ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান

মতামত

বিএনপির ইশতেহার: গণভোটে ‘হ্যাঁ’, ইশতেহারে ‘না’

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা সংস্কার কমিশনের এই প্রস্তাবেতে বিএনপি শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে।

জুলাই সনদে তাদের এই ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি এই পত্রিকায় একটি কলামে লিখেছিলাম, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত; ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতির নির্বাচনের মৌলিক দুর্বলতার সুযোগে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোটেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শাসক দলগুলো বারবার সংবিধানকে নিজেদের মতো করে কাটাছেঁড়া করেছে, যা আদতে স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছে।

এই আত্মঘাতী প্রবণতা রোধ করতে হলে উচ্চকক্ষকে হতে হবে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক, যেখানে ভোটের সংখ্যানুপাতে সব দলের উপস্থিতি থাকবে। আর সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এই উচ্চকক্ষের অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একটি দল চাইলেই সহজে রাষ্ট্র পরিচালনার ‘খেলার নিয়ম’ বা মৌলিক নীতিগুলো একপক্ষীয়ভাবে বদলে ফেলতে না পারে। (সূত্র: মৌলিক সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট রাখলে জুলাই সনদ হবে মূল্যহীন, ৩ নভেম্বর, ২০২৫)

যেহেতু অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ এবং সংবিধান সংশোধনে এর ভূমিকার পক্ষে অনড় ছিল, তাই অন্তর্বর্তী সরকার বাধ্য হয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

গণভোটের প্রশ্নের ‘খ’ প্রস্তাবে আনুপাতিক উচ্চকক্ষের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য—যখন দলগুলো একমত হতে পারে না, তখন জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আশার কথা ছিল, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, গণভোটের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং কয়েকটি সমাবেশে এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এতে মনে হয়েছিল, হয়তো বিএনপি এই ইস্যুতে নমনীয় হচ্ছে এবং গণরায় মেনে নিতে প্রস্তুত।

আমাদের বুঝতে হবে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মূল উদ্দেশ্য কেবল ‘পণ্ডিতদের আড্ডাখানা’ তৈরি করা নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো একপক্ষীয় ও স্বেচ্ছাচারী সংবিধান সংশোধন রোধ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে কোনো দল মাত্র ৪০ শতাংশের ঘরে ভোট পেয়েও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বাগিয়ে নেয়।

কিন্তু সম্প্রতি বিএনপি যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানে উচ্চকক্ষ গঠনের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু হতাশাজনকই নয়; বরং স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নয়। এই প্রস্তাব গণভোটের ‘খ’ প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পূর্ববর্তী সমর্থনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার হুবহু অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করার প্রস্তাবটি কার্যত অর্থহীন। যদি উচ্চকক্ষের গঠন নিম্নকক্ষের মতোই হয়, তবে আলাদা একটি কক্ষ রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? বিএনপি হয়তো বলবে, তারা বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনদের এখানে আনতে চায়; কিন্তু যদি উদ্দেশ্য শুধুই বিশেষজ্ঞ বা বিশিষ্টজনদের মতামত নেওয়া হয়, তবে ক্ষমতাসীন দল চাইলেই একটি ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করতে পারে। এর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে, আইনসভার আদলে একটি ক্ষমতাহীন ও নিম্নকক্ষের প্রতিচ্ছবিসম উচ্চকক্ষ তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

আমাদের বুঝতে হবে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মূল উদ্দেশ্য কেবল ‘পণ্ডিতদের আড্ডাখানা’ তৈরি করা নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো একপক্ষীয় ও স্বেচ্ছাচারী সংবিধান সংশোধন রোধ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে কোনো দল মাত্র ৪০ শতাংশের ঘরে ভোট পেয়েও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বাগিয়ে নেয়।

এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই বিএনপি চতুর্দশ এবং আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল, যা দেশের রাজনীতির জন্য ছিল চরম ধ্বংসাত্মক। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতন্ত্রের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

‘খেলার নিয়ম’ বা সংবিধান যেন কোনো একক দল নিজেদের সুবিধামতো পাল্টে ফেলতে না পারে, সেটিই নিশ্চিত করা জরুরি। আর এ কারণেই গণভোটে প্রস্তাবিত পিআর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির উচ্চকক্ষ—যাদের সংবিধান সংশোধনে অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন লাগবে—একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আদর্শগতভাবে এটি উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ হওয়া উচিত ছিল, তবে অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শর্ত থাকাও সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের পথে বাধা হতে পারে।

জুলাই সনদে প্রস্তাবিত এই ‘হাইব্রিড সিস্টেম’, যেখানে নিম্নকক্ষ হবে প্রচলিত ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে এবং উচ্চকক্ষ হবে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে—একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ নকশা। উচ্চকক্ষের ক্ষমতা কেবল সংবিধান পরিবর্তন ও যুদ্ধ ঘোষণার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

ফলে সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বা সাধারণ আইন প্রণয়নে কোনো অচলাবস্থা তৈরির সুযোগ নেই। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে, অন্যদিকে পিআর পদ্ধতির সুফলও নিশ্চিত করবে। কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই বিএনপির এমন একটি যৌক্তিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করা সত্যিই দুঃখজনক।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা নির্বাচনের আগে প্রকাশ করা হবে না। এটি কি গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এর পরিষ্কার ইঙ্গিত হলো নিম্নকক্ষে যেসব হেভিওয়েট নেতা পরাজিত হবেন, তাঁদের ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে সংসদে আনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ভোটাররা কাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাচ্ছেন, তা জানার অধিকার তাঁদের আছে। নির্বাচনের পরে নিজেদের পছন্দমতো লোক বসানোর এই পরিকল্পনা ভোটারদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা।

সব শেষে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, তা হলো বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব একদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে কথা বলছে, অন্যদিকে ইশতেহারে এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা গণভোটের একটি মৌলিক প্রস্তাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। যদি জনগণ গণভোটে পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ এবং সংবিধান সংশোধনে তার ক্ষমতার পক্ষে রায় দেয়; পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে জিতে বিএনপি তাদের ইশতেহার অনুযায়ী উল্টো পথে হাঁটে, তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? তখন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এক নতুন সংঘাত সৃষ্টি হবে।

দেশ যখন স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের দিকে এগোতে চাইছে, তখন এমন স্ববিরোধিতা নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। বিএনপিকে বিষয়টি গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।

  • ইসলামুল হক পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার, ইয়েল ইউনিভার্সিটি।

    ই–মেইল: mhaque.islamul@gmail.com

*মতামত লেখকের নিজস্ব