কাইয়ুম চৌধুরীর অলংকরণ ও মাসুক হেলাল অঙ্কিত আনিসুজ্জামানের প্রতিকৃতি অবলম্বনে
কাইয়ুম চৌধুরীর অলংকরণ ও মাসুক হেলাল অঙ্কিত আনিসুজ্জামানের প্রতিকৃতি অবলম্বনে

দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্য স্মারক বক্তৃতা ’০৭

ভারতীয় সাহিত্যের ধারণা

আনিসুজ্জামানের জন্মদিন উপলক্ষে আর্কাইভ থেকে আজ তুলে ধরা হচ্ছে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক বক্তৃতা, যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ প্রথম আলোয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত এই বক্তৃতায় তিনি ‘ভারতীয় সাহিত্য’ ধারণাটির ঐতিহাসিক উৎস, পাশ্চাত্য প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের ভূমিকা এবং সংস্কৃতকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ বিশ্লেষণ করেন বিস্তৃত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। ইউরোপীয় পণ্ডিতদের অনুবাদ, ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা ‘ইন্ডিয়ান লিটারেচার’ ধারণার সীমা ও সম্ভাবনা তিনি পরিমিত যুক্তিতে পর্যালোচনা করেছেন। চিন্তার স্বচ্ছতা ও ঐতিহাসিক গভীরতায় এই বক্তৃতা আজও প্রাসঙ্গিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃত ও পালি বিভাগে আমাদের সহকর্মী দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্য অতি বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তাঁকে যে খুব বেশিজন চিনতেন, তা নয়। কেননা তিনি খানিকটা অন্তরালে থাকতে ভালোবাসতেন। তবে যাঁরা তাঁকে জানতেন, তাঁরা তাঁর বিদ্যানুরাগ এবং শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠার বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তিনি যে কত উদার ও মহৎপ্রাণ ছিলেন, তার পরিচয় আমরা পেয়েছি তাঁর মৃত্যুর পরে—যখন জেনেছি যে তিনি জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্যের স্মৃতি জাগরূক রাখতে তাঁর নামে স্মারক বক্তৃতার প্রবর্তন খুব উপযুক্ত হয়েছে। প্রথম স্মারক বক্তৃতাটি প্রদান করতে আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুগৃহীত করেছে। আমার মনে হয়েছে, বক্তৃতাটি এমন বিষয়ে হওয়া উচিত, যে বিষয়ে দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্যের আগ্রহ থাকতে পারত। তাঁর আগ্রহের বিষয়ে আমার পুঁজি নিতান্ত অল্প। তাই কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে এই বক্তৃতা দিতে অগ্রসর হয়েছি।

এই বক্তৃতায় দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রথমত, উনিশ শতকের প্রায় শেষ অবধি পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার একটা বিবরণ। এমন এক সময় ছিল, যখন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের অকৃত্রিমতায় অনেকে সন্দেহ পোষণ করতেন। ইংরেজ দার্শনিক ডুগাল্ড স্টুয়ার্ট একবার প্রবন্ধ লিখে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে সংস্কৃত বলে কিছু ছিল না, সংস্কৃতের যেসব নিদর্শন বের হচ্ছে, সেসবই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের জালিয়াতি। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীরা মনে করতেন যে উইলিয়াম জোন্স প্রমুখ পণ্ডিত ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন এবং প্রতারিত হয়ে তাঁরা সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে কল্পকাহিনি প্রচার করতে ব্রতী হয়েছেন। এই ধারণা ভেঙেছিল সেই সব পণ্ডিতের প্রয়াসে, যাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংস্কৃতচর্চার দীপশিখাটি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃত ও পালি বিভাগে আমাদের সহকর্মী দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্য জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। তাঁর স্মৃতি জাগরূক রাখতে তাঁর নামে স্মারক বক্তৃতার প্রবর্তন খুব উপযুক্ত হয়েছে। প্রথম স্মারক বক্তৃতাটি প্রদান করতে আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে অনুগৃহীত করেছে।

