
গত মাসের কথা। অনলাইন জগৎ থেকে মাঠে-ময়দানের আলাপে নেমে আসে ফেসবুকের একটা গ্রুপের কথা। প্রায় দেড় লাখ সদস্যের ওই গ্রুপে হরদম পর্নোগ্রাফি, নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা, গণধর্ষণের ভিডিও ক্লিপ, কৌশলে বা গোপনে তোলা নারীদেহের ভিডিও দেখানো ও লেনদেন করা হতো। পুলিশ গ্রুপটির তিনজন পরিচালককে (অ্যাডমিন) গ্রেপ্তার করে। অবশ্য মূল হোতা বসে আছেন মালয়েশিয়ায়। এই উদাহরণগুলো ডুবে থাকা বরফপাহাড়ের শীর্ষমাত্র। তলায় চলছে আরও অনেক কিছু।
সেক্স ইন্ডাস্ট্রির বাজার বিশ্বজুড়েই চাঙা। ইরটিক বা যৌনকামনা উদ্রেককারী ছবি-ভিডিও পাওয়াও খুব সহজ হয়ে গিয়েছে ইন্টারনেটে। অধিকাংশ ওয়েবসাইট থেকে মাত্র এক-দুই ক্লিক দূরেই অপেক্ষা করছে সেক্স ইন্ডাস্ট্রির ডিজিটাল প্রোডাক্ট। তরুণ-তরুণীরা এসবে ঢুকছেন, ডাউনলোড করছেন এবং এক থেকে বহু কপি হয়ে মোবাইল থেকে মোবাইলে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অসুবিধা নেই। পাড়া-মহল্লা-বাজারে এসবের দোকান আছে, সামান্য দামে মেমোরি কার্ডে ভরে নেওয়া যায় উত্তেজক ভিডিও ক্লিপ।
আর আছে টেলিভিশনে। শ খানেক ভারতীয় চ্যানেলের অনেকগুলোয় এমন নাচ-গান ও শো চলে, যা চিত্তকে নয়, জাগায় কামনাকে। একটানা এসব দেখে দুর্বল চিত্তের কেউ ভাবতে পারে, পুরুষের মন মজানোই নারীর প্রধান কাজ। কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রায় প্রতিটি বলিউডি সিনেমায় আইটেম গান নামের এক বস্তু আছে। এসব গানের ইরটিক ভাষা পুরুষকে করে লালসাকাতর আর নারীকে দেখায় লালসা মেটানোর সামগ্রী হিসেবে। এসব গানের নর্তকীদের বলা হয় আইটেম গার্ল। এসব সিনেমার নায়কেরাও সাধারণত হন প্রবল পুরুষ, বাংলায় যাকে আমরা বলি ব্যাটা, ইংরেজিতে বলে মাচো। এভাবে জনসংস্কৃতির মধ্যে নারীকে তুলে ধরা হচ্ছে অবাস্তব শরীরসর্বস্ব এক মূর্তিতে।
এরই চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে পর্নোগ্রাফিতে। শুধু তা-ই কি? গোপন ক্যামেরায় কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে নগ্নতার ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনেও রয়েছে এই অসুস্থ ভোগবাসনা। আজকের যুগ দেখার যুগ। আমাদের কাজ ও বিনোদনের অনেকটাই পিসি-ল্যাপটপ-ট্যাব, স্মার্টফোন, ক্যামেরা ও টিভির ওপর নির্ভরশীল। তাই বিনোদনের জগৎও মোটামুটি দৃশ্য বা ইমেজনির্ভর। সেক্স ইন্ডাস্ট্রির লক্ষ্যও মানুষের চোখে পড়া, চোখে মজিয়ে তাকে কোনো পণ্য বা দৃশ্যে আসক্ত করা।
হিন্দি চ্যানেলের রিয়্যালিটি শো এরই আরেক নমুনা। একটি অবুঝ শিশু যখন কোনো আইটেম গানের আইটেম গার্লের মতো সেজে ও পোশাক পরে হুবহু সেভাবেই নাচে, তখন তাকে কি আর নিরীহ বিনোদন বলা সম্ভব? দুটি বালক-বালিকাকে প্রেমঘন গানে ও সেমতো অভিনয় করালে তাদের মনেই-বা কী ক্রিয়া হয়, আর দর্শকদের মধ্যেই-বা কী প্রতিক্রিয়া হয়? এভাবে শিশুদের একাধারে ‘খুদে প্রাপ্তবয়স্ক’ বানিয়ে বড়দের ‘আনন্দের পুতুল’ হিসেবে পরিবেশন করা হয়? এটাও কি একধরনের অ্যাবিউজ নয়?
