ইরানের তেহরানের একটি সড়কে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী।
ইরানের তেহরানের একটি সড়কে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী।

হামিদ দাবাশির বিশ্লেষণ

ইরান নিয়ে যে চিঠি পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ আবারও খুলে দিল

গত সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ান-এ 'ইরানজুড়ে কারাগার ও বন্দিশালায় থাকা সহযোদ্ধা অ্যাকটিভিস্ট, শিক্ষার্থী, চিন্তাবিদ, শ্রমিক, শিল্পী ও অপরাপর রাজবন্দীদের' উদ্দেশে লেখা একটি খোলা চিঠি প্রকাশিত হয়েছে।

একটি চিঠি লিখে প্রখ্যাত কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও অ্যাকটিভিস্ট ইরানের ওপর দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের ভয়াবহ যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সেই পুরোনো, বিরক্তিকর ‘উভয় পক্ষ নীতি’র চর্বিতচর্বণ করেছেন।

হামলাকারী একটি পক্ষ ফিলিস্তিনে গণহত্যা এবং সিরিয়া ও লেবাননে ভূমি দখলের রক্তক্ষয়ী খেলায় মেতে আছে, অন্য পক্ষটি একজন দুর্নীতিগ্রস্ত উন্মাদের হাতে শাসিত। জীর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বুলি দিয়ে লেখা চিঠিটি দেখে স্পষ্ট যে বাস্তবে ঠিক কী ঘটেছে—সে সম্পর্কে লেখকদের কোনো ধারণাই নেই।

তাঁরা ন্যক্কারজনকভাবে একই সঙ্গে ইরানের শাসকগোষ্ঠী এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনি যুদ্ধকে সমকাতারে দাঁড় করিয়ে আক্রমণ করেছেন। নথিটি অত্যন্ত আপত্তিকর।

ইরানের বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র সরকার যে বহু দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুদ্ধি অভিযান, রাজনৈতিক বন্দীদের গণমৃত্যুদণ্ড এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করে আসছে, তা অনস্বীকার্য। স্বাক্ষরকারীদের নিজেদেরই বেশ কয়েকজন ইরানি বন্ধু ও সহকর্মী সারা জীবন এসব ঘটনার তথ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করে বইয়ের পর বই লিখেছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাঁরা নিজের জন্মভূমিতেও পা রাখতে পারেন না।

কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে এবং পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্পেট বোম্বিংয়ের মাধ্যমে যখন ইরানের মাটিতে প্রথম ইসরায়েলি ও মার্কিন বোমা আছড়ে পড়ল, দৃশ্যপট রাতারাতি বদলে গেল।

ইরানজুড়ে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস যেন পুরো জাতির সামনে, এমনকি গোটা বিশ্বের সামনে নতুন করে জেগে উঠেছে। প্রশ্ন জাগে, এক বছর ধরে এই স্বাক্ষরকারীরা কোথায় ছিলেন?

হামিদ দাবাশি

কোনো ‘উভয় পক্ষ নীতি’ নয়

স্বাক্ষরকারীরা ইরানের রাজবন্দীদের সুরক্ষার কথা বলছেন। অথচ তাঁরা ভালো করেই জানেন যে গত জুনে তেহরানে হামলার সময় ইসরায়েল স্বয়ং ইরানের সবচেয়ে কুখ্যাত ‘ইভিন কারাগার’-এ বোমা ফেলেছিল। তথ্যটি অন্তত তাঁদের একটু থামিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করা উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

ইরানের বন্দিশালার নিষ্ঠুরতা ও ভিন্নমত দমনের ইতিহাস সবার জানা। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল। তেহরানের কাছে খাবোরান কবরস্থানটি সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

এ ধরনের বর্বর আচরণ, যেখানেই ঘটুক না কেন, অবিলম্বে বন্ধ হতে হবে—ইসরায়েলের সেই বন্দিশালাগুলো পর্যন্ত, যেখানে ফিলিস্তিনি বন্দীদের কুকুর দিয়ে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নিজেদের দেশের ওপর এই পাশবিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে ইরানের রাজবন্দীরা নিজেরাও কারাগার থেকেই চিঠি লিখে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সম্মানীয় স্বাক্ষরকারীরা কি এই খবরটি রাখার প্রয়োজন মনে করেছিলেন?