সেই সঙ্গে সংস্কৃত সাহিত্যকে ভারতীয় সাহিত্য বলে দেখারও একটা প্রবণতা ছিল। এমনকি যাঁরা জানতেন ভারতবর্ষে বহু ভাষার সাহিত্য রয়েছে, তাঁরাও ভারতীয় সাহিত্য বলতে মূলত সংস্কৃত এবং কখনো কখনো সেই সঙ্গে পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অবহট্ট ভাষায় রচিত সাহিত্য বুঝিয়েছেন। ভারতীয় সাহিত্যের বহুত্ব সত্ত্বেও অনেকে এখনো ভারতীয় সাহিত্য বলতে একবচনই ব্যবহার করেন। এ ধারণা কতখানি যুক্তিযুক্ত, সে কথা আমি এই বক্তৃতার দ্বিতীয়াংশে আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছি।

এক.

প্রাচ্যতত্ত্বের যে সমালোচনা করেছেন এডওয়ার্ড সাইদ, সে সম্পর্কে অবহিত থেকেও বলতে হয় যে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের বহু আগে, অর্থাৎ প্রাচ্যতত্ত্ব বা ভারততত্ত্ব-সম্পর্কিত ধ্যানধারণা বিকাশের বহু পূর্বে, ভারতীয় সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির কিছু কিছু নিদর্শন ইউরোপের দেশে দেশে পৌঁছে গিয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে পারস্য সম্রাট খসরু নওশেরওয়া সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের একটি পাহলভি অনুবাদ করিয়েছিলেন কালিলা ওয়া দিমনা নামে। এর পরপরই খলিফা আবুল মনসুরের জন্য বইটির একটি আরবি ভাষ্য প্রস্তুত করা হয়। স্পেনের শাসক আবদুর রহমানের দরবার হয়ে সেটি পৌঁছে যায় ইউরোপে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এর জার্মান অনুবাদ প্রকাশ পায়। সেটি আবার অনূদিত হয় ওলন্দাজ, দিনেমার ও আইসল্যান্ডিক ভাষায়। তার একটি ইতালীয় ভাষ্য থেকে স্যার টমাস নর্থ ইংরেজি রূপান্তর করেন রানি এলিজাবেথের কালে। তার থেকে শেক্‌সপিয়ার তাঁর নাটকে অন্তত দুটি গল্প ব্যবহার করেছিলেন বলে মনে করা হয়—এর একটি সেই ‘পাউন্ড অব ফ্লেশ’ সম্পর্কিত।

ভারতীয়দের কেউ কেউ ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষা করেছিলেন। জনৈক ব্রাহ্মণ পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন ভর্তৃহরির কিছু বচন। ওলন্দাজ ধর্মপ্রচারক আব্রাহাম রজার—তিনি মাদ্রাজের উত্তরে অনেক দিন বাস করেছিলেন—হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে যে বই লেখেন, তাতে সেসব উদ্ধৃত হয়েছে।

বিদেশিদের পক্ষে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করা সহজ ছিল না। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা অব্রাহ্মণদের বেদ-বেদান্ত শেখাতে চাইতেন না। তবে কাব্য প্রভৃতি শেখায় হয়তো অত বাধা ছিল না।

আঠারো শতকে ভারতবর্ষে বসবাসকারী জেসুইট পাদরিদের অনেকে দেশি ভাষা আয়ত্ত করেন এবং তার মাধ্যমে সংস্কৃতের জ্ঞান আহরণ করেন। পন্ডিচেরির মিশনারিরা যজুর্বেদের ফরাসি অনুবাদ করেছিলেন এবং তা পড়ে ভলতেয়ার চমৎকৃত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য বইটির অকৃত্রিমতায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। আরেক জেসুইট, য়োহান আর্নস্ট হানসেলডেন, ১৭৩২ সালে একটি সংস্কৃত ব্যাকরণ সংকলন করেন। মরিস উইন্টারনিটজ বলেছেন, বইটি কখনো প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু এল এস এস ও’ম্যালি জানিয়েছেন, ১৭৯০ সালে তা রোমে মুদ্রিত হয়েছিল। ১৭৪০ সালে পেরে পঁস ষড়দর্শন, অলংকারশাস্ত্র এবং বৌদ্ধ ও জৈন সম্প্রদায়ের সারকথা লিপিবদ্ধ করেন। অ্যাবে দুবোয়া হিন্দু ম্যানারস, কাস্টমস অ্যান্ড সেরিমনিজ প্রকাশ করেন ১৮১৭ সালে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে দারাশিকো উপনিষদের যে ফারসি অনুবাদ করেন, দু খণ্ডে তার লাতিন অনুবাদ প্রকাশ করেন ফরাসি পণ্ডিত আঁকুয়েতিল দুপেরোঁ ১৮০১-২ খ্রিষ্টাব্দে। অনুবাদটি সুখপাঠ্য হয়নি—এ কথা অনেকেই বলেছেন। কিন্তু তা পড়েই পরে শোপেনহাওয়ার এটিকে এক ‘অতুলনীয়’ রচনা বলে অভিহিত করেছিলেন। শোপেনহাওয়ার ও ফন হার্টম্যানের দৌত্যে সংস্কৃত দর্শন জার্মান অলৌকিকতাবাদকে প্রভাবান্বিত করে—ফিকটে ও নিশের লেখায় তার পরিচয় পাওয়া যায়।

খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে পারস্য সম্রাট খসরু নওশেরওয়া সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের একটি পাহলভি অনুবাদ করিয়েছিলেন কালিলা ওয়া দিমনা নামে। এর পরপরই খলিফা আবুল মনসুরের জন্য বইটির একটি আরবি ভাষ্য প্রস্তুত করা হয়। স্পেনের শাসক আবদুর রহমানের দরবার হয়ে সেটি পৌঁছে যায় ইউরোপে।

এই বৈশ্বিক পটভূমিতে বঙ্গদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সূচিত হয়। বিচারকার্যের সুবিধার্থে বিদ্যোৎসাহী ওয়ারেন হেস্টিংস ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দিয়ে বিবাদার্ণবসেতু নামে হিন্দু আইনের একটি সংকলন তৈরি করেন। সংস্কৃত থেকে ইংরেজি অনুবাদ করতে পারেন, এমন কেউ তখন ছিলেন না। তাই প্রথমে সংকলনটি ফারসিতে অনূদিত হয়, তারপর ১৭৭৬ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড—যিনি প্রথম বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়ন করেন, তিনি—ফারসি থেকে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এ কোড অব জেন্ট ল নামে। কয়েক বছরের মধ্যে হামবুর্গে তার জার্মান ভাষ্য প্রকাশিত হয়।

ওয়ারেন হেস্টিংসের উৎসাহে ইংরেজদের মধ্যে প্রথম সংস্কৃত শিখেছিলেন বোধ হয় চার্লস উইলকিনস। কাশীর পণ্ডিতেরা ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু। ১৭৮৫ সালে তিনি ভগবদ্গীতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৮৭-তে তিনি প্রকাশ করেন হিতোপদেশের অনুবাদ, ১৭৯৫-তে মহাভারতেশকুন্তলা-আখ্যান এবং ১৮০৮-এ সংস্কৃত ব্যাকরণসংস্কৃত ব্যাকরণের মুদ্রণের জন্য তিনি নিজেই দেবনাগরী হরফ তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন।

আনিসুজ্জামান (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭—১৪ মে ২০২০)

উইলিয়াম জোন্স প্রথম যৌবনে আরবি-ফারসি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। ভারতবর্ষে এসে তিনি সংস্কৃত শিক্ষা করেন এবং ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে কালিদাসের শকুন্তলার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। দু বছরের মধ্যেই তার জার্মান অনুবাদ প্রকাশিত হয় এবং তা পড়ে গ্যেটে মুগ্ধ হন। জোন্স কালিদাসের ঋতুসংহারের সম্পূর্ণ সংস্কৃত পাঠ প্রকাশ করেন এবং মনুর ধর্মশাস্ত্রের ইংরেজি অনুবাদ করেন ইনস্টিটিউটস অব হিন্দু ল, অর দ্য অরডিন্যান্সেস অব মনু নামে। শেষোক্ত বইটিরও জার্মান ভাষ্য প্রকাশিত হয়। জোন্সই প্রথম গ্রিক ও ল্যাটিনের সঙ্গে সংস্কৃতের সাদৃশ্যের কথা বলেন এবং গথিক, কেলটিক, প্রাচীন ফারসি ও সংস্কৃত একই মূল থেকে বিকাশ লাভ করেছে বলে তাঁর অনুমানের কথা ঘোষণা করেন। এখান থেকেই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব-চর্চার শুরু হয়।

জোন্সের পর এলেন হেনরি টমাস কোলব্রুক। তিনিও দেশীয় পণ্ডিতদের দিয়ে হিন্দু আইন সংকলন করিয়ে অনুবাদ করলেন ইংরেজিতে। তাঁর চার খণ্ড বইয়ের নাম আ ডাইজেস্ট অব হিন্দু ল অন কন্ট্রাক্টস অ্যান্ড সাকসেশন। তিনি ভারতীয় আইন ও ব্যাকরণ, ধর্ম ও দর্শন, জ্যোতিষ ও গণিত বিষয়ে আরও অনেক লেখেন এবং অমরকোষসহ সংস্কৃত অভিধান, পাণিনির ব্যাকরণ এবং একাধিক সংস্কৃত গ্রন্থের মূলপাঠ প্রকাশ করেন।

আলেকজান্ডার হ্যামিলটন নামের আরেক ইংরেজ ভারতবর্ষে সংস্কৃত শিখে ফ্রান্স হয়ে দেশে ফিরছিলেন ১৮০২ সালে। তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। হ্যামিলটন প্যারিসে আটকা পড়ে যান তিন বছরের জন্যে। ওই সময়ে তিনি অন্য বন্দীদের সংস্কৃত শিখিয়ে সময় কাটান। এই সূত্রে কলেজ দ্য ফ্রাঁসের সংস্কৃতের প্রথম অধ্যাপক এ এল শেজির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁরা দুজনে মিলে বিখ্যাত ভ্রাতৃদ্বয় ফ্রিডরিশ ও আওগস্ট উইলহেলম ফন শ্লেগেলকে সংস্কৃত শেখান। এঁরা দুজন জার্মানিতে সংস্কৃতের চর্চা ছড়িয়ে দেন। অন্য পক্ষে শেজির উত্তরাধিকারী ইউজিন বার্নুফ ফ্রান্সে সংস্কৃত—এবং সেই সঙ্গে বৌদ্ধ সংস্কৃত ও প্রাচীন ফারসি—শিক্ষাদানে ব্রতী হন।

অনুবাদটি সুখপাঠ্য হয়নি—এ কথা অনেকেই বলেছেন। কিন্তু তা পড়েই পরে শোপেনহাওয়ার এটিকে এক ‘অতুলনীয়’ রচনা বলে অভিহিত করেছিলেন। শোপেনহাওয়ার ও ফন হার্টম্যানের দৌত্যে সংস্কৃত দর্শন জার্মান অলৌকিকতাবাদকে প্রভাবান্বিত করে—ফিকটে ও নিশের লেখায় তার পরিচয় পাওয়া যায়।

ইউজিন বার্নুফের ছাত্র ছিলেন ফ্রিডরিশ ম্যাক্স মুলার। তিনি জার্মান, কিন্তু অধ্যয়ন করেছিলেন প্যারিসে, অধ্যাপনা করেছিলেন অক্সফোর্ডে। প্রায় ৩০ বছরের চেষ্টায় তিনি অনুবাদ করেছিলেন ঋগ্বেদ, সম্পাদনা করেছিলেন দ্য সেক্রেড বুকস অব দ্য ইস্ট সিরিজ, লিখেছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসসহ আরও অনেক বই, গতি এনেছিলেন ব্রিটেনে সংস্কৃতচর্চায়। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বে তাঁর অবদান অশেষ। একজন পণ্ডিত এসব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার তুলনা করেছেন প্রকৃতিজগতের ধারণায় ডারউইন-আনীত বিপ্লবের সঙ্গে।

শেজির আরেকজন ছাত্র ছিলেন ফ্রাঞ্জ বপ। সংস্কৃত ব্যাকরণ সম্পর্কে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রসিদ্ধ। ব্যাকরণের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বেদ এবং রামায়ণ-মহাভারত থেকে কিছু কিছু অংশের ছন্দোবদ্ধ অনুবাদ করেন জার্মান ভাষায় এবং ল্যাটিনে। আরেকজন জার্মান বিদ্বজ্জন—উইলহেলম ফন হামবোল্ড—কাজ করেছিলেন ভগবদ্গীতা নিয়ে, সেটিও বিদ্বৎসমাজে সাদরে গৃহীত হয়েছিল। তবে জার্মান মনীষার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন অটো বটলিংক ও রুডলফ রথ—১৮৫২ থেকে ১৮৭৫ পর্যন্ত ২৩ বছরে এবং সাত খণ্ডে সম্পূর্ণ তাঁদের সংস্কৃত অভিধান সেন্ট পিটার্সবুর্গে প্রকাশিত হয়েছিল।

