বাঘা তেঁতুল

রামপাখির আন্ডা সমাচার

মুরগির আরেক নাম রামপাখি। ডিমের অপর নাম আন্ডা। পাখি প্রজাতির মধ্যে মুরগি আকারে কিছুটা বড় বলে সম্ভবত একে রামপাখি বলা হতো। যেমন বড় আকারের দাকে বলা হয় রামদা, যা এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মাঝেমধ্যেই প্রচুর দেখা যায়। ছাগলের মধ্যে যেগুলো বড়, তাকে বলে রামছাগল। মানুষের মধ্যে যারা বড় রকমের বেকুব, তাদেরও ডাকা হয় রামছাগল বলে। যে জিনিস গোল তা অন্ড। ডিম গোলাকার বলে তার নাম আন্ডা। হাজার হাজার বছর ধরে মুরগি ডিম দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব ডিম দিবসে আন্ডা নিয়ে যা ঘটে গেল বিশ্বে তা এক নতুন রেকর্ড। এবং সে রেকর্ড সৃষ্টি হলো বাংলার মাটিতে ও তেজগাঁও-ফার্মগেটে। অবশ্য ও জিনিস বাংলার মাটি ছাড়া অন্য কোথাও ঘটতেই পারে না।

সেদিনের ঘটনাটির কারণে এবং ডিম ও তেজগাঁও-ফার্মগেট শব্দগুলোর কারণে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। ৬২-৬৩ বছর আগের কথা। আবু হোসেন সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী, লোকে বলত প্রধানমন্ত্রী, কাগজেও লেখা হতো। শেরেবাংলা ফজলুল হক গভর্নর। মুসলিম জাতীয়তাবাদী দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সরকার। তখন ঢাকা আর তেজগাঁও-ফার্মগেট দুই জিনিস। আমি আব্বার সঙ্গে ঢাকা থেকে প্রথম তেজগাঁও যাই ট্রেনে। লালবাগ জগন্নাথ সাহা রোড থেকে রিকশায় ফুলবাড়িয়া স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেনে তেজগাঁও স্টেশন। তারপর ঘোড়ার গাড়িতে আওলাদ হোসেন মার্কেটের কাছে আমাদের আত্মীয়ের বাড়ি। ঘন গাছপালাবেষ্টিত প্রাকৃতিক পরিবেশে দিন দুই ছিলাম। তেজগাঁও বিমানবন্দরের একেবারে ভেতরে ঢুকে দেখেছিলাম উড়োজাহাজ। একদিন ঘুরে দেখেছিলাম তেজগাঁও কৃষিফার্ম। তা থেকেই নামকরণ ফার্মগেটের। কৃষিফার্মের কর্মকর্তা স্নেহবশত আমাকে ফার্মের মুরগির চারটি ডিম দিয়েছিলেন। বড় আকারের লাল ডিম। সেকালে ওই ডিম দুর্লভ ছিল। ওই চার ডিম দেশি মুরগির সঙ্গে তা দিয়ে অনেক মুরগি করেছিলাম।
এখন সাভার, আশুলিয়া, উত্তরা বা কামরাঙ্গীরচর থেকে খামারবাড়িতে ডিম কিনতে আসা যত
সহজ, ৬২ বছর আগে লালবাগ থেকে তেজগাঁও যাওয়া অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ছিল। বিশ্ব ডিম দিবসের আগে প্রবলভাবে প্রচার করা হয়েছিল ওই দিন খামারবাড়ি থেকে ডিম বিক্রি হবে। জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম কিনবে পারবেন। প্রতিটি ডিম ৩ টাকা, যখন বাজারে ৮ টাকার নিচে ডিম পাওয়া যায় না। সুতরাং ডিম দিবসের আগের রাতে অনেকেরই ঘুম হয়নি।
ভোর হওয়ার আগেই অনেকে রওনা দেন খামারবাড়ির উদ্দেশে। কেউ সাভার থেকে, কেউ আশুলিয়া, কেউ যাত্রাবাড়ী, কেউ মুগদা বা মেরাদিয়া থেকে। কারও হাতে প্লাস্টিকের বালতি, কারও হাতে গামলা, কেউ নিয়ে আসেন ঝুড়ি বা বাঁশের খাঁচি। কারও হাতে পলিথিন বা পাটের থলে। সকাল ১০টা থেকে ডিম বিক্রির কথা ছিল, কিন্তু ৮টার মধ্যেই এক কিলোমিটার জায়গা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সব বয়সী নারী-পুরুষ। কেউ হতদরিদ্র নয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। ৯০টি ডিম ২৭০ টাকা দিয়ে কেনার সামর্থ্য বস্তিবাসীর থাকার কথা নয়। মাত্র একটি জায়গা থেকে এত কম দামে ৯০টি ডিম বিক্রির বুদ্ধি যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছিল, তিনি পাকা লোক বটে।
