মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে প্রেক্ষাগ্রহে গিয়ে সিনেমা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (৩ এপ্রিল, ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর জিগাতলায় বিডিআর সীমান্ত সম্ভার সিনেমা হলে ‘প্রোজেক্ট হেইল মেরি’ সিনেমাটি দেখেছেন তাঁরা।
মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে প্রেক্ষাগ্রহে গিয়ে সিনেমা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (৩ এপ্রিল, ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর জিগাতলায় বিডিআর সীমান্ত সম্ভার সিনেমা হলে ‘প্রোজেক্ট হেইল মেরি’ সিনেমাটি দেখেছেন তাঁরা।

মতামত

প্রধানমন্ত্রীর এক সন্ধ্যা, আমাদের বেহাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ও এর ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের মেয়েকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখেন, এটি নিছক একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক বার্তাও বটে। রাষ্ট্রের একজন সর্বোচ্চ নেতা এভাবে হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া দর্শকদের জন্য হলে ফিরে যাওয়ার এক নীরব আহ্বান। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় কি আছে?

এ ঘটনায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। লেখক ও প্রকাশক সাঈদ বারী এ ঘটনা সম্পর্কে তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে হলে মুভি দেখতে গিয়েছিলেন। আমার যদ্দুর মনে পড়ে, এ রকম ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো তিনি সে সময়ের দর্শকপ্রিয় একটি মুভি রিয়াজ-পূর্ণিমা অভিনীত “মনের মাঝে তুমি” দেখেছিলেন। এ ব্যাপারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মারুফ খান কামাল ভাই আরও ভালো বলতে পারবেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ঈর্ষণীয়!’

পোস্টের মন্তব্যে মারুফ খান কামাল লিখেছেন, ‘আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ে ছিলাম। সেটা ২০০৩ সাল। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় “মনের মাঝে তুমি” ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল। মতিউর রহমান পানু ছিলেন পরিচালক। বাংলাদেশি প্রযোজক আব্বাস উল্লাহ্ শিকদার আমার সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর ভাই তারিকউল্লাহ্ শিকদার ছিলেন আমার অতি ঘনিষ্ঠ। এই ফিল্ম হাউসের তৈরি “বেদের মেয়ে জোস্‌না” ছবি সুপারডুপার হিট হয়েছিল। “মনের মাঝে তুমি” বক্স অফিস হিট করলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী–পুত্র, বিএনপি নেতা তারেক রহমান হলে গিয়ে সস্ত্রীক ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন। সে মুগ্ধতার প্রকাশ ও বাংলা ছায়াছবিকে উৎসাহিত করতে তারেক-জুবাইদা রহমান দম্পতি পূর্ণিমার উদ্দেশে লেখা একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই চিত্রনায়িকার বাসায়।’

এই স্মৃতিচারণা কেবল একটি নস্টালজিক তথ্য নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়—ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ, হলমুখী সংস্কৃতির সঙ্গে একধরনের সম্পর্ক। আজকের ঘটনাটি তাই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি পুনরাবৃত্তি; তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন সংকটের মধ্যে।

বাস্তবতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। একসময় যে দেশে শত শত প্রেক্ষাগৃহ ছিল, আজ সেখানে কার্যকর হলের সংখ্যা নেমে এসেছে হাতে গোনা পর্যায়ে; দেশের প্রায় ২৯টি জেলা এখন সম্পূর্ণ হলশূন্য। শহরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী হলগুলো একে একে হারিয়ে গেছে—কোনোটি ভেঙে মার্কেট হয়েছে, কোনোটি পরিণত হয়েছে গুদামে। ফলে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখা এখন আর স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক অভ্যাস নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

এ পরিবর্তন কেবল পরিসংখ্যান নয়, একটি সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট লক্ষণ। একসময় যেখানে শত শত প্রেক্ষাগৃহ ছিল, সেখানে এখন সক্রিয় আছে প্রায় ৬০টি। ঢাকার গুলিস্তান, নাজ, রাজমণি, শাবিস্তানের মতো হলগুলো এখন শুধু স্মৃতির অংশ। যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘মণিহার’ ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা চলছে, বগুড়ার আধুনিক ‘মধুবন সিনেপ্লেক্স’ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যে সিনেমা একসময় ছিল একটি সম্মিলিত সামাজিক অভিজ্ঞতা, তা ক্রমে ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রযোজনা ও প্রদর্শনের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে। নির্মাতারা ছবি বানাচ্ছেন, কিন্তু সেই ছবি পর্যাপ্ত স্ক্রিন পাচ্ছে না। দর্শকও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন ঘরে বসে কনটেন্ট দেখার দিকে। ফলে আমাদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ কমে গেছে, আমরা সামাজিকীকরণের সুযোগ হারাচ্ছি। প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও এর সঙ্গে তাল মেলানোর মতো নীতিগত প্রস্তুতি আমাদের ছিল না।

চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) অবস্থাও এই সংকটের প্রতীক। যে প্রতিষ্ঠান একসময় দেশের চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ তা অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ১৯৫৭ সালে যাত্রা করা এফডিসি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সর্বোচ্চ রাজস্ব দিয়েছিল ১৯৯৯-২০০০ সালে; যার পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এরপর রাজস্বের পরিমাণ কমতে থাকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এফডিসির উপার্জন ছিল ৬ কোটি ২৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৫৭ টাকা, কিন্তু সে বছর খরচ হয়েছে ২৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭৬৩ টাকা।

অথচ আমাদের দেশের ভালো চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনগুলোর পোস্টপ্রোডাকশনের কাজ ভারত বা অন্যান্য দেশ থেকে করিয়ে আনা হচ্ছে শুধু যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকের অভাবে। চলচ্চিত্রকারেরা মনে করেন, এসব সংকটের প্রধান কারণ শুধু সরকারের আর্থিক বরাদ্দের স্বল্পতাই নয়; বরং এফডিসি দীর্ঘদিন যোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাচ্ছে না।

এফডিসির উচিত এ মুহূর্তে পুরোনো যন্ত্রপাতি মেরামত করে আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ নতুন কর্মী নিয়োগ করা। সরকারের উচিত বিএফডিসি কমপ্লেক্স দ্রুত সমাপ্ত করা, স্বেচ্ছায় অবসর নিতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’–এর ব্যবস্থা করা, আওয়ামী সরকারের আমলে যে ফিল্ম সিটির প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তার দিকে এখনই নজর না দিয়ে লাইফ সাপোর্টে থাকা এফডিসিকে সারিয়ে তোলা।

এই ভূখণ্ডেই, পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র একসময় স্বর্ণালি অধ্যায় অতিক্রম করেছে। প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক দর্শকসংস্কৃতি ছিল দৃঢ়, চলচ্চিত্র ছিল জনজীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে ধারাবাহিক সাফল্যে গড়ে উঠেছিল একটি আত্মবিশ্বাসী শিল্পভিত্তি। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন সেই ধারাবাহিকতা টিকে ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তা ভেঙে পড়ে।

চলচ্চিত্রে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ক্লাস এফডিসিতে করলে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা এফডিসিমুখী হয়ে উঠবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলচ্চিত্র বিভাগের শিক্ষার্থীরা যন্ত্রের অভাবে ব্যবহারিক ক্লাস করতে পারছেন না; সরকারের সমন্বয় এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। দেশে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম স্টাডিজ বা মিডিয়াবিষয়ক বিভাগ থাকলেও সেগুলোর অবকাঠামো, কারিগরি সুবিধা এবং গবেষণার পরিবেশ অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক ক্যামেরা, সাউন্ড, পোস্টপ্রোডাকশন—এসবের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই কম। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পেলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিক্ষার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিটিআইয়ের নির্দিষ্ট কোনো ভবন নেই, নিয়মিত শিক্ষক নেই। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের বাইরের মানুষদের। ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো দৃশ্যমান নয়।

এসব গভীর সংকটের মধ্যেও একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে—আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ছে, স্বীকৃতিও মিলছে, বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে। তাই নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা বিকল্প পথ খুঁজছেন—কখনো বিদেশে, কখনো স্বল্প বাজেটের স্বাধীন প্রযোজনায়।

বিশ্বের অনেক দেশ চলচ্চিত্রকে এখন শুধু বিনোদন হিসেবে দেখে না; তারা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প খাত, এমনকি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স কিংবা হলিউড—সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখি রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে।

ভারতও এ বাস্তবতাকে অনেক আগে বুঝেছে। বলিউড ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্র মিলিয়ে তারা একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করেছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ডায়াসপোরা। ফলে ভারতীয় চলচ্চিত্র শুধু সাংস্কৃতিক প্রভাবই বিস্তার করছে না, নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছে।

অথচ এই ভূখণ্ডেই, পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র একসময় স্বর্ণালি অধ্যায় অতিক্রম করেছে। প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক দর্শকসংস্কৃতি ছিল দৃঢ়, চলচ্চিত্র ছিল জনজীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে ধারাবাহিক সাফল্যে গড়ে উঠেছিল একটি আত্মবিশ্বাসী শিল্পভিত্তি। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন সেই ধারাবাহিকতা টিকে ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তা ভেঙে পড়ে।

সব মিলিয়ে একটি ভাঙা চক্র তৈরি হয়েছে—হল নেই, তাই দর্শক নেই; দর্শক নেই, তাই বিনিয়োগ নেই; বিনিয়োগ নেই, তাই মানসম্মত চলচ্চিত্র কম; আর মানসম্মত চলচ্চিত্র না থাকায় দর্শক আরও সরে যায়। এই চক্র ভাঙার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, যেখানে প্রদর্শন, প্রযোজনা, শিক্ষা এবং বাজার—সবকিছুকে একসঙ্গে ভাবা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা হলে যাওয়ার প্রতীকী আহ্বানকে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন চলচ্চিত্রশিল্পের ভাঙা কাঠামো পুনর্গঠন। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগে চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

  • অনার্য মুর্শিদ লেখক, গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

    ই-মেইল: anarjomurshid@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব