
এই নিবন্ধে নজরুলের ছায়ানট কাব্যের রোমান্টিক ও সংগীতঘন অন্তর্জগতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ছায়ানট সংগঠনের ভূমিকা ও সাম্প্রতিক সংকটকে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দ্বৈত ছায়ানট আমাদের বলে—ধ্বংস নয়, নির্মাণই বাঙালির ঐতিহ্য; আগ্রাসনের মুখেও সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে মানবিকতার শক্তিতে।
বাঙালির ইতিহাসে অন্ততপক্ষে দুটি ‘ছায়ানট’ আছে—একটি কাব্য, অন্যটি সংগঠন। একটি স্থান পেয়েছে অমরত্বের আসনে, অন্যটির বয়স সত্তর ছুঁই ছুঁই–প্রায় প্রবীণ, সম্প্রতি আক্রমণ ও আগ্রাসনের শিকার। প্রথমটির রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম। দ্বিতীয়টি রচিত হয়েছে পূর্ব বাংলার বাঙালির সমবেত ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে।
এক শ বছর আগে, ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ছায়ানট। প্রকাশক বর্মণ পাবলিশিং হাউস, কলকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা এক শ, দাম পাঁচ সিকা। উৎসর্গপত্রে দুজনের নাম—মুজফ্ফর আহমদ ও কুতুব-উদ্দিন আহম্মদ। মুদ্রিত কবিতা ও গানের বেশির ভাগই প্রকাশিত হয়েছিল সেকালের বিখ্যাত সব পত্রিকায় ভারতী, প্রবাসী, মোসলেম ভারত, কল্লোল, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা কিংবা উপাসনায়। কোনো কোনো কবিতা এক পত্রিকা থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল অন্য পত্রিকায়। বাঙালির সৌভাগ্য এই যে ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখাগুলোর স্বরলিপিও মুদ্রিত হয়েছিল।
এক শ বছর আগে, ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ছায়ানট। প্রকাশক বর্মণ পাবলিশিং হাউস, কলকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা এক শ, দাম পাঁচ সিকা। উৎসর্গপত্রে দুজনের নাম—মুজফ্ফর আহমদ ও কুতুব-উদ্দিন আহম্মদ।
কবিতা ও গানের সংকলন হিসেবে বইটি কতটা সমাদৃত হয়েছিল, বলা মুশকিল। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে অগ্নি-বীণার আলোকপ্রভায় নজরুলের অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইও খানিকটা অনুজ্জ্বল। আমরা বাঙালি পাঠকেরা কজন জানি, ছায়ানট-এর সঙ্গে আছে পূর্ববঙ্গের নিবিড় সহযোগ? এই বইয়ের লেখাগুলোর সঙ্গে গেঁথে আছে বাংলাদেশের দুটি শহরের নাম কুমিল্লা ও বরিশাল। পূর্ববঙ্গের জল-মাটি আর হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে নজরুল লিখেছিলেন ছায়ানট।
এই সেই কুমিল্লা—এখানেই মিশে আছে নজরুলের নার্গিসের স্মৃতি। ১৯২১ সালে নার্গিসের সঙ্গে আক্দ হওয়া বিয়ে আর জোড়া লাগেনি। ছায়ানট–এর কবিতায় বেশ কয়েকবার এসেছে দৌলতপুরের নাম। ১৯২২ সালে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লেখার জন্য নজরুল গ্রেপ্তার হন কুমিল্লা থেকেই। এই শহরেই নজরুলের ত্রাতা হয়ে এসেছিলেন প্রমীলা। আর তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, নজরুলের জীবনে এই স্থান ও অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক, যা তৈরি করেছে স্মৃতি। নয়তো জীবনের অন্য এক পর্বে নজরুল কেন লিখবেন, ‘আজও মধুর বাঁশরি বাজে’, কেন বারবার তাঁর স্মৃতিতে দোলা দেবে গোমতীর তীরে থাকা ‘চাঁপার কুটির’? কিংবা লিখবেন ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে/ ঝরা বনগোলাপের বিলাপ শোনে।’
