মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশে জ্বালানি–সংকট তৈরি করেছে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশে জ্বালানি–সংকট তৈরি করেছে

মতামত

বিদ্যুতের দাম বাড়বে না, কিন্তু ভর্তুকি কমবে—উপায় কী

নির্বাচনের পরপর বর্তমান সরকার আগামী অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর কথা বলেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় জনজীবনে সংকট তৈরি হয়েছিল। সম্ভবত এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকারের দিক থেকে দাম না বাড়িয়ে সংকট সমাধানের উপায় বের করার কথা বলা হয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার কি সেই অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে যাচ্ছে? সরকার বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণে ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৭ দশমিক ৮ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। খুচরার পাশাপাশি পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও তৈরি করা হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগের পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে সরকারি ব্যয়ের বোঝা কমানো ও আইএমএফের শর্ত পূরণের কথা আসছে। কিন্তু ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র উপায় নয়, উৎপাদন খরচ কমিয়েও ভর্তুকি কমানো যায়। তা ছাড়া এই ভর্তুকির অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তার যৌক্তিকতা কতটুকু, এই প্রশ্নেরও সুরাহা প্রয়োজন।

ভর্তুকি কমাতে হলে প্রথমে দেখতে হবে ভর্তুকি কেন দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি দিতে হচ্ছে কারণ, আমদানিনির্ভর ও ব্যয়বহুল জ্বালানিভিত্তিক বেসরকারি মালিকানার বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে পিডিবিকে। এই সমস্যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগেও ছিল, যুদ্ধের কারণে ভর্তুকির চাপ আগের চেয়ে আরও বেড়েছে কেবল।

ভর্তুকির অর্থের একটা বড় অংশ আবার ব্যয় হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের পেছনে। জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ সারা বছর অব্যবহৃত থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ না কিনলেও চুক্তি অনুসারে বিদ্যুতের একক ক্রেতা হিসেবে পিডিবি কর্তৃক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়া দিতে হয়। প্রতিবছর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এই ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদানের পরিমাণ এবং সেই সঙ্গে বেড়েছে পিডিবির লোকসান। আর সেই লোকসান কমানোর কথা বলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু লোকসান ও ভর্তুকি কমেনি। বরং বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।

কাজেই ভর্তুকি কমানোর জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কোনো টেকসই পথ নয়। টেকসই সমাধান করতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এই উৎপাদন খরচ কমাতে হলে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অসম চুক্তিগুলো সংশোধন করে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথা বলা যেতে পারে। পাকিস্তানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ ও আমদানি করা ব্যয়বহুল জ্বালানি সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দেশটি সম্প্রতি বেশ কতগুলো উদ্যোগ নিয়ে এই সমস্যার সমাধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

এমনিতেই লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। সরকার জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বললেও বাস্তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি দিতে পারছে না। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কৃষকেরা সেচের ডিজেলের জন্য হাহাকার করছেন। সরকার ইতিমধ্যে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জ্বালানির পাশাপাশি বিদ্যুতের বাড়তি দামের প্রভাব বহুমাত্রিক প্রভাব আকারে গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে, মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে আইপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন: সরকার ছয়টি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী আইপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে এবং ১৬টি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সংশোধন করে টেক-অ্যান্ড-পে মডেলে রূপান্তর করেছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জ হ্রাস করেছে। ডলারের বদলে রুপিতে বিদ্যুতের দর নির্ধারণ: বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্রয় চুক্তি সংশোধন করে বিদ্যুতের মূল্য ডলারের বদলে রুপিতে রূপান্তর করেছে। রিটার্ন অন ইকুইটি কমানো: রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রিটার্ন অন ইকুইটি বা বিনিয়োগের বিপরীতে আয়ের হার ৩০ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এ জন্য পাকিস্তান সরকার আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বলেছে তোমরা হয় বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সংশোধনে রাজি হও, নাহলে চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করে দেব অথবা ফরেনসিক অডিট করব। এতেই কাজ হয়েছে। শুধু ১৪টি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি রুপি সাশ্রয় হয়েছে।

এ ছাড়া দেশটি দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমিয়েছে। বিশেষ করে সোলার প্যানেল আমদানির ব্যয় হ্রাস ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ায় দেশটিতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এ পর্যন্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তান।

বাংলাদেশেও আইপিপিগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন করে, চুক্তিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জের বদলে ‘টেক অ্যান্ড পে’ মডেলে কনভার্ট করে, বিদ্যুতের দাম ডলারের বদলে টাকায় নির্ধারণ করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানো সম্ভব। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সে রকম কিছু বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ আইনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে সেই কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয় ও বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার সমস্যার কথা তুলে ধরেছে। কমিটি বলেছে, এসব চুক্তির মাধ্যমে ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাজারদরের চেয়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কমিটির হিসাবে, অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বছরে ৯০ কোটি থেকে ১১৫ কোটি মার্কিন ডলার বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

এই সমস্যা সমাধানে কমিটির সুপারিশ হলো, যেসব চুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ ব্যয় ও বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তিগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে আবার আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান বিএনপি সরকারের উচিত ছিল দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত চুক্তিগুলো বাতিল বা সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয় হ্রাসের এসব উদ্যোগ নেওয়া আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ উদ্দেশ্যে মন্ত্রিসভা কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠন করাই স্বাভাবিক হতো। তা না করে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তটি যথাযথ হয়নি।

এমনিতেই লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। সরকার জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বললেও বাস্তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি দিতে পারছে না। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কৃষকেরা সেচের ডিজেলের জন্য হাহাকার করছেন। সরকার ইতিমধ্যে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জ্বালানির পাশাপাশি বিদ্যুতের বাড়তি দামের প্রভাব বহুমাত্রিক প্রভাব আকারে গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে, মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

কাজেই সরকারকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সহজ কিন্তু অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি উৎপাদন খরচ কমানোর তুলনামূলক কঠিন কিন্তু টেকসই রাস্তা বেছে নেবে।

  • কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক। নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা

  • মতামত লেখকের নিজস্ব