
জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে মানুষটি পরম মমতায় নিজের পরিবার ও সমাজকে গড়ে তুলেছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যখন নিজের চেনা বসতভিটা, প্রিয় সন্তান, এমনকি নিজের নামটি পর্যন্ত মনে করতে পারেন না—তখন এর চেয়ে গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না।
ডিমেনশিয়া কোনো নিছক বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক উপসর্গ বা সাধারণ স্মৃতিভ্রংশ নয়; এটি মস্তিষ্কের এক জটিল ও ক্রমবর্ধমান ক্ষয়িষ্ণু রোগ, যা একজন মানুষের আত্মমর্যাদা, পরিচিতি ও মৌলিক সক্ষমতাকে নিঃশেষ করে দেয়। অথচ আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একে কেবল বয়সের ভার বা ভীমরতি বলে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রবীণদের নীরব এই হাহাকার ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় ডিমেনশিয়া নীতিমালা বা পলিসি প্রণয়ন করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন সক্রিয় সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্পষ্ট বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ২০১৭ সালের ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল ডিমেনশিয়া–বিষয়ক বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০১৭)।
সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অন্যতম মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল সদস্যদেশগুলোর অন্তত ৭৫ শতাংশ দেশে নিজস্ব ডিমেনশিয়া কর্মকৌশল বা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা। পরবর্তী সময়ে এই লক্ষ্যমাত্রার মেয়াদ বাড়ানো হলেও বাংলাদেশ এখনো কোনো জাতীয় রূপরেখা চূড়ান্ত করতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক ফোরামে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদেই এই নীতি প্রণয়ন এখন আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।
গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ বা বৈশ্বিক রোগভার নিরীক্ষার সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ডিমেনশিয়া দ্রুততম সময়ে শারীরিক অক্ষমতা ও পরনির্ভরশীলতার শীর্ষ কারণে রূপ নিচ্ছে (জিবিডি ডিমেনশিয়া ফোরকাস্টারস, ২০২২)। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ দেশব্যাপী পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। বর্তমানে দেশে এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ, যা ২০৫০ সাল নাগাদ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি দ্রুত বর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশে এই বিপুল রোগভার মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতি এখনই না নিলে সামনের দিনগুলোতে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।
আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যে পথ দেখাতে শুরু করেছে। ভারত ডিমেনশিয়া যত্নে সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করেছে । ইন্দোনেশিয়া তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিমেনশিয়া শনাক্তকরণ ও পরিবারের প্রশিক্ষণকে মূলধারায় যুক্ত করেছে। শ্রীলঙ্কাও তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকাঠামোর ভেতর প্রবীণদের এই সুরক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা পারলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?
আজকের যে প্রবীণ নাগরিক স্মৃতি হারিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন, স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তুলতে এবং আজকের মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁদের অসামান্য শ্রম ও ঘাম জড়িয়ে রয়েছে। জীবনের অপরাহ্ণে এসে সেই মানুষগুলোকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। ডিমেনশিয়ার চূড়ান্ত ধাপে একজন ব্যক্তি খাওয়া, গোসল বা টয়লেটে যাওয়ার মতো ন্যূনতম কাজগুলোও নিজে করতে পারেন না; তীব্র ভয়, বিভ্রান্তি, অনিদ্রা ও আগ্রাসী আচরণের শিকার হন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাঠামোগত সেবা না থাকলে এই প্রবীণ নাগরিকদের জীবন কাটে চরম অবহেলা আর অস্বস্তিতে।
বাংলাদেশে বিশেষায়িত ডে-কেয়ার বা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সেবাকেন্দ্রের তীব্র ঘাটতি থাকায় ডিমেনশিয়ার পুরো যত্নভার গিয়ে পড়ে পরিবারের কাঁধে, যার প্রধান শিকার হন নারী সদস্যরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কেয়ারগিভার বার্নআউট’ বা সেবাদানকারীর শারীরিক ও মানসিক চরম অবসাদ। দিনের পর দিন রোগীর বিভ্রান্তিকর আচরণ সামলাতে গিয়ে স্বজনেরা অপরাধবোধ ও বিষাদের অতলে তলিয়ে যান। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অনেকে রোগীকে ঘরে তালাবদ্ধ বা শিকলবন্দী করে রাখেন, যা কোনো নিষ্ঠুরতা নয়—বরং পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাহীনতার এক করুণ ও অসহায় প্রতিফলন। জাতীয় নীতিমালা ছাড়া সমাজভিত্তিক রেসপাইট কেয়ার বা স্বজনদের সাময়িক বিশ্রাম ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার কোনো কাঠামো গড়ে উঠবে না।
এর পাশাপাশি যোগ হয় ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধাক্কা। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি মেটাতে হয় ব্যক্তি বা পরিবারের পকেট থেকে, যাকে বলা হয় ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’। ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা বছরের পর বছর স্থায়ী হয়; নিয়মিত ওষুধ, মস্তিষ্কের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিয়মিত ডায়াপার ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যাকারীর পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা ‘ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেনডিচার’-এর শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য সমতা অর্জন করতে হলে ডিমেনশিয়াকে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক সুরক্ষা সেফটি নেটের আওতায় আনতেই হবে।
আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যে পথ দেখাতে শুরু করেছে। ভারত ডিমেনশিয়া যত্নে সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করেছে (আলঝেইমারস অ্যান্ড রিলেটেড ডিজঅর্ডারস সোসাইটি অব ইন্ডিয়া, ২০২০)। ইন্দোনেশিয়া তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিমেনশিয়া শনাক্তকরণ ও পরিবারের প্রশিক্ষণকে মূলধারায় যুক্ত করেছে। শ্রীলঙ্কাও তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকাঠামোর ভেতর প্রবীণদের এই সুরক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা পারলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?
একটি জাতীয় ডিমেনশিয়া পলিসির মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা হাসপাতালে প্রাথমিক স্ক্রিনিং চালু করা, প্রবীণদের বিশেষ ভাতা প্রদান, পরিবারের পরিচর্যাকারীদের বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ডিমেনশিয়া কোনো পাগলামি নয়—এটি একটি চিকিৎসাজনিত রোগ, এমন জনসচেতনতা ছড়িয়ে সামাজিক স্টিগমা দূর করা সম্ভব। ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মানুষটি হয়তো সমাজের স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্র তাঁকে ভুলে যেতে পারে না। একটি সংবেদনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থেই অবিলম্বে জাতীয় ডিমেনশিয়া পলিসি বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের আশু অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
*মতামত লেখকের নিজস্ব