ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি পরিবারের একজনকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হওয়া সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনিকে নির্বাচিত করা হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি প্রয়াত আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রায় ৩৬ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই মোজতবার স্ত্রী এবং ধারণা করা হয় তাঁর এক সন্তানও নিহত হন।
মোজতবা খামেনি আগে কখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। অনেকের মতে, বহু বছর ধরে তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য কৌশল করে যাচ্ছিলেন, যেখানে প্রায় কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য ছাড়াই বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়।
অনেকের ধারণা বিশ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকেই মোজতবা তাঁর বাবার উত্তরসূরি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা বানানোর সিদ্ধান্ত ইরানের ওপর হামলা চালানো শক্তিগুলোর প্রতি একধরনের প্রতিরোধের বার্তাও হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, হামলাকারীদের লক্ষ্য যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, তা স্পষ্ট।
৩ মার্চ ইসরায়েল এমন এক ভবনে হামলা চালায়, যেখানে ৮৮ জন আলেমের পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য বৈঠক করার কথা ছিল।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলী খামেনিকে ইতিহাসের সবচেয়ে দুষ্ট মানুষের একজন বলে মন্তব্য করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মোজতবা খামেনিকেও গ্রহণযোগ্য নন বলে মন্তব্য করেন।
মোজতবাকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কাও সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘোষণাটি বিলম্বিত হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। প্রথম খবর ফাঁস হওয়ার পাঁচ দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ঘোষণাটি শিয়া সম্প্রদায়ের ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা থেকে তাঁকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
রবিবার এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘মোজতবাকে আমাদের অনুমোদন নিতে হবে। যদি তিনি আমাদের অনুমোদন না পান, তাহলে তিনি বেশি দিন টিকতে পারবেন না। আমরা চাই না প্রতি দশ বছর পরপর আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক, বিশেষ করে যখন আমার মতো প্রেসিডেন্ট থাকবে না, যে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।’ মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের খবরটি ইরানের মানুষের কাছে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর সম্পর্কে নানা ধরনের ক্ষমতার কৌশল ও রাজনৈতিক চালচিত্রের গল্প প্রচলিত রয়েছে।
২০০৫ সালে যখন তেহরানের তুলনামূলকভাবে অল্প পরিচিত মেয়র মাহমুদ আহমাদিনেজাদ হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন ধারণা করা হয় যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ প্যারামিলিটারি বাহিনীর সমর্থন নিশ্চিত করতে মোজতবা খামেনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এরপরের বছরগুলোতে কোম শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার আড়ালে তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
অনেকের মতে, তাঁর বাবার মতোই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ওই বাহিনীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির বড় অংশই হুমকির মুখে পড়েছে।
রোববার বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে নতুন নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, পূর্ণ আনুগত্য এবং নিঃশর্ত বাধ্যতার অঙ্গীকার করেছে। তেহরানভিত্তিক এক বিশ্লেষকের মতে, গার্ড বাহিনী এখন শুধু প্রক্সি গোষ্ঠী বা ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছে না। তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই লড়ছে। তারা এমন এক জটিল ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে, যার শাখা-প্রশাখা ইরানের অর্থনীতি, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। এই কাঠামো অন্য অনেক শক্তি ও গোষ্ঠীকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
ওই বিশ্লেষক আরও বলেন, এখন অনেক গোষ্ঠী প্রকাশ্যেই বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ক্ষমতা সীমিত করা বা এমনকি তা ভেঙে দেওয়ার কথাও বলছে। যদি এ ধরনের কোনো গোষ্ঠীর কেউ সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে গার্ড বাহিনীর দিন ফুরিয়ে যেতে পারে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো হয়তো মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় ওঠার পথ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে দেশের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগও সংকুচিত করেছে। বরং এই যুদ্ধ ইরানের সেই বিপ্লবী আদর্শকে আরও শক্ত করেছে, যেখানে দেশটিকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়।
আগে যদি সামান্য সম্ভাবনাও থাকত যে মোজতবা খামেনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো বড় ধরনের সংস্কারের পথে যেতে পারেন, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নও থাকতে পারত। এখন তা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। ওই হামলায় তিনি শুধু বাবাকেই হারাননি, হারিয়েছেন মা, স্ত্রী এবং এক সন্তানকে। তাঁর মনে প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, আর গার্ড বাহিনীও তা জানে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধিতাও মোজতবা খামেনির নির্বাচিত হওয়ার পথ আরও সহজ করে থাকতে পারে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক কর্মীর মতে, খামেনির ছেলে উত্তরসূরি হতে পারেন—এমন সম্ভাবনা আগেই ছিল। গত কয়েক মাসে অন্য গোষ্ঠীগুলো ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ৮৮ সদস্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু যখন ট্রাম্প, যাঁকে এই শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখা হয়, প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি মোজতবা খামেনিকে মেনে নেবেন না, তখন তাঁর নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। কারণ, তখন তাঁর বিরোধিতা করলে সহজেই তাঁকে আমেরিকার পক্ষে বলে অভিযুক্ত করা যেত।
মোজতবাকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কাও সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘোষণাটি বিলম্বিত হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। প্রথম খবর ফাঁস হওয়ার পাঁচ দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ঘোষণাটি শিয়া সম্প্রদায়ের ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা থেকে তাঁকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
রক্ষণশীল কলাম লেখক আলী গোলহাকি, যিনি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, নতুন নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁর নির্বাচনের প্রক্রিয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কে আরমিন সেরজোই ইউরোপভিত্তিক ইরানি সাংবাদিক।
টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত