সারের জন্য সরকার নির্ধারিত পরিবেশকের দোকানে কৃষকদের ভিড়। রাজশাহীর গোদাগাড়ী।
সারের জন্য সরকার নির্ধারিত পরিবেশকের দোকানে কৃষকদের ভিড়। রাজশাহীর গোদাগাড়ী।

মতামত

কৃষকের ক্ষোভ: সংকট কি ঘাটতির, না ন্যায়ের

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা গুদাম থেকে ১৯৮ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে গুদাম ভাঙা ও সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আইনভঙ্গ।

কিন্তু ঘটনাটিকে কেবল বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলে মূল সংকট আড়ালে থেকে যাবে। প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কৃষকেরা কেন এমন একটি পথে গেলেন? কেন তাঁদের মনে হলো, সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছিলেন না। ডিলারের গুদাম খালি বলা হলেও খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ সার পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল না; বরং সরকারি দামে কৃষকের নাগালের বাইরে ছিল।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কৃষকের কাছে সংকটটি নিছক বাজার-ঘাটতির সমস্যা নয়; এটি বঞ্চনা, প্রতারণা ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। তাঁরা দেখছেন, তাঁদের জন্য বরাদ্দকৃত সার কোথাও না কোথাও আছে, কিন্তু সেটি তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, অথবা পৌঁছাচ্ছে বাড়তি দামে।

কৃষকের কাছে সার কোনো সাধারণ পণ্য নয়। বীজ, সেচ, শ্রম ও ঋণের সঙ্গে সার সরাসরি যুক্ত ফসল উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে। সময়মতো সার না পেলে ফলন কমে যায়, জমির বিনিয়োগ নষ্ট হয়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং পুরো পরিবারের খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

তাই সার পাওয়ার প্রশ্নটি একজন কৃষকের কাছে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। সরকারি মূল্যে সার বরাদ্দ থাকলেও যদি তা না মেলে, আর একই সার কালোবাজারে কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়, তবে কৃষকের মনে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এ ক্ষোভকে বোঝার জন্য ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ই পি থম্পসনের ‘নৈতিক অর্থনীতি’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। থম্পসন দেখিয়েছিলেন, খাদ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই মানুষ প্রতিবাদ করে না; প্রতিবাদ তীব্র হয় তখন, যখন ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ সমাজে প্রচলিত ন্যায্যতার ধারণা ভঙ্গ করে। সাধারণ মানুষ মনে করে, খাদ্যের মতো অপরিহার্য পণ্য কেবল মুনাফার বস্তু হতে পারে না। সংকটের সময় ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো ন্যায্য দামে মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া।

ভূরুঙ্গামারীর ঘটনায় কৃষকেরা শুধু সার আনেননি, এর মধ্য দিয়ে নৈতিকতাকে প্রশ্ন করেছেন। নৈতিকতা নিয়ে এ প্রশ্ন এখন উন্মুক্ত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, আইনভঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

কুড়িগ্রামে বারবার ঘুরেও সার না পেয়ে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যান কৃষকেরা। ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে, ২৩ আগস্ট

বাংলাদেশের কৃষকের কাছেও সার এমনই একটি নৈতিক পণ্য। কৃষকের প্রত্যাশা খুবই মৌলিক—কৃষির জন্য বরাদ্দকৃত সার কৃষকের কাছেই যাবে; ডিলার মজুত গোপন করবেন না; প্রশাসন বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে; আর সরকারি ভর্তুকি প্রকৃত কৃষকের কাজে লাগবে। কিন্তু যখন সরকারি ভর্তুকির সার মধ্যস্বত্বভোগী, অসাধু ডিলার বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মুনাফায় পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। জনগণের অর্থে দেওয়া ভর্তুকি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর বদলে যদি কালোবাজারের মুনাফা বাড়ায়, তবে সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি ন্যায়বিচারেরও ব্যর্থতা।

ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার দাবিতে কৃষকদের আন্দোলন পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনায় রূপ নেয়। অভিযোগ ছিল, কৃষকদের জন্য নির্ধারিত সার বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। কৃষকেরা প্রতিবাদ করেছিলেন; কিন্তু তাঁদের অভিযোগের জবাব দেওয়ার বদলে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা হয়। সে সময় কৃষক হত্যার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সারসংকট নতুন নয়, আর সংকটের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও বহুদিন ধরে একই রকম।