ওপরে বলা ফেসবুকের ওসব গ্রুপ, ইউটিউবের ভিডিও ইত্যাদির মধ্যে নির্বিচার যৌনতার সুড়সুড়ি আছে। এগুলো একধরনের বিকার। জন থেকে জনে এই সাংস্কৃতিক ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যৌনতা স্বাভাবিক, কিন্তু সবকিছুর মধ্যে যৌনতা ছড়ানো এবং নারীদের কেবলই ভোগের বস্তু মনে করা অস্বাভাবিক। একের আনন্দের জন্য যদি অন্যকে অসম্মানিত বা অত্যাচারিত হতে হয়, তবে সেই অন্যের অধিকার আছে এসবের বিরোধিতা করার।
এসবের মাধ্যমে জনপরিসরে নারীকে যে রূপে দেখানো হচ্ছে, তা সুস্থতার পরিপন্থী। যে পুরুষের চোখ নারীকে ভোগের দৃষ্টিতে দেখায় আসক্ত, তার পক্ষে নারীকে ব্যক্তি, মানুষ, নাগরিক ও স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী মানবসত্তা ভাবা কঠিন। তাদের ওই আগ্রাসী দৃষ্টির সামনে নারীর পক্ষে মর্যাদা নিয়ে চলাফেরা করা কঠিন। অনেকের ধারণা, পোশাক বা চলাফেরার কারণেই নারী আক্রান্ত হন! যে দেশে ছয় বছরের শিশু ধর্ষিত হয়, ঘরের ভেতর কিংবা বাহিরে হিজাব পরা নারীও আক্রান্ত হন, সেখানে নারীর সাজ-পোশাক, চলাফেরা ও স্বাধীন উপার্জনের জীবনকে দোষারোপ করা মানে ভিক্টিমকেই দোষ দেওয়া। কোনো নারী যদি ‘না’ বলেন, তার মানে তা ‘না’; সেটা তিনি স্ত্রী, প্রেমিকা, সহকর্মী, সহযাত্রী যে-ই হোন। এই ‘না’কে সম্মান করার মধ্যে দিয়েই সভ্যতা শুরু, প্রতিবেশিতার শুরু, সহযাত্রার শুরু, সমমর্যাদার শুরু। সমমর্যাদার ভিত্তিতে নারী-পুরুষের মেলামেশা ও জানাশোনার পরিবেশ যে সমাজে নেই, সেই সমাজে বিকৃতিই হয়ে ওঠে বিকল্প পথ। যৌনতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা যায় না এ দেশে, তরুণ-তরুণীদের প্রেমকে অনেকেই দেখেন সন্দেহের চোখে। অথচ যৌন-সন্ত্রাস ঘটে যায় প্রকাশ্যেই।
ধর্ষকের জন্ম তাই মায়ের পেটে হয় না, হয় সাংস্কৃতিক জলবায়ুতে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যে যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটছে, তার কারণ কি পুরুষের সহজাত প্রবণতা? ধর্ষণ কি পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি? জৈবিকভাবেই কি পুরুষের যৌনতা নারীর প্রতি আগ্রাসী? এসব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ধর্ষণ মানসিকতার জন্ম পুরুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নেই।
ধর্ষণের জন্য একটা বিশেষ মানসিকতার চাষবাস হতে হয়। খুনি ও খুনের শিকারের মধ্যে একজনকে হতে হয় শক্তিশালী, ক্ষমতাবান এবং ঘৃণার দ্বারা চালিত। ধর্ষক ও ধর্ষণের শিকারের মধ্যেও পার্থক্য এমনটাই। সমাজে ধর্ষণের সংস্কৃতি আছে বলেই ধর্ষণের মানসিকতা সেখান থেকে পরিপুষ্ট হয়। আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ধর্ষণের ওই ইচ্ছাকে সম্ভব করে তোলে। এই অর্থে ধর্ষণ একটা রাজনৈতিক ঘটনাও বটে।
বেগম রোকেয়া তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ বলেছিলেন যে কেবল ঘরের আশ্রয় পেলেই হবে না, যেদিন নারী বাহিরকে ঘর করতে পারবে, অর্থাৎ ঘরের বাইরেও মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাবে, সেদিনই নারী মুক্ত হবে, সমান হবে।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের আড়াই থেকে চার লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছিলেন। সেই নারীদের বেদনার অংশীদার যদি রাষ্ট্র হতো, ইতিহাস যদি তাঁদের স্মৃতি বহন করত, সমাজ যদি তাঁদের মর্যাদা দিত, তাহলে হয়তো নারীর জন্য নিরাপদ এক দেশ আমরা পেতাম। বরং আমরা দেখি দলের, প্রশাসনের ও সমাজের সমর্থনে ধর্ষকেরা রক্ষা পায়। অন্যান্য অপরাধীর মতোই ধর্ষকেরাও ক্ষমতার জালের মধ্যে আত্মীয়, বস বা বড় ভাই খুঁজে পায়। প্রতাপশালী দলে থাকলেও নারীকে দখল করার সাহস বেড়ে যায়। দুটি তথ্যই যথেষ্ট: ১. ‘গত ১০ বছরে ধর্ষণসহ যত নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তার ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। বিচারের হার ১ শতাংশেরও কম (ইত্তেফাক, ৭ জুলাই, ২০১৫)।’ ২. সম্প্রতি রিশা থেকে নিতু, খাদিজা থেকে পূজা, তনু থেকে আফসানা; একটি ঘটনারও চার্জশিট বা অভিযোগপত্র হয়নি; বিচার তো দূর অস্ত।
জনসংস্কৃতিতে যৌনবিকৃতির আমদানি আর বিচারহীনতা যখন দুজনে দুজনার হয়, তখন ধর্ষণের অবসান হবে কীভাবে?