
গত ৫ সেপ্টেম্বর শিনচিয়াংয়ের কাশগর, যার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম, সেই শহরে শত বছরের প্রাচীন একটি চায়ের দোকানে চা পান করছিলেন ১৩ দেশের ২৩ সাংবাদিক। বনেদি কাঠের পাটাতনের দ্বিতল দোকানটি প্রাচীনকালের এশিয়ান হর্স টি রোড ছুঁয়ে আছে। দোকানটির জৌলুশ ঠিকরে পড়ছে। প্রাচীনকালের সিল্ক রুটের অংশ হিসেবে এই সড়ক বাংলাদেশেও পৌঁছেছে। গত নভেম্বরে দক্ষিণ ইউনানের মিয়ানমার সীমান্ত লাগোয়া পুইয়ারে হর্স টি রোডের শুরুতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রাচীনকালে ঘোড়সওয়ারিরা চা বয়ে বার্মা হয়ে বাংলাদেশেও পৌঁছেছিল।
পুইয়ার থেকে কাশগর সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি। কিন্তু সিল্ক রুটেরই অংশ। সেদিন ওই দোকানে স্থানীয়দের মধ্যে যাঁরা চা পান করছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। তাঁরা চীনা ভাষায় কথা বলেন না। বলেন উইঘুরে। আমার প্রশ্ন ও তার উত্তরও তাই তিন ভাষায় তরজমা হচ্ছিল। অবশ্য ‘আসসালামু আলাইকুম’ বললে আর কথা নেই। দরাজ কণ্ঠে, অমায়িক হাসিতে প্রত্যুত্তর মিলেছে: ওয়ালাইকুমআস্লাম। নারী-পুরুষে কোনো তফাত নেই। আমি খুব আস্থা নিয়ে উইঘুরদের সঙ্গে সালাম বিনিময় করেছিলাম।
দুই হাজার এক শ বছরের প্রচীন নগরী কাশগরই হলো বহুল আলোচিত সিল্ক রুটের অন্যতম মুখ্য রুট। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ—এককথায় অবশিষ্ট বিশ্বের সঙ্গে সড়কপথে সেতুবন্ধ স্থাপনে চীনের সিংহদ্বার হলো কাশগর। আবার ইসলাম, চীনা, ভারতীয় ও গ্রিক-রোমান—বিশ্বের এই চার প্রধান সাংস্কৃতিক সভ্যতা শিনচিয়াংয়ে একত্রে মিশেছে। তাই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শিনচিয়াংকে উন্নয়নে ভাসিয়ে নেওয়াটা হয়ে পড়েছে বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার। অনগ্রসর উইঘুর সমস্যার সুরাহা যে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়; রাজনৈতিক—সেটা চীনা নেতারা সম্প্রতি বিবেচনায় নিয়েছেন। তাই তাঁরা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার মন্ত্র কবুল করেছেন। প্রদেশটির পাবলিসিটি প্রধান শুয়েজুন বললেন, ‘আমরা ধর্মের নৈর্ব্যক্তিক আইন (অবজেকটিভ ল অব রিলিজিয়ন) এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের পরামর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকছি। প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে যে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না, তা বুঝেছি । আদর্শগত, সাংস্কৃতিক, লোকাচারসংশ্লিষ্ট, ধর্মীয় ও সন্ত্রাস–বিষয়ক সমস্যা সুরাহায় পাঁচটি মুখ্য কর্মকৌশল নেওয়া হয়েছে।’ খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটা প্রাদেশিক সরকারের সিদ্ধান্ত; কেন্দ্র থেকে নাজেল হয়নি।
দুই কাশগরির সঙ্গে অল্পবিস্তর কথা হলো। তাঁরা ফুলের পাপড়িসদৃশ চা পান করছিলেন মিছরি দিয়ে। কারও চোখেমুখে তাড়াহুড়ো ছিল না। প্রবীণদের ভিড়টাই বেশি। ইসলাম রাজি, বয়স ৮৪। তিনি এই প্রতিবেদকের নোটবুকে উইঘুর ভাষাতেই নিজের নাম লিখলেন। বয়সটা লিখলেন ইংরেজিতে। আরেকজন হলেন আহাত অবুল, বয়স ৬০। তিনি নিজের নাম ইংরেজিতেই লিখেছেন। তাঁরা উভয়ে বলেন, হিংসা বা বিচ্ছিন্নতায় তাঁদের সমর্থন নেই। তাঁরা শান্তিপূর্ণ জীবন ও উন্নয়নে বিশ্বাস করেন। তবে প্রশ্নের জবাবে তাঁরা মাথা নাড়ালেন যে, কিছু বিক্ষোভকারী তাঁদের চেনাজানা।
১৯৫৫ সালে চীন শিনচিয়াংয়ে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল জাতিগত সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও সংস্কৃতিগত সংবেদনশীলতা বজায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ৩১ আগস্ট শিনচিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচিতে পৌঁছার পরে চোখে পড়ল ইউরোপীয় কায়দায় আকাশ ছোঁয়া দালানকোঠা। উরুমচিতে প্রাচীন বাড়িঘর চোখে পড়ল না। তদুপরি খুব ভালো করে তাকালে মুসলিম ঐতিহ্যের ছাপ চোখে পড়ে। কিন্তু উরুমচি থেকে ১ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার দূরের পুরান কাশগর (পুরান ঢাকার মতো) মুসলিম স্থাপত্যের আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবেই দাঁড়িয়ে আছে। শিনচিয়াংয়ে মেয়েদের হিজাব পরা নিষিদ্ধের খবর পড়েছি। কিন্তু আমি তো উরুমচি, শানচি ও কাশগরের কোথাও হিজাব বা স্কার্ফ ছাড়া কাউকে দেখিনি। এমনকি কাশগরে মধ্যরাতের পরে বন্ধুদের সঙ্গে চলাচলরত স্কার্ট পরা রমণীকেও হিজাব পরিহিত দেখলাম।
