নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ভেন্যু ভারত মণ্ডপমের বাইরে ছবি তুলছেন এক দর্শনার্থী।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ভেন্যু ভারত মণ্ডপমের বাইরে ছবি তুলছেন এক দর্শনার্থী।

মতামত

ব্রিকসের হাত ধরে বদলাচ্ছে বিশ্ব, বাংলাদেশ কী করবে

বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার মানচিত্র কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্রগুলো একসময় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তে অবস্থান করত, অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তারাই একসময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে।

ব্রিকসের উত্থানকে এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্যেই বুঝতে হবে। এটি কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতা কাঠামো নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসম বণ্টন সম্পর্কে একধরনের রাজনৈতিক প্রশ্ন।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর থেকে ‘ব্রিকস’ নামটির উৎপত্তি। পরবর্তী সময়ে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।

বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১টি দেশ এর সদস্য। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রকে অংশীদার দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

ফলে ব্রিকস এখন আর পাঁচ দেশের একটি সীমিত মঞ্চ নয়, এটি ক্রমে বৃহত্তর দক্ষিণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

ব্রিকস কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক সময়ে নির্মিত হয়েছিল, যখন বর্তমানের বহু উদীয়মান শক্তির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।

কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। চীন ও ভারত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজ নিজ অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তব ক্ষমতাবিন্যাস যদি বদলে যায়, তবে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে কেন? ব্রিকস মূলত এই অসামঞ্জস্যের জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে।

এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অধিকতর বহুকেন্দ্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি সংবেদনশীল করা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও উন্নয়ন কাঠামোতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ শক্তিশালী করা, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে অর্থায়ন বৃদ্ধি, সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সংকটে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা—এসবই ব্রিকসের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ।

নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।

ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হলো নতুন উন্নয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ, পরিবহন, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করে।

এর লক্ষ্য প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত করা নয় বরং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য অর্থায়নের আরও একটি পথ তৈরি করা।

ব্রিকস কি অন্য আঞ্চলিক সংস্থার জন্য হুমকি? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, ব্রিকস প্রকৃত অর্থে কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নয়।

কারণ, এর সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্র এতে রয়েছে।

ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রগুলোর জোট কিংবা আফ্রিকার আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর সরাসরি প্রতিযোগিতা নেই।

বরং ব্রিকসের উত্থান সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছে সেই আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলোর প্রাধান্য নিয়ে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব প্রবল।

তবে ব্রিকসকে ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখা অতিসরলীকরণ হবে।

ভারত যেমন ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তার গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

অতএব, ব্রিকসের প্রকৃত তাৎপর্য সম্ভবত পশ্চিমকে প্রতিস্থাপনে নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিকল্প দর-কষাকষির ক্ষেত্র সৃষ্টি করার মধ্যে।

বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে?

বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে বিপুল অবকাঠামোগত অর্থায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২১ সাল থেকে নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জন্য ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আগ্রহের পর্যায়ে নেই; এর একটি কার্যকর আর্থিক ভিত্তিও ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ব্রিকস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির পরিসর বাড়াতে পারে। চীন ও ভারত বাংলাদেশের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ব্রিকস সদস্যরাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তা, শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

তৃতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈদেশিক অর্থায়ন, বাজার সুবিধা এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের নতুন উৎস খুঁজতে হবে।

ব্রিকস সেই পরিবর্তনপর্বে একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবলম্বন হতে পারে।

চতুর্থত, ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর বহুমুখিতা দিতে পারে।

একটি ক্ষুদ্র বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্য সব সময় কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করার মধ্যে থাকে না; বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের দর-কষাকষির পরিসর বাড়ানোর মধ্যেই থাকে।

তাহলে বাধা কোথায়?

সম্ভাবনা যত বড়, কূটনৈতিক হিসাবও তত জটিল। বাংলাদেশের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা। দেশটির রপ্তানি, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আর্থিক ব্যবস্থায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্ব বিপুল।

অন্যদিকে চীন, ভারত, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য এশীয় রাষ্ট্রও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ব্রিকসে যোগদানকে যদি কোনো পক্ষের দিকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকে পড়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ব্রিকসের অভ্যন্তরেই। এর সদস্যদের স্বার্থ সর্বক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে; রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের গভীর বিরোধ বিদ্যমান; ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-অগ্রাধিকারও এক নয়।

এত বৈচিত্র্যের মধ্যে ব্রিকস কতটা সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।

তৃতীয়ত, সদস্যপদ নিজেই কোনো অর্থনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। একটি রাষ্ট্র কোনো জোটে প্রবেশ করলেই বিনিয়োগ, বাণিজ্য কিংবা উন্নয়ন অর্থায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় না।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য তখনই হবে, যখন ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেও ওয়াশিংটনকে হারাবে না, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা রেখেও নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে, মস্কোর সঙ্গে কাজ করেও ব্রাসেলসের বাজারকে বিপন্ন করবে না এবং ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েও অন্য অংশীদারদের কাছে নিজেকে কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরবে না।

তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল, প্রকল্প প্রস্তুতির সক্ষমতা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি।

বাংলাদেশের সামনে ‘ব্রিকসে যোগ দেওয়া উচিত কি না’ এত সরল নয়। অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রিকসকে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থে কীভাবে ব্যবহার করবে?
পররাষ্ট্রনীতিতে সদস্যপদ কোনো অলংকার নয়, এটি একটি উপকরণ।

ব্রিকসে প্রবেশের লক্ষ্য যদি কেবল একটি নতুন পরিচয় অর্জন হয়, তার মূল্য সীমিত। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন, নতুন বাজার, জ্বালানিনিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বৃহত্তর দক্ষিণের রাজনৈতিক মঞ্চে অধিক কণ্ঠস্বর অর্জন করতে পারে, তবে এর কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি।

আজকের বিশ্ব আর একক কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে না। ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন মেরু তৈরি হচ্ছে, পুরোনো জোটের পাশাপাশি নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে।

এই পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো একটি শিবির নির্বাচন করা নয়; প্রয়োজন নিজের অবস্থানের মূল্য বৃদ্ধি করা। ব্রিকস সেই সুযোগগুলোর একটি।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য তখনই হবে, যখন ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেও ওয়াশিংটনকে হারাবে না, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা রেখেও নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে, মস্কোর সঙ্গে কাজ করেও ব্রাসেলসের বাজারকে বিপন্ন করবে না এবং ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েও অন্য অংশীদারদের কাছে নিজেকে কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরবে না।

কারণ, ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময় তার সামরিক সামর্থ্য নয়—অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কারও স্যাটেলাইট স্টেট বা অনুগ্রহ নির্ভর রাষ্ট্র না হয়ে সবার কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার কূটনৈতিক সক্ষমতা।

ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য সেই সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পথ হতে পারে—যদি সদস্যপদকে গন্তব্য নয়, জাতীয় স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই। ই–মেইল: akmahsanullah@gmail.com

    * মতামত লেখকের নিজস্ব।