এর মধ্যেই ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে, অলব্রেখট ওয়েবার রচনা করেন একাডেমিক লেকচারস অন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অব লিটারেচার, ১৮৭৬-এ তা নতুন করে মুদ্রিত হয় এবং ইংরেজি অনুবাদে তার নাম দাঁড়িয়ে যায় হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার। এতে ৫০০ সংস্কৃত গ্রন্থের আলোচনা করা হয়। ১৮৯১ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে থিওডোর অফ্রেক্ট তিন খণ্ডে প্রকাশ করেন ক্যাটালোগাস ক্যাটালোগোরাম—ভারতবর্ষ ও ইউরোপের বড় বড় গ্রন্থাগারে রক্ষিত সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির বিবরণ। ৪০ বছরের একক সাধনায় অফ্রেক্ট কয়েক হাজার সংস্কৃত রচনার সন্ধান দিতে পেরেছিলেন।

দুই.

অলব্রেখট ওয়েবারই প্রথম সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গিয়ে হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার (১৮৫২) শিরোনাম ব্যবহার করেন, তবে তিনিই কেবল এমনটা করেননি। এল ভি শ্রোয়েডার (Indiens Litteratur and Kultur, ১৮৮৭), আর ডব্লিউ ফ্রেসার (লিটারারি হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, ১৮৯৭), হারম্যান ওলডেনবার্গ (Die Litteratur des alten Indiens, ১৯০৩), ডি হেনরি (Les Literature de l’Inde, ১৯০৪), মরিস উইন্টারনিট্স (আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার, দুই খণ্ড, ১৯০৭) এবং এইচ এইচ গাওয়েনের (হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার, ১৯৩১) কথা এ প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবে মনে পড়ে।

পাশাপাশি অনেকে স্পষ্ট করেই সংস্কৃত সাহিত্যের কথা উল্লেখ করে দিয়েছিলেন। যেমন ম্যাক্স মুলার (হিস্ট্রি অব সংস্কৃত লিটারেচার, ১৮৬০), আর্থার এ ম্যাকডোনেল (আ হিস্ট্রি অব সংস্কৃত লিটারেচার, ১৯০০), এ বেরিডেল কিথ (আ হিস্ট্রি অব সংস্কৃত লিটারেচার, ১৯২৮) এবং এস এন দাশগুপ্ত ও এস কে দে (আ হিস্ট্রি অব সংস্কৃত লিটারেচার, ১৯৬২)।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫) নামে পুস্তিকার কথাও এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়।

বইয়ের নাম সম্পর্কে ওয়েবার যে খানিকটা দ্বিধান্বিত ছিলেন, তা তাঁর নিজের কথা থেকেই প্রকাশ পায়; ‘আমি বলব না যে তাঁর বক্তৃতাগুলোয় “ভারতীয় সাহিত্য” বিচার করা হয়েছে, কারণ তাহলে আমাকে সকল ভারতীয় ভাষাকে বিবেচনায় নিতে হবে, যেগুলোর উৎস ইন্দো-আর্য নয়, সেগুলোকেও। আমি এ-ও বলতে পারি না যে তার বক্তৃতাগুলোর বিষয়বস্তু ছিল “ইন্দো-আর্য সাহিত্যের” ইতিহাস কারণ তাহলে আমাকে ভারতের আধুনিক ভাষাগুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে—যেগুলোর মাধ্যমে ইন্দো-আর্য ভাষার বিকাশের তৃতীয় পর্ব গড়ে উঠেছে। শেষত, আমি এটাও বলতে পারি না যে তার বক্তৃতাগুলোতে সংস্কৃত সাহিত্যের একটা ইতিহাস উপস্থাপিত হয়েছে, কারণ ইন্দো-আর্য ভাষার প্রথম পর্যায় “সংস্কৃত” ছিল না, অর্থাৎ শিক্ষিতজনের ভাষা ছিল না, কিন্তু তা ছিল একটা জনপ্রিয় উপভাষা; আর দ্বিতীয় পর্বে মানুষ সংস্কৃত বলত না, বলত প্রাকৃত ইত্যাদি উপভাষা যেগুলো সংস্কৃতের সমান্তরালে প্রাচীন ইন্দো-আর্য আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে থেকে গড়ে উঠছিল।’

