নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপারে বিভিন্ন দলের বা প্রার্থীর প্রতীক সাজিয়ে থাকে বাংলা বর্ণের ক্রম অনুযায়ী। এবারের জাতীয় নির্বাচনে প্রতীক সাজানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কোনো বিশেষ ইচ্ছা বা অভিসন্ধি কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে কোনো কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালট পেপারে দলীয় প্রতীকের অবস্থান দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় বা অনিয়ম হয়নি বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করছে। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটের যে নমুনা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায়।
প্রথম কথা, বিভিন্ন গণমাধ্যম বা অনলাইন মাধ্যমের খবরে পোস্টাল ব্যালটের যেসব ছবি বা নমুনা ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো সব ক্ষেত্রে এক নয়। সুতরাং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যে প্রজ্ঞাপন বাংলাদেশ সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, এই লেখায় সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত সেই প্রজ্ঞাপনে ১১৯টি প্রতীকের নাম রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপারে প্রতীকগুলোকে বর্ণক্রম অনুযায়ী সাজানোর চেষ্টা করলেও তাতে ত্রুটি রয়ে গেছে। তবে পোস্টাল ব্যালটে দলীয় প্রতীকের অবস্থান নিয়ে বিএনপি মনঃক্ষুণ্ন হলেও তাদের যুক্তি যথেষ্ট জোরালো নয়, এমনকি গ্রহণযোগ্য যুক্তিও তারা দাঁড় করাতে পারেনি। কারণ, ব্যালটের মধ্যবর্তী স্থানে যেখানে ভাঁজ পড়ছে, সেই বরাবর ধানের শীষ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতীক রয়েছে। অন্যভাবে বিন্যস্ত করলেও কোনো না কোনো প্রতীক সেখানে পড়ত।
অনেকে বলছেন, প্রতীকগুলো ওপর থেকে নিচের দিকে না সাজিয়ে বাঁ থেকে ডানের দিকে সাজালে ভালো হতো। কারণ, শিশু শ্রেণিতে বর্ণগুলো বাঁ থেকে ডান দিকেই সারিবদ্ধ থাকে। যাঁরা এমনটি বলছেন, তাঁদের খেয়াল রাখা দরকার, অভিধানে শব্দ সাজানো থাকে কলামভিত্তিক এবং তা ওপর থেকে নিচের দিকে বিন্যস্ত হয়। এই বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন যথার্থ কাজটিই করেছেন। তা ছাড়া কোনো কাগজ যদি ওপর-নিচে বেশি লম্বা হয়, সে ক্ষেত্রে কলামের চেয়ে সারি বেশি হবে; তখন শব্দগুলো ওপর থেকে নিচে সাজালেই পড়তে বা দেখতে সুবিধা হয়।
তবে সমস্যা ঘটে গেছে বর্ণক্রম করার ক্ষেত্রে। প্রজ্ঞাপনে কিংবা ব্যালট পেপারে প্রতীকগুলো যথাযথ বর্ণক্রম অনুযায়ী বিন্যস্ত হয়নি। যাতে ভুল না হয়, এ জন্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কাজটি করানো।
ব্যালট পেপারে প্রতীকের আগে-পরে অবস্থান বাড়তি কোনো সুবিধা বা অসুবিধা তৈরি করে কি না, সেটা ভিন্ন তর্ক। কিন্তু প্রতীক সাজানোর ক্ষেত্রে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে ভুল ঘটে গেলে নির্বাচন কমিশনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ব্যালটে দেখা যায়, আ বর্ণ দিয়ে প্রতীক রয়েছে চারটি; আভিধানিক ক্রম অনুযায়ী এগুলো হলো আনারস, আপেল, আম ও আলমারি। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটে আপেলকে শুরুতে রেখে আনারস, আম ও আলমারিকে পরে রাখা হয়েছে। আবার ক বর্ণ দিয়ে শুরু এমন প্রতীক রয়েছে ১৫টি, যেগুলোর প্রায় সবই এলোমেলো হয়ে গেছে। পোস্টাল ব্যালটের তালিকা অনুযায়ী প্রতীকগুলোর ক্রম এমন: কাঁচি, কবুতর, কলম, কলসি, কলার ছড়ি, কাঁঠাল, কাপ-পিরিচ, কাস্তে, কেটলি, কুমির, কম্পিউটার, কুড়াল, কুলা, কুঁড়েঘর ও কোদাল। কিন্তু বর্ণক্রম অনুযায়ী হওয়া দরকার ছিল কবুতর, কম্পিউটার, কলম, কলসি, কলার ছড়ি, কাঁচি, কাঁঠাল, কাপ-পিরিচ, কাস্তে, কুঁড়েঘর, কুড়াল, কুমির, কুলা, কেটলি, কোদাল।
একইভাবে ক্রমে ভুল রয়েছে চ বর্ণ দিয়ে শুরু প্রতীকগুলোতে। চশমা প্রতীক সবার শেষে বসেছে, কিন্তু এটি শুরুতে বসবে এবং চিংড়ি প্রতীক চিরুনির আগে বসবে। আবার ট বর্ণের টেলিফোন ও টেলিভিশন প্রতীক দুটির আগে ট্রাক ও ট্রাক্টর আছে, এগুলো শেষে বসবে। টেবিল ল্যাম্প যাবে টেবিল ঘড়ির পরে। ব বর্ণের বাঘ প্রতীক সরে যাবে বটগাছ ও বাইসাইকেল প্রতীকের পরে। ম বর্ণেও যথেষ্ট মাত্রায় এলোমেলো ঘটেছে। ম দিয়ে প্রতীক রয়েছে ১৪টি—মই, মগ, মাইক, মোটরগাড়ি (কার), মশাল, ময়ূর, মাছ, মাথাল, মিনার, মোমবাতি, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, মোড়া, মোরগ। কিন্তু প্রতীকগুলোর ক্রম হবে এমন: মই, মগ, ময়ূর, মশাল, মাইক, মাছ, মাথাল, মিনার, মোটরগাড়ি (কার), মোটরসাইকেল, মোড়া, মোবাইল ফোন, মোমবাতি, মোরগ। র বর্ণের রিকশা আসবে রেল ইঞ্জিনের আগে। ল বর্ণের লাঙ্গল আসবে লিচুর আগে। স বর্ণের তালিকায় আছে: সোনালি আঁশ, সেলাই মেশিন, সোফা, সিঁড়ি, সিংহ ও সূর্যমুখী। কিন্তু ক্রম অনুযায়ী হবে: সিংহ, সিঁড়ি, সূর্যমুখী, সেলাই মেশিন, সোনালি আঁশ, সোফা। হ বর্ণের ক্রমে হাঁস আসবে হাত (পাঞ্জা) প্রতীকের আগে এবং হ্যান্ডশেক যাবে হেলিকপ্টারের পরে।
প্রতীকগুলোর বানানের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়ে গেছে। কিছু শব্দ ভুল বানানে লেখা হয়েছে, আবার কিছু শব্দ পুরোনো বানানে রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন এসব শব্দের বানান আগেই ঠিক করে নিতে পারত। যেমন ঈগল পরিবর্তন করে ইগল, ধানের শীষ পরিবর্তন করে ধানের শিষ, লাঙ্গল পরিবর্তন করে লাঙল, সোনালী আঁশ পরিবর্তন করে সোনালি আঁশ (পাট) লেখা যেত। আবার ‘কুঁড়ে ঘর’ শব্দটি একসঙ্গে ‘কুঁড়েঘর’ লেখা যেত।
ব্যালট পেপারে প্রতীকের আগে-পরে অবস্থান বাড়তি কোনো সুবিধা বা অসুবিধা তৈরি করে কি না, সেটা ভিন্ন তর্ক। কিন্তু প্রতীক সাজানোর ক্ষেত্রে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে ভুল ঘটে গেলে নির্বাচন কমিশনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তা ছাড়া কম্পিউটার প্রযুক্তির এই যুগে প্রতীকের ঘরগুলো বড়-ছোট করে নির্দিষ্ট আকারে এনে কোনো প্রতীককে ওপরে বা নিচে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তো রয়েছেই। জাতীয় নির্বাচনের জন্য সংসদীয় আসনগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন যেসব ব্যালট পেপার ছাপা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত প্রতীকের বর্ণক্রম ঠিক রাখা দরকার। প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে আগের প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে নিতে হবে।
● তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব