শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি ও তাঁর উপন্যাস ‘পথের দাবী’র প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস : প্রথম আলো
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি ও তাঁর উপন্যাস ‘পথের দাবী’র প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস : প্রথম আলো

শতবর্ষে ‘পথের দাবী’

যে বইকে ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশরাজ

শতবর্ষ আগে প্রকাশিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী শুধু পাঠকের হৃদয়ে আলোড়নই তোলেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের ভিতও। বিপ্লব, স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় লেখা এই উপন্যাস শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়েছিল ঔপনিবেশিক সরকারের হাতে। শত বছর পর ফিরে দেখা যাক, কেন একটি উপন্যাসকে এতটা ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশরাজ।

কিছু বই শুধু গল্প বলে না। সময়ের জানালা খুলে দেয়। মানুষকে জাগিয়ে তোলে। রাষ্ট্রের ঘুমও কেড়ে নেয় কখনো কখনো। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী তেমনই এক উপন্যাস।

শত বছর আগে বইটি প্রকাশের সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য আকাঙ্ক্ষার স্ফুরিত সময়—একদিকে অহিংস জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অন্যদিকে বিপ্লবী তৎপরতা। সেই পটভূমিতে শরৎচন্দ্র লিখলেন এমন এক উপন্যাস, যার সারকথা ব্যক্তিগত জীবনকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর মানবমুক্তির ঝান্ডা তুলে ধরা। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুনে প্রকারান্তরে কিছু কাঠখড়েরই জোগান দেন লেখক।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাই পথের দাবীকে শুধু শতবর্ষের মাইলফলক ছোঁয়া একটি উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেই থেমে যাওয়া চলে না। উপন্যাসটি যে উত্তাল এক সময়খণ্ডের ধারক, একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার বাহক এবং সাহিত্যের রাজনৈতিক শক্তির দলিল, তা উচ্চ স্বরে উচ্চারণের দাবি রাখে।

অথচ তেমন সাহিত্যগুণ নেই মনে করে লেখক নিজেই পথের দাবীর পাণ্ডুলিপি ফেলে রেখেছিলেন। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেটি বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের জন্য চেয়ে নেন, পরে তিনিই হন বইটির প্রকাশক।

বঙ্গবাণীর দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা থেকে (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) পথের দাবী প্রকাশিত হতে শুরু করে। শেষ কিস্তি ছাপা হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখে, অর্থাৎ ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল-মে মাসে। পরে একই বছরের ৩১ আগস্ট বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ। দাম তিন টাকা।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের দাবী’র প্রচ্ছদ
শরৎচন্দ্র নিজেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পথের দাবীর রাজনৈতিক উত্তাপকে লেখকের জীবন ও সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করা তাই কঠিন। তবে তিনি রাজনৈতিক পুস্তিকা লেখেননি; রাজনৈতিক বাস্তবতাকে রূপ দিয়েছিলেন উপন্যাসে।

সাদা কাগজে মোড়া পিচবোর্ডের মলাট। ওপরের দিকে লাল হরফে লেখা পথের দাবী, নিচে লেখকের নাম। রূপসজ্জার দিক থেকে নিছক সাদামাটা এ বই-ই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের মস্ত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম সংস্করণের প্রায় সব কপি (মতভেদে তিন থেকে পাঁচ হাজার) বিক্রি হয়ে যায়। শুধু এই একটিমাত্র তথ্যেই বোঝা যায়, বইটি পাঠকের মধ্যে কতটা আলোড়ন তুলেছিল আর কেনই–বা শাসকগোষ্ঠীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। ফলে পুলিশ যখন বইটি বাজেয়াপ্ত করতে মাঠে নামে, তখন হাতে পাওয়ার মতো কপি প্রায় ছিলই না বাজারে।

২.

পথের দাবীর কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী মল্লিক, যিনি একজন বিপ্লবী। চিকিৎসা ও প্রকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী, ছদ্মবেশে পুলিশের চোখ এড়িয়ে চলতে ‘ওস্তাদ’ সব্যসাচী একই সঙ্গে রহস্যময় ও ‘অতিমানবীয়’। এ কারণেই বুঝি গবেষক তনিকা সরকার সব্যসাচীকে বাংলা কথাসাহিত্যের প্রথম দিককার ‘সুপারম্যান’ চরিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সব্যসাচীর সঙ্গে রাসবিহারী বসুসহ সমকালীন বিপ্লবীদের কিছু সাদৃশ্য নিয়েও আলোচনা আছে। তবে তাঁকে কোনো একক ব্যক্তির ছায়া হিসেবে না দেখে বরং সমকালীন বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও লেখকের কল্পনার সম্মিলিত রূপ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তাই পথের দাবী কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর অনুপ্রেরণার কাহিনি নয়। এর ভেতরে রয়েছে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার প্রশ্ন—রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

শরৎচন্দ্র নিজেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পথের দাবীর রাজনৈতিক উত্তাপকে লেখকের জীবন ও সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করা তাই কঠিন। তবে তিনি রাজনৈতিক পুস্তিকা লেখেননি; রাজনৈতিক বাস্তবতাকে রূপ দিয়েছিলেন উপন্যাসে। সেখানেই তাঁর সাহিত্যিক মনীষা; সেটাই সাহিত্যের শক্তি।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
শরৎচন্দ্রের বক্তব্য ছিল সরল, তিনি বই লিখেছেন মাত্র। ইংরেজদের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হলে তার দায় লেখকের নয়। তাঁর কথায়, ‘ইংরাজশক্তির এই বই বাজেয়াপ্ত করবার জাস্টিফিকেশন যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর প্রোটেস্ট করবার জাস্টিফিকেশনও তেমনি আছে।’

আর এই শক্তির সামনে ‘কাবু’ বোধ করে ব্রিটিশরাজের পুলিশ প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি পথের দাবী বাজেয়াপ্ত করা হয়। অভিযোগ, উপন্যাসটি পাঠকের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা রাজদ্রোহের মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। একই সময়ে বিখ্যাত আমেরিকান পাদরি ও লেখক জে টি সান্ডারল্যান্ডের লেখা ইন্ডিয়া ইন বন্ডেজ বইটিও ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

৩.

পথের দাবীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চেয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে চিঠি-বিনিময় হয়। রবীন্দ্রনাথের মত ছিল, এমন বই লিখলে শাসকের প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্য হিসেবে সেটা দোষের না–ও হতে পারে। কারণ, লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন, তা হলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই।’

শরৎচন্দ্রের বক্তব্য ছিল সরল, তিনি বই লিখেছেন মাত্র। ইংরেজদের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হলে তার দায় লেখকের নয়। তাঁর কথায়, ‘ইংরাজশক্তির এই বই বাজেয়াপ্ত করবার জাস্টিফিকেশন যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর প্রোটেস্ট করবার জাস্টিফিকেশনও তেমনি আছে।’

তবে বাস্তবতা বলে, ‘জাস্টিফিকেশন’-এর বিষয়টি সব দেশ-কালেই ক্ষমতার দড়ির সঙ্গে কমবেশি বাঁধা। এ কারণে পথের দাবীর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে প্রায় এক যুগ। শরৎচন্দ্র মারা যান ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর ১৯৩৯ সালের ১ মার্চ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

এ কথা অনস্বীকার্য, যে বইকে একদিন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেটি এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রচার বন্ধ করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু ‘প্রসার’ থামাতে পারেনি, পারেনি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে।

শরৎচন্দ্র তাঁর বইয়ের ‘মুক্তি’ দেখে যেতে পারেননি। দেখে যেতে পারেননি ব্রিটিশ শাসনের অবসানও। তবে বইটি টিকে ছিল পাঠকের হাত ঘুরে ঘুরে, বিপ্লবের প্রেরণা জুগিয়ে জুগিয়ে।

অবশ্য আজকের পাঠকের কাছে সব্যসাচীর সব রাজনৈতিক ধারণা গ্রহণযোগ্য না–ও মনে হতে পারে। সশস্ত্র বিপ্লবের যথার্থতা নিয়েও উঠতে পারে প্রশ্ন। একটি ক্লাসিক বা ধ্রুপদিকে নতুন করে পড়ার অর্থ কিন্তু তার সব বক্তব্য বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া নয়; বরং বুঝতে চাওয়া—কেন সেই সময় এমন একটি কাহিনি এত মানুষের মনের বন্ধ দরজায় কড়াঘাত করতে পেরেছিল।

৪.

এ কথা অনস্বীকার্য, যে বইকে একদিন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেটি এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রচার বন্ধ করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু ‘প্রসার’ থামাতে পারেনি, পারেনি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে।

শরৎচন্দ্রের আগে কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। বিদ্রোহী কবির লেখা শুধু নিষিদ্ধই করা হয়নি, তাঁকে কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। সমসাময়িক সময়ে নিষিদ্ধ হয়েছিল জেমস জয়েসের ইউলিসিস কিংবা ডি এইচ লরেন্সের লেডি চ্যাটারলি’স লাভার-এর মতো বইও। অজুহাত ভিন্ন, কিন্তু শাস্তির ধরন এক। কালে কালে শাসকদের আস্থা মূলত প্রায়োগিক শক্তিতে। কিন্তু এর বাইরেও যে ‘শক্তি’ আছে, ক্ষমতার দম্ভে তাঁরা তাকে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। সময়ের পরিক্রমায় শাসকের নিষেধাজ্ঞার খড়্গে তাই মরচে পড়ে, ‘নিষিদ্ধ’ বই ঠিকই পাঠকহৃদয় আলোকিত করে চলে। এর নাম—সাহিত্যের শক্তি।

  • হাসান ইমাম: কবি, সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com