উইন্টারনিটজ একবচনে ভারতীয় সাহিত্যের কথা বলেন, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লেখা হলেও ভারতীয় সাহিত্যের একত্বে তিনি আস্থাবান। তাঁর মতে, ভারতীয় সাহিত্যে সেই মানসিকতার প্রকাশ, যে মানসিকতা রাজনৈতিক সীমানার পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারতবর্ষ নামে একটি দেশকে অনুভব করে।

ওয়েবারের এই দ্বিধা বইয়ের নামকরণের হেতু বুঝতে আমাদের তেমন সাহায্য করে না। আমরা কি তাহলে ধরে নেব যে, যে সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস তিনি লিখতে যাচ্ছিলেন, তা ভারতে সৃষ্ট বলে তিনি অমন নাম দিয়েছেন?

এ বিষয়ে উইন্টারনিটজ কী বলেন, তা–ও দেখা যেতে পারে:

‘আমাদের কাল পর্যন্ত যে সাহিত্য পৌঁছেছে তার অধিকাংশই রচিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। কিন্তু ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃত সাহিত্যের ধারণা দুটি আদৌ এক নয়। বিশদ অর্থে ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস হচ্ছে এমন এক সাহিত্যের ইতিহাস, যা কেবল দীর্ঘ সময় ও বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে গড়ে ওঠেনি সেই সাহিত্য অনেকগুলি ভাষায় রচিত হয়েছে।’

উইন্টারনিটজের বইয়ের প্রথম খণ্ড সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে রচিত এবং এটিই তাঁর মূল বিষয় হলেও দ্বিতীয় খণ্ডে পালি ও প্রাকৃত—মূলত বৌদ্ধ ও জৈন—গ্রন্থের আলোচনা আছে। এখানে তিনি একাধিক ভাষার সাহিত্যের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তা দেখেছেন একই সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করে। ভাষা ভিন্ন, কিন্তু সাহিত্য এক, এ কথা বুঝতে আমাদের সত্যিই অসুবিধা হয়।

প্রসঙ্গগত উল্লেখ করি, সুকুমার সেন ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৬২) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে তিনি ভারতীয় সাহিত্য বলতে বুঝিয়েছেন এমন সাহিত্য, যা কোনো প্রাদেশিক ভাষায় রচিত নয়। তাই এই বইতে তিনি বৈদিক, সংস্কৃত, বৌদ্ধ সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অবহট্ট সাহিত্যের আলোচনা করেছেন।

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে নয়াদিল্লির সাহিত্য আকাদেমি ইংরেজি ভাষায় দশ খণ্ডে ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস প্রকাশের পরিকল্পনা করে। আমরা এর মাত্র দুটি খণ্ড দেখেছি—শিশিরকুমার দাশের আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার, ভলিউম ৮ ও ভলিউম ৯ (১৯৯১)। ভারতীয় সাহিত্য বলতে এতে ভারতের সকল ভাষার সাহিত্য বোঝানো হয়েছে, তবে তা দেখা হয়েছে একটিমাত্র সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করে। এমন অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে জোরালো যুক্তিও দিয়েছেন শিশিরকুমার দাশ। তিনি বলছেন, ভাষা ও সাহিত্যের যোগ অনস্বীকার্য, কিন্তু তা-ই যথেষ্ট নয়। ইংরেজিতে লেখা বলে ইংরেজি, মার্কিন, অস্ট্রেলীয় সাহিত্য কি এক? কানাডার ইংরেজি সাহিত্য কি কানাডীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হবে, না ইংরেজি সাহিত্যের? ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় রচিত সাহিত্যের মধ্যে তিনি একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য দেখতে পান।

তিনি মনে করেন, জনসাধারণ ও সাহিত্যের মধ্যে একধরনের প্রাণের যোগেই গড়ে ওঠে জাতীয় সাহিত্য। তিনি তাই একবচনে ভারতীয় সাহিত্যের কথা বলেন, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লেখা হলেও ভারতীয় সাহিত্যের একত্বে তিনি আস্থাবান। তাঁর মতে, ভারতীয় সাহিত্যে সেই মানসিকতার প্রকাশ, যে মানসিকতা রাজনৈতিক সীমানার পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারতবর্ষ নামে একটি দেশকে অনুভব করে।

ভারতীয় উপমহাদেশ বহু ভাষার ও বহু সাহিত্যের ভূখণ্ড, যেমন তা বহু জাতির আবাসস্থল। সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সাহিত্য তার বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্বের ফসল। ঠিক তেমনিভাবে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি ভাষার সাহিত্য তার অন্য ঐতিহাসিক পর্বের সৃষ্টি। 

এর সঙ্গে আমরা তুলনা করতে পারি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ল্যাঙ্গুয়েজেজ অ্যান্ড লিটারেচারস অব ইন্ডিয়া (১৯৬২) বইটির। গ্রন্থের নাম থেকেই বোঝা যায়, ভারতের বিভিন্ন ভাষায় লেখা সাহিত্যকে সুনীতিকুমার পৃথক করে দেখেছেন। অবশ্য এই পৃথক সাহিত্যের সমষ্টিকেই তিনি ভারতের সাহিত্য বলেন, কিন্তু এগুলোকে একবচনে ভারতীয় সাহিত্য বলে অভিহিত করেন না। শিশিরকুমার দাশের যে প্রশ্নের উল্লেখ করেছি, তার যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু তামিল সাহিত্য, হিন্দি সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য অগ্রাহ্য করে আমরা কীভাবে তা এক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি? যে সাহিত্য আমি পড়তে পারি এবং যে সাহিত্য আমি পড়তে পারি না, তা কী করে এক করে দেখা যায়?

সংস্কৃত সাহিত্যের সর্বভারতীয়তার কথা গ্রাহ্য করে যাঁরা একে ভারতীয় সাহিত্য বলে অভিহিত করেছিলেন, ভারতীয় সাহিত্যের বৈচিত্র্য সম্পর্কে অবহিত হয়েও তাঁরা সংস্কৃতের প্রাধান্য দিয়েছিলেন সবার ওপরে। কোনো বিশেষ প্রাদেশিক ভাষায় যেসব সাহিত্য রচিত নয়, তাকে ভারতীয় সাহিত্য বলে অভিহিত করার প্রবণতাও আমরা লক্ষ করেছি। সবশেষে আমরা দেখছি ভাষার ভিন্নতা অগ্রাহ্য করে, ভাষা ও সাহিত্যের আবশ্যিক যোগকে কিছুটা ক্ষুণ্ন করে, জনসাধারণের রাজনৈতিক পরিচয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বহু ভাষার সাহিত্যকে ভারতীয় সাহিত্য বলে গণ্য করার চেষ্টা দেখা দিয়েছে।

আমরা বলব, ভারতীয় উপমহাদেশ বহু ভাষার ও বহু সাহিত্যের ভূখণ্ড, যেমন তা বহু জাতির আবাসস্থল। সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সাহিত্য তার বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্বের ফসল। ঠিক তেমনিভাবে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু প্রভৃতি ভাষার সাহিত্য তার অন্য ঐতিহাসিক পর্বের সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্য একাধারে বাংলাদেশ ও ভারতের, উর্দু ও পাঞ্জাবি সাহিত্য একাধারে ভারত ও পাকিস্তানের, তামিল একাধারে ভারত ও শ্রীলঙ্কার সাহিত্য। ভারতে লিখিত ইংরেজি সাহিত্য ইংরেজি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তার সংলগ্ন সাহিত্য তো বটেই। প্রত্যেক ভাষার এবং তার সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে নিয়ে এর যোগফলকে কোনো দেশের বা অঞ্চলের ভাষা ও সাহিত্য হিসেবে দেখাই সমীচীন।

দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্য স্মারক বক্তৃতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ৭ এপ্রিল ২০০৭