আমদানিনির্ভর ভোক্তাপণ্যের বাজার শুধু ‘পণ্য’ নয়, এটি বিশাল এক বাণিজ্য-শ্রমজাল।
আমদানিনির্ভর ভোক্তাপণ্যের বাজার শুধু ‘পণ্য’ নয়, এটি বিশাল এক বাণিজ্য-শ্রমজাল।

মতামত

শুল্কের চাপে আমদানি থামলে থামে জীবিকাও

আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর আলোচনা সাধারণত রাজস্ব আর আমদানির পরিমাণ ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এই নীতির আরেকটি দিক আছে, যেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো কর্মসংস্থান। কারণ, আমদানি কমে গেলে শুধু কাস্টমসের খাতা বদলায় না, বদলে যায় বাজারের ভেতরের কাজের প্রবাহও।

বড় আমদানিকারক থেকে শুরু করে পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, বিক্রয়কর্মী, গুদামশ্রমিক, পরিবহন-সংযুক্ত কর্মী, এমনকি ছোট দোকানের সহকারী পর্যন্ত অনেকের আয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাই এই প্রশ্নটি শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, শ্রমবাজারেরও।

সাম্প্রতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য। কিছু প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে এই মূল্য ২৫ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। লিপস্টিক, স্কিন ক্রিম, মেকআপ কিট, পাউডার, ফেসওয়াশসহ বেশ কয়েকটি লাইনে এই বৃদ্ধি হয়েছে।

ফলে শুধু করের হার নয়, কর হিসাবের ভিত্তিটাই ওপরে তুলে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এই ভিত্তিমূল্য বাস্তব আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে মেলে না।

এই নীতির প্রভাব বাজারে কতটা পড়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানি তথ্যে তা উঠে এসেছে। সেখানকার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রসাধনীর ১০টি এইচএস কোডে ২০২৫ সালের অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে আমদানির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৫১ শতাংশ, ৪৯ শতাংশ এবং ৫৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রাজস্বও কমেছে।

অর্থাৎ সরকার বেশি তুলতে গিয়ে কম পেয়েছে, আর বাজারে বৈধ বাণিজ্যও সংকুচিত হয়েছে। এই জায়গাতেই কর্মসংস্থানের ঝুঁকির সূত্রপাত। কারণ, পণ্য কম এলে সেই পণ্য ঘিরে যে কাজগুলো চলত, সেগুলোও কমে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ঝুঁকিকে কি বাড়িয়ে বলা হচ্ছে, নাকি এর বাস্তব ভিত্তি আছে। এখানে বাংলাদেশের সামগ্রিক শ্রমবাজারের চরিত্রটি মনে রাখা দরকার। দেশে মোট বেকারত্বের হার খুব বেশি না দেখালেও কাজের নিরাপত্তা খুব দুর্বল।

আইএলওস্ট্যাটের দেশ-প্রোফাইল অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিল ৪.৪ শতাংশ। শুনতে কম মনে হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে যুব বেকারত্ব অনেক বেশি এবং আইএলওর এক বিশ্লেষণে যুব বেকারত্ব ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলা হয়েছে।

অর্থাৎ ওপরের দিকে সংখ্যা যত শান্তই দেখাক, শ্রমবাজারের ভেতরে চাপ অনেক বেশি। তার ওপর ২০২২ সালে মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশই ছিল অনানুষ্ঠানিক খাতে। ফলে বাজারে ধাক্কা লাগলে বেশির ভাগ মানুষ দ্রুত আয়ের ঝুঁকিতে পড়ে।

এই অনানুষ্ঠানিকতার কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশে চাকরি হারানো মানে সব সময় অফিশিয়াল ছাঁটাইপত্র পাওয়া নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এর মানে হলো মাসের শেষে ডাকা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কমিশনভিত্তিক বিক্রি কমে যাওয়া, দোকানে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া বা গুদামে অস্থায়ী কাজ না থাকা।

আমাদের দেশে বেকারত্বের বড় অংশ এভাবেই আসে। উপরন্তু বাংলাদেশে কার্যকর বেকারভাতা ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। একটি সাম্প্রতিক শ্রমবাজার প্রোফাইলে বলা হয়েছে, বেকারদের জন্য আনুষ্ঠানিক বেকারভাতা কার্যত অনুপস্থিত। ফলে বাজারে ধাক্কা লাগলে তার ভার পরিবারকেই বইতে হয়।

