মতামত

মাতৃত্বের মহিমা ছুঁয়ে যাক পিতৃত্বকে

‘নারীত্বের পূর্ণতা মাতৃত্বে’ কথাটি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আমার অভিজ্ঞতা বলে, মাতৃত্বের এই সংজ্ঞা গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে মা হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত হতে পারি না। যে নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মা হতে পারেননি, তিনি কি তাহলে পূর্ণাঙ্গ নারী নন?

মাদার তেরেসাকে মা হয়ে উঠতে কিন্তু গর্ভধারণ করতে হয়নি। অথচ তাঁর নামের সঙ্গে কী অদ্ভুত নির্ভরতায় ‘মাদার’ বা ‘মা’ শব্দটি যোগ করা হয়! গর্ভধারণ না করেও মাতৃহৃদয়ের আলোয় উদ্ভাসিত মহীয়সী এই নারী তাঁর কোলে আশ্রয় দিয়েছেন অগণিত অসহায় শিশুকে। তিনি পুরো বিশ্বকে জানিয়েছেন, গর্ভধারণ না করেও মা হয়ে ওঠা যায়। মাতৃত্ব আর পিতৃত্ব সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত কিছু কর্তব্যের সমাহার বৈ তো কিছু নয়। তাই একজন বাবাও কিন্তু হয়ে উঠতে পারেন মা, যেমন একজন মা হয়ে উঠতে পারেন বাবা।

সত্যি কথা বলতে কি গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান আরÍ স্তন্যপান করানোর প্রক্রিয়াটি বাদ দিলে ‘মা’ হয়ে উঠতে দুখানি হাত আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটি অন্তর ছাড়া অন্য কিছুর প্রয়োজন হয় না। তবে সেই ধারণাও কিন্তু সর্বজনীন নয়। শারীরিকভাবে অক্ষম নারীটিও কিন্তু মাতৃত্বের কর্তব্য পালন করেন তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর ভালোবাসার আহ্বানে।

মাতৃত্ব নিয়ে এক অপরিসীম ভালো লাগা আছে আমার মনে, কিন্তু এই অনুভূতির অতিরঞ্জিত প্রকাশ নিয়ে কিছুটা দ্বিমত আছে। সন্তানধারণ ও জন্মদান একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যা নিঃসন্দেহে প্রকৃতি দ্বারা নির্ধারিত। সমাজ মা হিসেবে একজন নারীকে অতিমানবী করে চিত্রিত করতে অভ্যস্ত, যিনি কিনা সন্তানের স্বার্থে নিজেকে নিঃস্ব করে দেবেন। মা যেন এক স্বর্গের দেবী, জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি ভালোবাসা, সেবা আর ত্যাগের এক আদর্শ প্রতিমূর্তি।

প্রশ্ন হলো, মা হিসেবে নারীর এই কাঙ্ক্ষিত রূপ কি শুধুই প্রকৃতিপ্রদত্ত নাকি এখানেও আছে একধরনের সামাজিক চাপ আর ÿক্ষমতার রাজনীতির মারপ্যাঁচ? নারীকে মা হিসেবে অতিমানবী করে তোলার সামাজিক প্রক্রিয়াটি কিন্তু ভয়ংকর। এ প্রক্রিয়ায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় পরিবার আর সমাজের প্রত্যাশার ভার। একই সামাজিক কাঠামোতে বেড়ে ওঠা নারীরাও বুঝে উঠতে পারেন না মহত্ত্বের মোড়কে মাতৃত্বকে ঢেকে কী এক কঠিন দায়িত্ব পালনের শৃঙ্খলে তাঁদের বেঁধে ফেলা হয়। নিজের অজ্ঞাতেই তাঁরা নেমে পড়েন অসাধারণ মা হওয়ার যুদ্ধে। সন্তানকে বড় করে তোলার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের দায়বদ্ধতা যেন অনেকটাই মায়ের একার! মজার ব্যাপার হলো যে নারীকে সংসারে তাঁর অযোগ্যতার জন্য পদে পদে চড়-থাপ্পড় খেতে হয়, অপমানিত হতে হয়, তাঁকে কিন্তু আবার সুযোগ্য মা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য নেই সমাজের। তাই সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম এবং প্রধান কর্তব্যটি বর্তায় মায়ের কাঁধে। আবার সন্তান বখে গেলে সেই দায়ভারও কিন্তু নারীর!

কোনো শিশু পৃথিবীতে মা কিংবা বাবা হিসেবে জন্ম নেয় না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ তাকে জানিয়ে দেয় মা আর বাবার কর্তব্যের বিষয়টি। সমাজ দ্বারা নির্ধারিত নারীর এই মাতৃরূপ কি শুধু নারীর জীবনকেই কর্তব্যের ভারে জর্জরিত করেছে? পুরুষ কি এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। সমাজ দ্বারা নির্ধারিত বাবার প্রচলিত রূপটির প্রভাবে স্নেহশীল পিতৃহৃদয় মাতৃহৃদয়ের মতো মহিমান্বিত হয়ে উঠতে পারেনি। তাই ইচ্ছা থাকলেও অনেক পুরুষ মাতৃরূপে সন্তানের সামনে আবির্ভূত হতে পারেননি। অধিকাংশ সন্তান জেনেছে সংসারে পিতারÿ ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির কথা। অন্যদিকে মাকে তারা চিনেছে মহানুভবতা আর বিসর্জনের প্রতিমূর্তি হিসেবে। পিতাও যে সন্তানের কাছে ত্যাগ আর নির্ভরতার এক আদর্শ ছবি হয়ে উঠতে পারেন, তা সন্তানের সামনে তুলে ধরতে অধিকাংশ পুরুষই ব্যর্থ হয়েছেন। সভ্যতা পুরুষকে চিনিয়েছে কঠোর আর কঠিন হিসেবে। তাই মা হিসেবে নারী যেভাবে মহিমান্বিত হয়েছেন, ‘বাবা’ হিসেবে পুরুষ সেভাবে মহিমান্বিত হননি। এই চর্চার আড়ালে অনেক বাবার ত্যাগ আর কষ্টের কাহিনি চাপা পড়ে গেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সমাজে ‘রত্নগর্ভা’ বা এ ধরনের কিছু পুরস্কারের প্রচলন থাকলেও সফল পিতৃত্বের জন্য কিন্তু কোনো পুরস্কারের প্রচলন করা হয়নি। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নারীকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার কর্তব্যের আহ্বানে যেভাবে অনুপ্রাণিত করা হয়, পুরুষকে তাঁর কর্তব্য পালনে সেভাবে অনুপ্রাণিত করা হয় না। অথচ নিবিড়ভাবে সন্তান লালন-পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরুষের মানবিক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায় এবং এ প্রক্রিয়ায় নির্যাতক হিসেবে পুরুষের আত্মপ্রকাশ করার প্রবণতাও কমে যায়। তাই কর্তব্য পালনের এই শ্রেণিবিভাজন একজন পুরুষের মানবিক হয়ে ওঠার পথে একটি বড় অন্তরায়।

লক্ষ করার মতো আরেকটি দিক হলো নারীর উপস্থিতিতে পুরুষের মায়ের ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে সমাজের কার্পণ্য থাকলেও নারীর অনুপস্থিতিতে পুরুষের মাতৃরূপকে কিন্তু উদারভাবেই মেনে নেয় সমাজ। এ সমাজে মাতৃহারা কত শিশুই তো পিতার কোলে মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠেছে। ফলে প্রমাণিত হয়, অনুকূল সামাজিক পরিবেশে পুরুষও পূর্ণ মাতৃরূপে আবির্ভূত হতে সক্ষম। অনুকূল সামাজিক পরিবেশে একজন বাবা যেমন মায়ের কর্তব্য পালন করতে সক্ষম, ঠিক একইভাবে একজন মা–ও বাবার কর্তব্য পালন করতে সক্ষম। তাই প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পরিবর্তিত বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মাতৃত্ব আর পিতৃত্বের ওপর আরোপিত দায়িত্বের এই সীমারেখা ভেঙে ফেলতে হবে। মাতৃত্ব আর পিতৃত্বকে কোনো সীমাবদ্ধ সংজ্ঞায় ও গণ্ডিতে আমরা আর আবদ্ধ না করে ফেলি। ‘নারীত্বের পূর্ণতা মাতৃত্বে’—এমন ধারণা পরিবর্তনের সময় হয়েছে এখন। বরং মনুষ্যত্ব পরিপূর্ণতা লাভ করুক মানবিকতায় আর কর্তব্যবোধের পূর্ণ বিকাশে।

নিশাত সুলতানা : লেখক ও গবেষক

purba_du@yahoo. com