জেমস সি স্কটের ‘দুর্বলের অস্ত্র’ ধারণা দিয়ে এ ঘটনাগুলোর আরেকটি দিক বোঝা যায়। কৃষকেরা সার আমদানি, বরাদ্দ, পরিবহন বা ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা প্রশাসনিক নথি, সরবরাহের তালিকা কিংবা গুদামের হিসাবও নিয়ন্ত্রণ করেন না। অভিযোগ জানালেও অনেক সময় প্রতিকার মেলে না। ক্ষমতার এই অসমতার মধ্যে তাঁরা ছোট ছোট প্রতিরোধের পথ বেছে নেন: দলবদ্ধ হওয়া, রাস্তা অবরোধ, সরবরাহ আটকে দেওয়া, প্রকাশ্যে অভিযোগ করা কিংবা শেষ পর্যায়ে সরাসরি গুদাম থেকে সার নিয়ে নেওয়া।

এসব কাজ আইনগতভাবে বৈধ নয়, কিন্তু এগুলোকে কেবল বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিহ্নিত করলে সামাজিক বাস্তবতা বোঝা যায় না। যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন দুর্বল মানুষ অনানুষ্ঠানিক ও প্রত্যক্ষ প্রতিরোধের আশ্রয় নেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে ভূরুঙ্গামারীর কৃষকেরা সত্যিই সার পাননি, অথচ একই সময়ে খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া গেছে, তাহলে তাঁদের কর্মকাণ্ডের পেছনে যে গভীর অবিশ্বাস কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কৃষকেরা দান চান না; তাঁরা ন্যায্য দামে উৎপাদনের উপকরণ চান। ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা তাই শুধু একটি গুদাম ভাঙার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, বাজার ও কৃষকের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। মহিমাগঞ্জের শিক্ষা হলো, গুলি চালিয়ে ক্ষোভ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার কারণ দূর করা যায় না। ভূরুঙ্গামারীর শিক্ষা হলো, প্রশাসনিক ব্যর্থতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্বল মানুষের প্রতিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

গুদাম ভাঙা বা জোর করে সার নিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে। কারণ, মানুষ নৈতিকতাকে প্রশ্ন করছে। তাই সরকারি বরাদ্দ গোপন রাখা, মজুত লুকানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি, ভর্তুকির অপব্যবহার এবং কালোবাজারি—এসব অভিযোগ সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। যদি ডিলার, মজুতদার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়, তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

এ সংকটের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নও যুক্ত। বিদ্যুৎ-সংকটের অবসান এবং সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিতে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের উদ্যোগে পিপুলবাড়িয়া বাজারে আয়োজিত একটি সমাবেশে রাজনৈতিক কর্মীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। নাগরিকেরা যখন ব্যক্তিগতভাবে দুর্ভোগের কথা বলেন, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত কষ্ট সামনে আসে। কিন্তু যখন তাঁরা সংগঠিত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁরা সংকটের রাজনৈতিক দায়ও সামনে আনেন। তাই সংগঠিত প্রতিবাদকে ভয় দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

নীলফামারীতে সার পরিবেশকের দোকানের সামনে কৃষকদের ভিড়। সদর উপজেলার রামগঞ্জ বাজারে

কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা সহযোগী গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা করতে পারে না। সরকারের দায়িত্ব হলো বিরোধী মত ও প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা—তা সে প্রতিবাদ যতই অস্বস্তিকর হোক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কৃষক বা রাজনৈতিক কর্মীদের দমন করে সাময়িক নীরবতা তৈরি করা যায়, কিন্তু সারসংকটের কারণ দূর করা যায় না।

সরকারকে প্রথমত ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সার বরাদ্দ, ডিলারের মজুত, বিক্রির পরিমাণ ও সরবরাহের সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষক প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে স্বচ্ছ তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিলারদের মজুত ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত যাচাই করে অনিয়মের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়-নির্বিশেষে শাস্তি দিতে হবে। চতুর্থত, কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগের ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডিজিটাল তালিকা ও মুঠোফোনে বার্তার মাধ্যমে বরাদ্দের তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানো যেতে পারে, যাতে গোপনীয়তার সুযোগ কমে।

কৃষকেরা দান চান না; তাঁরা ন্যায্য দামে উৎপাদনের উপকরণ চান। ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা তাই শুধু একটি গুদাম ভাঙার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র, বাজার ও কৃষকের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। মহিমাগঞ্জের শিক্ষা হলো, গুলি চালিয়ে ক্ষোভ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার কারণ দূর করা যায় না। ভূরুঙ্গামারীর শিক্ষা হলো, প্রশাসনিক ব্যর্থতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্বল মানুষের প্রতিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের উচিত কৃষকের বেপরোয়া অবস্থা প্রত্যক্ষ করে নিজেদের ত্রুটির দিকে তাকানো। ন্যায্য বণ্টন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু আইনশৃঙ্খলার ভাষায় এই সংকটের সমাধান হবে না। কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রথম শর্ত।

  • ড. মোশাহিদা সুলতানা সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: moshahida@du.ac.bd

    মতামত লেখকের নিজস্ব