মতামত

শিক্ষার্থী পরিচয় নিয়ে মা হওয়া যাবে না তাহলে?

দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে। সমাজের অস্পৃশ্য, নিম্নবিত্ত একটি পরিবারের গৃহবধূ প্রসববেদনায় কাতরাচ্ছেন। সে মুহূর্তে বাড়ির আঙিনায় বসে আলু পুড়িয়ে খাচ্ছেন তাঁর স্বামী ও শ্বশুর। বাবা-ছেলে দুজনেই পেশাগতভাবে চর্মকার। এক ঘণ্টা কাজ করলে এক ঘণ্টা চুরুট টানেন। আয়রোজগার নেই। তা নিয়ে অবশ্য তাঁদের খুব একটা ভাবনাও নেই। ঋণে জর্জরিত তিন প্রাণীর সংসার। ঘরের মেঝেতে গোটা তিনেক বাসন আর ছেঁড়া কাপড়ে দিব্যি চলে যায় তাঁদের।

আলু খাওয়া হলে দুজন গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েন ঘরের দাওয়াতেই। ঘরের ভেতর থেকে আসা গৃহবধূর করুণ আর্তনাদ উপেক্ষা করেই ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে উঠে দেখা যায়, অনাগত সন্তান মাতৃগর্ভেই চিরবিদায় নিয়েছে। আর তার গর্ভধারিণীর ফ্যাকাশে মুখের ওপর ব্যস্ত হয়ে উড়তে থাকা মাছির দল দেখে স্বামী বুঝে নেন, বিদায় নিয়েছে তাঁর স্ত্রীও।

মা ও সন্তান মারা গেলে এলাকার সহৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে হাত পেতে বাবা-ছেলে কাফনের টাকা জোগাড় করেন। অবশ্য সে টাকা নিয়ে তাঁরা চলে যান পানশালায়, মদ খেতে। যতক্ষণ হুঁশ থাকে, বাবা বলতে থাকেন, ‘বেচারি বেঁচে থাকতে একটুকরা ছেঁড়া কাপড় পেল না, আর এখন মরার পর তাকে একখানা নতুন কাফন কিনে দিতে হবে।’

হিন্দি ও উর্দু ভাষার জীবনবাদী সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচান্দ (প্রকৃত নাম ধনপত রায়)-এর ‘কাফন’ (১৯৩৬) নামে গল্পের পাতা থেকে নেওয়া ওপরের ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। তবে এর হালনাগাদ সংস্করণ যেন কিঞ্চিৎ পরিমার্জিতরূপে ২০২৩ সালেও দৃশ্যমান।

সেদিন ‘কাফন’-এর গৃহবধূ ও তাঁর অনাগত সন্তান তাদের জীবন ত্যাগ করেছিল শিক্ষাহীন, বিবেকহীন নিম্নবর্ণের দুজন চুরুটখোর চর্মকার পুরুষের পরিবারে প্রসবকালে প্রয়োজনীয় সেবার অভাবে। আজ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তান ধারণকারী নারী শিক্ষার্থীকে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ‘প্রাধ্যক্ষ ম্যাডাম’ (যিনি একজন নারী ও শিক্ষিত মানুষ) অযোগ্য বিবেচনা করেন সন্তান ধারণের ‘অপরাধে’।

এ নিয়ে প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটিকে ইংরেজিতে এককথায় বলা যায় ‘শকিং’। কিন্তু ম্যাডামকে দোষ দেওয়ার সুযোগ আছে কি না, তা খানিক ভাবা দরকার।

কারণ, প্রথমত মোটেও বেআইনি কিছু তিনি করেননি, প্রশাসনের অংশ হিসেবে আইনের প্রয়োগ করেছেন মাত্র। প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে—আবাসন লাভ ও বসবাসের শর্তাবলি এবং আচরণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা ২০২১-এর ১৭ নম্বর ধারা মোতাবেক বিবাহিত ও গর্ভবতী ছাত্রীরা আবাসিক সিট (আসন) পাবেন না। এই রকম উদ্ভট ও অধিকারবিরোধী আইন যিনি/ যাঁরা প্রণয়ন করেছেন, তাঁর/ তাঁদের চিন্তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, এ ধরনের চিন্তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব পৃথিবীতে সেই চুরুটখোর চর্মকার বাবা-ছেলের চিন্তার সঙ্গে বেশ মিলে যায়, যা সমাজে দুশ্চিন্তার উদ্রেক করে।

দ্বিতীয়ত, অতীতে ওই আবাসনে গভীর রাতে একজন হবু মা-শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে বিধায় অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রাধ্যক্ষ ম্যাডাম সন্তানধারণকারী ছাত্রীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা নাকচ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা যতই সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হোক না কেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সেবার সূচনা করার কথা তাঁর মাথায় আসেনি।

এ-জাতীয় অন্যায় আচরণের যৌক্তিকতা বুঝতে হলে খানিকটা ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের আশ্রয় নিতে হবে। কোনো ধারণা, প্রথা, রীতি; তথা সমাজব্যবস্থা শিক্ষিত মানুষকে প্রভাবিত করলে, একজন বিবাহিত নারীর প্রজননের আধিকারকে অপরাধ হিসেবে সমাজ দেখে—তার ব্যাখ্যা জানা দরকার বৈকি।

১৬৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮৪৭ সালে আবেদন করা নারী শিক্ষার্থীদের মেডিকেল স্কুলে ‘শিক্ষার্থী’ হিসেবে ঢুকতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ এক শ বছর।