স্বাক্ষরকারীদের মধ্য থেকে কেউই যে ফারসি ভাষার উৎসগুলো পড়তে পারেন না, তা স্পষ্ট। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় সাবেক রাজবন্দী বেহরুজ গামারি-তাবরিজি খুব স্পষ্ট করে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। স্বাক্ষরকারীরা কি তাঁর যুক্তিগুলো শোনার আগ্রহ দেখিয়েছেন?

এখানে উভয় পক্ষকে সমান দোষী বানানোর সুযোগ নেই। আপনি হয় গণহত্যাকারী বোমারুদের পক্ষে থাকবেন, না হয় যাদের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছে তাদের পক্ষে দাঁড়াবেন।

তেহরানে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর এভিন কারাগারের হাসপাতালের একটি কক্ষে ধ্বংসস্তূপের মাঝে এক ব্যক্তি

চিঠিটির মূল সমস্যা হলো এর মারাত্মক ভুল রূপক—কাঁচির রূপক। ধরে নেওয়া হয়েছে যেন একটি আস্ত জাতি কোনো প্রাণহীন কাগজের মতো দুই দিক থেকে চেপে ধরা সহিংসতার মুখে পড়ে পিষে যাচ্ছে, যার নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বা ঐতিহাসিক ভূমিকা নেই।

যদি সত্যিই তা হতো, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই সঠিক প্রমাণিত হতেন: অর্থাৎ ইরানিদের মুক্ত করতে সত্যিই ইসরায়েলি ও মার্কিন বোমারু বিমানের দরকার ছিল!

ইরানিদের নিজস্ব বিবেক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করে এমন একটি মারাত্মক রূপক বেছে নিয়ে স্বাক্ষরকারীরা মূলত মার্কিন-ইসরায়েলি ‘মানবতাবাদী হস্তক্ষেপ’-কেই সমর্থন জানিয়েছেন—যে হস্তক্ষেপের মূল প্রতিশ্রুতি হলো ইরানিদের মুক্ত করার নামে বোমা মেরে একেবারে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া।

পোস্টকলোনিয়াল তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একদা লিখেছিলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা বাদামি পুরুষদের হাত থেকে বাদামি নারীদের উদ্ধার করছে।’ যে এলিট পশ্চিমা একাডেমিক ক্লাবে ইরানি বা সাধারণ মানুষের প্রবেশের অধিকার নেই, তার চেয়ে বেশি প্রতারণামূলক আর কী হতে পারে?

চিঠির গুমর ফাঁস

এই জঘন্য চিঠিটি কে বা কারা ড্রাফট করল? কিসের ভিত্তিতে? এর উত্তর এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ র‍্যাডিক্যালিজম ইতিহাসবিদ রবিন ডিজি কেলি নিজের স্বাক্ষর প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্বাক্ষর সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল ‘সন্দেহজনক’ এবং ‘যা ছাপানো হয়েছে, তা প্রথম দেখা খসড়ার সঙ্গে মেলে না।’

সুদানীয় নৃবিজ্ঞানী নিসরিন এলামিন লিখেছেন, ‘আমার নাম এই চিঠিতে আর থাকা উচিত নয় এবং শুরুতেও থাকা উচিত ছিল না।’ তিনি চিঠির বক্তব্য, নাম যুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং ‘ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা অবাস্তব সমতা’—কোনোটার সঙ্গেই একমত নন। তিনি একে ‘ক্ষতিকর ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় রাখা সাবেক ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ও রেডিও সাংবাদিক মুমিয়া আবু-জামাল হয়তো তাঁর নাম ব্যবহারের অনুমতিই দেননি। বিজয় প্রসাদ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মুমিয়ার হয়ে কে সই করল?’ তিনি জানান, মুমিয়া তাঁর জেলখানা থেকে দুটি কাগজের প্লেটে লিখে পাঠিয়েছেন—ইরান এখন বিশ্বকে (বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বকে) দেখাচ্ছে কীভাবে ‘সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়।