এই জায়গায় প্রসাধনী খাতকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য জরিপে দেখা যায়, এই খাতে মোট প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ মানুষ যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

আমদানিনির্ভর ভোক্তাপণ্যের বাজার শুধু ‘পণ্য’ নয়, এটি বিশাল এক বাণিজ্য-শ্রমজাল। প্রসাধনী বিক্রি হয় দোকানে, সুপারশপে, ফার্মেসিতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, বাজারের ছোট স্টলে, সেলুনে, বিউটি পয়েন্টে, ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে।

ফলে এই বাজারে ধাক্কা লাগলে ক্ষতি শুধু আমদানিকারকের অফিসে আটকে থাকে না, তা নিচের স্তরে গড়িয়ে পড়ে।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবিতে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি আরও বড় করে তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, এই খাতের সঙ্গে ২৫ লাখের বেশি মানুষের জীবিকা জড়িত।

১০ লাখের বেশি মানুষ এই আমদানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং গত ছয় মাসে ৩ লাখের বেশি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার এবং সেগুলোকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে ধরা যাবে না।

কিন্তু এগুলোকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন। কারণ, যখন কয়েক মাসের মধ্যে বৈধ আমদানি অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে আসে, তখন কর্মসংস্থানে ধাক্কা লাগবে, সেটি অর্থনীতির খুব স্বাভাবিক ফল।

কেউ বলতে পারেন, আমদানি কমলে দেশীয় শিল্প বাড়বে, কাজও বাড়বে। কথাটি আংশিকভাবে ঠিক। দেশীয় প্রসাধনশিল্প যে বেড়েছে, তার প্রমাণও আছে। একটি শিল্পভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় ব্র্যান্ড এখন বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ ধরে রেখেছে। কিন্তু এখানে সময়ের প্রশ্ন আছে।

আমদানি ধাক্কা খেলেই দেশীয় শিল্প পরদিন থেকে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগে, বিনিয়োগ লাগে, কাঁচামাল লাগে, মান নিয়ন্ত্রণ লাগে, আর বাজারে পৌঁছাতে লাগে একটি শক্ত সরবরাহব্যবস্থা। ফলে স্বল্পমেয়াদে যা ঘটে, তা হলো অস্থিরতা। আর অস্থিরতার প্রথম আঘাত লাগে ছোট ব্যবসা ও অনিরাপদ শ্রমের ওপর।

এর সঙ্গে আরেকটি ঝুঁকি জুড়ে আছে। বৈধ আমদানি যদি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে, তাহলে বাজারে অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ সরবরাহচক্র শক্তিশালী হতে পারে। এতে হয়তো কিছু পণ্য বাজারে আসবে, কিন্তু তাতে স্থিতিশীল বা সুরক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। বরং আনুষ্ঠানিক, কর-নিবন্ধিত, নিয়মমাফিক ব্যবসা দুর্বল হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি আরও খারাপ, কারণ তখন নষ্ট হয় সেই চাকরিগুলো, যেগুলো অন্তত কিছুটা নিয়মতান্ত্রিক ছিল।

এ কারণেই বর্তমান শুল্কনীতি শুধু রাজস্বের প্রশ্ন নয়, এটি কাজের প্রশ্নও। যদি একটি নীতি বৈধ আমদানি কমায়, রাজস্ব কমায়, আর নিচের স্তরে আয়-অনিশ্চয়তা বাড়ায়, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করা ছাড়া উপায় নেই। করনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাজস্ব তোলা, বাজার সচল রাখা এবং অকারণে জীবিকা নষ্ট না করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, অন্তত এ ক্ষেত্রে সেই ভারসাম্যটি রক্ষা করা যায়নি।

বেকারত্ব সব সময় বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আসে না। অনেক সময় তা আসে দোকানে বিক্রি কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে, অর্ডার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বা ছোট কর্মীদের নীরবে ছেঁটে ফেলার মধ্য দিয়ে। প্রসাধনী আমদানিতে বর্তমান শুল্কচাপ সেই নীরব বেকারত্বের ঝুঁকিই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো সরকার কি এই সংকেতটি সময় থাকতে বুঝবে?

  • মহিবুল ইসলাম, শিক্ষক, ব্যবসায় প্রশাসন, ইউল্যাব।