১০৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস করার অনুমতি পেয়েছিল মাত্র এক শ বছর আগে, অর্থাৎ ১৯২০ সালে। আর ১৮৬৯ সালে প্রথমবারের মতো নারী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি তথা ডিগ্রি প্রদান করেছিল পরের শতাব্দীতে, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে। পুরুষতান্ত্রিকতার দাপটে সৃষ্ট ঐতিহাসিকভাবে নারীকে পেছনে রাখার তালিকাটি দীর্ঘ না করে, বরং সমাজবিজ্ঞানের পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার প্রতি আলোকপাত করা যাক সংক্ষেপে।

শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং সন্তান ধারণ, জন্মদান ও প্রতিপালন—এসবই যিনি একসঙ্গে করতে সক্ষম, তাঁকে অভিনন্দন জানানোর সংস্কৃতি শুরু হওয়া উচিত। শিক্ষাগ্রহণের পথে মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়—এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে তখন, যখন একটি মেয়ের যোগ্যতাকে খাটো করে দেখার ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও অবিদ্যা দূর হবে।

নারীর দক্ষতা, যোগ্যতা, ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাকে খাটো করে দেখার প্রবণতা ট্যালকট পার্সন, অগাস্ট কোতে, এমিল ডার্খেইমের মতো সমাজবিজ্ঞানীদের ছিল। তাঁদের সময়ে নারীকে মোটামুটি দ্বিতীয় শ্রেণির বা সেকেন্ড ক্লাস মানুষ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো। তাঁদের মত ছিল, পুরুষ যা করতে পারে, অর্থাৎ গাণিতিক বা বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের যেসব কাজ, তার ধারেকাছেও নারী অবদান রাখতে পারেন না। কারণ, তাঁরা মূলত গৃহকর্ম সম্পাদনের জন্যই বুদ্ধি রাখেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীর অবস্থান ও অবস্থা বদলেছে বলেই বেগম রোকেয়ার মতো মহীয়সী ও দুঃসাহসী নারী পৃথিবীতে এসেছিলেন, যার ফলে দীপিকা রানী সরকারের মতো নারীদের প্রাধ্যক্ষের আসনে আজ আসীন হওয়ার সুযোগ মিলেছে।
কিন্তু আফসোস, নারীর পেছনে পড়ে থাকার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ও সমাজবিজ্ঞানের প্রাচীন ব্যাখ্যাগুলোর প্রভাব এত বেশি গভীরে পৌঁছে গিয়েছে যে সেখান থেকে নারী-পুরুষের একটা বড় অংশ বের হয়ে আসতে পারেনি এখনো।

আর সে কারণেই নারীর প্রজননের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য অনায়াসে আইন তৈরি হয় দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মেয়েদের একটি আবাসিক হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েও মেয়েদের প্রজননের অধিকারকে আইনের প্যাঁচে ফেলে কৃতিত্ব অর্জনের চেষ্টা করেন তাঁরা।

শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং সন্তান ধারণ, জন্মদান ও প্রতিপালন—এসবই যিনি একসঙ্গে করতে সক্ষম, তাঁকে অভিনন্দন জানানোর সংস্কৃতি শুরু হওয়া উচিত। শিক্ষাগ্রহণের পথে মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়—এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে তখন, যখন একটি মেয়ের যোগ্যতাকে খাটো করে দেখার ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও অবিদ্যা দূর হবে।

সন্দেহ নেই, প্রতিবেদনের ঘটনাটি হতাশাজনক, দুঃখজনক। কিন্তু ঘটনাটি এ-ও মনে করিয়ে দেয়, এই বাংলাদেশেই সন্তানের মা হওয়ার কারণে নারী যেন শিক্ষা থেকে পিছিয়ে না যান, সে জন্য শিক্ষক কামরুল ইসলাম ছাত্রী ফাতিমা আক্তারের মেয়ে মারিয়ামকে কোলে নিয়ে পরীক্ষা হলে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেটা দীপিকা রানী যে প্রতিষ্ঠানের হলের প্রাধ্যক্ষ, সেই প্রতিষ্ঠানেই। আরও মনে করিয়ে দেয় রাজধানীর আশুলিয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমেদ মাহবুবুল আলমের কথা, যিনি পরীক্ষা হলে ছাত্রীর শিশুসন্তানকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে ছাত্রীকে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিতে বলেন।

মনে পড়ে, স্বামীর অনুপ্রেরণায় ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় মাত্র এক দিন আগে মা হওয়া সিলেটের পিংকী রানী পাল (২২) অনার্স চতুর্থ বর্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরীক্ষা দেন হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসেই।

এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় কাঠামোগত ও সংস্কৃতিগত পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে বের হওয়া সম্ভব। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য সদ্য মা হওয়া নারীর কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীর চাহিদামতো অবকাঠামো তৈরি করার বদলে সন্তান ধারণের অপরাধে ছাত্রীকে হলে আসন না দেওয়ার আইন বদলানোর সময় হয়েছে অনেক আগেই। তা না হলে আজ অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, কাল র‍্যাম্প নেই বলে হুইলচেয়ার-নির্ভর শিক্ষার্থীকেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হবে।

মাথায় ব্যথা হলে তার চিকিৎসার পরিবর্তে মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়। তাই অ্যাম্বুলেন্স নেই, চিকিৎসক নেই, নার্স নেই ইত্যাদি অজুহাতে সেকেলে কাঠামো নিয়ে পড়ে থাকার মধ্যে আত্মপ্রসাদ লাভ করা গেলেও, সমাজটা পিছিয়ে যায়। বরং তৃপ্তি লাভ করার কথা সেই ব্যবস্থা সৃষ্টির মধ্যে, যেখানে হবু মা কিংবা সদ্য মা হওয়া নারী নিজের প্রজনন ও শিক্ষার অধিকার সমানভাবে লাভ করেন।

  • ইশরাত জাকিয়া সুলতানা সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।