বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা শুরু। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ। বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬
বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা শুরু। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ। বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

মতামত

নির্বাচন, নির্বাচন, নির্বাচন—এখন আর কিসের সংশয়!

অবশেষে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু হয়ে গেল। এর আগে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থী ফরম সংগ্রহ ও জমাদান, প্রার্থিতা যাচাই–বাছাই, আপিল, চূড়ান্ত প্রার্থিতা ঘোষণা ইত্যাদি নিয়ে সরগরম পরিস্থিতিও দেখা গেল।

প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি নিয়ে তর্কবিতর্কও ছিল চরমে। অর্থ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন: আগামী নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবে না; কিন্তু সেটি হয়নি। ভোটের মাঠে চলে এসেছেন ৪৫ জন ঋণখেলাপি। ‘মনোনয়ন বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা কিন্তু দিয়ে দিয়েন’—এমন বক্তব্য দিয়ে বড় ঋণখেলাপিকেও নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক অবস্থানের দুর্বলতা আবারও প্রকাশ পেল। যা–ই হোক, প্রতীকও বরাদ্দ হয়ে গেছে, এখন আমরা নির্বাচনের দিকেই এগোতে থাকি।

নির্বাচনের ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়ে যায় তফসিল ঘোষণার পর থেকেই। এরপর নির্বাচন নিয়ে আর সংশয় থাকে না। মানে থাকা উচিত নয়। এরপরেও একটা সংশয় থেকে যায়। কারণ, সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্বাচন পিছিয়ে গিয়েছিল প্রায় দুই বছর।

সেই উদারহণ টেনে নির্বাচন নিয়ে সংশয়বাদীরা বা যাঁরা আক্ষরিক অর্থেই এই নির্বাচন চান না, তাঁদের তির্যক মন্তব্য ছিল—তফসিল ঘোষণা হয়েছে কী হয়েছে, এরপরেও নির্বাচনের কোনো গ্যারান্টি নেই।

নির্বাচন না হোক, সেটি কারা চান না আসলে? প্রথমেই বলতে হবে, ক্ষমতাচ্যুত শক্তি। সেটি তারা আনুষ্ঠানিকভাবেই প্রকাশ করে থাকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞায় পড়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারিয়েছে তারা। ফলে তাদের ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে, সেটি স্বাভাবিকভাবেই তারা চাইবে না।নির্বাচনবিরোধী নানা প্রচার-প্রচারণাও তারা চালিয়ে যাচ্ছে।

জনমনে আরেকটা পক্ষ নিয়ে আলোচনা আছে, সরকারের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা হয়তো ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার পক্ষে। এমন তো হতেই পারে, কারণ সব সরকারেই কোনো না কোনো পক্ষ থাকে যাঁরা ‘ক্ষমতার স্বাদ’ সহজে ছাড়তে চান না।

আরেকটি পক্ষ নিয়েও জোরেশোরে আলোচনা আছে—রাজনৈতিক গোষ্ঠী। কোনো কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী এখন ক্ষমতায় না থাকলেও সর্বত্র ক্ষমতাচর্চার অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে মানুষকে বলতে শোনা যায়—কিসের ইন্টেরিম! অমুকরাই তো এখন দেশ চালাচ্ছে! নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার গঠিত হলেই সেই গোষ্ঠীর ক্ষমতাচর্চার সুযোগ আর থাকবে না, যদি না সেই গোষ্ঠী নির্বাচনে জিতে না আসে।

এরপর বিদেশি শক্তি তথা ভারতসহ পশ্চিমা দেশগুলোরও আওয়ামী লীগকে ছাড়া এ নির্বাচন নিয়ে আপত্তি ছিল; সেটি যদিও ধীরে ধীরে কেটে গেছে।  