প্রকৃতপক্ষে ‘স্থান’ কেবলই বস্তুগ্রাহ্য উপাদান নয়, স্থান তৈরি করে স্মৃতি। ব্যক্তি, প্রকৃতি আর প্রতিবেশের দৃশ্যমানতা যেমন সত্য, তেমনি সত্য ব্যক্তি ও প্রতিবেশের সংযোগ। আর তাই স্থানের অনুষঙ্গে হাজির হয় নজরুলের প্রেম ও বিচ্ছেদের আখ্যান। আর এই আখ্যানই রূপান্তরিত হয়ে ফিরে আসে গান অথবা কবিতা হয়ে। ছায়ানট-এ নজরুল লেখেন একরাশ বিরহভারাতুর প্রেমের কবিতা। অগ্নি-বীণার ভাব-স্বভাবের সঙ্গে তুলনায় এ বই একেবারেই আলাদা। এখানে কোনো ‘রণ-তূর্য’ নেই, যুদ্ধের দামামা নেই, আছে এক নির্জন ‘বাঁশরি’; একাকী যে বেজে চলছে উদ্দিষ্টের উদ্দেশে।
ছায়ানট কাব্যের সঙ্গে আছে পূর্ববঙ্গের নিবিড় সহযোগ। এই বইয়ের লেখাগুলোর সঙ্গে গেঁথে আছে বাংলাদেশের দুটি শহরের নাম কুমিল্লা ও বরিশাল। পূর্ববঙ্গের জল-মাটি আর হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে নজরুল লিখেছিলেন ছায়ানট।
ছায়ানট–এর নজরুল দেশ-কাল-রাজনীতির ডামাডোলে উন্মাতাল নন, প্রেমে তিনি মগ্ন, শান্ত ও সমাহিত। নজরুলের এ–ও এক নিশানা। বিদ্রোহের আড়ালে পড়ে থাকা নজরুলের কবিতার এই খাতটিকে চিনতে হলে ছায়ানট–এ মোড় ফেরা দরকার। আমরা দেখব, দোলন-চাঁপা আর চক্রবাক–এর কবিতাগুলোতেও ছিল প্রেমার্তের গুঞ্জন। কিন্তু কে সেই অনামা দয়িতা? নজরুল তার নাম দিয়েছেন ‘বিজয়িনী’। রোমান্টিকতার এই এক ধরন—আপাত-অনির্দেশ্য দয়িতার উদ্দেশে কবিরা আওড়ে যান শ্লোক। অধরা মাধুরীকে ধরতে চান ভাষার অবয়বে। পৃথিবীখ্যাত রোমান্টিকরা তা-ই করেছেন।
অবশ্য কবিতায় যে দয়িতা অনির্দেশ্য, ইতিহাসকারেরা তাকেই করে তুলেছেন নির্দিষ্ট ও শনাক্তযোগ্য। বিদ্রোহী রণক্লান্ত বইয়ে গোলাম মুরশিদ তাই দাবি করেছেন বারবার প্রেমে পড়া নজরুল দোলন-চাঁপা আর ছায়ানট-এর কবিতাগুলোতে নার্গিসকেই স্মরণ করেছেন। মুরশিদের ভাষায় এসব লেখায় আছে ‘কখনো কোনো সুখ-স্মৃতি, চকিত মিলনের মুহূর্তের কথা, কখনো প্রেমিকার অবহেলার কথা। কখনোবা তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্মরণ করে তাঁকে অভিশাপ দিয়েছেন।’
ছায়ানট-এ নজরুল লিখেছেন সমর্পণের গান, ‘জানি রাণী, এমনি করে আমার বুকের রক্ত-ধারায়/ আমারই প্রেম জন্মে জন্মে তোমার পায়ে আলতা পরায়।’ বৈষ্ণব কবিরা যেমন রূপের ভেতর দিয়ে অরূপকে খুঁজে পেয়েছেন, নজরুল তেমন করেই প্রিয়কে দেখেছেন ‘আলোকে অনন্তলোকে’ ‘জীবনদেবী’ হিসেবে।
অগ্নি-বীণায় যে ‘আমি’কে আমরা উচ্চকিত হতে দেখি, সেই আমি ছায়ানট-এ এসে প্রশমিত। অর্থাৎ রোমান্টিকতার সক্রিয় ‘আমি’ পথ ধরেছে নিষ্ক্রিয়তার। এই পর্বেই নজরুল লিখেছেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন/ খুঁজি তারে আমি আপনায়,/ আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি আমারি তিয়াসি বাসনায়।’ আত্মমুগ্ধ এই উচ্চারণ নিজেকে ফিরিয়ে নেয় নিজের কাছেই। কিন্তু তৃপ্তি কি মেলে? মেলে না। থাকে শুধু বাসনার ব্যাকুল টলোমলো ধারা।
শাস্ত্রীয় সংগীতের দৃষ্টিতে ‘ছায়া’ আর ‘নট’ রাগের সহযোগে গড়ে ওঠা ‘ছায়ানট’ হলো সেই রাগ, যা একই অঙ্গে ধারণ করেছে ‘ছায়া’র পরিমিতি ও ‘নট’-এর গভীরতা। রাতের নির্মেঘ আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আবহ দেয় ছায়ানট।
নজরুলের আবেগকম্পিত উচ্চারণকে অনেক সমালোচক ভালো চোখে দেখেননি। কেউ কেউ মনে করেছেন নজরুলের প্রেমবোধ প্রাপ্তমনস্ক নয়। কারও কারও অভিযোগ, আবেগের আতিশয্য প্রেমানুভূতিকেই গৌণ করে তুলেছে। কিন্তু আবেগও তো জীবনের সত্য। লাগাম টেনে টেনে বাসনাকে মনবন্দী করে নজরুল কবিতাকে বিশেষভাবে ‘শিল্পিত’ করে তুলতে চাননি। এই স্বভাবের দেখা মিলবে তাঁর সমগ্র সাহিত্যে। এমনকি চিঠিপত্রেও দেখা যাবে আবেগের অতিশয় প্রকাশ।
কিন্তু স্বীকার করতে হবে যে অগ্নি-বীণা কিংবা দোলন-চাঁপার কবিতাগুলোর চেয়ে ছায়ানট-এ নজরুল অনেক বেশিই সংযত ও মিতবাক। এর সম্ভাব্য কারণ, নজরুল তখন সময় দিচ্ছেন সংগীতে। আর কাঠামোগত কারণেই সংগীতে গানের বাণীকে হতে হয় কণ্ঠ ও গায়ন উপযোগী। আরও খেয়াল করার মতো ব্যাপার, নজরুল কবিতা ও গানের সংকলনটির নাম দিয়েছেন ছায়ানট। শাস্ত্রীয় সংগীতের দৃষ্টিতে ‘ছায়া’ আর ‘নট’ রাগের সহযোগে গড়ে ওঠা ‘ছায়ানট’ হলো সেই রাগ, যা একই অঙ্গে ধারণ করেছে ‘ছায়া’র পরিমিতি ও ‘নট’-এর গভীরতা। সংগীতজ্ঞতরা বলেন, রাতের নির্মেঘ আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আবহ দেয় ছায়ানট। নজরুলের উন্মাতাল প্রেমের জন্য ‘ছায়ানট’ শব্দটি যেন সেই ভাবগম্ভীর দিশা।
এক শ বছর অতিক্রান্ত। আমরা যখন নজরুলের ছায়ানটকে উদ্যাপন করছি, তার ঠিক কাছাকাছি সময়েই আক্রান্ত হলো বাঙালির আরেক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’। আগ্রাসী হামলায় ধ্বংস করা হলো বাদ্যযন্ত্র, তছনছ করা হলো দেয়ালে ঝোলানো ছবি, ফ্যাসিবাদবিরোধিতার নামে চালানো হলো সহিংস আক্রমণ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্মারকচিহ্ন হওয়ায় অভিযোগ তোলা হলো, ‘ছায়ানট’ ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’।
আমরা যখন নজরুলের ছায়ানটকে উদ্যাপন করছি, তার ঠিক কাছাকাছি সময়েই আক্রান্ত হলো বাঙালির আরেক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’। আগ্রাসী হামলায় ধ্বংস করা হলো বাদ্যযন্ত্র, ফ্যাসিবাদবিরোধিতার নামে চালানো হলো সহিংস আক্রমণ।
এসব করতে গিয়ে মূলত রাষ্ট্রসমর্থিত রাজনৈতিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালির জীবনজুড়ে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে ব্যাপকভাবে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। ধরেই নেওয়া হয়েছে ‘ছায়ানট’-এর সাংস্কৃতিক আয়োজনসমূহ রাষ্ট্রসমর্থিত জাতীয়তাবাদকেই প্রতিবিম্বিত করে। কিন্তু এই বিবেচনার মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত সরলীকরণ আছে। শুধু তা-ই নয়, সংগঠন হিসেবে ‘ছায়ানটে’র ঐতিহাসিক ভূমিকাকেও অস্বীকার করা হয়েছে।
সংগঠনটিকে মাপা হয়েছে প্রধানত বিগত পনেরো-ষোলো বছরের শাসনের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছিল এই সংগঠন। এর একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণ আছে। ইতিহাসের আয়নায় চোখ রাখলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার সাম্প্রতিক প্রবণতার মতো করেই পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রযত্নে দেখা দিয়েছিল রবীন্দ্রবিরোধিতা। এমনকি ‘হিন্দুয়ানি’র অভিযোগ তুলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতির লক্ষ্যে নজরুলের সাহিত্য থেকে ছাঁটাই করা হচ্ছিল চিরায়ত ঐতিহ্যিক উপাদান। পাকিস্তান ক্রমেই হয়ে উঠেছিল বাঙালিবিরোধী এক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। তখন ‘ছায়ানট’ গাইতে চেয়েছে সম্প্রীতির গান।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রবিরোধিতার প্রতিবাদে লেখক-শিল্পীদের সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছিল ছায়ানটের অঙ্কুর। সংস্কৃতির রাজনৈতিক প্রকাশ হিসেবে ছায়ানট সে সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমর্থন জানিয়েছে, শহুরে মধ্যবিত্তের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে ঐকতানে বাঁধতে চেয়েছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতির যৌথতায় জাতীয়তাবাদ এভাবেই গড়ে ওঠে।
সে কারণে ছায়ানট একসময় এ–ও বুঝতে পেরেছিল যে শিক্ষিতের নাগরিক সংস্কৃতির বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষের সংস্কৃতিকেও বোঝাপড়ার আওতায় নিয়ে আসা দরকার। সন্জীদা খাতুন জানিয়েছেন, ‘নাগরিক সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি পল্লীসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের প্রয়োজন অনুভব করা যায়।’ মূলত তাঁরা দাঁড়াতে চেয়েছিলেন দুই ধরনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে—এক. সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, দুই. জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।
একদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি, অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের বাংলা-উর্দু সিনেমাপ্রসূত অভিঘাত। ছায়ানট চেয়েছিল তৃতীয় একটি অবস্থান, যেখানে মুখ্যত স্থান পাবে বাঙালির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ছায়ানট একটি উচ্চ সংস্কৃতি তৈরি করতে চেয়েছিল। সংস্কৃতির রাজনীতির দিক থেকে এই অবস্থান রক্ষণাত্মক ও আত্মরক্ষামূলক। কেননা, বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত এসেছে দুদিক থেকে—একদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য, অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের বাংলা-উর্দু সিনেমাপ্রসূত অভিঘাত। ছায়ানট তৈরি করে নিতে চেয়েছিল তৃতীয় একটি অবস্থান, যেখানে মুখ্যত স্থান পাবে বাঙালির ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি। ছায়ানটের এই আত্মপরিচয় অনুসন্ধান তৈরি করে দিয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মঞ্চ।
অনেকের অভিযোগ, ছায়ানটে মুসলমানের সাংস্কৃতিক প্রতীক ও উপাদানকে গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু এই সত্য তারা এড়িয়ে যায় যে কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতকে ছায়ানট ধারণ করতে চেয়েছে সামগ্রিকভাবে, খণ্ডিতভাবে নয়। সন্জীদা খাতুন এক স্মৃতিলেখায় জানিয়েছেন, ‘নজরুলের জাগরণী গান যেমন, তেমনি তাঁর শ্যামাসংগীতও আমাদের অনুষ্ঠানে গাইতে উৎসাহ পেতেন গুণী শিল্পীরা। ইসলামী গান ও হিন্দুয়ানী গান বলে তাঁর গানকে বিভক্ত করতাম না আমরা। ভক্তিরসের গান হিসেবে এই সব গান, উদ্দীপনার গান, গজল, রাগসংগীত সবকিছুই ছায়ানটের আসরে সমান আদরে স্থান পেত। এইভাবে সম্প্রদায়বিহীন সর্বজনীন মানুষ-নজরুলকে প্রচার করবার প্রয়োজনীয়তা আমরা একান্তভাবে অনুভব করতাম।’
হ্যাঁ, ছায়ানটের ষোলো আনা বাঙালিয়ানা সম্ভব কি না, ‘শাশ্বত বাঙালি’র তত্ত্ব আদৌ প্রয়োগযোগ্য কি না—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। হয়তো ইতিহাসের কাঠগড়ায়ও দাঁড় করানো যেতে পারে যে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ছায়ানট আগের সেই প্রতিরোধী সাংস্কৃতিক তৎপরতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে কি না। কিন্তু ছায়ানটকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী তৎপরতার মাধ্যমে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকেই আঘাত করা হয়েছে।