ইসরায়েলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইরানকে ধ্বংস করে সিরিয়া, লেবানন বা লিবিয়ার মতো টুকরো টুকরো করে দেওয়া। যে জেলখানার প্রহরীরা ইরানের অভ্যন্তরে নাগরিক স্বাধীনতা হরণ করেছে, আজ তারাই ট্রাম্প ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করছে।

বিজয় প্রসাদ নিজেও একটি কঠোর জবাবে লিখেছেন, চিঠির কাঁচির রূপকটি ‘আক্রমণকারী ও আক্রান্ত—উভয়কেই একই বিপদের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করে।’

প্রকাশের দিন স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় থাকা আরও বেশ কিছু নাম, যেমন—আমার সহকর্মী রশিদ খালিদি ও নাদিয়া আবু এল-হাজ—পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই উধাও হয়ে গেছে।

মূল প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে, যার উত্তর কেবল চিঠির নেপথ্য কারিগরেরাই দিতে পারবেন: কে এই ষড়যন্ত্রমূলক খসড়া তৈরি করল, কেন একজন ইরানি গবেষকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলো না এবং কীভাবে অন্যদের বিভ্রান্ত করে স্বাক্ষর নেওয়া হলো?

যাঁরাই হোন না কেন, মনে হচ্ছে যুদ্ধ চলাকালে ইরানের প্রতি বিশ্বজুড়ে যে অভূতপূর্ব সহানুভূতি তৈরি হয়েছে, তাতে তাঁরা ভিত হয়ে পড়েছেন এবং তা নস্যাৎ করতেই এই অপচেষ্টা।

আমি যখন এটি লিখছি, তখন শাসক ও শাসিত নির্বিশেষে—এমনকি রাজবন্দীরাও—ইসরায়েলি উপনিবেশবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে নিজেদের জন্মভূমি রক্ষায় এক জোটে লড়াই করছেন। যে দেশকে বারবার পারমাণবিক ছাই বানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাকে বাঁচাতে কোটি কোটি ইরানি নিজেদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে এক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

তেহরানে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত এক ব্যক্তির দাফন অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতির পাশে বসে আছেন এক ব্যক্তি

এক নির্মম বৈপরীত্য

আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ধারণাকে তীব্র ঘৃণা করি। আমার মতো অসংখ্য মানুষকে স্বদেশে ফেরার আনন্দ বিসর্জন দিয়ে এর মূল্য চুকাতে হয়েছে।

কিন্তু আমি যেখানে জন্মেছি, বেড়ে উঠেছি, যেখানে আমার মা-বাবা ও ভাই সমাহিত আছেন—সেই জন্মভূমি যদি আজ টিকে থাকে এবং আমি যদি এখনো ‘ইরানি স্টাডিজ’ পড়াতে পারি, তবে তা সম্ভব হয়েছে কারণ এই বিতর্কিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রই ৯০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবন, সম্মান ও ভূখণ্ড রক্ষা করে চলেছে।

ইসরায়েলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইরানকে ধ্বংস করে সিরিয়া, লেবানন বা লিবিয়ার মতো টুকরো টুকরো করে দেওয়া। যে জেলখানার প্রহরীরা ইরানের অভ্যন্তরে নাগরিক স্বাধীনতা হরণ করেছে, আজ তারাই ট্রাম্প ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করছে।

চিঠির আয়োজকেরা কি এই নির্মম সত্য বা বৈপরীত্য হজম করতে পারেন? এর সমর্থকেরা বোমার শব্দ থেকে হাজার মাইল দূরে বসে এই কুরুচিপূর্ণ নথিতে নিজের নাম দেখে সকালে শান্তিতে উঠে মুখ দেখাতে পারেন?

আফগানিস্তান থেকে ফিলিস্তিন—আরব ও মুসলিমদের যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তা কি এই স্বাক্ষরকারীদের চোখে পড়েনি? বিশ্বের অন্য দেশগুলো যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন একটি মুসলিম দেশ অন্তত ইসরায়েলের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে।

যাঁরা জেনেশুনে এতে সই করেছেন, তাঁরা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আবেগ থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন! কারণ, মানুষ এই সত্যটি বোঝে যে—ইরানি জনগণ কোনো নির্দিষ্ট সরকারের জন্য নয়, বরং একটি জাতি হিসেবে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

শিয়া-সুন্নি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। চিঠির পেছনের কারিগরেরা কি এই সত্য পর্যবেক্ষণ করার বা বোঝার চেষ্টা করেছেন?

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় যে লাখ লাখ ইরানি ও ইরাকি রাজপথে নেমে এলেন, তাঁরা কি সবাই অজ্ঞ? তাঁরা কি জেলের রাজবন্দীদের কথা জানেন না, নাকি নিজেদের দেশকে ভালোবাসেন?

পশ্চিম থেকে প্রকাশিত একটা চিঠি এসে সেখানকার মানুষকে তাঁদের দেশের বৈপরীত্য শেখাবে—সেই অপেক্ষায় কি অঞ্চলের মানুষ বসে ছিল? বাস্তবতার সঙ্গে এমন যোগাযোগহীন মানুষ আর যা-ই হোক, ‘বিপ্লবী’ হতে পারে না।

খামেনির জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তা

চিন্তার জগতে আমূল পরিবর্তন

চিঠির খসড়াকারীদের কাছে ‘জন্মভূমি’ শব্দের মূল্য হয়তো খুব সামান্য। ইসলামি সরকারের হাজারও ভুল থাকতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁরা প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মানুষের একটি পুরো জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে লড়ছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এমন এক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন, যা নাকি এই সরকারকে ‘ধসিয়ে দেবে’।

এটি আক্ষরিক অর্থেই গণহত্যার শামিল। কারণ, এই নিষেধাজ্ঞা সরকারের ক্ষতি করার চেয়েও ইরানের সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মারে—যে সরকার প্রায় আধা শতাব্দী ধরে এসব পার করে টিকে আছে।
ইরানে রাজনৈতিক বন্দিত্ব ও মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হওয়া উচিত—ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত চীন, সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রেও (যে দেশ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নিজ দেশের মানুষকে খাঁচায় বন্দী করে রাখে)।

অথচ চিঠিটি একটি পুরো জাতির অস্তিত্ব মুছে ফেলার আন্তর্জাতিক হুমকিকে সেই সরকারের সঙ্গে সমকাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে, যে সরকার অন্তত এই দুই পারমাণবিক শক্তির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কোনো যুক্তি আছে?

এই বর্বর সামরিক হামলার পর ইরান এক অভূতপূর্ব মানসিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা অবশ্যই নীতিমান ইরানিদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং সেই লড়াই বজায় থাকবে।

আমি যখন এটি লিখছি, তখন শাসক ও শাসিত নির্বিশেষে—এমনকি রাজবন্দীরাও—ইসরায়েলি উপনিবেশবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে নিজেদের জন্মভূমি রক্ষায় এক জোটে লড়াই করছেন। যে দেশকে বারবার পারমাণবিক ছাই বানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাকে বাঁচাতে কোটি কোটি ইরানি নিজেদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে এক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

কিন্তু কাকতালীয় নয় যে চিঠিটির উদ্যোক্তারা একজনও গুরুত্বপূর্ণ ইরানি শিক্ষাবিদ বা চিন্তাবিদকে পাশে পাননি। তাঁরা কি আদৌ কোনো স্বাধীন ইরানি গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন?

