সহিংসতা

রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রতিবন্ধিতা

বাংলাদেশে গত ১৩ বছরে নির্বাচন-উত্তর ও পরবর্তী সহিংসতায় আহত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ধর্মীয় সংখ্যালঘু। ’৭২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। চিরদিনের মতো পুঙ্গত্ব বা প্রতিবন্ধিতা বরণ করেছে প্রায় ১২ হাজার সংখ্যালঘু। ১৯৯১ সাল থেকে গণতন্ত্রায়ণের নবযাত্রার সঙ্গে ক্ষমতাসীন ও পরাজিত রাজনৈতিক দলের সহিংসতায় নিহত এবং শারীরিক নির্যাতনে প্রতিবন্ধিতার সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলে। তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ, শারীরিক হামলার মাধ্যমে জখম, হত্যা, ধর্ষণ, জোর করে ধর্মান্তর ও বিয়ে, জায়গা-জমি দখল, মিথ্যা মামলায় জড়ানোসহ এমন কোনো অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন নেই, যা তখন ঘটেনি। শারীরিক জখমের চিহ্ন নিয়ে অনেকেই কোনো না-কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে এর মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তবে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে আরেক দফা হামলা। তবে এসব সহিংসতার ঘটনা কেবল সংখ্যালঘুদের জীবনই বিপন্ন করেনি, ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সব নাগরিকই নিরাপত্তহীনতায় ভুগছে।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের দেশান্তরের প্রবণতা বন্ধ হয়নি। ’৭০ সালে যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, তা আদমশুমারি ১১ অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৯ দশমিক ৬ শতাংশের কিছুটা ওপরে। এর পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা অন্যতম। বিশ্বের ১৯৩ দেশের মধ্যে মাত্র ৬৪ দেশে দেড় কোটির অধিক জনসংখ্যা রয়েছে; আর বাকি ১২৯ দেশের প্রতিটির জনসংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সংখ্যায় বেশি। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা রোধে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় প্রতিবন্ধী হওয়া মানুষগুলোর জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না ।
এরশাদের শাসনামল এবং ’৯০-এর ডিসেম্বরে ভারতের বাবরি মসজিদকেন্দ্রিক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রভাবে এই দেশে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয় প্রায় দুই হাজারের ওপরে মানুষ। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশেষ করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৬ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতিবন্ধিতার শিকার হয় এক হাজারেরও অধিক। ২০০৮ থেকে ২০১৪ বিশেষ করে, যুদ্ধাপরাধীর বিচার-প্রক্রিয়া শুরু এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আবার রাজনৈতিক সহিংসতার সূত্রপাত হয়। ২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর রাজনৈতিক সহিংসতা বর্বরতায় রূপ নেয় এবং ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর এর মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
পত্রপত্রিকার তথ্যমতে, রাজনৈতিক সহিংসতায় শুধু গত বছরে শিশুসহ মৃত্যু হয় পাঁচ শতাধিক এবং পুঙ্গত্ববরণ বা প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছে ১২ শতাধিক; যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ থেকে ২০। তা ছাড়া শুধু সাভার রানা প্লাজা ধসে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছে প্রায় দেড় হাজারের অধিক। এই প্রতিবন্ধিতা শিকার হওয়ার পেছনেও কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের একটি সূত্র খুঁজে পান। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং রাজনৈতিক দলের কর্মীসহ সাধারণ মানুষেরও প্রাণহানি ঘটছে। কারও জীবন আটকে যাবে আজীবন প্রতিবন্ধিতা নামক নিষ্ঠুর ফ্রেমে।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই রাজনৈতিক সহিংসতার দায়ভার কার? ঘুরেফিরে গান্ধীর সেই কথাটিই মনে পড়ে ‘যে পর্যন্ত সরকার আমাদের জীবনমান রক্ষা করবে, ততক্ষণ সরকারকে সহযোগিতা করা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু সরকার যখন তা পারবে না তখন তাকে অসহযোগিতা করাও আমাদের কর্তব্য’। রাষ্ট্রের হেফাজতকারী হিসেবে সরকারকেই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তবে পাশাপাশি সমাজের অপরাপর মানুষের দায়িত্বকেও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা নিজেদের সহিষ্ণু জাতি হিসেবে অভিহিত করি। কিন্তু এই পাশবিক অত্যাচার মেনে নেওয়া কি আমাদের সহিষ্ণুতা নাকি ভীরুতা! তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্নাত দেশের মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তনের সংগ্রামের পথে সব অশুভ শক্তির মহড়া রুখে দিতে শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এখনই সময়। শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনার মধ্যে শুধু আজ আমাদের সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; আমাদের যেতে হবে আরও গভীরে।
কিন্তু কেন জানি আমাদের রাজনীতিবিদেরা চান না এ ধরনের সমস্যার একটি টেকসই সমাধান হোক। কারণ, বিদ্যমান সমস্যাকে জটিল করার ওপর তাঁদের ক্ষমতায় টেকা ও যাওয়া নির্ভর করে। নাগরিকেরা যত বেশি দুর্ভোগে থাকে, তাঁরা তত বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার সুযোগ পান। রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষত নিয়ে যারা আজ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার, তারা হয়তো একদিন তাঁদের জীবনের সঙ্গে এই ‘শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে’ মানিয়ে নেবে, তাদের স্বজনদের কান্না শুকাবে, কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মানসিক প্রতিবন্ধিতা চিরতরে দূর হবে কীভাবে, তা আমার জানা নেই।
মোশাররাফ হোসেন, কান্ট্রি ডিরেকটর, এডিডি ইন্টারন্যাশনাল।
ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া: উন্নয়ন প্রশিক্ষক।