নির্বাচনের পথ মসৃণ নয়। ঘটনা-অঘটন-সহিংসতা নানা কিছুই নিয়ে প্রতিটি নির্বাচনের পথ পেরোতে হয়েছে দেশকে। আসন্ন নির্বাচনের আর কয়েক সপ্তাহ বাকি রয়েছে, সেই সময়ের মধ্যেও অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাদের এবং কেন? অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকে নির্বাচনের দাবি উঠতে থাকে। এরপর আগে সংস্কার নাকি আগে নির্বাচন, তা নিয়ে তর্কবিতর্কও চলে। তখন সংস্কারের প্রশ্নে উন্মুখ ছিল গোটা জাতি। ফলে যাঁরা নির্বাচন চান, তাঁদের সংস্কারবিরোধী বলে একপ্রকার চাপেও ফেলা হয়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে, তা নিয়েও অস্পষ্টতা তৈরি হয়। ইউনূস সরকারকে পাঁচ বছর চাই—এমন ক্যাম্পেইনও চলে। কোনো কোনো উপদেষ্টা এমন আগ্রহও প্রকাশ করেন।

তবে আমরা দেখি, আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত ‘উন্নয়ন’ শব্দের মতো ‘সংস্কার’ শব্দেরও একই পরিণতি হতে থাকলে নির্বাচনের প্রতিই জনমত বাড়তে থাকে। ডিসেম্বরেই নির্বাচন করতে হবে—এমন রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়। অবশেষে লন্ডনে ইউনূস-তারেকের বৈঠকে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পরও নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

নির্বাচন যথাসময়েই হবে; এক দিন আগেও না, পরেও না, ঘোষিত তারিখেই নির্বাচন হবে; নির্বাচন কেউ ঠেকাতে পারবে না, কোনো ষড়যন্ত্রই নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না—নানাভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও মানুষ নির্বাচন নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছিল না কয়েকটি কারণে।

নির্বাচনের জন্য সরকারের প্রস্তুতি মানুষের কাছে স্পষ্ট হচ্ছিল না। মব সহিংসতার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, উগ্রপন্থার উত্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অনিশ্চিয়তা তৈরি করে। সেই সঙ্গে নির্বাচনবিরোধী পক্ষগুলোর নানা তৎপরতা, অপপ্রচার, গুজব এবং কিছু কানাঘুষাও এখানে সন্দেহ তৈরি করে। সেটি আরও বেশি জোরালো হয় তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঢাকার একটি আসনের সম্ভাব্য আলোচিত প্রার্থী ও জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।

জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু। রাজধানীর মিরপুর–১০ এলাকা থেকে, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬। এনসিপিসহ ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ সেখানে বক্তব্য দেন

এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষোভকে পুঁজি করে একটা গোষ্ঠী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করল তাতে জনমনে নির্বাচন নিয়ে সংশয় আরও বেশি জোরালো হয়।

যদিও পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার মৃত্যু, এর আগে তারেক রহমানের বহুল প্রত্যাশিত আগমন, খালেদা জিয়ার মহাসমুদ্রসম জানাজা, খালেদার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহলের তারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সমবেদনা প্রকাশ—এসব ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশই তৈরি করে।

যদিও সচেতন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একাংশের এ–ও প্রবল ধারণা ছিল—সরকারের ঘোষিত সময়েই নির্বাচন হবে। শাসনকার্য পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকার এতটা ‘তালগোল’ পাকিয়ে ফেলেছে, নির্বাচন না দিয়ে তার আর উপায় নেই।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আসিফ বিন আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন পেছানো হলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটি সামাল দেওয়ার শক্তি সরকার বা জনগণের কারও থাকবে না। রক্তাক্ত একটা গণ-অভ্যুত্থানের ঘা এখনো শুকায়নি, এই জাতীয় ট্রমা দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের। সেখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সহিংসতা তৈরি হলে যে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে তাতে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকিই তৈরি হবে।’

নির্বাচন হবে কি না, সেই সংশয়ের চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বের বিষয়—নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, নিরাপত্তার সঙ্গে করতে পারছে অন্তর্বর্তী সরকার? বলতে দ্বিধা নেই, এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ইউনূস সরকারের এটিই শেষ পরীক্ষা। দেখা যাক, সেই পরীক্ষায় তারা কতটা পাস করতে পারে।  

আসিফ বিন আলী আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোও যত “দর-কষাকষি” কৌশলের খেলায় লিপ্ত থাকুক, তারা ভালো করেই জানে এবারের নির্বাচন বানচাল হলে তার ভুক্তভোগী হতে হবে তাদেরই বেশি। ক্ষমতায় যাওয়ার পথ থেকে বা প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ থেকে তারা আরও বেশি ছিটকে পড়বেন। পরবর্তী নির্বাচন তখন ক্ষমতাচ্যুত শক্তি ছাড়া গ্রহণযোগ্য হবে না বলে বিদেশি শক্তিও জানিয়ে দিতে পারে।’

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া, গণভোট, ধারাবাহিক সংস্কার প্রক্রিয়া—সব কিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

ফলে আরও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী বলতেই হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন যেকোনো প্রকারে হয়ে যাবেই। এটা আর ঠেকানো যাবে না। সচেতন নাগরিক পরিসরেও এমন আলোচনা পোক্ত হয়েছে। নির্বাচন হবে কি না, সেই সংশয়ের চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বের বিষয়—নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, নিরাপত্তার সঙ্গে করতে পারছে অন্তর্বর্তী সরকার? বলতে দ্বিধা নেই, এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ইউনূস সরকারের এটিই শেষ পরীক্ষা। দেখা যাক, সেই পরীক্ষায় তারা কতটা পাস করতে পারে। 

এরপরও কি সংশয়, বিরোধিতা, ষড়যন্ত্র থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। নির্বাচনের পথ মসৃণ নয়। ঘটনা-অঘটন-সহিংসতা নানা কিছুই নিয়ে প্রতিটি নির্বাচনের পথ পেরোতে হয়েছে দেশকে। আসন্ন নির্বাচনের আর কয়েক সপ্তাহ বাকি রয়েছে, সেই সময়ের মধ্যেও অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। সেসব ধাক্কা সামলিয়েই নির্বাচন হতে হবে, হয়ে যাবে। নির্বাচন পেছানোর, ঠেকানোর বা বানচালের আর সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় এক আড্ডায় তিনি বলছিলেন, ‘নির্বাচনের পক্ষে বা বিপক্ষে পাওয়ার সেন্টারগুলো খেয়াল করুন। নির্বাচনের পক্ষের পাওয়ার সেন্টারই এগিয়ে গেছে। দু–একটি দল ছাড়া বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক মহল, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আর সর্বোপরি জনগণ নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। ফলে এখানে নির্বাচন না হওয়ার সুযোগ নেই।’

এরপরও নির্বাচনের বিপক্ষে থাকাদের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শক্তি বলেন কিংবা দেশে বা দেশের বাইরের নানা শক্তি বলেন, যারা নির্বাচনবিরোধী বা কোনোভাবেই নির্বাচন হতে দিতে চায় না, শেষ দিন পর্যন্ত তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে একটা অ্যানার্কি তৈরি করা। সেটি আসলে ব্যর্থই হবে।’  

নানা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দেরিতে হলেও নির্বাচনী ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে বলা যায়। গত তিনটা বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রায় গোটা দেশ এখন আগামী নির্বাচনের জ্বরে ভুগছে। পুরোনো প্রজন্ম ভোটের স্মৃতিতে কাতর। নতুন প্রজন্ম অধীর অপেক্ষায় জীবনের প্রথম ভোটের জন্য। প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো ভোট প্রদানের সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাও ভোট দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন।

চিরায়ত নিয়ম অনুযায়ী একেক দল একেকভাবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে—কেউ পীরের মাজার, প্রয়াত নেতার কবর বা মা–বাবার কবর জিয়ারত করে বা তাঁদের সালাম করে। রাজনৈতিক দলের প্রধানেরা জেলায় জেলায় সফরে চলে গিয়েছেন। এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে প্রচারণা ঢেউ, প্রতীকের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। এখন শুধু—নির্বাচন, নির্বাচন আর নির্বাচন।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী।
    ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব