
উত্তরবঙ্গের অন্যতম জেলা শহর ঠাকুরগাঁও যেন অনেকটা বিচ্ছিন্ন জনপদ। রাজশাহী অনেক কাছে হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। যেতে হয় রংপুর হয়ে। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি রেলযোগাযোগ নেই। এক হাজার কোটি টাকা খরচ করে পুরোনো রেললাইন সংস্কার করা হলেও আন্তনগর ট্রেনের কোনো সংযোগ দেওয়া হয়নি। গত বছরের জুনে দিনাজপুরের সঙ্গে শাটল ট্রেন চালু হলে নাগরিক অধিকার আন্দোলন প্রতিবাদ জানায়। মানববন্ধন করে। একবার এক মন্ত্রীকে রাস্তায় অবরুদ্ধও করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। তাঁরা বলেছেন, ঠাকুরগাঁওয়ে আন্তনগর ট্রেন চালু করতে হবে। আন্দোলনের মুখে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাংসদ ইয়াসিন আলী ওয়াদা করেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে আন্তনগর ট্রেন চালু হবে। ১৫ মাস চলে গেছে। কিন্তু আন্তনগর ট্রেনের দেখা নেই। প্রতিদিন ঠাকুরগাঁও থেকে চার হাজার যাত্রী ঢাকায় যান। তাঁদের জন্য ট্রেনে আসন রাখা হয়েছে ২০টি। এটিকে হাস্যকর বলেই মনে করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।
ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগও বেহাল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শশী আহমদের সঙ্গে আলাপ হলো। বললেন, ঈদের আগে রাজশাহী থেকে ঠাকুরগাঁও আসতে তাঁর লেগেছে ১২ ঘণ্টা। প্রথমে রাজশাহী থেকে ট্রেনে রংপুরে যান। সেখান থেকে বাসে ঠাকুরগাঁওয়ে। খুলনা থেকে রংপুরগামী ট্রেন তিন ঘণ্টা বিলম্বে এসেছে। আবার রংপুর থেকে ঠাকুরগাঁও আসতে তিন ঘণ্টা বাসে আটকে থাকেন রাস্তায় ট্রাক উল্টে যাওয়ার কারণে। বাংলাদেশে এখন চলছে উল্টো যাত্রা।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এবারের ঈদে বাড়ি যাওয়া মানুষের ভোগান্তি হয়নি। কিন্তু উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, ভোগান্তি কাকে বলে। ঈদের ১০/১২ দিন পরও যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে। হানিফ এন্টারপ্রাইজের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হলো ২ হাজার ৪০০ টাকা। আমাদের এক সহকর্মী তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, ঢাকা থেকে জয়পুরহাটে নন–এসি বাসের ভাড়া ৬০০ টাকা। কিন্তু ঈদের সময় দিতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। এত বেশি ভাড়া কেন নিচ্ছেন? হানিফ পরিবহনের ব্যবস্থাপক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
স্বাভাবিক সময়ে সড়কপথে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় আসতে অন্য সময়ে লাগে ৮-৯ ঘণ্টা। আমাদের লাগল পাক্কা ১২ ঘণ্টা। রাত সোয়া ৯টায় রওনা দিয়ে ঢাকার গাবতলী এসে পৌঁছাই পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায়। মহাসড়কে মহাবিশৃঙ্খল অবস্থা। যে যেখানে পারে, অপরকে টেক্কা দিচ্ছে।
বাসযাত্রার ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে এখন অনেকেই বিমানে যাচ্ছেন। সৈয়দপুর থেকে যাত্রীদের জন্য দিনাজপুর, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে মাইক্রো সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে। ঈদের আগে–পরে বিমানের টিকিটের চাহিদাও ছিল বেশি। সৈয়দপুর থেকে ঠাকুরগাঁও দেড় ঘণ্টার পথ। কিন্তু রাস্তাঘাট খারাপ থাকায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল।
শিল্পকারখানা নেই, বেকারত্ব বড় সমস্যা
গত বছর ঠাকুরগাঁওয়ে দেখেছি, ছাত্রীরা স্কুল-কলেজে যাচ্ছে সাইকেলে চড়ে। এবারে দেখলাম শুধু ছাত্রী নয়, কর্মজীবী নারীরাও সাইকেলে চড়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। ঠাকুরগাঁওবাসীর আক্ষেপ, সেখানে কোনো ভারী শিল্পকারখানা নেই। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও চিনিকল বছরে তিন মাস চালু থাকে। বাকি সময় বন্ধ। তবে বিসিক নগরীতে বেশ কিছু প্লাস্টিক, সাবান, ময়দা ও পোলট্রি কারখানা গড়ে উঠেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রধান সমস্যা বেকারত্ব ও যোগাযোগ।
প্রথম আলোর ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি মজিবর রহমান খান গতবার যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে লিখতে বলেছিলেন। এবারে দেখলাম পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শহরের প্রায় সব সড়কই খানাখন্দে ভরা। পৌর মেয়রের দাবি, সরকারি বরাদ্দ নেই বলে তিনি কাজ করতে পারছেন না। ট্রাফিক–ব্যবস্থা নড়বড়ে।
ঠাকুরগাঁও কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানে ধান ছাড়াও প্রচুর গম, ভুট্টা ও আলু উৎপন্ন হয়। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর হওয়ায় কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না। গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও এসেছিলেন। তিনি সেখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনৈতিক জোন ও আইটি পার্ক হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কবে হবে সেটি কেউ বলতে পারছেন না। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, তারা কোনো প্রজ্ঞাপন পাননি।
সহকর্মী মজিবর রহমান খানকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলি। বিএনপির অফিসে আলাপ হয় জেলা কমিটির সভাপতি তৈমুর রহমান (তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও) এবং যুগ্ম সম্পাদক আনসারুল ইসলাম ও পয়গাম আলীর সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম, নির্বাচন তো এসে গেল। আপনাদের দল কতটা প্রস্তুত? তৈমুর বললেন, ‘আমরা প্রস্তুত আছি। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ তো নেই। বিএনপির নেতা-কর্মীদের পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। পুলিশ বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দিচ্ছে। পুরোনো মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করছে।’ অনেকের প্রশ্ন, ঠাকুরগাঁও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকা। এ কারণেই কি পুলিশ বেশি তৎপর?
জিজ্ঞেস করি, ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন? তিন নেতাই বললেন, এখানে মারামারি-কাটাকাটি নেই। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদে তাঁরা একযোগেই কাজ করছেন। উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। তিনি সব বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যানও বিএনপির। মির্জা ফয়সাল আমিন। মির্জা ফখরুলের ভাই। স্থানীয় অনেকের অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান বিএনপিদলীয় বলে সরকার বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে। কাবিখা, জিআর, কর্মসৃজন কর্মসূচি ইত্যাদির অর্থও ঠিকমতো দেওয়া হয় না। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় সরাসরি ইউএনওর তত্ত্বাবধানে। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধির ভূমিকা নেই।
পাঠক সংবাদপত্রে যা দেখতে চান
বিএনপির অফিস থেকে আমরা যাই খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ে। স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক সংগঠন। এখানে আড্ডা দিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, জাকের পার্টির তরুণ নেতারা যেমন আসেন, তেমনি আসেন সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী ও ক্রীড়াবিদও। আলোচনায় অনিবার্যভাবে উঠে আসে রাজনীতি, নির্বাচন। যে যাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী কথা বলেন। আবার কেউ কেউ দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত মতও প্রকাশ করেন। তাঁরা চান সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। আওয়ামী লীগের নেতা গোলাম ফারুক রুবেল জোর দিয়ে বললেন, আগামী নির্বাচন ২০১৪-এর মতো হবে না। বিএনপিকে নিয়েই ভোট হবে।
তঁারা কথা বললেন, প্রথম আলো নিয়েও। আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, প্রথম আলো ভালো পত্রিকা। কিন্তু মাঝেমধ্যে বিরোধী দলের প্রতি পক্ষপাত দেখায়। তাঁর পাশের চেয়ার থেকে একজন প্রতিবাদের সুরে বললেন, ‘কথাটি ঠিক নয়। বিএনপির আমলে বিএনপির নেতারাও একই কথা বলতেন। প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করছে। আমি বলব, কঠিন সময়ে সঠিক পথে আছে।’ তাঁদের সবার দাবি, ঠাকুরগাঁওয়ের খবর বেশি বেশি থাকতে হবে; বিশেষ করে সরকারি প্রকল্প নিয়ে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়, রাস্তাঘাটের কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না, সেগুলোর খবর তাঁরা প্রথম আলোয় দেখতে চান। কলেজশিক্ষক মাজেদুর রহমান একটি গুরুতর সমস্যার কথা বললেন। সরকার আইটি বিষয়ে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে চায়। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়, তাদের বেশির ভাগই তো বাংলা বা ইংরেজি কোনো ভাষাই ভালো করে জানে না। তাহলে আইটি শিখবে কীভাবে?
লড়াই হবে সমানে সমান
স্থানীয় দুই দলের নেতা-কর্মীরাই মনে করেন, সদর আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিএনপির প্রার্থী হবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আওয়ামী লীগের বর্তমান রমেশ চন্দ্র সেন, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। বিএনপিতে দ্বিতীয় কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা না ভাবলেও আওয়ামী লীগে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী আছেন। ঠাকুরগাঁও সদর আসনে ভোটার ৪ লক্ষাধিক। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট ১ লাখ ২০ হাজার। সুতরাং এখানে সংখ্যালঘু ভোট যাঁর দিকে যাবে, তিনিই জয়ী হবেন। আওয়ামী লীগের ভরসা সংখ্যালঘু ভোট। আর বিএনপির মির্জা ফখরুলের ব্যক্তি ইমেজ।
এরপর আমরা যাই উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা অরুণাংশ দত্ত টিটুর অফিসে। সেখানে বাস্তুহারা লীগের কয়েকজন নেতা এসেছেন, তঁার সঙ্গে শুভেচ্ছা জানাতে। নির্বাচন নিয়ে তাঁর সঙ্গেও কথা হয়। জানান, গত কয়েক বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে অনেক উন্নয়নকাজ হয়েছে। তার আগে বিএনপির আমলে কোনো কাজই হয়নি। সরকারের উন্নয়ন দেখেই মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। সাংবাদিক বন্ধুরাও স্বীকার করলেন, বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগের আমলে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা মির্জা ফখরুলের নামে এককাট্টা। কিন্তু আওয়ামী লীগে বিরোধ আছে। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জিতেছেন দলের জনপ্রিয়তার জোরে নয়; আওয়ামী লীগের বিভেদের কারণে।
ঠাকুরগাঁওয়ে তিনটি নির্বাচনী এলাকা। সদরে রমেশ চন্দ্র সেন, বালিয়াডাঙ্গীতে দবিরুল ইসলাম এবং আরেকটিতে জাসদের নেতা ইয়াসিন আলী। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দুটি আসন থেকে দাঁড়াতে পারেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কেননা বালিয়াডাঙ্গীতে বিএনপির ভালো কোনো প্রার্থী নেই। সেখানে সাবেক সিপিবি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা দবিরুল ইসলাম ছয়বার নির্বাচিত। রমেশ চন্দ্র সেনের রেকর্ডও তা-ই।
আগামী সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওবাসী কার পক্ষে রায় দেন, তা দেখার জন্য হয়তো ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com