মতামত

আফগান ট্র্যাজেডি এবং অশান্তির যুগ

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে তালেবান যোদ্ধাদের সশস্ত্র মহড়া
ছবি: এএফপি

তালেবান শাসন থেকে বাঁচতে কাবুল বিমানবন্দরের উঁচু কাঁটাতার বেয়ে হাজারো আফগান পালানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা করেছে। এ ঘটনা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার হৃদয়বিদারক ছবিই ফুটিয়ে তুলেছে। আফগানিস্তানের সাবেক পশ্চিমা মিত্ররা নিষ্ঠুরভাবে দেশটি ছেড়ে চলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে জো বাইডেন প্রশাসন পুরোনো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন যুগকে আলিঙ্গন করার সংকল্প করেছে।

আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার তাড়াহুড়ো করে প্রত্যাহারের ঘটনায় অনেক সমালোচনা চলছে। এ সমালোচনা শুধু আফগান নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, গোয়েন্দা ব্যর্থতা, কিংবা পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য করা হচ্ছে, এমনটা নয়। বিগত হয়ে আসা একটা যুগের প্রতি অটল নস্টালজিয়া, এমনকি আর্তিও এর পেছনে রয়েছে। আমেরিকার নেতৃত্বে আফগানিস্তানে ২০ বছর আগে শুরু হয়েছিল সামরিক আগ্রাসন। এটাই ভিন্ন কোনো অঞ্চলে পশ্চিমা আগ্রাসনের শেষ নিদর্শন। একটি আন্তর্জাতিক উদারনৈতিক শৃঙ্খলা স্থাপন এবং দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে এ আগ্রাসন চালানো হয়েছিল।

এ পরিস্থিতিতে আমেরিকার যেকোনো প্রেসিডেন্টই দেশীয় বাস্তবতার দিকে মনোযোগ দেবেন। ‘আমেরিকা প্রথম’ অনুভূতির দিকেই প্রথম তাকাবেন। আমেরিকার সরকার এখন নির্মোহভাবে পরস্পর সম্পর্কিত শক্তিগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আবার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দূরবর্তী মিশনে স্থিতিশীলতার প্রতিষ্ঠার জন্য আর কোনো সম্পদ কিংবা জীবন উৎসর্গ করতে তারা চায় না। নিজেদের ঘরেই এখন সমস্যার শেষ তারা দেখতে পাচ্ছে না।

বাইডেন এমন এক নতুন দুনিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে এক দেশ অন্য দেশকে আক্রমণ করছে। এ আক্রমণ চলছে সেটাকে কেন্দ্র করেই, যেটা তাদের এত দিন সংযুক্ত করে রেখেছিল। বিগত কয়েক দশকে আমরা বিশ্বের নানা প্রান্তে দেয়াল ও সীমান্ত প্রাচীর সরিয়ে দিয়েছি। গড়ে তুলেছি বিশ্বব্যাপী একটা ওয়েবের জাল। এর মাধ্যমে জনগণ এবং দেশগুলো একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। কিন্তু এখন বড় শক্তির দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক প্রেমহীন দাম্পত্য সম্পর্কের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা একে অপরকে ঘৃণা করে, কিন্তু বিচ্ছেদে যেতে পারছে না। প্রতিশোধপরায়ণ ভূরাজনৈতিক সঙ্গীরা ব্যবসা, অর্থনীতি, অভিবাসী, মহামারি ও ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে ঘুরছে।

কানেকটিভিটিকে বা যোগাযোগকে কেন্দ্র করে এ রকম সংঘাত এখন খুব সাধারণ। কিছু দেশ ব্যবসা, মাস্ক, ভ্যাকসিন, বৈশ্বিক পুঁজি কিংবা খনিজ সম্পদ আটকে দিচ্ছে। অন্যরা সাইবার হামলা কিংবা গুজব ছড়াচ্ছে। আন্তসীমানায় শরণার্থী সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আধুনিক এই যুদ্ধ পদ্ধতি যুদ্ধের কেতাবি কোনো সংজ্ঞা নয়। কিন্তু সামরিক যুদ্ধের চেয়ে এই যুদ্ধ অনেক বেশি মানুষকে আক্রান্ত যেমন করছে, প্রাণহানিও ঘটাচ্ছে বেশি।

প্রচলিত অর্থে আমরা যেটাকে যুদ্ধ বলি, এটা-সেটা নয়। কিন্তু এটা শান্তির যুগও নয়, বরং বিশ্ব এখন একটা অশান্তির যুগে ঢুকে পড়ছে। ভবিষ্যতে আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাশালী দেশগুলো চিরস্থায়ী অশান্তির মধ্যে ঢুকে পড়বে। বাইডেন প্রশাসন মনে করছে, মুক্তির নতুন ক্ষেত্র আফগানিস্তানের শাসনহীন অঞ্চলে আর নেই। বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সেটা রয়েছে। নতুন এই যুগের জন্য আমেরিকাকে উপযুক্ত প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলাটাই এখন বাইডেনের সংকল্প।

আফগানিস্তানে ‘অনন্ত যুদ্ধ’ শেষ হয়েছে। এরপরও সেখানে শান্তি ফিরে আসবে না। তথ্যের ওপর তালেবানদের যে নিয়ন্ত্রণ, সেটার মাধ্যমে যুদ্ধ ছাড়াই দেশের ভেতরকার শত্রুদের তারা বশে নিয়ে আসতে পারবে। আফগান শরণার্থীদের সম্ভাব্য বিপুল স্রোত বেলারুশ ও অন্যান্য দেশ, যারা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে, তাদের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করবে। একই সময়ে আমেরিকা আফগানিস্তানে সাহায্য ও ডলারের প্রবাহ বাড়িয়ে সেখানটাতে প্রভাব তৈরি করতে চাইবে।

বাইডেনের পরবর্তী কাজ হচ্ছে, অশান্তির যুগটাকে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, এমন মিত্রদের খুঁজে বের করা। খুব সাদামাটাভাবে তিনি তা শুরু করেছেন। অনেকগুলো দেশ মার্কিন আনুগত্য লাভের আশায় আফগানিস্তানে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। যদিও ওই দেশগুলো আন্তর্জাতিক মূল্যবোধ ও উদার শাসনের যুক্তি দিয়ে সেই যুদ্ধে নিজেদের যুক্ত করেছিল, জনগণকে বুঝ দিয়েছিল। মার্কিন নীতির এত দ্রুত বদল এখন তারা মেনে নিতে পারছে না।

একক পরাশক্তি হিসেবে আগে বিশ্বকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে আমেরিকা, ভবিষ্যতে তারা সেটা আর পারবে না। তাদের এখন এমন মিত্রদের দরকার পড়বে, যারা সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং যোগাযোগ নামের অস্ত্রের জোরে চলবে। ইউরোপের দেশগুলোর জন্য এটা যেমন সুযোগ, আবার চ্যালেঞ্জও বটে। ২০০১ সালের সন্ত্রাসী হামলার পর ইউরোপের দেশগুলো আফগানিস্তানে আমেরিকার পিছু পিছু গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অবধারিতভাবেই সেখানে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। এখন তাদের সংঘাতের নতুন ভূমিতে (কানেকটিভিটি) প্রতিযোগিতা কীভাবে করতে হবে, তা শিখতে হবে। এরপরেই তারা আমেরিকা ও অন্য মিত্রদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারবে।

অনন্ত যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে শেষ হয়েছে। শুরু হয়ে গেছে অশান্তির যুগ।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক