কাপ্তাই লেকে জাল ফেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলেরা। কাট্টলি বিল, লংগদু, রাঙামাটি
কাপ্তাই লেকে জাল ফেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলেরা। কাট্টলি বিল, লংগদু, রাঙামাটি

মতামত

কাপ্তাই থেকে সব রুই-কাতলা গেল কোথায়

কাপ্তাই হ্রদ একসময় ছিল বড় মাছের অভয়াশ্রম। রুই, কাতলা, মৃগেলের দাপটে এই হ্রদ শুধু উৎপাদনের দিক থেকে নয়, জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও ছিল বেশ সমৃদ্ধ। জেলেদের জালে ধরা পড়ত বড় আকারের মাছ, বাজারে মিলত তার যথাযথ দাম; ফলে স্থানীয় অর্থনীতির ভিত ছিল মজবুত। কিন্তু আজকের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। হ্রদে ছোট মাছের আধিক্য চোখে পড়ে ঠিকই, তবে বড় মাছের উপস্থিতি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। মাছের মোট উৎপাদন হয়তো একেবারে কমে যায়নি, কিন্তু গুণগত দিক থেকে বড় এক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

এই পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি; এটি ধীরে ধীরে ঘটে যাওয়া এক নীরব রূপান্তর। একসময় কাপ্তাই হ্রদে প্রায় ৮০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, যা এখন কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে গত এক দশকে কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। একসময় মোট মৎস্য উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য
অংশ ছিল রুই-কাতলা, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় নগণ্য পর্যায়ে। বিপরীতে ছোট প্রজাতির মাছের আধিক্য বেড়েছে, যা হ্রদের সামগ্রিক বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়।

এই অবস্থার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, হ্রদের পানির স্বাভাবিক ওঠানামার ছন্দ নষ্ট হয়ে যাওয়া। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর ফলে পানির স্তরে যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, তা মাছের প্রজননচক্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কার্পজাতীয় মাছ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট পরিবেশে প্রজনন করে। পানির হঠাৎ ওঠানামা এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে চরমভাবে ব্যাহত করে।

কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই হ্রদকে তার সোনালি অতীতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, পলি জমে হ্রদের গভীরতা কমে যাওয়া। মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যেসব অগভীর, উদ্ভিদসমৃদ্ধ এলাকা একসময় মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ স্থান ছিল, সেগুলো এখন কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের মাছ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তৃতীয়ত, আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির বিস্তার। সাকার ফিশ, পিরানহা বা পাকুর মতো বিদেশি প্রজাতিগুলো স্থানীয় মাছের সঙ্গে খাদ্য ও আবাসস্থলের জন্য লড়াই করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এরা দেশীয় মাছের ডিম ও পোনা খেয়ে ফেলছে। এটি হ্রদের জন্য একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক হুমকি। এখনই এসব প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

চতুর্থত, অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ। নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা এবং মশারি জালের মতো ক্ষতিকর উপকরণের ব্যবহার পোনা ও প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। দেশে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় সংকটটি দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে কাপ্তাই হ্রদ এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে—যেখানে হ্রদভর্তি ছোট মাছ, কিন্তু উচ্চমূল্যের বড় মাছের তীব্র অভাব। এতে মাছের মোট উৎপাদন হয়তো কাগজের হিসাবে স্থিতিশীল থাকে; কিন্তু পুষ্টিগুণ, জেলেদের আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্য কমে যায়। এটি ‘গুণের চেয়ে পরিমাণকে’ গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রবণতামাত্র, যা দীর্ঘ মেয়াদে কোনোভাবেই টেকসই নয়।

তাহলে করণীয় কী? এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় অবশ্যই আছে, তবে তা খণ্ডিতভাবে নয়; সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রথমেই পানি ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। পলি অপসারণ করে হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করা জরুরি। পাশাপাশি আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ। এ ছাড়া নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, কাপ্তাই হ্রদকে কেবল একটি ‘মাছের খামার’ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু মাছের ওপরই পড়ে না, তা খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিকেও পথে বসিয়ে দেয়। তাই সমাধানের পথে স্থানীয় জেলে, প্রশাসন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে ‘সহব্যবস্থাপনা’ (কো-ম্যানেজমেন্ট) গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাঁদের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তাঁরা নিয়ম মেনে চলতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত হন।

কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই হ্রদকে তার সোনালি অতীতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে আশার কথা, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। পরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদ আবারও তার হারানো প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

  • ড. মো. শরীফুল ইসলাম সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষিকেন্দ্র

    bausharif@gmail.com