ট্রলার থেকে ঝুড়িতে করে বিক্রির জন্য ইলিশ কক্সবাজারের ফিসারীঘাট মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।
ট্রলার থেকে ঝুড়িতে করে বিক্রির জন্য ইলিশ কক্সবাজারের ফিসারীঘাট মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।

মতামত

ইলিশ কমছে কেন, সে প্রশ্নের উত্তর আগে দরকার

১৮ সেপ্টেম্বর মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত থেকে আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ইলিশ আমদানি বন্ধ হলে কি দেশের ইলিশের সংকট মিটবে? প্রশ্নটি আসলে আরও গভীর। এর অন্তরালে যে মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, সেটি হলো বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের বিচরণ ও প্রাপ্তি কমছে কেন?

দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান ১২ থেকে ১৩ শতাংশ এবং জাতীয় জিডিপিতে এর অংশ প্রায় ১ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, প্রায় ৫ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং পরিবহন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন আরও ২০-২৫ লাখ মানুষ। সুতরাং ইলিশ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক বড় চালিকা শক্তি।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবিবের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মৎস্যবিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে কেবল জেলের জালে কী পরিমাণ মাছ উঠছে, তা দেখলে চলবে না। নজর দিতে হবে নদী, মোহনা, প্রজননক্ষেত্র, প্রজাতিটির অভয়াশ্রম এবং সমুদ্র থেকে নদীতে চলাচলের প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথের ওপর। বর্তমানে দেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের সার্বিক মজুত বা ‘স্টক অ্যাসেসমেন্ট’ কেমন, কত আকারের মাছ কী পরিমাণে আছে এবং প্রজননক্ষম মাছের ঘনত্ব কেমন—এসব বৈজ্ঞানিক তথ্যের নির্ভরযোগ্য উত্তর ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা অসম্ভব।

বিশেষ করে যেভাবে ইলিশের মোট উৎপাদন ও একক মাছের গড় ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, তা সামগ্রিক মৎস্য খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি ইলিশ-গবেষক ড. আনিসুর রহমান এ সংকটকে চিহ্নিত করে উল্লেখ করেছেন যে জাটকা বা ছোট ইলিশকে বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত সুযোগ না দিলে বড় মাছ পাওয়া অসম্ভব। পাশাপাশি উজানের নদীগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ঘাটতি এবং উপকূলীয় মিঠাপানির অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ধেয়ে আসার কারণেও প্রজনন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৭ হাজার মেট্রিক টন, যা ১২ শতাংশের মতো। শুধু সার্বিক উৎপাদনই কমেনি, ইলিশের গড় আকার ও ওজন কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের পেছনে নদী ও সামুদ্রিক পরিবেশের নানাবিধ সংকটও স্পষ্ট। নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রের আশপাশে পানিদূষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহার, নাব্যতাসংকটে ডুবোচর সৃষ্টি, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। খাদ্যাভ্যাসের প্রধান উপাদান প্লাঙ্কটনের রূপান্তর এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে প্রজাতিটির প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথ বদলে যাচ্ছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্​ঘাটন করা দরকার।

আমাদের নদীগুলোতে পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার কারণে ইলিশ বিকল্প প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ভারত বা মিয়ানমারের নদ-নদীতে চলে যাচ্ছে কি না, এ সম্ভাবনাকে কেবল অনুমানের ওপর না রেখে আধুনিক গবেষণার আওতায় আনতে হবে।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সমুদ্রসীমায় ইলিশের ওপর অতি আহরণের চাপ। সমুদ্র থেকে যদি পরিণত ও ডিমওয়ালা ইলিশ অতিরিক্ত পরিমাণে আহরণ করা হয়, তবে নদীতে ডিম ছাড়ার জন্য পর্যাপ্ত ইলিশ প্রবেশ করতে পারে না। নদীতে জেলেদের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার বিষয়টি সমুদ্রের অতিরিক্ত আহরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি উদ্বেগজনক ও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন নজরে আসছে। তুলনামূলক ছোট আকারের ইলিশে ডিম বা পরিপক্বতা আসার প্রবণতা। বড় ও পরিণত স্ত্রী মাছগুলো অব্যাহতভাবে আহরিত হতে থাকায় বংশ রক্ষার্থে ইলিশ কি স্বাভাবিকের চেয়ে কম বয়সে পরিপক্ব হয়ে উঠছে?

একটি পূর্ণাঙ্গ পরিণত ইলিশের ডিম বা পোনার টিকে থাকার ক্ষমতা যতটুকু, অপরিপক্ব বা ছোট ইলিশের ডিমের টিকে থাকার হার তার চেয়ে অনেক কম। ফলে এই পরিবর্তন যদি সত্যি ঘটে থাকে, তবে তা ইলিশের সার্বিক প্রজননক্ষমতা ও নতুন প্রজন্মের সংযোজনের ওপর দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ ছাড়া সম্প্রতি ভারতের গুজরাট থেকে আসা ইলিশগুলো তুলনামূলক বড় ও ডিমযুক্ত হওয়ায় দুই দেশের ইলিশের বয়সভিত্তিক বিন্যাস, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত অভিযোজন নিয়ে একটি তুলনামূলক গবেষণা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের গবেষকদের হাতে ইলিশের জীবনরহস্য বা ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং’ উন্মোচিত হওয়া মাৎস্যবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী সাফল্য। 

আমাদের নদীগুলোতে পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার কারণে ইলিশ বিকল্প প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ভারত বা মিয়ানমারের নদ-নদীতে চলে যাচ্ছে কি না, এ সম্ভাবনাকে কেবল অনুমানের ওপর না রেখে আধুনিক গবেষণার আওতায় আনতে হবে।

আশার কথা হলো, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশ নিয়ে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছে। যেহেতু ইলিশ কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত মানে না, তাই এ ধরনের ত্রিদেশীয় গবেষণার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ‘আঞ্চলিক মৎস্য কূটনীতি’ জোরদার করে তথ্য আদান-প্রদান ও টেকসই আহরণনীতি বাস্তবায়ন করা দরকার।

ফলে ইলিশ নিয়ে আলোচনা কেবল ‘আমদানি বন্ধ’ বনাম ‘আমদানি চালু’—এই দ্বিমুখী বিতর্কে আটকে রাখা মোটেও সংগত নয়। নদীর পরিবেশ রক্ষা, কঠোর নজরদারি, জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আঞ্চলিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই জাতীয় সম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ইলিশকে রক্ষা করতে হলে শুধু কত টন মাছ ধরা পড়ল, সে হিসাব করলেই হবে না; বুঝতে হবে মাছটির পুরো জীবনচক্র। জেলের অভিজ্ঞতা, ভোক্তার কষ্ট, গবেষকের তথ্য—সবকিছুকে একসুতায় গাঁথতে হবে।

মো. বশিরুল ইসলাম কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

mbashirpro1986@gmail.com