মতামত

এখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাড়ির কাজ পাওয়া যায়

ঢাকা শহরের একটি স্টেশনারি দোকানের সামনে লাগানো বিজ্ঞপ্তি
ছবি: তাসদীখ হাবীব

শিরোনাম দেখে অনেকেই চমকে গেছেন। চমকে যাওয়াই স্বাভাবিক। বাড়ির কাজ কি কিনতে পাওয়া যায়? এটা কি বিক্রি হওয়ার জিনিস? কিন্তু বাংলাদেশে এখন তা–ই হচ্ছে! আগেও যে হতো না, তা নয়। তবে তখন সেটি ব্যক্তিপর্যায়ে সীমিত ছিল। কিন্তু এটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এ শিরোনাম আমি নিয়েছি ঢাকা শহরের একটি স্টেশনারি দোকানের সামনে লাগানো বিজ্ঞপ্তি থেকে। সাদা কাগজে কম্পিউটারে প্রিন্ট করে এ বিজ্ঞপ্তি লাগানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার কাছে এটি পাঠিয়েছেন আমার এক বন্ধু, কয়েক দিন আগে।

এ কয় দিনে যত দূর জানতে পেরেছি, তাতে এটি শুধু ঢাকা শহরের একটিমাত্র দোকানের চিত্র নয়। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এ বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে এবং ইন্টারনেটেও। গুগলে গিয়ে ‘অ্যাসাইনমেন্ট এসএসসি ২০২১’ অনুসন্ধান করাতে কয়েক লাখ ফলাফল পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম, এসএসসির বিভিন্ন বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিনা মূল্যেই সেগুলো ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। এ জন্য অনেক নতুন নতুন ওয়েবসাইটেরও জন্ম হয়েছে।

ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে গিয়ে দেখলাম, সেখানেও মনের আনন্দে সব অ্যাসাইনমেন্টের সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কষ্ট আর উদ্যোগ দেখলে মনে হবে, শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার জন্য প্রত্যেকেই জীবনপাত করছেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন সহজ হয়ে গেছে! মোড়ের দোকান থেকে কিনে বা ডাউনলোড করে কিংবা ভিডিও দেখে লিখে জমা দিলেই হলো। নম্বর আর নম্বর। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজেরাও সেটি লিখছে না। কারও কারও অভিভাবকই এ কাজ করে দিচ্ছেন। আমি অবাক হব না, যদি কদিন পরে জানতে পারি যে নতুন সার্ভিস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানকার কর্মীরা বাসায় বাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়ে বাড়ির কাজ লিখে দিয়ে আসবে বা পাড়ার মোড়ে টেবিল–চেয়ার নিয়ে বসে পড়বে বাড়ির কাজ করে দেওয়ার জন্য।

অথচ এই প্রথম শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে অ্যাসাইনমেন্টগুলো যেন আকর্ষণীয়, কৌতূহলোদ্দীপক এবং মস্তিষ্ক–উদ্দীপক হয়, সে জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে যাঁরা নিয়মিত নতুন নতুন প্রশ্ন করেন, তাঁদের এই অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকদের সঙ্গে অলিম্পিয়াডের বিশেষজ্ঞ ও স্বেচ্ছাসেবকেরাও যুক্ত হয়েছেন। যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু দিন শেষে এই অ্যাসাইনমেন্টগুলোর পরিণতি হয়েছে মোড়ের দোকানের ফটোকপির আধেয়তে বা ইউটিউবের ভিডিওতে!

দীর্ঘ ১৮ মাসের বন্ধের ফলে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থীই তাদের বই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের অনেকেরই সক্ষমতা কমে গেছে। আমাদের দেশের একদল শিক্ষার্থী এখনো স্কুলে শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থেকেও কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন করতে পারে না। কাজে টেলিভিশন বা ফেসবুকে ক্লাস ‘দেখে’ তারা নিজেরাই শিখে ফেলবে, এমনটা ভাবা কষ্টকর।

এটি যে একেবারে অজানা, তা নয়। কারণ, ২২ আগস্ট প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গেছে, অ্যাসাইনমেন্টে নকল প্রতিরোধ করার জন্য এলাকায় এলাকায় কমিটি গঠন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে! (এসএসসি-এইচএসসির অ্যাসাইনমেন্টে নকল ঠেকাতে উদ্যোগ সরকারের, প্রথম আলো অনলাইন)। কেন এমনটি হয়েছে, এর অনেকগুলো কারণ বের করা যাবে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো দীর্ঘ ১৮ মাসের বন্ধের ফলে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থীই তাদের বই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের অনেকেরই সক্ষমতা কমে গেছে। আমাদের দেশের একদল শিক্ষার্থী এখনো স্কুলে শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থেকেও কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন করতে পারে না। কাজে টেলিভিশন বা ফেসবুকে ক্লাস ‘দেখে’ তারা নিজেরাই শিখে ফেলবে, এমনটা ভাবা কষ্টকর।

অন্যদিকে অনলাইন স্কুলের কারণে তারা তাদের অনেক দিনের আরাধ্য স্মার্টফোনের মালিকানা পেয়ে গেছে। সেখানে অনেক ডিসট্র্যাকশনের ব্যবস্থা আছে। ফলে তাদের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হচ্ছে না। কিন্তু যখন জানা গেল, অ্যাসাইনমেন্ট আর বাড়ির কাজ তার ফলাফলে কাজ লাগবে, তখনই একশ্রেণির অভিভাবক সেটি করিয়ে নেওয়ার বিকল্প খুঁজলেন। আর তাতেই বাড়ির কাজ আর অ্যাসাইনমেন্টের সমাধানের একটি বড় চাহিদা তৈরি হয়ে গেছে।

আরও গভীরে গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটা গলদের কথা আপনার মনে পড়বে। সেটি হলো, আমাদের পড়াশোনার একমাত্র উদ্দেশ্য যেন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া এবং তাদের জিপিএ দেওয়া। শিখন-শেখন এখানে খুব একটা পাত্তা পায় না। ছেলেমেয়েরা ভাবে, যেকোনোভাবে নম্বর পেলেই হবে। কাজটি যে মোটেই ঠিক হচ্ছে না, সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ২৩ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকা এ–সংক্রান্ত একটি আলোচনার সংবাদ প্রকাশ করেছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, ওপেন বুক (বই খুলে রেখে) অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ভালো শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, তাতে ‘মুড়ি-মুড়কির’ একদর হয়ে গেছে। জবাবে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘মূল্যায়ন হলো শেষের কথা। প্রথম কথা হলো, শিখছি কী রকম, বুঝছি কী রকম, কীভাবে এগোতে পারছি। শেখার ব্যবস্থা কী রকম করা যাচ্ছে। এই দিকগুলিতে নজর দিয়েই মূল্যায়নের কথা ভাবতে হবে। মূল্যায়নকেই সব থেকে বড় জিনিস ভাবা হোক, এটা আমরা চাইব না!’ (স্কুল কবে খোলা উচিত, চট করে বলা যাবে না, মত অমর্ত্য সেনের, আনন্দবাজর পত্রিকা অনলাইন)।

করোনাকাল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অনেক কিছুই উন্মোচন করেছে, নতুন করে। আশার আলো হচ্ছে নতুন কারিকুলাম। ২০২৩ সাল থেকে চালু হতে যাওয়া নতুন কারিকুলামে এ রকম উঠে আসা বিষয়গুলোকে ঠিকমতো নজর দেওয়া হবে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

মুনির হাসান প্রথম আলোর যুব কার্যক্রম ও ইভেন্টের প্রধান