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার বোমা বর্ষণ করার পর থেকেই ইরানে যে গভীর পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার গভীরতা এখনো পুরোপুরি মাপা সম্ভব নয়। এমন চিঠি শুধু এটাই প্রমাণ করে যে বাস্তবতা থেকে এর লেখকেরা কত আলোকবর্ষ দূরে আছেন।

ইসরায়েলি দখলদারদের এই দুঃসাহস ইরানিদের অতি পুরোনো স্মৃতিকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছে। আলেকজান্ডারের আক্রমণ থেকে শুরু করে আরব ও মঙ্গোল আক্রমণ, কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর দখলদারি এবং সিআইএ-এমআই৬-এর অভ্যুত্থানের ইতিহাস—সবই আজ সাধারণ ইরানিদের মনে নতুন করে ফিরে এসেছে। দুই পারমাণবিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানো ইরানকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য প্রার্থনারত শোকাহত মানুষেরা

একটু বিনীত হোন

স্বাক্ষরকারীরা ইরানের উপনিবেশবিরোধী ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ এবং এই আগ্রাসন যে প্রতিটি ইরানির মনে কতটা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, সে বিষয়ে অন্ধ। সরকার ও জনগণের মধ্যে যে সূক্ষ্ম দেয়ালটুকু ছিল, তা মিনাবে ইসরায়েলি বোমা ও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রে নিহত নিরপরাধ শিশুদের রক্তের সঙ্গে মিশে মুছে গেছে।

আমাদের জন্মভূমি আক্রান্ত, ভৌগোলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং আমাদের সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত। আপনাদের এই অন্তঃসারশূন্য ‘অ্যাকটিভিজম’ কি এই বাস্তবতার সামান্য ছোঁয়াও পায়?

এই যুদ্ধ কখনোই শুধু একটা ইসলামি সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। এই যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে, ইরানিদের বিরুদ্ধে—যার উদ্দেশ্য একটাই: দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা, রাষ্ট্রকে ধসিয়ে দেওয়া এবং কোটি কোটি শরণার্থী তৈরি করা।

কারাগারের ভেতরের রাজবন্দীরা পর্যন্ত যুদ্ধের বিরুদ্ধে চিঠি পাঠাচ্ছেন। আর কিছু ‘বসন্তের কোকিল’ টাইপ অ্যাকটিভিস্ট হুট করে এসে এতে উসকানি দিচ্ছেন, যা একটি অস্তিত্বসংকটে পড়া জাতির জন্য চরম অপমানজনক।

আপনাদের কিছুটা বিনয় থাকা উচিত ছিল। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ইরানিকে যুক্ত না করে চিঠি ছাপাতে আপনাদের লজ্জা করল না? ‘তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না, তাই তাদের হয়ে অন্যদের বলতে হবে’—বিষয়টি কি তাই?

সমাজবিজ্ঞানী সাঈদ মাদানি, যিনি ইরানের অন্যতম শীর্ষ রাজবন্দী, জেল থেকে বেরিয়েই আবার নিজের অধিকারের লড়াইয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন—আর সবই বলছেন ফারসি ভাষায়, নিজের দেশের মানুষের নাগরিক অধিকারের জন্য।

ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা মানুষগুলো আধা শতাব্দী ধরে এই সরকারের ইতিহাস নথিভুক্ত করেছে এবং রক্ত দিয়ে নাগরিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। ভবিষ্যতেও তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে, যেমনটা তারা ইসরায়েলি ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে। ইসরায়েলের উসকানিতে শুরু হওয়া এই মার্কিন যুদ্ধ ইরানিদের উপনিবেশবাদ ও স্বৈরাচার—উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও শক্তিশালী করবে।

সেই লড়াইয়ে, যাঁরা জেনে-বুঝে এই ন্যক্কারজনক নথিতে সই করেছেন—যদিও তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে—তাঁদের আর কোনো দিন ইরানিদের বিশ্বস্ত বন্ধু বলে মনে করা হবে না।

  • হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

    মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।