কাশগর ও খোতান এই দুটি কাউন্টিতেই ১৪ হাজার মসজিদ ও ১৬ হাজার মুফতি আছেন। শিনচিয়াং ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বড় ধরনের শিরোনাম তৈরি করে। কারণ, মুসলিম-হান দাঙ্গায় ২০০ লোক নিহত হয়। এর দায়ে বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও উইঘুর ভিন্নমতালম্বী তোহতির যাবজ্জীবন জেল হয়েছে। বারাক ওবামা এর সমালোচনা করেছিলেন। গত বছর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উরুমচি অবস্থানকালে বোমা হামলার ঘটনায় আটজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এর পরে আরও কয়েকটি সহিংস হামলায় অন্তত ৩৯ জন প্রাণ হারান। সন্ত্রাসের দায়ে ৪৫ ব্যক্তির চার বছর থেকে যাবজ্জীবন মেয়াদে জেল হয়েছে। নিষিদ্ধ পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামি মুভমেন্ট ও তালেবানের দলে যোগদান চেষ্টার দায়ে কাশগরের পাঁচ ব্যক্তির ৮ থেকে ১০ বছরের জেল হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে উইঘুরদের রাজপথের প্রতিবাদ বেশি ছিল। সেতু ও সড়ক নির্মাণের মতো কিছু বিষয়ে কয়েক মাস আগের একটি সমাবেশের কথা প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেন কাশি মিউনিসিপ্যাল সরকারের তথ্য বিভাগের কর্মকর্তা ঝান কাই। তবে অভিযোগ হলো উন্নত চাকরিতে হানদের প্রাধান্য, উইঘুররা বৈষম্যের শিকার। আর সরকারি ভাষ্য হলো, ২০১০ থেকে তারা উইঘুরদের জীবনমান উন্নতকরণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে একজনেরও কর্মসংস্থান না থাকা এমন ৪৩ হাজার ৮০০ পরিবারের জন্য ৫০ হাজারের বেশি চাকরি সৃষ্টি করা হয়েছে। স্বায়ত্তশাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকর না থাকলে এ রকম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না। তাই মডেল আমদানি করতে চাইলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেকেই তা নিতে পারে। প্রদেশটির সোয়া ২ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ইতিমধ্যে বিমাকৃত।
দেড় কিলোমিটার বিস্তৃত পুরান কাশগর, যেখানে সেই বিখ্যাত মোল্লা নাসিরুদ্দিনের বাসস্থান, সেখানে দেখলাম সরকারি খরচে জনগণের বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার কীর্তি। ৭০ হাজার উইঘুরের সাড়ে ২৬ হাজার বাড়ি মুসলিম স্থাপত্য মেনে সংশ্লিষ্ট বাড়ি মালিকের সম্মতিতে নির্মিত হয়েছে। ভালো লাগল দেখে অধিকাংশই তাদের প্রাচীন বাড়ির ডিজাইন অবিকল বজায় রেখেছেন। প্রাচীন বাড়ির ছবি ও নতুন বাড়ির ছবিও বাঁধাই করা আছে। তবে তা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিবেচনায় নয়, প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ-সংযোগও সরকারের। কেবল তারা বিল শোধ করেন। এসব বাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ে আবার তারা স্বাধীন। এক গৃহিণী বললেন, এ বাড়ির বংশধরেরা এখানে ৩০০ বছর ধরে আছে।
প্রদেশটির নাগরিকদের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ৬০০ ডলার, যা বাংলাদেশিদের চেয়ে চার গুণ বেশি। তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হলো সেরা মাপকাঠি। শিনচিয়াংয়ের স্বায়ত্তশাসনের কান্ডারিদের অভিনন্দন জানাই। কারণ, তারা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু ভর্তুকি ৪ হাজার টাকার বেশি করেছে, যা চীনের অন্যত্র নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগামীর হার ৯৮ ভাগের বেশি। ‘প্রাক-স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা’ চলছে সরকারি খরচে। দুই ভাষায় প্রি-স্কুল শিক্ষার হার ৯০ ছুঁই ছুঁই। আর উইঘুর অধ্যুষিত দক্ষিণ শিনচিয়াংয়ের চারটি প্রিফেকচারে (জেলার মতো) সবার জন্য ১৪ বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষাপদ্ধতি সম্প্রতি চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ জরুরি ত্রাণ এবং গৃহায়ণ ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি জোগান দিচ্ছে সরকার। পশ্চিমা মিডিয়া যদি এসব বিষয় উল্লেখ বা খণ্ডন করে শিনচিয়াংকে চিত্রায়িত করে, তাহলে সেখানকার পরিস্থিতি বুঝতে বিশ্ববাসীর সহায়ক হবে। কিন্তু বাস্তবে তার একটা বেশ ঘাটতি চলছে।
আগামীকাল: সিল্ক রুটের পুনরুত্থান অবশ্যম্ভাবী
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com