সপ্তাহ দুই দেশের বাইরে ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে যেসব বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হয়েছে, প্রথম দিকে সবার উদ্বেগাকুল প্রশ্ন ছিল, নির্বাচন হবে তো? কিন্তু দেশের কিছু ঘটনায় পরে তাঁদের মনে এই প্রতীতি জন্মে যে নির্বাচনের বিকল্প নেই। বিশেষ করে তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর সবাই ধরে নিয়েছেন নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, সেই সিদ্ধান্তও হয়েছিল লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে।
সিডনিতে বেশ কয়েকজন প্রবাসী বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা হলো। তাঁদের কেউ ইতিমধ্যে দেশে এসেছেন, কেউ আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার চেয়ে তাঁদের বেশি আগ্রহ দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে।
সপ্তাহ তিন আগে দেখলাম আসন ভাগাভাগি নিয়ে বিএনপির সঙ্গে মিত্রদের বেশ টানাপোড়েন চলছিল। বিএনপির সঙ্গে দর-কষাকষিতে সুবিধা করতে না পেরে এনসিপিসহ কোনো কোনো দল জামায়াত শিবিরে ভিড়েছে। কেউ আলাদা জোট গঠন কিংবা এককভাবে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন যে হারে প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করেছিল, তাতে অনেকের কপাল পুড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে কমিশন অনেকটা সদয় হয়ে একের পর এক বাতিল হওয়া প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করলে বিএনপি শিবিরে স্বস্তি ফিরে আসে। বাতিলের তালিকায় তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। অতীতে যাচাই–বাছাইয়ে এত বেশি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে ফের বৈধ ঘোষণার নজির নেই।
জোট নিয়ে জামায়াত শিবিরে নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল, বিএনপির বাইরের সব দলকে নিয়ে তারা জোট করবে। সেটা সফল হয়নি। এরপর বলা হলো ধর্মভিত্তিক সব দল তাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সেখানেও তাঁদের হোঁচট খেতে হয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আগেই বিএনপির ছাতার নিচে নিজেদের নিরাপদ মনে করেছে।
তবে জামায়াতের সাফল্য হলো ধর্মীয় রাজনীতির বাইরের কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিতে পারা। বিশেষ করে জুলাই যোদ্ধাদের দল হিসেবে পরিচিত এনসিপি ও কর্নেল অলি আহমদের এলডিপি তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। একদা যাঁরা জামায়াতকে রাজাকারের দল বলতেন, তাঁরাই তাদের সঙ্গে ভিড়েছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাবেক বিএনপি নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানকে দলে নিয়ে ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়েও জামায়াত একাত্তরের দায় কিছুটা শোধ করেছে বলে অনেকে মনে করে থাকেন।
জুলাই যোদ্ধাদের দল এনসিপির একটি স্ববিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি বলে মনে করি। স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টির প্রার্থিতা বাতিল করার জন্য তারা নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছে। আবার ১০–দলীয় জোটে এমন দল আছে, যারা চব্বিশের আমি-ডামির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তারা নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও জোট ভবিষ্যতে তাদের মূল্যায়ন করার কথা বলেছে এবং এনসিপি সেটা মেনেও নিয়েছে। প্রশ্ন হলো জাতীয় পার্টি ১০–দলীয় জোটে আসতে চাইলে তাদেরও বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি না।
কিন্তু নির্বাচনী যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে জয় ছিনিয়ে আনতে যে শক্তি ও সামর্থ্য দরকার, সেটা কোন দল বেশি দেখাতে পারবে তা এখন অনেকের কাছে পরিষ্কার। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, অনেক টানাপোড়েন, দেনদরবার ও শেষ মুহূর্তে টানা বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০টি দল নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই উদ্যোগে শুরু থেকে যুক্ত থাকা ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত থাকেনি। শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে দলের নেতারা জানিয়েছেন, ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। এর মধ্যে আপিলে দুজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। বাকি ২৬৮ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী এখন পর্যন্ত মাঠে কাজ করছেন। আমরা তাঁদের নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি, তাঁরা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একজনও তাঁরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না।’
বৃহস্পতিবার ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি ২৫৩ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় জোট। তখনো তাদের আশা ছিল ইসলামী আন্দোলন জোটে থাকবে। কিন্তু শুক্রবারের ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটা নিশ্চিত হলো যে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচন করছে, কোনো জোটে যাচ্ছে না।
ঘোষিত নির্বাচনী সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ১৭৯ আসনে প্রার্থী দেবে। বাকি আসনগুলোর মধ্যে এনসিপি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৭টি, এবি পার্টি ৩টি, বিডিপি ও নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি করে আসনে প্রার্থী দেবে। কিছু আসন উন্মুক্ত থাকবে।
ইসলামপন্থীদের ভোট ‘এক বাক্সে’ নেওয়ার লক্ষ্যে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ শুরুতে ৮টি, পরে ১১টি দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে দফায় দফায় বৈঠক-আলোচনা করেও সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। বিশেষ করে এক সপ্তাহ ধরে একাধিক দফায় আলোচনা এবং গত বুধবার রাতে টানা বৈঠক হলেও জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে বাদ রেখেই ১০ দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম না থাকায় ইসলাম অনুসারীদের সব ভোট এক বাক্সে পড়ার সম্ভাবনা আগেই তিরোহিত হয়েছিল। এখন ইসলামী আন্দোলন আলাদা নির্বাচন করলে জামায়াতে ইসলামী জোট বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। চরমোনাই পীরের অনুসারী ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি যা–ই হোক, প্রতিটি আসনে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোট আছে। নিজ দলের প্রাথীকে জয়ী হওয়ার জন্য এই ভোট যথেষ্ট না হলেও জয়–পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
জামায়াত জোটের এই হাল দেখে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের কথা মনে পড়ল। সেই নির্বাচনের আগে মাঠের রাজনীতিতে সবচেয়ে বলবান আওয়ামী লীগ জোট গঠন নিয়ে শরিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে গিয়ে লেজেগোবরে করে ফেলে। ১৫ দলের শরিক অনেক দল জোট থেকে বেরিয়ে যায়। আবার যারা জোটে ছিল, তাদের প্রতিও বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়। একানব্বইয়ের নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পেছনে খালেদা জিয়ার ক্যারিশমা যেমন কাজ করেছে, তেমনি আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পেছনে দলীয় নেতাদের আত্মম্ভরিতা ও নড়বড়ে জোটও কম দায়ী নয়। অনেক আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে শরিক দলের প্রার্থী দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।
এবার ভিন্ন বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচন করতে পারছে না। বিভক্ত জাতীয় পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী লড়াইটি বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০–দলীয় জোটেরই হওয়ার কথা।
নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে কোনো দল যদি মনে করে জয় তাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, সেটাও আত্মঘাতী হতে পারে।
সবশেষে জুলাই যোদ্ধাদের দল এনসিপির একটি স্ববিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি বলে মনে করি। স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টির প্রার্থিতা বাতিল করার জন্য তারা নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছে। আবার ১০–দলীয় জোটে এমন দল আছে, যারা চব্বিশের আমি-ডামির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তারা নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও জোট ভবিষ্যতে তাদের মূল্যায়ন করার কথা বলেছে এবং এনসিপি সেটা মেনেও নিয়েছে। প্রশ্ন হলো জাতীয় পার্টি ১০–দলীয় জোটে আসতে চাইলে তাদেরও বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি না।
● সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি
*মতামত লেখকের নিজস্ব