প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। হয়তো ইতিহাসের কাঠগড়ায়ও দাঁড় করানো যেতে পারে যে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ছায়ানট আগের সেই প্রতিরোধী সাংস্কৃতিক তৎপরতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে কি না। কিন্তু ছায়ানটকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা অগ্রহণযোগ্য।
ইতিহাসের নিয়মে কোনো মতবাদ, চিন্তা বা ভাবাদর্শের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে, তাই বলে সেসব চিন্তা বা ভাবাদর্শের সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ ও তার ভোক্তারা বিলীন হয়ে যায় না। তার অসংখ্য নজির আমাদের সামনে উপস্থিত। মধ্যবিত্তের মননে লালনপন্থী আধ্যাত্মিকতা প্রবল নয়, কিন্তু লালনের গান আছে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেকের আস্থা নেই, কিন্তু তাঁর ছোটগল্পের বিপুল ভোক্তা আছে। রুশ বিপ্লবের পর তলস্তয়কে লেলিনরা তাই ইতিহাস থেকে গায়েব করে দেননি। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট পতিত হয়েছে বলে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমস্ত উপাদান প্রবহমান জীবন থেকে উধাও হয়ে যাবে না। কেননা, সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে ব্যাপ্ত, যান্ত্রিকভাবে তা নির্মিত নয়, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদযোগ্যও নয়। তা ছাড়া কোনো সাংস্কৃতিক উপাদানের ভোক্তামাত্রই অবধারিতভাবে ওই সংস্কৃতির রাজনীতির ধারক নয়।
এক ছায়ানট থেকে অন্য ছায়ানটে এসে নজরুলকেই আবারও মনে করতে হয়। একদিন যিনি বলেছিলেন, ‘আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল’, তিনি কি ছায়ানটের এই আক্রান্ত দশা মেনে নিতেন? বোধ হয় না। কেননা, তিনি তো মুসলমানের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতেন। ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জে দেওয়া বক্তৃতায় নজরুল বলেছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে কণ্ঠসংগীত ও যন্ত্রসংগীতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা এসেছেন মুসলমান সম্প্রদায় থেকে; বাঙালি মুসলমানের মধ্যে একজন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর কিংবা সংগীতজ্ঞ নেই। ‘গোঁড়া সমাজ’ সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের ‘টুঁটি টিপে’ হত্যা করছে। নজরুল লিখেছেন, ‘এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের সমস্ত শক্তি লইয়া ঝুঝিতে হইবে। নতুবা আর্টে বাঙালি মুসলমানদের দান বলিয়া কোনো কিছু থাকিবে না। পশুর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হইয়া লাভ কি, যদি আমাদের গৌরব করিবার কিছু না থাকে।’
ধ্বংসে কোনো গৌরব নেই, গৌরব বলে যদি কিছু থাকে, তা আছে সৃষ্টিতে, নির্মাণে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো নির্মাণ। রাত্রির অন্ধকার ফুঁড়ে নক্ষত্রের স্নিগ্ধ আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ুক ছায়ানট রাগের স্নিগ্ধ অনুরাগ।