বাংলাদেশের জন্য ধরিত্রী দিবস পালন কোনো প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।
বাংলাদেশের জন্য ধরিত্রী দিবস পালন কোনো প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।

মতামত

যুদ্ধের বারুদে মেশা ধরিত্রীর ভবিষ্যৎ কী

প্রতিবছর ২২ এপ্রিল যখন ধরিত্রী দিবস পালিত হয়, তখন সেটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট তারিখ হিসেবে আমাদের সামনে আসে না; বরং প্রতিটি মানুষের বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়-আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারছি?

২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আওয়ার পাওয়ার, আওয়ার প্ল্যানেট’ বা ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’। এই বার্তাটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আহ্বান।

এই লড়াই কোনো একক সরকার বা ঘনঘন বার্ষিক সম্মেলনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ধরিত্রী রক্ষার এই দীর্ঘমেয়াদি লড়াই নির্ভর করে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস, নাগরিক সচেতনতা এবং সর্বোপরি বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ওপর।

আমরা প্রায়ই পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে শুধু ‘ব্যক্তিগত সচেতনতা’ বা ‘গাছ লাগানো’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে হালকা করে ফেলি।

অথচ ইতিহাস বলে, ধরিত্রী রক্ষা মানেই মানুষের সংগঠিত আন্দোলন। ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিলে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা-ই আজ আধুনিক পরিবেশবাদের শক্ত ভিত্তি।

বর্তমানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই দিবসে শামিল হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তা হলো-এই গ্রহের এক বিস্তীর্ণ অংশ আজ যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে।

যুদ্ধের বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু আকাশকেই অন্ধকার করছে না, এটি দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ (ক্লাইমেট জাস্টিস)-এর সম্ভাবনাকেও নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

যুদ্ধের কার্বন-ক্ষত: অদৃশ্যে বাড়ছে ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা যখন ‘মানবসৃষ্ট’ দুর্যোগ বলি, তখন সেই তালিকায় ‘যুদ্ধ’ শব্দটিকে প্রায়ই আড়ালে রাখি। অথচ আধুনিক যুদ্ধ হলো একটি অতিকায় কার্বন নির্গমনকারী যন্ত্র। সামরিক খাতের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে তথ্যগত ঘাটতি বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বড় সমস্যা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতের মোট ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ বৈশ্বিক নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ।

এই বিপুল পরিমাণ নিঃসরণের তথ্য অধিকাংশ দেশই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করে না। অর্থাৎ, যে কার্বন আমরা হিসাবের খাতায় দেখি না, বাস্তবে তা নিঃশব্দে আমাদের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধের একাধিক উৎস থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়।

সমরযানের জ্বালানি, ভারী গোলাবারুদের ব্যবহার, জ্বালানি অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত, বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া-সবই বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে।

পরিসংখ্যান বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত মোট নিঃসরণ ৩১১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়িয়েছে, যা একটি উন্নত দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান।

অন্যদিকে, গাজা সংকটের কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন, যা জর্ডানের মতো একটি দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলছে, যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। গাজায় জমা হওয়া ৪০ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধ্বংসাবশেষের ভেতরে থাকা রাসায়নিক মাটিকে চিরতরে বিষাক্ত করে তুলছে।

এখানে মূল কথা হলো-যুদ্ধ পরিবেশকে কেবল সাময়িকভাবে ধ্বংস করে না, বরং প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপায়। তাই শান্তি কেবল মানবিক লক্ষ্য নয়, এটি একটি জরুরি জলবায়ু লক্ষ্যও বটে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: অস্তিত্বের লড়াই

বাংলাদেশের জন্য ধরিত্রী দিবস পালন কোনো প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।

বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে প্রথম সারিতে আছি। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আমাদের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ায় লাখ লাখ মানুষের জীবিকা আজ বিপন্ন।

তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালে জমা দেওয়া ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে আমাদের নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ২০.৩১ শতাংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অর্থায়ন আসবে কোত্থেকে?

জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) বাস্তবায়নে আগামী কয়েক দশকে আমাদের প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই অর্থের বড় অংশই আন্তর্জাতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

আর এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি পুনরায় ফিরে আসে, উন্নত দেশগুলোর নির্গমনের দায়ভার কেন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বহন করতে হবে?