ডিম ক্রেতাদের অনেকেই হয়তো বাড়িতে বলে এসেছিলেন পেঁয়াজ, রসুন, শুকনা মরিচ বেটে রাখতে। ছুটির দিন। দুপুরে ডিমের কারি বা কোর্মা হবে। কারও ইচ্ছা ছিল ডিমের হালুয়া বানাবেন। অনেকে বহুদিন পুডিং খাননি। ৯০টি ডিম থেকে সাত-আটটি দিয়ে পুডিং হবে।
সেদিন ডিম ক্রেতাদের জনসমুদ্র যদি কোনো বিদেশি পর্যটক দেখে থাকেন, তাঁর বদ্ধমূল ধারণা হবে বাঙালি বহুদিন ডিমের স্বাদ পায়নি। আজ তারা ডিম খাবে। সরকার তাদের ডিম খাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
ডিমের খদ্দেররা সম্মানিত ব্যক্তি। যেমন-তেমনভাবে সরকারের কর্মকর্তারা তাদের হাতে ডিম তুলে দিতে পারেন না। সুদৃশ্য মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। যেন কারও বউভাত। বিচিত্র ব্যানারে ভরে গিয়েছিল সমগ্র এলাকা। নির্দিষ্ট সময়ের দুই ঘণ্টা আগেই বিক্রি শুরু হয়। তবে ৯০টি নয়, ২০টির প্যাকেট। তিন ঘণ্টা ঠাঠা রোদে দাঁড়িয়ে প্রায় সবারই ব্রহ্মতালু গরম হয়ে গিয়েছিল। ৯০ থেকে ২০-এ নামার কথা শুনে সে মাথা ঠান্ডা থাকতেই পারে না। মাত্র দুজন কেনার পরই শুরু হয় মহাযুদ্ধ। ভেঙে পড়ে ডিমমঞ্চ। ডিমও না ভেঙেই পারে না। আমরা রাজনৈতিক দলের সভামঞ্চ ভাঙচুর দেখতে অভ্যস্ত, এবার দেখলাম ডিমমঞ্চ চুরমার। রাজনৈতিক দলের স্লোগান শুনে অভ্যস্ত, এবার ডিমের নামে উচ্চারিত হলো স্লোগান, ‘আর কোনো দাবি নাই—ডিম চাই ডিম চাই’, ‘ধর ধর—ডিম চোর ডিম চোর’ প্রভৃতি।
যেখানে বঙ্গসন্তানের সমাবেশ আছে, সেখানে পুলিশের আবির্ভাব না ঘটেই পারে না। আয়োজক সংগঠনের কর্তাব্যক্তি ও সহযোগী সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জীবন রক্ষার্থে লাঠ্যাষুধি প্রয়োগ না করে উপায় ছিল না। লাঠিচার্জের সময় অনেকে হারিয়েছে তার স্যান্ডেল। মারামারিতে কারও শার্ট বা পাঞ্জাবি ছিঁড়ে গেছে। ডিম ছোড়াছুড়িতে অনেকের কাপড়চোপড় নষ্ট হয়েছে। পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন কেউ কেউ।
বাঙালি অতীতের নানা রকম বিদ্রোহ দেখেছে। নীল বিদ্রোহ, পাগল বিদ্রোহ, এবার দেখল ডিম বিদ্রোহ। অনেকে ক্ষোভে তাঁর হাতের বালতি আছড়ে ভেঙে ফেলেন, কেউ ডিম মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেন। এক খদ্দের বললেন, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে ডিম পেয়েছিলাম ১২টা। কে যেন এসে থাবা মেরে আমার ডিমগুলো নিয়ে দৌড় দিয়েছে।’
এত দিন জাকাতের কাপড় বিতরণের সময় পদদলিত হয়ে মানুষ মরেছে, এখন থেকে ডিম দিবসে পদদলিত ও মার খেয়ে মরবে ডিম ক্রেতারা। ডিম সমাচারে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে তা হলো:
এক. সংগঠকদের আক্কেলের অভাব;
দুই. কোনো কিছু সস্তায় কেনার কথা শুনলে বাঙালির হিতাহিত জ্ঞান থাকে না;
তিন. মারামারির সংস্কৃতিতে অর্থাৎ যেকোনো উপলক্ষে অন্যকে মার দেওয়া ও নিজে মার খাওয়াই বাঙালির বৈশিষ্ট্য এবং
চার: নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হয়েছি, কিন্তু নিম্নমধ্য আয়ের মানুষ বাজারের দামে ডিম কিনে খেতে পারছে না। এক শ টাকা বাঁচাতে চার ঘণ্টা আশ্বিনের ভ্যাপসা রোদে বসে থাকে।
বিশ্ব ডিম দিবসের নাটক থেকে শুধু আয়োজক সংগঠন নয়, অন্যান্য সংগঠন যারা বিভিন্ন দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করে তারা যদি শিক্ষা নেয় তাহলে মানুষ দুর্ভোগের হাত থেকে কিছুটা রেহাই পাবে।

 সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।