
ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় পৌঁছেছে। আগামীকাল ১৯ জুন শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা। এর মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় এলাকায় স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। তবে এই সমঝোতা কতটুকু টেকসই হবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়ে গেছে।
ইরানের মহাকৌশল বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ইরাক-ইরান আট বছরের যুদ্ধের পর থেকেই ইরান ভবিষ্যৎ সংঘাত এবং এর সম্ভাব্য পরিণতির জন্য মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। গত বছরের ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধেই তারা তাদের সক্ষমতার একটি পরীক্ষা চালিয়েছিল। ওই যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
সংক্ষিপ্ত সেই যুদ্ধের পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু মোসাদের প্রতিবেদন এই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। নেতানিয়াহু ওই ধরনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এই বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন, যা অতীতের কোনো প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।
এ বছরের ১০৭ দিনের যুদ্ধে ইরানের কৌশল ছিল তুলনামূলকভাবে সরল, কিন্তু দৃঢ়। তারা এই যুদ্ধকে ‘বেঁচে থাকার লড়াই, যা মৃত্যুর চেয়ে কঠিন’ বলে বিবেচনা করে এসেছে। এই মনোভাব নিয়েই ইরানের সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃত্বের পাশে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ অনেকেই ধারণা করেছিল, ইরান হয়তো টিকতে পারবে না; দেশটি ভেঙে পড়বে—এমনকি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। বাস্তবে ইরান আরও শক্তিশালী হয়েছে। সম্ভবত ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা ইরানের তিন হাজার বছরের অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীরতা অনুধাবন করতে পারেননি।
এই যুদ্ধে ইরান শুধু আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পাল্টা আক্রমণও চালিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাঁটিগুলোর ওপর। ইসরায়েলকে বৈরুত অঞ্চলে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একাধিকবার হামলা চালিয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি উপস্থিতি ও তথাকথিত আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেছে যে তাদের লক্ষ্য কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, আরব রাষ্ট্র নয়।
অন্যদিকে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এটি তাদের সামরিক কৌশলের একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই পুরো যুদ্ধে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হলো, প্রয়োজনে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ করবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে ট্রাম্প) যখন বুঝতে পারেন, তাঁরা নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল, অজনপ্রিয় এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে পরিণত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু মিত্রকেও হারায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়ে।
বিশ্ববাজারে তথা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম ক্রমাগত বাড়ছিল। অন্যদিকে রাশিয়া, বিশেষ করে চীনকে ইরানের সমর্থন থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়। বাস্তবে চীন পরোক্ষভাবে ইরানের জ্বালানির ওপর প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ভরশীল, যা থামানো সম্ভব হয়নি। একই সময়ে ইরানের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তান ইরানের জন্য তিনটি সমুদ্রবন্দর এবং পাঁচটি যোগাযোগপথ উন্মুক্ত করে দেয়।
ইরানের জনগণ যে দেশপ্রেমের উদাহরণ দেখিয়েছেন এবং এত বিতর্কের মধ্যেও দেশের নেতৃত্বের প্রতি যে আস্থা বজায় রেখেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। এমন এক অস্তিত্বসংকটের সময় পুরো জাতি প্রমাণ করেছে যে তারা সহজে ভেঙে পড়বে না।
সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরও নিশ্চিত পরাজয় এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেয়। পাকিস্তান সুন্নিপ্রধান দেশ হলেও এই যুদ্ধে নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। উল্লেখযোগ্য যে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও কয়েকটি দেশ নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য উভয় পক্ষের প্রশংসা পেয়েছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশও ছিল। এবার পাকিস্তান দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে উভয় পক্ষ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর আস্থা অর্জন করে।
ফলে গত রোববার (১৪ জুন) উভয় পক্ষের সম্মতিতে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিনে ঘটে।
গত রোববার যে সমঝোতা স্মারকটি গৃহীত হয়েছে, সেখানে সব পক্ষ যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়া হয়েছে এবং আটকে থাকা কয়েকটি জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল শুরু করেছে। জেনেভায় ১৯ জুন চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে ১৪ দফা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রথমত, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান কতটা ছাড় দেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তারা কি ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ দাবি করবে—এটি একটি বড় প্রশ্ন। ইরান তার ইউরেনিয়াম অন্য কোনো দেশে হস্তান্তর করতে অনিচ্ছুক।
দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হবে কি না বা কোথাও প্রতীকী উপস্থিতি রাখা হবে কি না—এ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইরান ইতিমধ্যেই এসব দেশকে বার্তা দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নির্ভরযোগ্য রক্ষাকর্তা নয়। একই সঙ্গে তারা গালফ দেশগুলোর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ বার্তাও দিয়েছে।
তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এটি ইরান ও ওমানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পথে পরিণত হবে—তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের অবসান এবং লেবানন থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
এই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে প্রতিটি পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এবং এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে দেশটির অধিকাংশ মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে আগ্রহী। তবে বাস্তব বিশ্লেষণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয় হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে অক্টোবরে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে তাঁর জোটের পরাজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার কাছাকাছি ফলাফলও তিনি অর্জন করতে পারেননি। ফলে দক্ষিণ লেবানন, পশ্চিম তীর এবং সিরিয়ার দখলকৃত অঞ্চলকে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর অংশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।
ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ আপাতত সাফল্য পাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা যায়, এই যুদ্ধে ইরানের কৌশলগত বিজয় ঘটেছে। শুধু বিজয়ই নয়, এ অঞ্চলে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা তুলে নিলে দেশটি আরও শক্তিশালী এবং প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এতে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
ইতিমধ্যে পাকিস্তানের ইতিবাচক ভূমিকার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরানের জনগণ যে দেশপ্রেমের উদাহরণ দেখিয়েছেন এবং এত বিতর্কের মধ্যেও দেশের নেতৃত্বের প্রতি যে আস্থা বজায় রেখেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। এমন এক অস্তিত্বসংকটের সময় পুরো জাতি প্রমাণ করেছে যে তারা সহজে ভেঙে পড়বে না।
এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব ভূরাজনীতিতে যে পরিবর্তন আনবে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের মতো দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া কোন পথে যাবে—তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।
● ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
* মতামত লেখকের নিজস্ব