চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে।

মতামত

ঢাকা-বেইজিং ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ও ঝুঁকির হিসাব-নিকাশ

চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সরকারি সফরটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এই সফরকে শিরোনামে নিয়ে এলেও এর তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি আরও সুসংহত করার আকাঙ্ক্ষাকেও প্রতিফলিত করে।

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার পুনর্বিন্যাস এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতার এই সময়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দিয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অন্যতম প্রধান উৎস।

চীনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার; আর বাংলাদেশের জন্য চীন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বৃহৎ বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে, যা দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম।

এই সফরে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারক মূলত বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা, আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন, সবুজ উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দীর্ঘমেয়াদি যৌথ কর্মপরিকল্পনা, চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের আওতায় সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানি, মান্দারিন ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গণমাধ্যমে তথ্য বিনিময়, সম্প্রচার প্রযুক্তি এবং গবেষণা ও মিডিয়া পার্টনারশিপের মতো ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

লক্ষণীয় যে এসব চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা; সামরিক বা নিরাপত্তা খাত এখানে প্রাধান্য পায়নি।
যদি উল্লিখিত চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারবে।

চীনা বিনিয়োগ শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন দেশের লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়াবে এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযোগকে আরও গভীর করবে।

একই সঙ্গে চীনের বাজারে কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানিতে সহযোগিতা দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে হলে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর।

এই প্রস্তাবিত করিডর চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নতুন অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে।

তবে এর বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মিয়ানমারের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত। চলমান গৃহযুদ্ধ, নিয়ন্ত্রণহীন নিরাপত্তা পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি এই করিডরের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে এটি দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর ভারতের নজরও কাড়ে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এটিকে কৌশলগত সতর্কতার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছে, বিশেষ করে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী প্রকল্পে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং প্রস্তাবিত করিডরকে ঘিরে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ ও উদ্বেগ উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। জাতীয় স্বার্থ কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ায় নয়; বরং বহুমাত্রিক কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখায় নিহিত। চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

অনেক ভারতীয় বিশ্লেষকের মতে, এই করিডর চীনের আঞ্চলিক প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে অন্য একটি মত হলো প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ভারতের উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সহযোগিতা আরও জোরদার করা।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। জাতীয় স্বার্থ কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ায় নয়; বরং বহুমাত্রিক কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখায় নিহিত।

চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

পাশাপাশি ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুকূল হওয়া অপরিহার্য।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-চীন শীর্ষ বৈঠক তাই কেবল ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূকৌশলগত গুরুত্বের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

যথাযথ নীতি প্রণয়ন, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন, লজিস্টিকস ও সংযোগকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

তবে এই অগ্রযাত্রার সফলতা নির্ভর করবে সুদৃঢ় শাসনব্যবস্থা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের সক্ষমতার ওপর।

  • রিয়াজুল ইসলাম সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব