙ্কেট ভাইয়ের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে তাঁর কোটের পকেট থেকে একটি চিরকুট পান। তাতে একটি অসমাপ্ত কবিতার দুটি লাইন লেখা ছিল, যা তিনি সম্ভবত জেলে বসে তাঁর শেষ দিনগুলোতে লিখেছিলেন। লাইন দুটি ছিল অনেকটা এ রকম: ‘আমি যে পথ বেছে নিয়েছি, তা রক্তের; কিন্তু এর শেষ প্রান্তে রয়েছে এক চিরন্তন আলো।’ প্লাঙ্কেট জানতেন তাঁর পরিণতি কী হতে চলেছে; কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর কবিহৃদয় এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস কতটা অবিচল ছিল, এই চিরকুট তারই প্রমাণ দেয়।
প্লা ঙ্কে টে র ক য়ে ক টি ক বি তা
১.
আমি সমুদ্রের একটি ঢেউ
এবং ঢেউয়ের ফেনা
এবং ফেনার বাতাস
এবং বাতাসের ডানা।
আমার আত্মা সমুদ্রের লবণে
ঢেউয়ের ভারে
ফেনার বুদ্বুদে
বাতাসের পথে।
আমার উপহার সমুদ্রের গভীরতা
ঢেউয়ের শক্তি
ফেনার লঘুতা
বাতাসের গতি।
২.
মধ্যরাতে আমি সূর্য দেখলাম, রক্তিম হয়ে উঠছে,
গভীর রঙে রঞ্জিত তবু জ্বলজ্বলে, রক্তের করুণ ভারে।
আমি দেখলাম তা দ্রুত আকারে বাড়ছে,
এবং ছড়িয়ে পড়ছে তারাদের ওপর; নত হলো আকাশ তার মাথা।
তার হৃদয় থেকে যখন টুপটাপ করে ঝরছিল গাঢ় লাল বৃষ্টি,
তখন এক বিরাট কম্পন তাকে নাড়িয়ে দিল, যেন যন্ত্রণায়—
রাতের আঁধার নেমে এল, করুণ আর্তনাদে, যখন সে সেখানে ঝুলে আছে মৃতের মতো।
হে সূর্য, হে খ্রিষ্ট, হে জ্বলন্ত শিখার রক্তক্ষয়ী হৃদয়!
তুমি তোমার যন্ত্রণাকে আমাদের জীবনের মূল্য হিসেবে দিয়েছ,
এবং তাকে করেছ অনন্ত, যাতে তোমার নাম ধরে ডাকার মতো
অধিকারের অভাব আমাদের না হয়;
তুমি পৃথিবীকে বন্ধক রেখেছ স্বর্গের জন্য
আর আমাদের মহিমার জন্য সকল লজ্জা ভোগ করেছ।
৩.
আমি গোলাপের পাপড়িতে দেখি তাঁর রক্তের ছাপ,
নক্ষত্রে দেখি তাঁর চোখের জ্যোতি।
চিরতুষারাবৃত শ্বেত পর্বতের মাঝে ঝলমল করে তাঁর দেহ—
আকাশ থেকে পড়ে তাঁর কান্নার অশ্রু।
প্রতিটি ফুলের মধ্যে আমি দেখি তাঁর মুখ,
বজ্রনিনাদ ও পাখির গান—সবই তাঁর কণ্ঠস্বর।
পর্বতের গায়ে খোদাই করা শিলালিপির মতো
লিখিত তাঁর বাণী।
প্রতিটি পথের ধুলোয় আছে তাঁর পদচিহ্ন,
সমুদ্রের অনিঃশেষ ঢেউ তাঁর হৃদয়ের ধুকপুক।
প্রত্যেক কাঁটায় জড়ানো তাঁর কাঁটার মুকুট,
আর প্রতিটি গাছ যেন তাঁর ক্রুশবিদ্ধতার স্মৃতি।
৪.
মাতাল তারারা আকাশজুড়ে টলমল করে,
চাঁদ দোদুল্যমান ও দোলে বাতাসের ঝাপটায় পড়া কুঁড়ির মতো,
আমার পায়ের নিচে পৃথিবী, ভেসে চলা মেঘের মতো
গলে যায় আর পিছলে যায়, গড়াগড়ি খায় আর উঁচুতে ছুটে চলে;
অচল বস্তুগুলো হঠাৎ উড়ে যেতে শুরু করে,
শহর কাঁপে আর কাঁপতে থাকে, কাদা আর পঙ্কের এক শহর—
আমার রক্ত হলো গলে যাওয়া ধাতু ও আগুনের এক কোলাহলপূর্ণ জলপ্রপাত—
ঈশ্বরের মতো আমিও একজন।
যখন ঈশ্বর আমাদের তৃষ্ণার জন্য তাঁর আবেগ-ফল পিষে দেন
এবং মহাবিশ্ব টলমল করে—আমি পৃথিবীর আঙুর ফাটিয়েছি,
আর তার শক্তিশালী রক্তকে যেতে দিয়েছি
অস্বাদিত—চিৎকার করে জানতে চাই, আমার দৃষ্টি কি সাহস করে
একজন মেয়ের কোমল রূপে ঈশ্বরের উচ্চ মহিমা দেখতে পারবে—
হে ঈশ্বর! আমার এই উপাসনা কি আশীর্বাদপ্রাপ্ত, নাকি অভিশপ্ত?
৫.
আকাশের তারাগুলো গেয়েছিল ঈশ্বরের উদ্যানে গান।
ওরা যেন ঈশ্বরের পাখির মতন।
রাত্রি হলো ঈশ্বরের ফসল তোলার সময়,
যখন তারাগুলো মাটির দিকে নেমে আসে।
রাত্রির বাতাসের ফিসফিস—
গাছের পাতায় ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর।
এমন কণ্ঠস্বর, যা কখনো থামে না,
যদিও কেউ তা শোনে না।
৬.
সাদা তরঙ্গ কাঁপে জলের বুকে,
তাতে শুধু তোমার কথাই ফিসফিস।
হে আমার হৃদয়ের কন্যা,
আমি কী করব—বলো?
সাদা তরঙ্গ ডাকছে
নিম্নস্বরে তটভূমিতে—
তোমার নাম উচ্চারিত হয়
বারবার, নিরন্তর।
৭.
ভালোবাসা আমার সামনে এসে দাঁড়াল মধ্যদুপুরে,
ভালোবাসা আমাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেল।
আমি তাঁর ছায়ায় ঘুমালাম,
আর জাগলাম—তাঁর আহ্বানে।
না, আমি কোনো পাখির গান শুনি না,
না দেখি সূর্যোদয়।
শুধু দেখি—তাঁর রূপ-সৌন্দর্য,
এক আবরণহীন চোখে।
৮.
প্রিয়তমা, তোমার কণ্ঠস্বর যেন একটি গান,
যা উঠে আসে ঘুঘু পাখির হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে।
নক্ষত্রদের নীরবতা যেন মিশে আছে
তোমার অসীম প্রেমের নীরব গভীরতায়।
৯.
আমি দেখলাম সূর্য উঠছে মধ্যরাতে, রক্তিম আভায়,
রক্তমাখা করুণায় ভেজা—তবু দীপ্তিমান।
আমি দেখলাম সেটি দ্রুত ফেটে উঠছে বিশালতায়,
আর পরিণত হচ্ছে এক ভয়াবহ রূপে—
শিংযুক্ত, লেজওয়ালা, নখরবিশিষ্ট
এক আঁশযুক্ত দানব, যা আসলে ঈশ্বরের হৃদয়ের প্রতিমা।
১০.
প্রতিটি মেঘে আমি দেখি ঈশ্বরের মুখ,
বজ্রধ্বনি শুনি—সেটিই তাঁর বজ্রকণ্ঠ।
বাতাসের ঝোড়ো ঝাপটায় আছে তাঁর নিশ্বাসের জোর,
ঝড়ের মধ্যেও তিনি কাছে থাকেন—চিরকাল।
১১.
করুণাময় ঈশ্বর, মহাশক্তির অধিপতি—
রাত্রির অন্ধকারে আমার কান্না শুনুন।
আমার দুর্বলতায়, আমার ব্যথায়,
আমার আর্তি যেন বৃথা না যায়।
১২.
হে প্রভু, আমি কেন এই কষ্ট পাই—তা আমি জানি না।
তবে এই নীরব যন্ত্রণার মাঝেই আমি আপনার সান্নিধ্য অনুভব করি।
আমার প্রতিটি ক্ষতে যেন আপনার পবিত্র রক্ত প্রবাহিত হয়,
আর আমার চোখের জলে ফুটে ওঠে আপনার প্রতিচ্ছবি।
১৩.
খ্রিষ্টের চোখ সর্বত্র—
ভিখারির দুঃখে, স্বৈরাচারের দৃষ্টিতেও।
তিনি ছায়ায় কাঁদেন, আলোয় হাসেন—
তাঁর করুণার শক্তিতেই পৃথিবী অটল।
১৪.
প্রভু, আমার নিশ্বাস আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি,
আপনি আমাকে আলতো করে মৃত্যুতে নিয়ে যান।
আমার জীবন হোক এক অগ্নিশিখা,
নিঃশব্দে জ্বলবে যে আপনারই নামে।
১৫.
আমি ঈশ্বরের সাথে কোনো তর্ক করি না,
আমি তো কেবলই রং ছিটানো মাটি।
আমি তাঁর শাস্তির লাঠিকে ভয় পাই না,
কিংবা তাঁর ক্রোধ দূর করার জন্য প্রার্থনাও করি না।
কিন্তু যখন সন্ধ্যার তারা
পশ্চিম আকাশে জাদুকরি আলো ছড়ায়,
আমি দূর থেকে চাঁদকে লক্ষ্য করি—
সে কীভাবে তার রুপালি বিশ্রামের দিকে এগিয়ে যায়।
সে হলো একটি বাঁকা একফালি চিহ্ন,
ভবিষ্যতের কোনো গোপন রহস্যের;
সে যেন এক সুধাভাণ্ড,
যা ধারণ করে আছে অমরত্বের সুরা।
১৬.
যখন সমস্ত তারা এক হয়ে যাবে
এবং পুরো আকাশকে আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলবে,
আর যখন কোনো চাঁদ কিংবা সূর্য থাকবে না,
থাকবে কেবল উঁচুতে জ্বলতে থাকা একটিই বিশাল আলো;
তখন আমি তোমার মুখ দেখতে পাব, আমার ভালোবাসা,
সেই পরম ও অলৌকিক দীপ্তির মাঝে।
আর ওপরের সমস্ত দেবদূতেরা
অবাক হয়ে ভাববে, আমি কীভাবে তা জানতে পারলাম!
কারণ, তুমিই আমার কাছে আমার সমস্ত আলো,
আমার সূর্য, আমার চাঁদ এবং আমার তারা;
আর অবশেষে তোমার চোখের মাঝেই আমি দেখতে পাই
সেই স্বর্গকে, যা এত দিন অনেক দূরে ছিল।
১৭.
আমরা লজ্জা ভোগ করেছি, আমরা যন্ত্রণা সহ্য করেছি,
আমরা আমাদের দেশকে কেনাবেচা হতে দেখেছি।
আমরা দেখেছি আমাদের নিহত ভাইদের তাজা রক্ত
কীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে ইংরেজদের স্বর্ণমুদ্রায়।
কিন্তু এখন সেই গতিময় ও মোক্ষম সময়টি ঘনিয়ে এসেছে,
শিকলগুলো একটা একটা করে ভেঙে পড়ছে।
আমরা আমাদের সমস্ত সংশয় আর ভয়কে দূরে ছুড়ে ফেলেছি,
এবং আমাদের মুখ ফিরিয়েছি সূর্যের দিকে।
১৮.
আমি যে পথটি বেছে নিয়েছি তা মৃত্যুর চেয়েও রুক্ষ,
তবু আমার পা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না;
যদিও চারপাশ এখন সূর্যোদয়ের রঙের বদলে অন্ধকারে ঢাকা
এবং দিনের আলোকেও যেন জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাতাসে উড়ে আসা বালুর কণা
দৃষ্টিহীন চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবীকে অন্ধ করে দিচ্ছে,
কিন্তু আমি সেই প্রতিশ্রুত ভূমিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি—
আকাশের এই ঘন অন্ধকারের ওপারে।
১৯.
তারা তাঁর জন্য একটি কাঁটার মুকুট তৈরি করেছিল,
এবং সেটি তাঁর পবিত্র মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল;
তাতে স্বর্গের সমস্ত তারা ম্লান হয়ে গিয়েছিল,
আর সমস্ত জীবন্ত বস্তু যেন নিথর হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সেই কাঁটা থেকেই একটি গোলাপের জন্ম হলো,
যা তাঁর শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তের মতোই লাল;
আর এখন সেই একটি গোলাপই হয়ে উঠেছে সবকিছু—
এই একাকী নির্জন পথের বুক চিরে জেগে থাকা একমাত্র আলো।
২০.
ক্ষণস্থায়ী মানুষের হাত দিয়ে তৈরি করা এই আলিশান কাঠামো—
যা একদিন ভেঙে পড়বেই, তা নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি কেন?
বাতাস এসে একদিন এই দেয়ালে ধাক্কা দেবে,
আর ধুলোবালি তার নিজের জিনিস আবার নিজের করে ফিরিয়ে নেবে।
কিন্তু যা হৃদয়ের অন্তরে বেঁচে থাকে—
সেই নীরব ভাবনা, সেই গোপন প্রার্থনা,
তা কখনো মানুষের আত্মা থেকে বিদায় নেয় না;
বরং সেখানেই খুঁজে নেয় তার চিরন্তন স্থায়ী নিবাস।
২১.
দিনের ভোরের আলো চলে এসেছে,
তারাগুলো একটা একটা করে ম্লান হয়ে যাচ্ছে;
ছোট ছোট পাখিগুলো, যারা এতক্ষণ নিঝুম ও বোবা হয়ে ছিল,
তারা সূর্যকে স্বাগত জানাতে গান গাইতে শুরু করেছে।
শান্তির রুপালি পায়রাগুলো ডানা মেলে জেগে উঠছে
এবং উড়ে চলেছে এই অশান্ত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে;
আমি তাদের চোখের মাঝে সেই দূরদর্শী স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি,
যা বড় বড় ভাববাদীরাও কোনো দিন বুঝতে পারেননি।
২২.
আমি অভিবাদন জানাই সেই পাহাড়গুলোকে, যা এত উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে,
আমি অভিবাদন জানাই সেই সবুজ আর গভীর উপত্যকাগুলোকে,
আমি অভিবাদন জানাই সেই ঝড়কে, যা আকাশকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়
এবং ঘুমন্ত প্রাচীন সমুদ্রকে জাগিয়ে তোলে।
কারণ, তাদের এই শক্তির মাঝে আমি খুঁজে পাই
সেই মহান, প্রচণ্ড এবং মুক্ত আত্মার অংশ,
যা স্পন্দিত হয় এই একাকী হৃদয়ের ভেতরে
এবং আমাদের দান করে জীবন ও স্বাধীনতা।
২৩.
রাত কেটে গিয়ে চারপাশ সাদাটে ফরসা হয়ে উঠছে,
ক্লান্তিকর এই দীর্ঘ পদযাত্রা প্রায় শেষের পথে;
আমরা রাতের সমস্ত ছায়াকে পেছনে ফেলে রেখে যাচ্ছি—
উদীয়মান সূর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য।
যদিও আমাদের দেওয়া মূল্যটি ছিল ভীষণ চড়া,
আর যে পথটির ওপর দিয়ে আমরা হেঁটেছি তা ছিল অন্ধকার;
তবু আমরা ভয়হীন চিত্তে সেই বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলাম
এবং বাকি সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলাম ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বরের হাতে।