ব্যাংকিং খাত ও টেকসই অর্থায়নের শক্তি

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র হলো ‘টেকসই অর্থায়ন’ (সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স)। যে খাতে পুঁজি বিনিয়োগ হবে, সেই খাতই শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা এ ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

এর লক্ষ্য হলো এমন সব প্রকল্পে মূলধন সরবরাহ করা, যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে এবং পরিবেশগত সহনশীলতা বাড়াবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের উচ্চ সুদ। আইএমএফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি সুদ দিতে বাধ্য হয়।

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোট ‘ভি-২০ ’-এর হিসাব মতে, গত এক দশকে এই ‘ক্লাইমেট প্রিমিয়াম’-এর কারণে তারা ৬২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত সুদ দিয়েছে। এটি মূলত ‘ক্ষতস্থানে লবণের ছিটা’ দেওয়ার মতো।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক নির্দেশনাগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ২০২৫ সাল থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট মেয়াদী ঋণের ৫ শতাংশ সরাসরি ‘সবুজ অর্থায়ন’ এবং ৪০ শতাংশ ‘টেকসই অর্থায়নে’ ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৭ হাজার ৮২১ কোটি টাকা এবং টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

এর বিপরীতে সবুজ অর্থায়নে অর্জন প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং টেকসই অর্থায়নে অর্জন প্রায় ৮২ শতাংশ। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল জলবায়ু পরিস্থিতিতে এই অর্জন অর্থনীতির সবুজ রূপান্তরের ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।

গ্রিন বন্ড ও বৈশ্বিক পুঁজির বৈষম্য

কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ সবুজ রূপান্তর সম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাই পুঁজিবাজার ও ‘গ্রিন বন্ড’-এর ভূমিকা এখানে অপরিহার্য। গ্রিন বন্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা-বিনিয়োগকারী নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তাঁর অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

পৃথিবীতে আজ অর্থের অভাব নেই, কিন্তু অর্থের গন্তব্যে সমস্যা আছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট-জিরো’ নিঃসরণ অর্জনে ভৌত অবকাঠামোতে বছরে গড়ে ৯.২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করা প্রয়োজন।

এই ব্যবধান কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পালন জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমাতে পারলে জলবায়ু অর্থায়নের বড় একটি অংশ সেখান থেকেই আসা সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্য এখন দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বনের সময়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের জোরালো দাবি তুলতে হবে, যাতে যুদ্ধের কারণে জলবায়ু লক্ষ্যের যে বিচ্যুতি ঘটছে, তার দায়ভার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর না পড়ে।

অন্যদিকে, দেশের ভেতরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবনা মূল্যায়নের সময় ‘পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি’ (ইএসআরএম) বিবেচনা করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের জন্য এখন দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বনের সময়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের জোরালো দাবি তুলতে হবে, যাতে যুদ্ধের কারণে জলবায়ু লক্ষ্যের যে বিচ্যুতি ঘটছে, তার দায়ভার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর না পড়ে।

টিকে থাকার শেষ সুযোগ

পরিশেষে, ধরিত্রী দিবসকে কেবল পোস্টার বা স্লোগানে আটকে রাখলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে দেশে উপকূল ভাঙে, যেখানে শহরের বায়ু বিষাক্ত হয়-সে দেশে ধরিত্রী দিবস মানে জীবন-মরণের প্রশ্ন।

আমাদের শক্তি লুকিয়ে আছে সঠিক সিদ্ধান্তে, সামাজিক জাগরণে, আধুনিক নীতিতে এবং সবুজ বিনিয়োগের অঙ্গীকারে।

যুদ্ধের এই ডামাডোলের মধ্যে ধরিত্রী রক্ষার শপথ নেওয়া চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু অত্যন্ত জরুরি। যুদ্ধের বারুদ নিভে যাবে একদিন, কিন্তু যে ক্ষত আমরা পৃথিবীর বুকে রেখে যাচ্ছি, তা আগামী শত বছর আমাদের ভোগাবে।

আর্থিক খাত যদি অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত পৃথিবীর স্থায়িত্ব ও টিকে থাকার অনুকূলে অর্থকে প্রবাহিত করা।

আসুন, এবারের ধরিত্রী দিবসে আমরা শপথ নিই, আমরা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলব যা কেবল মুনাফা নয়, মানুষ এবং এই গ্রহকেও সুরক্ষা দেবে।

কারণ, পৃথিবী বিপন্ন হলে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি আমাদের বাঁচাতে পারবে না। আমাদের সম্মিলিত শক্তিই হোক ধরিত্রী রক্ষার প্রধান চালিকাশক্তি।

এম এম মাহবুব হাসান, ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক