একজন শিক্ষার্থী তাঁর থিসিস জমা দেওয়ার আগে টার্নিটিনে পরীক্ষা করলেন। টার্নিটিন হচ্ছে প্লেজিয়ারিজম বা লেখা চুরি শনাক্তকরণ সফটওয়্যার। এখন রিপোর্টে দেখা গেল, সিমিলারিটি বা মিল ৮ শতাংশ। তিনি স্বস্তি পেলেন, ‘মাত্র ৮ শতাংশ, তাই কোনো সমস্যা নেই।’ অন্যদিকে, আরেকজন গবেষকের গবেষণাপত্রে সিমিলারিটি ৩০ শতাংশ হওয়ায় প্রশ্ন উঠল, ‘এত বেশি মিল, নিশ্চয়ই প্লেজিয়ারিজম বা কুম্ভীলকবৃত্তি হয়েছে!’ কিন্তু ৮ শতাংশ কি সত্যিই নিরাপদ? আর ৩০ শতাংশ কি সত্যিই প্লেজিয়ারিজমের প্রমাণ?
দুটি ধারণাই ভুল হতে পারে। কারণ, সিমিলারিটি বা লেখার মিল এবং প্লেজিয়ারিজম বা কুম্ভীলকবৃত্তি এক জিনিস নয়। সিমিলারিটি হলো জমা দেওয়া কোনো লেখার সঙ্গে বিদ্যমান বিভিন্ন উৎসের পাঠ্যগত মিলের একটি পরিমাপ। আর প্লেজিয়ারিজম হলো অন্যের লেখা, ধারণা, তথ্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া নিজের বলে উপস্থাপন করা, যা একটি নৈতিক ও একাডেমিক লঙ্ঘন। প্রথমটি সফটওয়্যার শনাক্ত করতে পারে; দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করতে প্রয়োজন প্রেক্ষাপটনির্ভর মানবিক বিচার।
তাহলে প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘কত শতাংশ মিল গ্রহণযোগ্য?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘মিল কোথায়, কীভাবে এবং কেন তৈরি হয়েছে?’
টার্নিটিন বা আইথেনটিকেটের মতো শনাক্তকরণ সফটওয়্যার জমা দেওয়া লেখাকে বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে তুলনা করে; মিল পাওয়া শব্দ, বাক্য বা অংশ শনাক্ত করে এবং সম্ভাব্য উৎস দেখায়। এরপর একটি সিমিলারিটি রিপোর্ট তৈরি হয়, যেখানে মিলের পরিমাণ শতাংশ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সে মিল কুম্ভীলকবৃত্তি কি না, সেটি সফটওয়্যার নিজে নির্ধারণ করে না।
আমাদের নীতি হওয়া উচিত সিমিলারিটি মাপুন সতর্কভাবে। প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করুন গভীরভাবে। সিদ্ধান্ত নিন ন্যায়সংগতভাবে। কারণ, একাডেমিক সততা কোনো সফটওয়্যারের স্কোরে মাপা যায় না; এটি গড়ে ওঠে সততা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়সংগত একাডেমিক চর্চার মাধ্যমে।
এখানেই আমাদের প্রচলিত চিন্তার পরিবর্তন প্রয়োজন। ধরা যাক, একটি গবেষণাপত্রে মিল মাত্র ৫ শতাংশ। কিন্তু সেই ৫ শতাংশ যদি অন্য একজন গবেষকের একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ থেকে হুবহু নেওয়া হয় এবং কোনো উদ্ধৃতি বা সূত্র উল্লেখ না থাকে, তাহলে এটি গুরুতর কুম্ভীলকবৃত্তি হতে পারে। বিপরীতে, অন্য একটি গবেষণাপত্রে মিল ৩০ শতাংশ হলেও যদি তার বড় অংশ আসে তথ্যসূত্র, প্রচলিত গবেষণাপদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ও যথাযথভাবে উদ্ধৃত অংশ থেকে, তাহলে সেটি কুম্ভীলকবৃত্তি না-ও হতে পারে। অর্থাৎ, ৫ শতাংশও গুরুতর হতে পারে, আবার ৩০ শতাংশও বৈধ হতে পারে।
আমার নিজের গবেষণা-অভিজ্ঞতাতেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ রয়েছে। একবার আমার একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীর থিসিসে প্রায় ৭০ শতাংশ মিল পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর থিসিসের গবেষণার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল, ফলে সিমিলারিটির বড় একটি অংশই তাঁর পূর্বপ্রকাশিত গবেষণা থেকে এসেছিল। শুধু সিমিলারিটি কমানোর জন্য থিসিসের ভাষা পরিবর্তন করতে বলা হলেও আমরা তাতে সম্মত হইনি। কারণ, আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ওই থিসিসে অন্য কারও ধারণা, লেখা বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া নিজের বলে উপস্থাপন করা হয়নি।
একটি সিমিলারিটি স্কোরে থাকতে পারে যথাযথভাবে উদ্ধৃত বক্তব্য, তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি, প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, গবেষণাপদ্ধতির মানসম্মত বর্ণনা, বহুল ব্যবহৃত বাক্যাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক টেমপ্লেটের ভাষা এবং নিজের পূর্ব প্রকাশিত লেখার নীতিসম্মত পুনর্ব্যবহার। আবার এর মধ্যেই থাকতে পারে অন্যের লেখা যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া কপি করার ঘটনা। তাই সব ধরনের মিল একাডেমিক অসদাচরণ নয়। বৈধ মিল ফিল্টার করা যেতে পারে; তবে অবশিষ্ট মিলও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। সুতরাং একটি রিপোর্ট দেখার সময় প্রশ্ন হওয়া উচিত: কী মিলেছে? কোথা থেকে এসেছে? কেন মিলেছে? কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি না?
এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই আলোচনাকে আরও জটিল করেছে। কোনো সফটওয়্যার হয়তো বলছে, ‘সিমিলারিটি ৩০ শতাংশ’; অন্যটি বলছে, ‘৮৫ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে লেখাটি এআই-নির্মিত।’ এ দুটি সংখ্যা কি একাই একাডেমিক অসদাচরণের সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? উত্তর হলো, না।
এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার লেখার কিছু ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এআই-নির্মিত লেখার সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের একটি সম্ভাবনা বা ইঙ্গিত দেয়। এটি আরও পরীক্ষা করার জন্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এআই ব্যবহার করা হয়েছে কি না, লেখাটি কে লিখেছেন কিংবা সেই ব্যবহার কোনো নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কি না, এসব বিষয়ে এটি চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে পারে না।
সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক একটি পরিসংখ্যানগত উদাহরণে দেখা যায়, এক হাজারটি লেখার মধ্যে ২৬টি সঠিকভাবে এআই-নির্মিত হিসেবে শনাক্ত হওয়ার বিপরীতে ৯০টি মানব-লিখিত লেখা ভুলভাবে এআই-নির্মিত হিসেবে শনাক্ত হতে পারে; সে ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণের অনুপাত ছিল প্রায় ৭৮ শতাংশ (তথ্যসূত্র: নেক্সট রিসার্চ, ৭, ১০১৩৯৬, ২০২৬)। তবে এটি সব এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ভুল শনাক্তকরণের হার নয়; নির্দিষ্ট কিছু অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি এই উদাহরণ এ ধরনের ফলাফলকে একক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা দেখায়।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? শুধু প্রশ্ন করা যাবে না, ‘সফটওয়্যার কী বলছে?’ বরং প্রশ্ন করতে হবে, ‘প্রমাণ কী বলছে?’ লেখাটি কি লেখকের নিজের বোঝাপড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? উৎস যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়েছে কি? গবেষণাপদ্ধতি, তথ্য ও লেখকত্ব বিশ্বাসযোগ্য কি? সংশ্লিষ্ট নীতিমালা কী বলছে? অসদাচরণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কি?
সিমিলারিটি যাচাইয়ের প্রয়োজন অবশ্যই আছে; একটি নির্দিষ্ট সীমা প্রাথমিক বাছাইয়ে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কখনো চূড়ান্ত রায় নয়। কুম্ভীলকবৃত্তি প্রতিরোধের দায়িত্বও কেবল সফটওয়্যারের নয়। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে অন্যের অবদানকে যথাযথ সম্মান করা, প্রকৃত অর্থে ভাবান্তর করা, নিজের চিন্তার বিকাশ ঘটানো, তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনা ও এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রযুক্তির সক্ষমতার নয়; প্রশ্নটি আমাদের একাডেমিক সংস্কৃতির।
তাই আমাদের নীতি হওয়া উচিত সিমিলারিটি মাপুন সতর্কভাবে। প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করুন গভীরভাবে। সিদ্ধান্ত নিন ন্যায়সংগতভাবে। কারণ, একাডেমিক সততা কোনো সফটওয়্যারের স্কোরে মাপা যায় না; এটি গড়ে ওঠে সততা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়সংগত একাডেমিক চর্চার মাধ্যমে।
মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বুয়েট। ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ফিজিকস, যুক্তরাজ্য এবং রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি, যুক্তরাজ্য
m.basith75@gmail.com