
হত্যা ও দুর্ঘটনা ছাড়া বাংলাদেশের খুব কম খবরই বিদেশি গণমাধ্যমে জায়গা পায়। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার মুক্ত লেখক বা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলার বিচারের খবরটি নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, সিএনএনসহ বিশ্বের নামকরা সব গণমাধ্যম বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করেছে। কিন্তু পৌর নির্বাচন ও খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ডামাডোলে পড়ে দেশের গণমাধ্যমগুলো খবরটি তেমন গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না।
রাজীব হত্যা মামলার রায়টি এ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ যে এই প্রথম বাংলাদেশে কোনো ব্লগার হত্যার দায়ে মাননীয় আদালত অপরাধীদের শাস্তি দিলেন। যে বছরটি আমরা সবে পার হয়ে এসেছি, সেই ২০১৫ সালে জঙ্গিরা চারজন মেধাবী তরুণ লেখক-ব্লগার-প্রকাশককে হত্যা করেছে, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা করে নিরীহ মানুষ খুন করেছে। এই জঙ্গিরা কেড়ে নিয়েছে দুজন বিদেশি নাগরিকের জীবন, যাঁরা এ দেশে এসেছিলেন মানবসেবার ব্রত নিয়ে।
বাংলাদেশে জঙ্গিদের হাতে সংঘটিত প্রতিটি হত্যা ও হামলার দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস বিবৃতি দিলেও তাদের জন্মের আগে থেকে এখানে জঙ্গি তৎপরতা ছিল। তাই এসব বিবৃতির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাংলাদেশি কিংবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের এই সংগঠনে যুক্ত হওয়ার খবর যে মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ সিরিয়ায় আইএসবিরোধী বিমান হামলায় সাইফুল হক নামে এক বাংলাদেশি যুবকের নিহত হওয়ার ঘটনা। সাইফুলের খবরও বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে ফলাও প্রচার পেয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ভাষ্য অনুযায়ী, সিরিয়া ও ইরাকে বিমান হামলায় নিহত আইএসের ১০ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার একটি তালিকা গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট প্রকাশ করে, যাতে বাংলাদেশি সাইফুল হকের নাম রয়েছে। ১০ ডিসেম্বর আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা প্রদেশের কাছে বিমান হামলায় সাইফুল মারা যান। তিনি আইএসের হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনাকারী, হ্যাকিং কর্মকাণ্ড, নজরদারি প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং অস্ত্র উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর সাইফুল প্ল্যামারগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি আইব্যাক নামে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
পরিবারের সদস্যদের মতে, সাইফুল সর্বশেষ দেশে আসেন ২০১৪ সালে ঈদুল ফিতরের আগে এবং ঈদের কয়েক দিন পর লন্ডনের উদ্দেশে তিনি দেশত্যাগ করেন। তাঁদের ধারণা, সাইফুল তখন লন্ডন না গিয়ে সিরিয়া চলে যান। মাস খানেক আগে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে তিনি সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে সিরিয়া গেছেন। আর, চলতি সপ্তাহে তাঁরা বিমান হামলায় তাঁর মারা যাওয়ার খবর পান।
রাজীব হায়দার হত্যা মামলার বিচারের সঙ্গে সাইফুলের ঘটনার কি কোনো যোগসূত্র আছে? সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও পরোক্ষ যোগসূত্র আছে। যে চিন্তা ও দর্শন সাইফুলকে আইএসে যোগ দিতে প্ররোচিত করেছে, সেই চিন্তা ও দর্শনই রাজীবকে খুন করতে মদদ জুগিয়েছে। তাই, আইএস বাংলাদেশে থাকুক আর না-ই থাকুক, আইএসের চিন্তা ও দর্শন বহাল তবিয়তে আছে।
২০১৩ সালের জানুয়ারির শুরুতে একজন যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে যে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে অান্দোলন গড়ে ওঠে, রাজীব হায়দার তার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পল্লবী থানাধীন কালশীর পলাশনগরে নিজ বাড়ির সামনে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাসায় গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং হত্যার বিচার করবেন বলে ওয়াদা করেন। বিলম্বে হলেও বিচার হলো।
রাজীবের বাবা নাজিম উদ্দিন রায়ে খুশি হতে পারেননি। তাঁর দাবি, ‘খুনিরা হত্যার কথা স্বীকার করলেও তাদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া দুঃখজনক।’ গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারও বলেছেন, এই রায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রায়কে গুরুত্বপূর্ণ অভিহিত করে বলেছেন, এর মাধ্যমে জঙ্গি ঘাতকেরা বার্তা পেয়ে যাবে।
আমরাও রায়কে স্বাগত জানাতে চাই এই যুক্তিতে যে হত্যার বিচার হয়েছে। যদি নিম্ন আদালতের রায়ে কোনো ত্রুটি থাকে, উচ্চ আদালতে সংশোধন হবে, যেমনটি হয়েছে কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে। মনে রাখতে হবে, হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টা মামলাটি ঝুলে আছে ১২ বছর ধরে।
বিচারের রায় নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকতে পারে, রায়ে কেউ খুশি বা বেজার হতে পারেন, কিন্তু বিচার হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সব ক্ষেত্রেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) ব্লগার রাজীব হত্যা মামলার রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। সিপিজের এশিয়া-বিষয়ক গবেষণা সহযোগী সুমিত গালহোত্রা বলেছেন, ‘এই মামলার রায় দেরিতে হলেও বাংলাদেশে ব্লগারদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রথম ব্যবস্থা, যা উৎসাহব্যঞ্জক।’
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক সাঈদ আহমেদ মামলার রায়ে রাজীবকে হত্যার পরিকল্পনা ও হত্যার দায়ে ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ এবং পলাতক আসামি রেদোয়ানুল আজাদ ওরফে রানাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। হত্যায় সহযোগিতা ও সহায়তার দায়ে মাকসুদুল হাসান ওরফে অনিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ, ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যায় প্ররোচনা দেওয়ায় মুফতি জসীমকে পাঁচ বছর, হত্যা পরিকল্পনায় সহায়তা করায় এহসান রেজা, নাফিজ ইমতিয়াজ ও নাঈম শিকদারকে ১০ বছর করে এবং ইয়াছির মাহমুদকে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। এহসান, নাঈম ও নাফিসকে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রেদোয়ানুল ছাড়া বাকি সাত আসামিই কারাগারে আটক আছেন। মুফতি জসীম ছাড়া বাকি সবাই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পরে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
সমাজে একটি ধারণা আছে যে মাদ্রাসা-মক্তবে পড়ুয়ারাই এ ধরনের জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত। কিন্তু রাজীব হত্যা কিংবা সাইফুল হকের ঘটনা তা মিথ্যা প্রমাণ করেছে। রাজীব হত্যার দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। সাইফুল প্রযুক্তিবিদ।
রাজীব হত্যার রায়ে আদালত যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা আমাদের রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, ব্যক্তি ও পরিবার—সবার ধীরস্থিরভাবে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। আদালত বলেছেন, ‘মামলার তদন্তে তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি আছে। রাষ্ট্রপক্ষ রাজীব হায়দারকে ব্লগার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। এজাহারে তাঁকে ব্লগার বলা হয়নি।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ‘গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিয়ে রাজীবকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা কীভাবে জড়িত ছিলেন, তা তাঁদের জবানবন্দি থেকে ধারণা পাওয়া গেছে। এই মামলায় ৫৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৫ জনকে উপস্থাপন করা হয়েছে। মামলায় চাক্ষুষ কোনো সাক্ষী নেই। তবে আসামিদের জবানবন্দি, মামলার আলামত, সাক্ষী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আদালত রায়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।’ পলাতক আসামি রেদোয়ানুল আজাদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন। মূলত তাঁর পরিকল্পনামতে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
আমাদের সমাজে কীভাবে জঙ্গি তৎপরতা প্রসারিত হচ্ছে, সেই বিবরণও দিয়েছেন বিচারক। তিনি বলেছেন, ‘তাঁর আগের কর্মস্থলে একজন মেধাবী জজ ছিলেন। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পরে জেনেছেন, তিনি হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য ছিলেন। এই অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। আসামিরা মেধাবী—এ মামলায় তা বিবেচ্য বিষয় নয়, কারণ অনেক মেধাবীই এখন বিপথগামী হচ্ছেন।’
এই যে অনেক মেধাবী তরুণ বিপথগামী হচ্ছেন, সে বিষয়ে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ কি সজাগ? পরিবার বা অভিভাবকেরা কি ওয়াকিবহাল? রাষ্ট্রের যাঁরা কর্ণধার, সমাজের যাঁরা অধিপতি, তাঁরা কি জঙ্গিবাদের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন? সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বললেও তাদের হামলা ও হুমকি যে এতটুকু কেমনি, তার প্রমাণ ২০১৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ। এই এক বছরে জঙ্গিদের হাতে পাঁচজন ব্লগার খুন হয়েছেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি খুন হন অভিজিৎ রায়, ৩০ মার্চ ওয়াশিকুর রহমান, ২২ মে অনন্ত বিজয় দাশ, ৭ আগস্ট নিলয় নীল, ৩১ অক্টোবর ফয়সল আরেফিন দীপন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘাতকেরা ধরা পড়েনি; ওয়াশিকুরের ঘাতকদের তৃতীয় লিঙ্গের দুই ব্যক্তি ধরিয়ে দিলেও তাদের সহযোগীকে পুলিশ খুঁজে পায়নি। দীপনের ঘাতক কিংবা প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, রণদীপম বসু ও তারেক রহিমের ওপর হামলাকারীরাও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই বিচারের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক দিকটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। সমাজে শুভ চেতনার অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক বৈরিতা ও বিদ্বেষের সুযোগেই অন্ধকারের শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
জঙ্গিবাদ এমন ব্যাধি যে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা আইন আদালত দিয়ে একে দমন করা যাবে না। হত্যাসহ প্রতিটি অপরাধের বিচার করতে হবে। সেই সঙ্গে যে চিন্তা বা দর্শন মানুষকে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধে ইন্ধন জোগায়, সেই চিন্তা বা দর্শনের বিরুদ্ধে আদর্শের যুদ্ধটা জারি রাখতে হবে। দীপন নিহত হওয়ার পর তাঁর শোকাহত বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছিলেন, ‘সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ কিন্তু শুভবুদ্ধির উদয় যে হয়নি, বর্তমান বাংলাদেশই তার প্রমাণ। আমরা রাজনীতির ঝগড়াকে যেন গুলি-বোমার নিশানায় পরিণত না করি, ধর্মের ভিন্নমতকে যেন চাপাতির কোপে দ্বিখণ্ডিত না করি। ব্যক্তিমানুষ নিহত হলে বিচার করে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু মানবতা নিহত হলে তার বিচার পাওয়া যায় না। মানবতার রক্ষকদের কাছে এই আবেদনটুকুই রাখছি।
বাংলাদেশের সংবিধান কিংবা আইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বেলাগাম নয়। ব্যক্তিগত, জাতিগত, ধর্মগত বিদ্বেষ ছড়ানো আইনের
দৃষ্টিতে অপরাধ। আক্রান্ত ব্যক্তি অবশ্যই প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ হতে হবে আইন ও যুক্তির ভাষায়। লেখার প্রতিবাদ লেখা দিয়েই করতে হবে। কাউকে হত্যা করা ফৌজদারি আইন তো বটেই, ধর্মের দৃষ্টিতেও ঘৃণ্যতম অপরাধ। প্রতিটি হত্যার বিচার হোক। প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিকার হোক।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com