সংসদ অধিবেশন
সংসদ অধিবেশন

সারফুদ্দিন আহমেদের রম্যকথন

প্রধানমন্ত্রী না থাকিলে এমপির কেন মন খারাপ

তারেক রহমান মহোদয় তখনো প্রধানমন্ত্রিত্বের ‘সিংহাসনে’ আরোহণ করেন নাই; তথাপি তাঁহার পদপদ্মে প্রণতপ্রাণ প্রার্থীদের কদমবুসি-প্রবণতা প্রকাশ পাইতে আরম্ভ করিয়াছিল। ক্ষমতার কলস তখনো পূর্ণ হয় নাই; কিন্তু ক্ষমতালাভের আভাসমাত্র দেখিয়াই অনেকে অগ্রিম অঞ্জলি নিবেদনে নিদারুণ ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিলেন।

বিগত নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রমত্ত জনসমুদ্রে প্রকম্পিত জমকালো জনসভায় এক কেন্দ্রীয় নেতা তারেক রহমানের পদপ্রান্তে পতিত হইয়া কদমবুসির কসরত করিয়াছিলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় পরপর দুইজন নেতা একই প্রক্রিয়ায় পদধূলি সংগ্রহের প্রয়াস প্রদর্শন করিয়াছিলেন।

কদমবুসির সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য হইলেও পদধূলি লোভাতুর নেতাদের সবাই তারেক রহমানের সমবয়সী বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছিলেন। উভয় স্থলে জনাব রহমানকে যারপরনাই বিব্রত দেখা গিয়াছিল। পদরেণুপ্রার্থীদের হস্তযুগল তাঁহার পাদপদ্মে পৌঁছানোর পূর্বেই তিনি পা সরাইয়া প্রণতি-প্রচেষ্টা প্রতিহত করিয়াছিলেন।

এই ঘটনাবলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল তথা সংক্রমণ-সদৃশ সঞ্চারিত হইয়াছিল এবং বারোয়ারি পরিসরের লোকের মধ্যে যথেষ্ট আমোদের সঞ্চার করিয়াছিল।
তৎকালে প্রথম আলোতে ‘পলিটিক্যাল কদমবুসি কালচার যে কারণে ভয়ের’ শিরোনামে প্রকাশিত একখানি কলামে রাজনৈতিক পদরেণু-সংগ্রহ বাতিকের ভীতিকর দিক লইয়া কিঞ্চিত আলোচনার প্রয়াস পাইয়াছিলাম। সেই লেখার মূল কথা ছিল—পলিটিক্যাল পদরেণু-সংগ্রহের প্রবণতা প্রকৃতপক্ষে প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞাকে প্রহসনে পরিণত করিবার প্রারম্ভিক প্রপঞ্চমাত্র।

তো, এই কদমবুসি-সংস্কৃতি প্রথমে লঘু লীলারূপে থাকিলেও দেখা যাইতেছে, তাহা এখন ভিন্ন চেহারা লইয়া রীতিমতো গুরুগম্ভীর গঠনতন্ত্রে পরিণত হইয়াছে। পূর্বে কেবল পদস্পর্শে সীমাবদ্ধ থাকিলেও, অধুনা তাহা মনন, মনোবৃত্তি ও মঞ্চাভিনয়ের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করিয়াছে। সংসদীয় কার্যধারাও এই মহামারী হইতে পরিত্রাণ পায় নাই।

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে তাহার লক্ষণরেখা পূর্ণমাত্রায় পরিলক্ষিত হইয়াছে। সেখানে এমন এক অভিনব প্রথা প্রতিভাত হইয়াছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মহোদয়দের উপস্থিতির ইচ্ছা উবিয়া যাওয়ার প্রবণতা ধরা পড়িতেছে।

দেখা যাইতেছে, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি থাকিলেই সংসদ সদস্যবৃন্দের বাক্প্রবাহ প্রবল প্রপাতের ন্যায় প্রবাহিত হয়। আর তাঁহার অনুপস্থিতিতে বাক-সংযমই পরম ধর্ম বলিয়া বিবেচিত হয়। বক্তৃতা তখন কার্যত ‘উপযুক্ত শ্রোতা-সন্ধানী’ ভ্রাম্যমাণ বাণী হইয়া ওঠে।

স্পিকার কিংবা দলীয় হুইপের ভুল কিংবা গাফিলতির কারণে যদি প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে বাক্যবিস্তারের সুবর্ণ-সুযোগ ফসকাইয়া যায়, তাহা হইলে এমপি মহোদয়দের অন্তর ভেদ করিয়া যে কী ভয়ানক অভিমানের উদগীরণ হইতে পারে তাহার সর্বশেষ নজির সংসদে গত ১৬ জুন দৃশ্যমান হইয়াছে।

ওই দিন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনার উদ্দেশ্যে কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়াকে বক্তব্য দিবার জন্য সসম্মানে সম্বোধন করিয়াছিলেন।

অনেক সদস্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে বক্তব্য প্রদান করিতে এতদূর উৎসুক যে, তাহাদের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য যুক্তি প্রবর্তন নহে, বরং দৃষ্টি আকর্ষণ; নীতি প্রতিষ্ঠা নহে, নজরে আসা। যেন সংসদ কেবল আলোচনার অঙ্গন নহে, বরং অনুকম্পা-অর্জনের অভিনব অডিশনমঞ্চে পরিণত হইয়াছে।

মো. সেলিম ভুঁইয়াকে ছয় মিনিট সময় বরাদ্দ করা হইলে তিনি দণ্ডায়মান হইয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি আজ বক্তব্য দেব না।...আমারে দেন ছয় মিনিট, আর অন্যদের দেন, দশ মিনিট, বারো মিনিট। এর প্রতিবাদে আমি বক্তৃতা দিলাম না, এটা একটা পয়েন্ট। আরেকটা পয়েন্ট হলো, এখানে আমার সিরিয়াল ছিল আট নম্বরে। যদি তারা আট নম্বর সিরিয়াল ঠিক রাখত, তাহলে আমার বক্তৃতাটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে হইত। এখান থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হইছে। এই জন্য আমি বইসা পড়লাম। আমি বক্তৃতা দিবো না। ধন্যবাদ।’

এই বলিয়া তিনি বিক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে আসনে উপবিষ্ট হইলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় উদীয়মান হইয়া বক্তব্য প্রদান করিলেও তিনি এক প্রকার অভিমান-অভিষিক্ত উপসংহার স্বরূপ উল্লেখ করিতে ভুলেন নাই—‘বক্তব্য দিচ্ছি, তবে মন খারাপ।’
সেলিম ভূঁইয়ার এই ‘মন খারাপ’-এর মর্মার্থ তিনি সুস্পষ্টভাবেই স্বীকার করিয়াছেন।

নিতান্ত নির্ভেজাল সরলতায় তিনি ঘোষণা করিয়াছেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে বক্তব্য প্রদানের পবিত্র প্রাপ্তি হইতে তাঁহাকে ‘বঞ্চিত’ করা হইয়াছে বলিয়াই তিনি অভিমান-আবর্তে আবদ্ধ হইয়াছেন। অর্থাৎ বক্তব্যের গাম্ভীর্য নহে, বরং বক্তব্যের গন্তব্যই এখানে গৌরবের মূল নির্ধারক। তিনি অকপটে উচ্চারণ করিয়াছেন—প্রধানমন্ত্রী অনুপস্থিত থাকিলে বক্তব্য প্রদান অর্থহীন; কারণ, প্রধানমন্ত্রী অকুস্থলে না থাকিলে উক্ত বাক্যবাণী ‘যথাস্থানে’ পতিত হইবে না।

পরদিন, অর্থাৎ ১৭ জুন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজার সফরে গমন করিলেন। তাঁহার আগমন-অভ্যর্থনায় সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সসম্ভ্রমে সমবেত হইলেন সিলেট বিভাগের সাতজন সংসদ সদস্য।

এই দৃশ্য দেখিয়া যে কারো মনে হইতে পারে, সংসদীয় সভাকক্ষ অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সান্নিধ্য-সন্ধানের সমারোহে সঞ্চরণ অধিকতর মর্যাদার বিষয়। সংসদকক্ষ পরিত্যাগ করিয়া রানওয়ের প্রান্তে উপস্থিত হওয়াই তাঁহাদের নিকট অধিকতর কর্তব্য বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছিল। কারণ, সংসদে উপস্থিত থাকিলে ব্যক্তি বহুজনের মধ্যে বিলীয়মান হন। কিন্তু বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকিলে প্রধানমন্ত্রীর ‘দৃষ্টিগোচর’ হওয়ার সম্ভাবনা সুস্পষ্টভাবে স্ফীত হয়।

কিন্তু নিয়তির নির্মম নকশা দেখুন—যে প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টি-সাধনে এই সমগ্র সমাবেশ, তিনি ‘যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর’ ভঙ্গিতে এমপি মহোদয়দের প্রশ্ন করিয়া বসিলেন, ‘সংসদ নাই আজকে? এখানে কেন? সংসদে যান।’

তাঁর এই সংক্ষিপ্ত সংলাপ যেন সমগ্র সান্নিধ্য-সর্বস্ব রাজনীতির সারসংক্ষেপ আমাদের সম্মুখে তুলিয়া ধরিল। তাঁর এই একটিমাত্র বাক্যই সমগ্র কদমবুসি-প্রণোদিত রাজনীতির অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য উন্মোচিত করিয়া দিল। কারণ এর পরপরই ওই মন্ত্রী এমপিদের মধ্যে থাকা সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী তাৎক্ষনিক ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়া বিকালেই সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হইলেন। অনুরূপ অনুপ্রেরণায় এমপি কয়ছর আহমেদও বিলম্ব না করিয়া সংসদে প্রত্যাবর্তন করিলেন।

মন্ত্রী পরিষদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অনুপস্থিতি-প্রবণতা সুস্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদে তাঁহাদের উপস্থিতি যেন প্রহেলিকাপ্রায়—দেখিলে দেখা যায় না, খুঁজিলে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।

২২ জুন বাজেট আলোচনার সময় সংসদকক্ষের দৃশ্য ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। ওই সময় মন্ত্রীদের বহু আসন শূন্যতার শোভায় শোভিত ছিল। এই শূন্য-সমারোহ দর্শন করিয়া বিরোধী দলের এক মাননীয় সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়াইয়া স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি যথেষ্ট সরলতায় বলিলেন, ‘এইখানে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারপরে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অনেক মন্ত্রী নাই। মন্ত্রীদের চেয়ার সব খালি। এ ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাচ্ছি মাননীয় স্পিকার।’

যেন অনুপস্থিতির সেই অনুপম আয়োজনও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকলের অংশ বলিয়া বিবেচিত হইতেছিল।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ যে ভাষ্য প্রদান করিলেন, তাহা সংসদীয় সংস্কৃতির সারাংশ সংক্ষিপ্তসারে প্রকাশ করিবার জন্য যথেষ্ট—‘বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও উপস্থিতি দেখতে চাই। শোকর করেন যে অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন এখানে।’

স্পিকার মহোদয়ের কণ্ঠে তখন একপ্রকার সংযত সংবরণ, সুশৃঙ্খল স্বীকারোক্তি এবং সূক্ষ্ম সমর্পণের সুর স্পষ্ট প্রতীয়মান হইল—‘শোকর করেন, অর্থমন্ত্রী অন্তত উপস্থিত আছেন।’ ‘অন্তত’ শব্দখানি এখানে নিছক শব্দ নহে; ইহা বর্তমান সংসদীয় সংস্কৃতির সংকুচিত সম্ভ্রম, সঙ্কটগ্রস্ত শৃঙ্খলা এবং স্বল্পপ্রাণ উপস্থিতির সারসংক্ষেপস্বরূপ এক অনবদ্য অভিধান।

মাননীয় স্পিকার বুঝাইতে চাহিয়াছেন, যেখানে পূর্ণতা প্রত্যাশা করা বিলাসিতা, সেখানে ‘অন্তত’-ই পরম প্রাপ্তি।

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি থাকিলে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যবৃন্দের বাক্-বিস্ফোরণ একপ্রকার বসন্ত-বায়ুর ন্যায় সর্বত্র সঞ্জীবিত হইয়া উঠে, আর তাঁহার অনুপস্থিতিতে উপস্থিতিও যেন লজ্জাবনত লতার ন্যায় ক্রমশ ক্ষীয়মাণ হইতে থাকে—ইহা নিতান্ত নূতন কোনো প্রপঞ্চ নহে। ইহা বহুকালব্যাপী লালিত এক প্রাচীন সংসদীয় রেওয়াজ। খোদ সংসদের হুইপগণই ইহাকে সস্নেহে ‘সংসদীয় সংস্কৃতি’ বলিয়া স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন।

গত ২৭ এপ্রিল সংসদে দণ্ডায়মান হইয়া সরকার দলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি অকপট কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সংসদের প্রাণ অ্যাক্চুয়ালি। উনি থাকলে সবাই তার বক্তব্য শোনাতে চান। এই জন্য উনার অনুপস্থিতিতে আমি অনেক বক্তাই পাই না।’ অর্থাৎ, সংসদীয় প্রাণস্পন্দন এখন নীতিতে নহে, নেতার নৈকট্যে নির্ভরশীল বলিয়াই প্রতীয়মান।

অনেক সদস্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে বক্তব্য প্রদান করিতে এতদূর উৎসুক যে, তাহাদের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য যুক্তি প্রবর্তন নহে, বরং দৃষ্টি আকর্ষণ; নীতি প্রতিষ্ঠা নহে, নজরে আসা। যেন সংসদ কেবল আলোচনার অঙ্গন নহে, বরং অনুকম্পা-অর্জনের অভিনব অডিশনমঞ্চে পরিণত হইয়াছে।

অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সর্বজনীন পাঠ বলিতেছে—যেইখানে রাজনীতি ব্যক্তিসর্বস্ব, সেইখানে প্রতিষ্ঠান অনাথ হইয়া পড়ে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ইহা আর মোটেও তত্ত্ব কথা নহে, বরং দৈনন্দিন দৃষ্টান্তের দগদগে দলিল।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
    ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব